মুদ্রা


মুদ্রা  মুদ্রা বলতে সাধারণত এমন একটি ধাতবখন্ডকে বুঝায়, যার একটি নির্দিষ্ট ধাতব বিশুদ্ধি (মেটালিক পিওরিটি) এবং নির্দিষ্ট তৌলরীতি (ওয়েট স্ট্যান্ডার্ড) আছে। নির্দিষ্ট তৌলরীতির ভিত্তিতে এবং নির্দিষ্ট ধাতব বিশুদ্ধির ওপর নির্মিত এই ধাতবখন্ড যখন বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃত ও ব্যবহূত হয় তখন তা মুদ্রা বলে গণ্য হয়ে থাকে। মুদ্রার তৌলরীতি ও ধাতব বিশুদ্ধিকে নিশ্চিত ও স্থিরীকৃত করতে কোন বিশেষ এলাকার সার্বভৌম রাজনৈতিক শক্তি মুদ্রার ওপর নানা প্রতীক, নকশা ও লেখ উৎকীর্ণ করার ব্যবস্থা নেয়। বিভিন্ন প্রকার মুদ্রা সংগ্রহ ও তার গবেষণা হল মুদ্রা সংক্রান্ত বিদ্যা। এ মুদ্রাই প্রাচীন ইতিহাস পূণর্গঠনে ইতিহাসের পুরাতাত্ত্বিক সূত্র হিসেবে কার্যকরী একটি মাধ্যম।

দক্ষিণ এশিয়ার প্রাচীন ইতিহাস চর্চার অন্যতম প্রধান অন্তরায় লিখিত ঐতিহাসিক রচনার অভাব। তাই প্রাচীন ইতিহাস গ্রন্থ থেকে যতটুকু তথ্য নিষ্কাশন করা যায়, তার সঙ্গে পুরাতাত্ত্বিক সাক্ষ্য প্রমাণ না মেলালে দক্ষিণ এশিয়ার প্রাচীন ইতিহাস অস্পষ্ট রয়ে যায়। তাই দক্ষিণ এশিয়ার সুদূর অতীতকে অনুধাবন করতে গেলে পুরাতাত্ত্বিক সাক্ষ্য অপরিহার্য হয়ে দেখা দেয়। এই পুরাতাত্ত্বিক তথ্যসূত্রগুলির মধ্যে থাকে লিপি, মুদ্রা, প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান এবং উৎখনন ও শিল্পসামগ্রী (যেমন ভাস্কর্য, স্থাপত্য এবং চিত্রকলা)। প্রাচীন ইতিহাসের পঠন-পাঠনে (বিশেষত দক্ষিণ এশিয়া প্রসঙ্গে) মুদ্রা একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ আকর তথ্যসূত্র। মুদ্রায় অঙ্কিত প্রতীক, নকশা ও লেখ কোন এক সার্বভৌম রাজার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকতে পারে, আবার সেগুলি সামগ্রিকভাবে কোন বিশেষ রাজবংশের সঙ্গেও জড়িত হতে পারে।

ছাপাঙ্কিত রৌপ মুদ্রা (খ্রিষ্টপূর্ব ৬-৪ শতক) ইমপেরিয়াল সিরিজ, উয়ারি-বটেশ্বর

মুদ্রার দুই পিঠের মধ্যে যেটিতে শাসকের পরিচিতি ও ক্ষেত্র বিশেষে প্রতিকৃতি দেখা যায়, সেটি মুখ্য দিক (অবভার্স) বলে স্বীকৃত। তার অপর পিঠে বহুক্ষেত্রেই খোদিত থাকে ঐ রাজা বা তাঁর বংশের উপাস্য দেবদেবীর প্রতিকৃতি; এই পিঠটি মুদ্রার গৌণ দিক (রিভার্স) বলে উল্লিখিত হয়। গৌণ দিকেও লেখর ব্যবহার থাকতে পারে। মুদ্রার মুখ্য ও গৌণ দিক থেকে কোন শাসক বা কোন রাজবংশের রাজনৈতিক ইতিহাসের বিবিধ তথ্য উদ্ধার করা সম্ভব। উপরন্তু মুদ্রার আলোকে সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় এবং শিল্পকলা সংক্রান্ত তথ্যও গোচরীভূত হয়। তবে মুদ্রা যেহেতু প্রাথমিকভাবে বিনিময় ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত, তাই অর্থনৈতিক ইতিহাস, বিশেষ করে কোন বিশেষ আমলের বাণিজ্যিক ক্রিয়াকলাপ বোঝার জন্য মুদ্রার গুরুত্ব অপরিসীম। এখানে স্পষ্ট করে বলা উচিত যে, মুদ্রা বিনিময়ের অন্যতম মাধ্যম, একমাত্র মাধ্যম নয়। বিনিময়ের অন্য প্রকার মাধ্যমের ক্ষেত্রে কড়ির কথা অবশ্যই উল্লেখনীয়। বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে কড়ির ব্যাপক ব্যবহার দেখা যায় প্রাগাধুনিক, প্রাচীন ও সনাতনী অর্থনৈতিক ব্যবস্থায়। সুদূর অতীতে মুদ্রার উপস্থিতি থেকে অনুমান করা যায় যে, প্রাচীন কালের অর্থনৈতিক জীবনে আর্থ-সামাজিক জটিলতা দেখা দিচ্ছিল। এই জটিলতা ও বস্ত্তগত জীবনে অগ্রগতির ইঙ্গিত পাওয়া যায় বাণিজ্যিক বিকাশ, নির্দিষ্ট ভূখন্ডে আশ্রিত রাষ্ট্রশক্তির প্রসার এবং ভেদাভেদের দ্বারা চিহ্নিত সামাজিক গড়নের ক্ষেত্রে। অর্থাৎ মুদ্রার ব্যবহার সুপ্রাচীন কালে কেবলমাত্র অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপের জন্য ধাতবখন্ডের উপযোগিতাকে প্রমাণ করে না, তার উপস্থিতি এক জটিল আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ফসল হিসেবেই বিবেচ্য।

প্রাচীন মুদ্রা ব্যবস্থা  প্রাচীনকালে বাংলা বলতে কোনও সুসংগঠিত ভূখন্ডকে দেখা যায় না। প্রাচীন বাংলা প্রকৃতপক্ষে চারটি প্রধান অঞ্চলের সমষ্টি। এই চারটি অঞ্চল হলো: (১) পুন্ড্রবর্ধন (মূলত উত্তরবঙ্গ); (২) রাঢ় (বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্ভুক্ত পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, বীরভূম, বর্ধমান, হুগলি ও হাওড়া জেলার একাংশ); (৩) বঙ্গ (বর্তমান বাংলাদেশের ঢাকা-বিক্রমপুর-ফরিদপুর এলাকা) ও (৪) সমতট- হরিকেল (বাংলাদেশের নোয়াখালী-কুমিল্লা-চট্টগ্রাম, অর্থাৎ মেঘনা নদীর পূর্বে অবস্থিত এলাকা)। ব্রিটিশ শাসনাধীন অবিভক্ত বাংলাই এই নিবন্ধে প্রাচীন বাংলার ভৌগোলিক পরিচিতি হিসেবে গৃহীত।

স্বর্ণমুদ্রা (৭ শতক), শশাঙ্ক

প্রাচীন মুদ্রা যদিও বৈদিক সাহিত্যে ধাতবখন্ড বা ধাতবপিন্ড বোঝাতে ‘নিষ্ক’, ‘শতমান’ প্রভৃতি শব্দের প্রয়োগ নজরে আসে, কিন্তু দক্ষিণ এশিয়াতে বিনিময়ের মাধ্যমরূপে মুদ্রার চাক্ষুষ প্রমাণ খ্রিস্টপূর্ব ছয়-পাঁচ শতকের পূর্বে পাওয়া দুরূহ। তক্ষশিলার ভির ঢিবি অঞ্চল ও কাবুলের নিকটবর্তী চমান-ই-হুজুরীর মুদ্রাভান্ডার আবিষ্কৃত হওয়ায় তর্কাতীত প্রমাণ পাওয়া যায় যে, খ্রিস্টপূর্ব পাঁচ শতকে উত্তর ভারতে ধাতব মুদ্রার প্রচলন হয়েছিল। এই মুদ্রাগুলি রৌপ্য নির্মিত এবং ৩২ রতি বা ৫৭.৬ গ্রেণ তৌলরীতি অনুযায়ী প্রস্ত্তত (১ রতি = ১.৮ গ্রেণ)। প্রাক-মৌর্য পর্বের বৌদ্ধ গ্রন্থে কার্ষাপণ নামক যে মুদ্রার বিবরণ জানা যায়, তার সঙ্গে তক্ষশিলা ও চমন-ই-হুজুরীর (কাবুলের নিকটবর্তী স্থনে প্রাপ্ত) মুদ্রাগুলিকে শনাক্ত করা হয়েছে। মুদ্রাগুলির আকৃতি কখনও গোল, কখনও বর্গাকার আবার কখনও আয়তাকার; অর্থাৎ তাদের আকার এই পর্বে স্থিরীকৃত হয়নি। মুদ্রাগুলির ওপরে কোনও শাসক বা রাজবংশের নাম নেই; বস্ত্তত এগুলিতে কোনও লেখ-ই নেই। মুদ্রার একটিমাত্র দিকে বিভিন্ন প্রকারের নকশা ছাপ মারা হয়েছিল। এই ছাপগুলি ধাতবখন্ডের ওপরে সম্ভবত আলাদা আলাদাভাবে মারা হতো। এই কারণে মুদ্রাগুলি ‘ছাপাঙ্কিত মুদ্রা’ (চঁহপয গধৎশবফ ঈড়রহং) বলে অভিহিত। ছাপগুলি সম্ভবত মুদ্রার ধাতুগত বিশুদ্ধি ও নির্দিষ্ট তৌলরীতি প্রত্যয়ীকৃত করার জন্য দেওয়া হতো। যেহেতু এই মুদ্রাগুলিতে কোনও শাসকের পরিচয় লিপিবদ্ধ নেই, তাই অনুমান করা  যুক্তিসঙ্গত যে, ভারতের প্রাচীনতম মুদ্রাগুলি ব্যবসায়ীদের পেশাদারি সংগঠনের দ্বারা জারি করা হতো। ব্যবসায়ীদের কাছে লেনদেনের জন্য নির্দিষ্ট ওজনের ও নির্ধারিত ধাতব বিশুদ্ধি সম্পন্ন ধাতবখন্ডের (অর্থাৎ মুদ্রার) উপযোগিতা অনস্বীকার্য। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, মুদ্রাভান্ডারে অঙ্কচিহ্নিত মুদ্রা ছাড়াও ছিল বাঁকানো পাতের (বেন্ট বার) রৌপ্যমুদ্রা। এগুলি পাঞ্চমাকর্ড মুদ্রা থেকে আলাদা। এদের তৌলরীতিটিও পৃথক। এই মুদ্রাগুলির ওজন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ১৭৩ গ্রেণ, অর্থাৎ কার্ষাপণ তৌলরীতি অনুসারে এগুলি তৈরি হয়নি। মুদ্রাতত্ত্ববিদদের ধারণা বাঁকানো পাতের ১৭৩ গ্রেণ ওজন বিশিষ্ট মুদ্রাগুলি শতমান তৌলরীতি (১৮০ গ্রেণ) অনুযায়ী প্রস্ত্তত করা হয়েছিল। উত্তরভারতে খ্রিস্টপূর্ব ছয়-পাঁচ শতকে যখন মুদ্রার প্রচলন হয়, তখন একই সঙ্গে দেখা দেয় অনেকগুলি নগর, বাণিজ্যের বিকাশ এবং বহু মহাজনপদ।

মুদ্রা (খ্রিস্টীয় ৭-১২ শতক), সমতট

প্রাথমিক মুদ্রাব্যবস্থা  উত্তরভারতের বিভিন্ন এলাকায় যদিও খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম-চতুর্থ শতকে মুদ্রার ব্যবহার নিয়মিত হয়ে যায়, কিন্তু প্রাচীন বাংলায় মুদ্রার অস্তিত্ব আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকের পূর্বে প্রমাণ করা কঠিন। আনু. খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে উত্তরবঙ্গ সম্ভবত মৌর্য শাসনাধীনে আসে। বাংলাদেশের বিখ্যাত প্রত্নক্ষেত্র মহাস্থান থেকে আনু. খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকের যে লেখটি আবিষ্কৃত হয়েছে, তাতে জানা যায়, পুন্ড্রনগরে (বাংলার প্রাচীনতম নগর, বর্তমান মহাস্থানগড়েু তার ভগ্নাবশেষ আবিষ্কৃত) অবস্থিত রাজকোষে ‘গন্ডক’ ও ‘কাকিনী’ রাখার জন্য প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অনেক পন্ডিতের মতে ‘গন্ডক’ ও ‘কাকিনী’ দুই প্রকার মুদ্রার নাম, যা তৎকালীন উত্তরবঙ্গে ব্যবহূত হতো। একটি ভিন্ন ব্যাখ্যা অনুসারে চারটি (গন্ডা)-র হিসেবে কড়ির এক প্রকার একককে বুঝানো হয়েছে। দ্বিতীয় ব্যাখ্যাটি ইঙ্গিত দেয় যে, বাংলায় খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতক থেকে কড়ির ব্যবহার জানা ছিল। তবে খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয়-দ্বিতীয় শতক থেকে বাংলায় ধাতবমুদ্রার উপস্থিতির অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যাবে উৎখনিত প্রত্নক্ষেত্র থেকে। নিম্নলিখিত প্রত্নক্ষেত্রগুলি থেকে আবিষ্কৃত হয়েছে বহু রৌপ্য নির্মিত ‘অঙ্কচিহ্নিত’ মুদ্রা: মহাস্থানগড় (বাংলাদেশ), বাণগড় (দক্ষিণ দিনাজপুর জেলা, পশ্চিমবঙ্গ), মঙ্গলকোট (বর্ধমান জেলা, পশ্চিমবঙ্গ), চন্দ্রকেতুগড় (উত্তরচবিবশ পরগণা জেলা, পশ্চিমবঙ্গ); এছাড়া পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ, বাঁকুড়া ও মেদিনীপুর জেলা থেকেও এই জাতীয় প্রাচীন মুদ্রা উদ্ধার করা হয়েছে। এই তালিকায় অবশ্যই যুক্ত হবে বাংলাদেশে ঢাকার নিকটস্থ  উয়ারি-বটেশ্বর, যেখান থেকে প্রচুর পরিমাণে রূপার অঙ্কচিহ্নিত মুদ্রা সম্প্রতি পাওয়া গেছে। বহু স্থানেই রৌপ্যমুদ্রাগুলি পাওয়া গেছে উত্তরভারতের কৃষ্ণ চিক্কণ মৃৎপাত্রের (Black Polished Ware) সঙ্গে। উত্তরভারতের কৃষ্ণ চিক্কণ মৃৎপাত্র অতি উন্নতমানের কৌলাল, যা বিলাসব্যসনের উপযুক্ত তৈজস বলে স্বীকৃত। এই মৃৎপাত্রগুলি নিঃসন্দেহে বাণিজ্যের উপকরণ হিসেবেই বাংলায় এসেছিল মধ্যগাঙ্গেয় উপত্যকা থেকে। কৃষ্ণ চিক্কণ কৌলালের মতো রৌপ্য মুদ্রাগুলি বাণিজ্যের সুবাদে গাঙ্গেয় উপত্যকা থেকে উত্তরবঙ্গে এসেছিল সম্ভবত মৌর্যদের বাংলায় ক্ষমতাবিস্তারের ফল হিসেবে। খেয়াল রাখা দরকার যে, বাংলায় উৎখনিত নগরের মধ্যে প্রাচীনতম প্রত্নক্ষেত্র মহাস্থানগড় থেকে রৌপ্যনির্মিত ‘অঙ্কচিহ্নিত’ মুদ্রাগুলির বাংলায় উপস্থিতির প্রথম প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল। রৌপ্য মুদ্রাগুলির ওজন ১.৭ গ্রাম থেকে ৩.৪৮ গ্রাম; অবশ্য অধিকাংশ মুদ্রার ওজন ৩.০ গ্রাম থেকে ৩.৪৫ গ্রামের মধ্যে। বুঝতে অসুবিধে হয় না যে, মুদ্রাগুলি জারি করা হয়েছিল ৩.৭৩২ গ্রাম (অর্থাৎ ৫৭.৬ গ্রেণ) বা সুপরিচিত কার্ষাপণ তৌলরীতি অনুসারে। কয়েকটি মুদ্রা ওজনে এই তৌলরীতির অর্ধেক; অনুমান করা সঙ্গত যে ঐ মুদ্রাগুলি ‘অর্ধকার্ষাপণ’ পর্যায়ভুক্ত।

হরিকেল মুদ্রা (খ্রিস্টীয় ৭-৮ শতক) চট্টগ্রাম ও সন্নিহিত অঞ্চল

বাংলায় আবিষ্কৃত কার্ষাপণ মুদ্রাগুলি প্রধানত রৌপ্যনির্মিত; অবশ্য অঙ্কচিহ্নিত তাম্রমুদ্রা ও বিলন (এক প্রকার শঙ্কর ধাতু) মুদ্রাও অজানা ছিল না। একথা ঠিক যে অঙ্কচিহ্নিত তামার ও বিলনের মুদ্রা রৌপ্যমুদ্রার তুলনায় সংখ্যায় কম। তামার তৈরি ‘অঙ্কচিহ্নিত’ মুদ্রাগুলি পাওয়া গেছে পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্গত উত্তর এবং দক্ষিণ চবিবশ পরগনা জেলায় (যেমন, চন্দ্রকেতুগড় ও দেউলপোতা), বর্ধমান জেলায় (যেমন, মঙ্গলকোট) এবং বাঁকুড়া জেলায় (যেমন, কিহর)। তাম্রমুদ্রাগুলির ওজন ১.৪ গ্রাম থেকে ৩.৬২ গ্রামের মধ্যে (অর্থাৎ ২২ গ্রেণ থেকে ৫৬ গ্রেণ এর মধ্যে)। সহজেই বোঝা যায় তামার মুদ্রাগুলি তৈরি হয়েছিল কার্ষাপণ রৌপ্য মুদ্রার তৌলরীতি ৮০ রতি বা ১৪৪ গ্রেণ। সেই তৌলরীতির পরিবর্তে রৌপ্য কার্ষাপণ মুদ্রার তৌলরীতিই এক্ষেত্রে অনুসৃত হয়। বিলন নির্মিত ‘অঙ্কচিহ্নিত’ মুদ্রাগুলি আবিষ্কৃত হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের চন্দ্রকেতুগড় ও হরিনারায়ণপুর (উত্তর চবিবশ পরগণা জেলা) এবং বাণগড় (দক্ষিণ দিনাজপুর জেলা) থেকে। বর্গাকার ও গোলাকার এই বিলন মুদ্রাগুলির ওজন ১১ গ্রাম থেকে ৫১.৭৫ গ্রাম-এর মধ্যে। রৌপ্য ও তাম্রনির্মিত ‘অঙ্কচিহ্নিত’ মুদ্রার মতো বিলনের অঙ্কচিহ্নিত মুদ্রাগুলিও কার্ষাপণ তৌলরীতিকে (৫৭.৬ গ্রেণ) অনুসরণ করে তৈরি করা হয়েছিল। বিলন মুদ্রাগুলির মধ্যে যেগুলির ওজন ১১ থেকে ১৩ গ্রাম-এর মধ্যে, সেগুলি সম্ভবত পাদকার্ষাপণ (অর্থাৎ সিকি কার্ষাপণ বা কার্ষাপণ-এর একচতুর্থাংশ ওজন বিশিষ্ট)।

মুদ্রা (খ্রিস্টীয় ৭-১০ শতক), পাল যুগ

মৌর্যশাসন বাংলায় প্রসারিত হওয়ার অভিঘাতে আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতক নাগাদ উত্তরবঙ্গে ও পরে বাংলার অন্যান্য এলাকায় মুদ্রার প্রচলন দেখা যায়। উৎখনন থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে বোঝা যায় যে, এই জাতীয় ‘অঙ্কচিহ্নিত’ মুদ্রা (বিভিন্ন ধাতুতে নির্মিত) খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকের পর আর ব্যবহূত হয়নি। রৌপ্য নির্মিত অঙ্কচিহ্নিত মুদ্রাগুলির বিশদ ও অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ থেকে প্রমাণিত হয় যে, বাংলার প্রাচীনতম মুদ্রাগুলিতে অন্তত ১৭২ রকম নকশার ছাপ দেওয়া হয়েছিল। রৌপ্য নির্মিত অঙ্কচিহ্নিত কার্ষাপণ মুদ্রা তৈরির রীতি যে তামার এবং বিলনের মুদ্রা নির্মাণের ওপর বিশেষ প্রভাব ফেলেছিল সে বিষয়ে সংশয় নেই। তামা ও বিলনের মতো  অপেক্ষাকৃত কমদামী ধাতুতে যে অঙ্কচিহ্নিত মুদ্রাগুলি তৈরি হলো, সেগুলি সম্ভবত দৈনন্দিন ছোটখাটো লেনদেনের পক্ষে উপযোগী ছিল। দূরপাল্লার বড় মাপের বাণিজ্যের জন্য রৌপ্য মুদ্রার প্রাসঙ্গিকতা বোধহয় অধিকতর।

সুলতানি মুদ্রা ( ১৩৩৮-১৩৪৯ খ্রিস্টাব্দ), ফকরুদ্দীন মুবারক শাহ

ছাঁচে ঢালা মুদ্রা তৈরি করতে নিয়মিত ব্যবহূত হয়েছে তাম্র। এই জাতীয় ছাঁচে ঢালা (কাস্ট) তাম্রমুদ্রা পাওয়া যায় বিভিন্ন প্রত্নস্থল থেকে, যেমন: হরিনারায়ণপুর, চন্দ্রকেতুগড়, আটঘরা ও পাকুড়তলা (উত্তর ও দক্ষিণ চবিবশ পরগনা জেলা); তমলুক ও ইচ্ছাপুর (মেদিনীপুর জেলা), ডিহর ও পোখরনা (বাঁকুড়া জেলা), মঙ্গলকোট (বর্ধমান জেলা), হরিনারায়ণপুর (হাওড়া জেলা), বাণগড় (দক্ষিণ দিনাজপুর জেলা) এবং মহাস্থানগড় (বগুড়া, বাংলাদেশ)। উৎখনিত প্রত্নস্থল থেকে আহূত এই জাতীয় ছাঁচে ঢালা তাম্রমুদ্রা পরীক্ষা করে পন্ডিতরা এই সিদ্ধান্তে এসেছেন যে, এই মুদ্রাগুলি পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের বিবিধ অঞ্চলে খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় ও প্রথম শতকে প্রধানত প্রচলিত ছিল। তবে কোন কোন অঞ্চলে ছাঁচে ঢালা তাম্রমুদ্রাগুলির ব্যবহার খ্রিস্টীয় দ্বিতীয়-তৃতীয় শতক, এমনকি গুপ্ত আমল পর্যন্তও নজরে পড়ে। ছাঁচে ঢালা তামার মুদ্রাগুলি আকারে বিভিন্ন রকমের: গোল বা প্রায় গোলাকার, ডিম্বাকৃতি, বর্গাকার ও আয়তাকার। এদের ওজন ৭২ গ্রেণ থেকে ৯ গ্রেণ পর্যন্ত, যদিও সংখ্যাগরিষ্ঠ মুদ্রার ওজন ৪৫ থেকে ৫৬.৭৫ গ্রেণের মধ্যে। এর থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, ছাঁচে ঢালা তাম্রমুদ্রাগুলি তৈরি হয়েছিল রৌপ্য নির্মিত অঙ্কচিহ্নিত মুদ্রার তৌলরীতি অনুসারে (অর্থাৎ ৫৭.৬ গ্রেণ বা কার্ষাপণ তৌলরীতি)। অর্থাৎ অঙ্কচিহ্নিত তাম্রমুদ্রার মতোই ছাঁচে ঢালা তাম্রমুদ্রাগুলিও কার্ষাপণ তৌলরীতি মেনেই প্রস্ত্তত হয়; এক্ষেত্রে তাম্রমুদ্রার প্রথাগত ৮০ রতি বা ১৪৪ গ্রেণ-র তৌলমান অনুসৃত হয়নি। ওজনের দিক থেকে ছাঁচে ঢালা বাংলার তাম্রমুদ্রাগুলি কখনও দেড়-কার্ষাপণ, কখনও পৌনে (৩/৪) কার্ষাপণ, আবার কখনও অর্ধকার্ষাপণ বা পাদ (১/৪) কার্ষাপণ পর্যায়ভুক্ত।

কুষাণ মুদ্রা  দক্ষিণ এশিয়ায় রৌপ্য ও তাম্রমুদ্রা ব্যবহারের এক দীর্ঘ ঐতিহ্য আছে। সেই তুলনায় স্বর্ণমুদ্রার ব্যবহার ভারতীয় উপমহাদেশে দেখা দেয় কিছুটা পরবর্তী আমলে। উপমহাদেশে স্বর্ণমুদ্রা প্রচলনের কৃতিত্ব কুষাণ সম্রাটদের প্রাপ্য। কুষাণ সম্রাট বীম কদফিসেসই সম্ভবত ভারতে সর্বপ্রথম স্বর্ণমুদ্রা জারি করেন। তাঁর মুদ্রার মুখ্য দিকে বেদিতে যজ্ঞরত রাজার যে প্রতিকৃতি দেখা যায়, তা বোধ হয় পার্থীয় শাসক গোটার্জেসের স্বর্ণমুদ্রায় উৎকীর্ণ অনুরূপ নকশা দ্বারা প্রভাবিত। পরবর্তী কুষাণ সম্রাটদের মধ্যে, বিশেষ করে কণিষ্ক ও হুবিষ্ক তাঁদের স্বর্ণমুদ্রায় বহু বিচিত্র নকশা ও প্রতীক ব্যবহার করেছিলেন। একথা ঠিক যে, প্রাচীন বাংলা সরাসরি কুষাণ সাম্রাজ্যের অন্তর্গত ছিল না; কিন্তু বাংলায় যথেষ্ট সংখ্যায় কুষাণ মুদ্রা পাওয়া গেছে। এই মুদ্রাগুলি প্রাচীন বাংলায় বাণিজ্যের কারণেই এসে থাকবে। কনিষ্কের স্বর্ণমুদ্রা আবিষ্কৃত হয়েছে মহাস্থানগড় (বাংলাদেশ), পান্ডুরাজার ঢিবি এবং তমলুক (মেদিনীপুর জেলা) থেকে। হুবিষ্কের স্বর্ণমুদ্রা পাওয়া গিয়েছিল দেওয়ানাটি (উত্তর চবিবশ পরগণা জেলা) এবং ফারাক্কা (মুর্শিদাবাদ জেলা) থেকে। হুগলি জেলার মহানাদ কুষাণ স্বর্ণমুদ্রার অপর একটি প্রাপ্তিস্থান। প্রথম বাসুদেবের তিনটি স্বর্ণমুদ্রার সন্ধান পাওয়া যায় পশ্চিমবঙ্গের মালদহ ও মুর্শিদাবাদ জেলায় এবং বাংলাদেশের বগুড়া থেকে। কুষাণবংশীয় শেষ সম্রাট দ্বিতীয় বাসুদেবের একটি স্বর্ণমুদ্রা উদ্ধার করা হয়েছে মহাস্থান থেকে।

স্বর্ণমুদ্রা ৭৪৪-৭৫৮ হিজরী, সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ

লক্ষণীয় ঘটনা যে, কুষাণ স্বর্ণমুদ্রার চেয়ে বাংলায় কুষাণ তাম্রমুদ্রা সংখ্যায় প্রচুরতর। বীম কদফিসেস, কণিষ্ক, হুবিষ্ক ও প্রথম বাসুদেবের তাম্রমুদ্রা পাওয়া গিয়েছিল উত্তর ও দক্ষিণ চবিবশ পরগনা, বর্ধমান, মেদিনীপুর ও হুগলি জেলা থেকে। বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, কুষাণ তাম্রমুদ্রার প্রচলন ছিল খ্রিস্টীয় প্রথম থেকে খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতক পর্যন্ত, প্রধানত ভাগীরথীর পশ্চিমে অবস্থিত প্রাচীন রাঢ় অঞ্চলে। কুষাণ তাম্রমুদ্রা বাংলার নিজস্ব বস্ত্ত নয়, তা অন্য অঞ্চল থেকে বাংলায় এসেছিল। কিন্তু তার ব্যাপক প্রচলনের ফলে প্রাচীন বাংলার মুদ্রাব্যবস্থার সঙ্গে কুষাণ তাম্রমুদ্রা ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত হয়ে যায়। এর অভিঘাত দেখা যাবে কুষাণ তাম্রমুদ্রার অনুকরণে বাংলায় বহু সংখ্যক তাম্রমুদ্রা নির্মাণের ঘটনায়। এই জাতীয় অনুকৃত তাম্রমুদ্রা বহুসংখ্যায় পাওয়া গেছে উত্তর ও দক্ষিণ চবিবশ পরগণা, বর্ধমান ও বাঁকুড়া জেলা থেকে। এই অনুকৃত তাম্রমুদ্রাগুলির ওজন ১৬.১ গ্রাম থেকে ১.৪৮ গ্রাম পর্যন্ত। ওজনের তারতম্যের ভিত্তিতে এই তাম্রমুদ্রাগুলির সাতটি পর্যায় পন্ডিতগণ নির্দেশ  করেছেন: (ক) ১২-১৬.১ গ্রাম; (খ) ৮-১১ গ্রাম; (গ) ৬.০৫-৭.২৫ গ্রাম; (ঘ) ৫.০৮-৫.৬৭ গ্রাম; (ঙ) ৩.৬৫ গ্রাম; (চ) ২-২.২৮ গ্রাম; (ছ) ১.৪৮-১.৮০ গ্রাম। মুদ্রাতাত্ত্বিকদের বিচারে সংখ্যাগরিষ্ঠ অনুকৃত তাম্রমুদ্রাগুলির ওজন ৩.৬৫ গ্রাম বা তার কাছাকাছি। এই ওজনটি কার্যত ৫৭.৬ গ্রেণ বা সুপরিচিত কার্ষাপণ তৌলরীতির সঙ্গে অভিন্ন। বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা এই যে, বাংলায় অনুকৃত তাম্রমুদ্রাগুলি যেখানে কার্ষাপণ তৌলরীতিকে অনুসরণ করে নির্মিত, কুষাণদের নিজস্ব তাম্রমুদ্রাগুলি কিন্তু ’অ্যাটিক টেট্রাড্রাখম’ (অর্থাৎ ২৬৮.৮ গ্রেণ বা ১৭.৪১৭ গ্রাম) তৌলরীতির উপর আশ্রিত। অতএব কুষাণ তাম্রমুদ্রার অনুকরণে প্রস্ত্তত বাংলার তাম্রমুদ্রাগুলি কিন্তু কুষাণ তৌলরীতি অনুসরণ করেনি। সেগুলি প্রাচীন বাংলার সুপ্রতিষ্ঠিত কার্ষাপণ তৌলরীতিতে তৈরি হয়েছিল। বাংলার এই অনুকৃত তাম্রমুদ্রাগুলির স্বকীয় চরিত্র ও স্থানীয় বৈশিষ্ট্য সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এই মুদ্রাগুলির অধিকাংশই প্রাচীন রাঢ় ও বঙ্গ ভূখন্ডে আবিষ্কৃত। তাই কোনও কোনও মুদ্রাতত্ত্ববিদ এই অনুকৃত তাম্রমুদ্রাগুলিকে ‘কুষাণ-বঙ্গ’ বা ‘কুষাণ-রাঢ়’ বলে অভিহিত করেন।

রৌপমুদ্রা ৭৪৪-৭৫৮ হিজরী, সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ

কুষাণদের পূর্ণাহত (ডাই-স্ট্রাক) তাম্রমুদ্রা ছাড়াও কুষাণ বংশীয় রাজাদের ছাঁচে ঢালা তাম্রমুদ্রা প্রাচীন বাংলায় প্রচলিত ছিল। এই জাতীয় ছাঁচে ঢালা কুষাণ মুদ্রার মুখ্যদিকে দন্ডায়মান কুষাণ সম্রাট ও গৌণ দিকে দন্ডায়মান দেবতা মাও-এর প্রতিকৃতি চোখে পড়ে। পুরুলিয়ার ৫১.৫০ কি.মি. দক্ষিণে অবস্থিত মসুয়াবাজারে ২৮১টি ছাঁচে ঢালা কুষাণ তাম্রমুদ্রা পাওয়া গেছে (বর্তমানে কলকাতার ভারতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত)। এই ছাঁচে ঢালা কুষাণ তাম্রমুদ্রার সঙ্গে অনুকৃত কুষাণ-বঙ্গ বা কুষাণ-রাঢ় তাম্রমুদ্রার কয়েকটির ওজনের সাদৃশ্য লক্ষ্য করার মতো। কলকাতার আশুতোষ সংগ্রহশালায় সংরক্ষিত এই জাতীয় একটি মুদ্রার ওজন ৩.৬৩ গ্রাম। এর থেকে অনুমান করা যুক্তিযুক্ত যে, বাংলায় প্রচলিত ছাঁচে ঢালা কুষাণ তাম্রমুদ্রাগুলিও কার্ষাপণ তৌলরীতি (৫৭.৬ গেণ এবং ৩.৬৫ গ্রাম) অনুসরণ করে তৈরি হয়েছিল। সমকালীন উড়িষ্যা ও অন্ধ্রপ্রদেশের উত্তরাঞ্চলে যে ‘পুরী-কুষাণ’ জাতীয় তাম্রমুদ্রা ব্যবহার করা হতো, তার সঙ্গে কুষাণবংশীয় ছাঁচে ঢালা তাম্রমুদ্রার আকার ও ওজন উভয়েরই সাদৃশ্য আছে। যদিও ‘পুরী-কুষাণ’ তাম্রমুদ্রা এবং ‘কুষাণ-বঙ্গ’ বা ‘কুষাণ-রাঢ়’ তাম্রমুদ্রা অভিন্ন নয়, তবুও এই দুই প্রকারের তাম্রমুদ্রার সাদৃশ্য ইঙ্গিত দেয় যে, অন্ধ্রের উত্তরভাগ, উড়িষ্যা, পশ্চিমবঙ্গ (বিশেষত তটীয় এলাকা) এবং দক্ষিণ বিহার জুড়ে এক বিস্তীর্ণ এলাকায় এক জটিল মুদ্রাব্যবস্থার অস্তিত্ব ছিল। এই জটিল মুদ্রাব্যবস্থার সক্রিয় উপস্থিতি দেখা যায় খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতক থেকে খ্রিস্টীয় প্রায় চতুর্থ শতক পর্যন্ত পাঁচশত বৎসর ধরে।

সুলতানি মুদ্রা (৭৯২-৮১৩ হিজরী), গিয়াসুদ্দীন আজম শাহ

গুপ্ত মুদ্রা  খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতক থেকে সপ্তম শতক পর্যন্ত বাংলার মুদ্রা ব্যবস্থার পরিচয় পূর্বের চেয়ে অনেক বেশি উজ্জ্বল। তার মূল কারণ তৎকালীন বাংলায় যথেষ্ট সংখ্যক গুপ্ত স্বর্ণমুদ্রার ব্যবহার; গুণগত দিক দিয়ে ও কৃৎকৌশলের মানদন্ডে গুপ্ত স্বর্ণমুদ্রার শ্রেষ্ঠত্ব সুবিদিত। তবে গুপ্ত সম্রাটগণ যে রৌপ্য ও তাম্রমুদ্রা জারি করেছিলেন, সেগুলি প্রাচীন বাংলায় নিতান্তই অপ্রতুল। বাংলা থেকে গুপ্ত স্বর্ণমুদ্রা যেমন পাওয়া গেছে, তেমনই বেশ কয়েকটি গুপ্তকালীন লেখতে (যার অধিকাংশই প্রাচীন পুন্ড্রবর্ধন এলাকা বা উত্তরবঙ্গে প্রাপ্ত) বিভিন্ন মুদ্রানামের উল্লেখ আছে। গুপ্তকাুলীন বাংলায় মুদ্রাব্যবস্থা বোঝার পক্ষে এটি একটি অতিরিক্ত সহায়ক তথ্যসূত্র। পুন্ড্রবর্ধন একটি ‘ভুক্তি’ বা প্রদেশ হিসেবে গুপ্ত সাম্রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল (অন্তত ৪১৪ থেকে ৫৫০ খ্রি) এবং ষষ্ঠ শতকের গোড়াতে গুপ্ত অধিকার সমতট অঞ্চল (বাংলাদেশের অন্তর্গত কুমিল্লা) পর্যন্ত ছড়িয়ে যায়। বাংলায় গুপ্ত স্বর্ণমুদ্রার নিয়মিত ব্যবহার বুঝতে এই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটটি তাৎপর্যপূর্ণ। প্রসঙ্গত কলকাতার কালীঘাট থেকে পাওয়া মুদ্রাভান্ডারটিই গুপ্ত মুদ্রার সর্বপ্রথম আবিষ্কৃত ভান্ডার।

প্রথম চন্দ্রগুপ্ত (আনু. ৩২০-৩৩৫ খ্রি) থেকে বিষ্ণুগুপ্ত (খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতকের মধ্যভাগ) পর্যন্ত বিভিন্ন গুপ্ত সম্রাট বহু প্রকারের স্বর্ণমুদ্রা জারি করেন। তবে স্বর্ণমুদ্রায় সর্বাধিক বৈচিত্র্য দেখা যায় প্রথম কুমারগুপ্তের শাসনকালে (৪১৪-৪৫৪/৫৫ খ্রি)। বাংলায় আবিষ্কৃত বিভিন্ন প্রকারের গুপ্ত স্বর্ণমুদ্রার একটি সংক্ষিপ্ত পরিচিতি এখানে দেওয়া যায়।

স্বর্ণমুদ্রা ১৪৯৪-১৫১৯ খিস্টাব্দ, সুলতান আলাউদ্দীন হোসেন শাহ

প্রথম চন্দ্রগুপ্ত: গুপ্ত সম্রাট ও রাজ্ঞীর যুগল প্রতিকৃতি/চন্দ্রগুপ্ত-কুমারদেবীর প্রতিকৃতি (কেবলমাত্র এক প্রকার স্বর্ণমুদ্রা জারি করা হয়); সমুদ্রগুপ্ত: (১) রাজার দন্ডধর মূর্তি, (২) রাজার ধনুর্ধর মূর্তি, (৩) অশ্বমেধ-স্মারক মুদ্রা (মোট ৬ প্রকার স্বর্ণমুদ্রা জারি হয়েছিল); দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত: (১) রাজার ধনুর্ধর মূর্তি, (২) ছত্রাচ্ছাদিত রাজা (মোট ৯ প্রকার স্বর্ণমুদ্রা জারি করা হয়েছিল); প্রথম কুমারগুপ্ত: (১) রাজার ধনুর্ধর মূর্তি, (২) অশ্বারোহী রাজা, (৩) গজারোহী রাজা, (৪) সিংহ শিকারী রাজা, (৫) কার্তিক মূর্তি সম্বলিত (মোট ১৪ প্রকার স্বর্ণমুদ্রা জারি করা হয়েছিল); স্কন্দগুপ্ত: (১) রাজার ধনুর্ধর মূর্তি (দুটি ভিন্ন তৌলরীতি অনুসৃত), (২) সম্রাট ও সম্রাজ্ঞীর যুগল প্রতিকৃতি (মোট ৩ বা ৪ প্রকার স্বর্ণমুদ্রা জারি করা হয়েছিল); দ্বিতীয় কুমারগুপ্ত: (১) রাজার ধনুর্ধর মূর্তি (কেবলমাত্র একপ্রকার স্বর্ণমুদ্রা জারি করা হয়েছিল); বৈন্যগুপ্ত : রাজার ধনুর্ধর মূর্তি (কেবলমাত্র একপ্রকার স্বর্ণমুদ্রা জারি করা হয়েছিল); নরসিংহগুপ্ত: (১) রাজার ধনুর্ধর মূর্তি (কেবলমাত্র একপ্রকার স্বর্ণমুদ্রা জারি করা হয়েছিল); বিষ্ণুগুপ্ত: (১) রাজার ধনুর্ধর মূর্তি (কেবলমাত্র একপ্রকার স্বর্ণমুদ্রা জারি করা হয়েছিল)।

রৌপমুদ্রা, ১৪৯৪-১৫১৯ খিস্টাব্দ, সুলতান আলাউদ্দীন হোসেন শাহ

গুপ্ত সম্রাটরা তাঁদের স্বর্ণমুদ্রাগুলি জারি করেছিলেন প্রাথমিকভাবে ১২২.৯ গ্রেণ তৌলরীতি অনুযায়ী। স্বর্ণমুদ্রার এই বিশেষ তৌলরীতি তাঁরা নিয়েছিলেন তাঁদের পূর্বসূরী কুষাণ শাসকদের স্বর্ণমুদ্রার তৌলমান থেকে। প্রথম গুপ্ত স্বর্ণমুদ্রা তৈরি করার কৃতিত্ব সম্ভবত প্রথম চন্দ্রগুপ্তের; এই স্বর্ণমুদ্রাগুলি ১২০-১২১ গ্রেণ ওজনের। স্বর্ণমুদ্রার এই তৌলরীতিটি রোমক অরিয়স (১২২.৯ গ্রেণ) মানের অনুসরণেই করা হয়েছিল। রোমক এবং পরবর্তীকালে কুষাণ তৌলরীতির আদলে গুপ্ত সম্রাটগণ যে স্বর্ণমুদ্রাগুলি নির্মাণ করেন, তা দিনার নামে পরিচিত। গুপ্তদের লেখমালাতেও স্বর্ণমুদ্রা দিনার বলে আখ্যাত। তবে সম্ভবত প্রথম কুমারগুপ্তের রাজত্বকালের অন্তিম পর্বে এবং নিঃসন্দেহে স্কন্দগুপ্তের আমল (৪৫৫-৪৬৭ খ্রি) থেকে গুপ্ত স্বর্ণমুদ্রাগুলির ওজন বাড়ানো হয়। কুমারগুপ্তের স্বর্ণমুদ্রার কয়েকটির ওজন ১২৭ গ্রেণ; স্কন্দগুপ্তের কয়েকটি স্বর্ণমুদ্রার ওজন আরও বেশি, ১৩০-১৩২ গ্রেণ। স্কন্দগুপ্তের আমলেই স্বর্ণমুদ্রার ওজন বাড়িয়ে শেষ পর্যন্ত ১৪৪ গ্রেণে স্থিরীকৃত হয়, যা ভারতীয় শাস্ত্র অনুযায়ী ‘সুবর্ণ’ তৌলমান। অর্থাৎ স্কন্দগুপ্তের শাসনকালে গুপ্ত স্বর্ণমুদ্রাগুলি ওজনে ভারী সুবর্ণ তৌলরীতির অনুসরণে নির্মিত হতে থাকে এবং আগেকার দিনার তৌলরীতি কার্যত বাতিল হয়ে যায়। প্রাচীন ভারতীয় শাস্ত্র অনুযায়ী সুবর্ণ তৌলরীতির (৮০ রতি = ১৪৪ গ্রেণ) সমান। মনে হয় কিছুদিন অপেক্ষাকৃত হালকা ও অপেক্ষাকৃত ভারী উভয় তৌলরীতির স্বর্ণমুদ্রাই যুগপৎ প্রচলিত ছিল। উত্তর প্রদেশের গাধওয়া থেকে প্রাপ্ত প্রথম কুমারগুপ্তের একটি লেখতে স্বর্ণমুদ্রা বোঝাতে ‘দিনার’ ও ‘সুবর্ণ’ ‘দুই পরিভাষাই ব্যবহূত হয়েছে।

স্বর্ণমুদ্রা (১৫৩৮-১৫৪৫ খ্রিস্টাব্দ), শেরশাহ

লক্ষণীয় যে স্কন্দগুপ্তের ধনুর্ধর জাতীয় স্বর্ণমুদ্রার ওজন যেখানে ১২১-২২ গ্রেণ (অর্থাৎ দিনার তৌলরীতি অনুযায়ী), ওই একই সম্রাটের যে স্বর্ণমুদ্রায় রাজকীয় দম্পতির প্রতিকৃতি দৃশ্যমান, সেগুলির ওজন বেশি, ১৩২ গ্রেণ। দ্বিতীয় প্রকারের মুদ্রা সম্ভবত বেশি ওজনের দিনার তৌলরীতি অনুযায়ী নির্মাণ করা হয়েছিল। এর পরবর্তী পদক্ষেপ স্কন্দগুপ্ত নেন ১৪৪ গ্রেণ ওজন বিশিষ্ট রাজার ধনুর্ধর প্রতিকৃতি সম্বলিত পুরোদস্ত্তর ‘সুবর্ণ’ ‘জাতীয় স্বর্ণমুদ্রা জারি করে। অতএব গুপ্ত স্বর্ণমুদ্রার তৌলরীতি ‘দিনার’ থেকে ‘সুবর্ণ’ মানে আকস্মিকভাবে বদলানো হয়নি। এই পরিবর্তন এসেছিল ক্রমশ। এই রূপান্তর পর্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় ১৩২ গ্রেণ ওজনের অপেক্ষাকৃত ভারী তৌলরীতির দিনার মুদ্রা প্রস্ত্তত করা। তারই পরিণতি শেষ পর্যন্ত ১৪৪ গ্রেণের সুবর্ণ তৌলরীতির গুপ্ত স্বর্ণমুদ্রা নির্মাণ। অবশ্য স্কন্দগুপ্তের উত্তরসূরী সব গুপ্ত শাসক কেবলমাত্র ১৪৪ গ্রেণের সুবর্ণ তৌলরীতির ভিত্তিতে তাঁদের নিজ নিজ স্বর্ণমুদ্রা প্রস্ত্তত করিয়েছিলেন।

গুপ্ত স্বর্ণমুদ্রার নিয়মিত ব্যবহার ও প্রচলন যে প্রাচীন বাংলায় ছিল, তার স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় আবিষ্কৃত গুপ্ত স্বর্ণমুদ্রা থেকে। স্কন্দগুপ্ত ও তাঁর পরবর্তী গুপ্ত সম্রাটগণ যদিও সুবর্ণ তৌলরীতি অনুযায়ী অপেক্ষাকৃত ভারী স্বর্ণমুদ্রা তৈরি করিয়েছিলেন, কিন্তু বাংলায় পাওয়া গুপ্তকালীন লেখতে স্বর্ণমুদ্রা কেবলমাত্র ‘দিনার’ নামেই আখ্যাত (অর্থাৎ ভারী মুদ্রাগুলিও লেখতে ‘সুবর্ণ’ নয়, ‘দিনার’ বলে অভিহিত)। এই জাতীয় স্বর্ণমুদ্রার উল্লেখ উত্তরবঙ্গে অন্তত ৪৪৩ থেকে ৫৪৪ খ্রি পর্যন্ত গুপ্তকালীন তাম্রশাসনগুলিতে নিয়মিতভাবে দেখা যায়। স্কন্দগুপ্তের সময় থেকে ওজনে ভারী স্বর্ণমুদ্রা তৈরি হয় বটে, কিন্তু স্কন্দগুপ্তের আমলে এবং বিশেষত তাঁর পরবর্তী গুপ্ত সম্রাটদের ‘সুবর্ণ’ জাতীয় স্বর্ণমুদ্রায় সোনার পরিমাণ ক্রমহ্রাসমান। স্কন্দগুপ্ত-উত্তর গুপ্ত স্বর্ণমুদ্রায় তাই খাদের পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছিল। বাংলায় পাওয়া সুবর্ণ তৌলরীতিতে প্রস্ত্তত নরসিংহগুপ্তের স্বর্ণমুদ্রায় সোনা ৭০%-এর বেশি নয়। পরবর্তী শাসকদের স্বর্ণমুদ্রায় সোনার পরিমাণ ৫০% বা তারও কম। গুপ্ত স্বর্ণমুদ্রায় সোনার পরিমাণ ক্রমেই কমে যাওয়ার ফলে তার ধাতুগত বিশুদ্ধি আর অটুট ছিল না। এই অবস্থা নিঃসন্দেহে গুপ্ত শাসনের অন্তিম অধ্যায়ে অর্থনৈতিক সংকটের ইঙ্গিতবহ।

রৌপ্যমুদ্রা, (১৫৩৮-১৫৪৫ খ্রিস্টাব্দ), শেরশাহ

বাংলায় প্রাপ্ত গুপ্তকালীন লেখতে রূপার মুদ্রার পরিভাষা ‘রূপক’। কিন্তু গুপ্তদের রৌপ্যমুদ্রা বাংলা থেকে অতি সামান্য সংখ্যায় পাওয়া গেছে। দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত, প্রথম কুমারগুপ্ত ও স্কন্দগুপ্তের রৌপ্য মুদ্রা বাংলা থেকে আবিষ্কৃত হয়েছে, তবে সংখ্যায় তা মুষ্টিমেয়। গুপ্ত সম্রাটদের মধ্যে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তই সর্বপ্রথম রৌপ্য মুদ্রার প্রচলন ঘটান। গুপ্ত রৌপ্য মুদ্রাগুলি পশ্চিমভারতের শকক্ষত্রপদের রৌপ্য মুদ্রার আদলে তৈরি; এই শকক্ষত্রপদের আনু. ৪১১-১২ খ্রিস্টাব্দে পরাস্ত করেছিলেন দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত। গুপ্তদের রৌপ্যমুদ্রার ওজন ৩০-৩২ গ্রেণ, যা শকক্ষত্রপদের রৌপ্যমুদ্রার তৌলরীতি অনুসরণেই স্থিরীকৃত। এই তৌলরীতি অবশ্যই প্রাচীনতর রৌপ্য কার্ষাপণ মুদ্রার তৌলরীতি (৫৭.৬ গ্রেণ) থেকে পৃথক। ১২৮ গুপ্তাব্দের (৪৪৮ খ্রি) বৈগ্রাম তাম্রশাসন থেকে অনুমান করা সম্ভব যে, গুপ্তকালীন দিনার (স্বর্ণমুদ্রা) ও রূপক-এর (রৌপ্যমুদ্রা) অনুপাত ছিল ১:১৬। আবার ১২৮ গুপ্তাব্দের দামোদরপুর তাম্রশাসন থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, দিনার ও রূপকের অনুপাত ১:১৫। গুপ্ত সম্রাটগণ তাম্রমুদ্রাও জারি করেছিলেন। কিন্তু গুপ্তদের তাম্রমুদ্রা এখনও পর্যন্ত বাংলা থেকে পাওয়া যায়নি। বর্ধমান জেলার মঙ্গলকোটের উৎখননে গুপ্তকালীন স্তর থেকে প্রাক-গুপ্ত আমলের ছাঁচে ঢালা তাম্রমুদ্রার সন্ধান মিলেছে। অতএব অনুমান করা চলে যে, চতুর্থ শতক থেকে ষষ্ঠ শতক পর্যন্ত প্রাচীন বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে প্রাক-গুপ্ত পর্বের ছাঁচে ঢালা তাম্রমুদ্রাই ব্যবহূত হতো।

গুপ্ত পরবর্তী মুদ্রা  ষষ্ঠ শতকের শেষার্ধ থেকে অষ্টম শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত যেসব শাসক গৌড় এবং বঙ্গে স্বাধীনভাবে রাজত্ব করেন, তাঁরাও স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা জারি করেছিলেন। এই সব শাসকের নাম প্রধানত লেখমালা থেকে জানা গেলেও মুদ্রাতেও তাঁদের নাম উল্লিখিত। ষষ্ঠ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বঙ্গের তিন স্বাধীন শাসক ছিলেন ধর্মাদিত্য, সমাচারদেব এবং গোপচন্দ্র। সমাচারদেব দুই প্রকারের স্বর্ণমুদ্রার প্রচলন করেন। উভয় মুদ্রাই ১৪৪ গ্রেণ অর্থাৎ সুবর্ণ তৌলরীতি অনুসারে নির্মিত। তবে তাঁর স্বর্ণমুদ্রায় খাদের পরিমাণ অনেক এবং তাঁর স্বর্ণমুদ্রার ব্যবহার বঙ্গ অথবা বঙ্গ-সমতট এলাকাতেই সীমাবদ্ধ ছিল।

গৌড়েশ্বর শশাঙ্কের (রাজত্বকাল, ৬০০-৬২৫) অব্যবহিত পূর্ববর্তী বঙ্গের তিন স্বাধীন শাসকের মতোই তিনি সুবর্ণ তৌলরীতি অনুসরণে স্বর্ণমুদ্রা প্রস্ত্তত করেন। কিন্তু এই স্বর্ণমুদ্রার ধাতব বিশুদ্ধি নিম্নমানের। তাঁর স্বর্ণমুদ্রার কোন কোনটিতে সোনার পরিমাণ ৪৯-৫২%, ৩৩%, ৩২-৩৬% এবং ১৬-৩৪%। শেষোক্ত প্রকারের স্বর্ণমুদ্রার মূল্যমান যে নিতান্ত অল্প, তা ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু সমতট অঞ্চলে শশাঙ্ক যে স্বর্ণমুদ্রার প্রচলন করেন, তা অনেকটাই ভিন্ন প্রকৃতির। মুদ্রাগুলির ওজন ৯০ গ্রেণ, অতএব এগুলি কোনমতেই সুবর্ণ তৌলরীতি অনুসারে নির্মিত হয়নি, বরং এগুলি সম্ভবত শতমান (১৮০ গ্রেণ) তৌলরীতি মেনেই তৈরি হয়। এই দিক দিয়ে বিচার করলে শশাঙ্কের সমতট এলাকার স্বর্ণমুদ্রা অর্ধশতমান পর্যায়ভুক্ত। কেবলমাত্র সমতটে প্রচলিত অর্ধ-শতমান স্বর্ণমুদ্রায় সোনার পরিমাণও অনেক বেশি, অর্থাৎ তাদের ধাতুগত বিশুদ্ধি উন্নততর মানের। অতএব শশাঙ্ক তাঁর রাজত্বের দুই এলাকায় (গৌড়-বঙ্গ এবং সমতট) দুই ভিন্নপ্রকারের স্বর্ণমুদ্রা দুই ভিন্ন তৌলরীতি অনুযায়ী নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

গৌড়ে শশাঙ্কের পর যিনি ক্ষমতায় আসেন সেই জয়নাগ যে স্বর্ণমুদ্রা জারি করেন সেগুলি সুবর্ণ তৌলরীতি আশ্রিত। তাদের ধাতুগত বিশুদ্ধি নিম্নমানের; স্বর্ণমুদ্রায় বহুল পরিমাণ খাদ মেশানো হয়েছিল। অন্যদিকে সমতটের শাসকেরা (যেমন, দেববর্মণ, বসুবর্মণ, এক অজ্ঞাতনামা রাজা, শ্রীকুমার, জীবধারণরাত, শ্রীধরণরাত, দেবখড়গ এবং রাজভট) যে স্বর্ণমুদ্রা জারি করেন সেগুলি ৯০ গ্রেণ ওজন বিশিষ্ট। অর্থাৎ শশাঙ্ক সমতটে শতমান তৌলরীতির ভিত্তিতে যে অর্ধশতমান পর্যায়ভুক্ত স্বর্ণমুদ্রা জারি করেন, সেই ব্যবস্থা পরবর্তী আমলেও সমতটে ধারাবাহিকভাবে বিদ্যমান ছিল। শশাঙ্ক-পরবর্তী সমতটের স্বর্ণমুদ্রায় সোনার শতকরা হার যথেষ্ট উঁচু, সোনার গুণগতমানও উঁচু। অবশ্য বলভট যে ৯০ গ্রেণ ওজনের স্বর্ণমুদ্রা জারি করেন, তা কার্যত দুই প্রকারের। এক প্রকারের স্বর্ণমুদ্রার ধাতব বিশুদ্ধি উচ্চমানের, অন্যজাতীয় স্বর্ণমুদ্রায় খাদের পরিমাণ অনেক বেশি। শশাঙ্ক প্রবর্তিত অর্ধশতমান পর্যায়ের স্বর্ণমুদ্রা জারি করার নীতির প্রকৃতপক্ষে পরিসমাপ্তি ঘটে অষ্টম শতকে দেবপর্বতের (বর্তমান ময়নামতী) শাসক বঙ্গালমৃগাঙ্ক আনন্দদেবের শাসনকালে। সমতট ও সন্নিহিত অঞ্চলে আনন্দদেব ১৪৪ গ্রেণ ওজনের (সুবর্ণ তৌলরীতি) স্বর্ণমুদ্রা প্রচলন করেন। তাঁর স্বর্ণমুদ্রায় আরাকানের চন্দ্রবংশীয় স্বর্ণমুদ্রার প্রভাব নজর এড়ায় না। অষ্টম শতকে হরিকেল ভূখন্ডে (চট্টগ্রাম ও সন্নিহিত এলাকা) ৮ গ্রাম ওজনের যে স্বর্ণমুদ্রা প্রচলিত ছিল, তার ধাতুগত বিশুদ্ধি নিতান্ত নিম্নমানের। এর পর থেকে কার্যত প্রাচীন বাংলায় স্বর্ণমুদ্রার প্রচলন লুপ্ত হয়ে যায়।

লক্ষণীয় ঘটনা এই যে, যখন থেকে বাংলায় স্বর্ণমুদ্রা অদৃশ্য হলো, সেই একই সময়ে হরিকেল ও পট্টিকের অঞ্চলে বহুল পরিমাণে রৌপ্যমুদ্রার প্রচলন শুরু হলো। হরিকেলের রৌপ্যমুদ্রার সর্বাধিক তাৎপর্য তার অতি উচ্চ ধাতব বিশুদ্ধি। এই মুদ্রার মুখ্যদিকে বিদ্যমান একটি উপবিষ্ট বৃষের প্রতিকৃতি এবং ‘হরিকেল’ এই স্থান নাম, গৌণদিকে একটি ত্রিমুখী নকশা। ‘হরিকেল’ নামটির হরফ বিশ্লেষণ করে পন্ডিতগণ এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, ঐ লেখ সম্বলিত মুদ্রাগুলি খ্রিস্টীয় সপ্তম ও অষ্টম শতকে নির্মিত। পূর্ণাঙ্গ ওজনের একক বিশিষ্ট হরিকেলী রৌপ্যমুদ্রার ওজন ৮ গ্রাম। অতএব ৬ গ্রাম ওজনের মুদ্রাগুলি পূর্ণাঙ্গ ওজনের ২/৩ অংশ; ৪ গ্রাম ওজনের মুদ্রাগুলি ১/২ অংশ এবং ২ গ্রাম ওজনের মুদ্রাগুলি ১/৪ অংশ। হরিকেলের রৌপ্য মুদ্রাব্যবস্থা সম্ভবত নিকটবর্তী আরাকানের চন্দ্র শাসকদের রৌপ্যমুদ্রার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল। প্রায় একই সময়ে হরিকেল মুদ্রার সঙ্গে সাদৃশ্যসম্পন্ন রৌপ্যমুদ্রা প্রচলিত হয় পট্টিকের অঞ্চলে (কুমিল্লা এলাকা)। মনে হয় পট্টিকের-র রৌপ্যমুদ্রা হরিকেলের রৌপ্যমুদ্রার আদলে নির্মিত। উল্লেখ্য, হরিকেল বা পট্টিকের কোন এলাকার রৌপ্যমুদ্রাতেই কোন রাজনৈতিক শক্তি বা শাসকের নাম নেই।

মুগল স্বর্ণমুদ্রা ( খিস্টীয় ১৬ শতক), সম্রাট হুমায়ন

বাংলার মুদ্রা ব্যবস্থার জটিলতম পরিস্থিতি সম্ভবত দেখা যাবে ৭৫০-১২০০ খ্রিস্টাব্দের সময়সীমায়। এই পদের মুদ্রাব্যবস্থা সম্পর্কে পন্ডিতমহলে বিতর্কও প্রচুর। এই সাড়ে চারশ বছরের বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে পাল ও সেন এই দুই পরাক্রান্ত রাজবংশ ক্ষমতায় ছিল। অবশ্য পাল ও সেন বংশ প্রাচীন বাংলার চারটি এলাকার উপর একচ্ছত্র আধিপত্য কখনও বিস্তার করতে পারেনি। আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে পাল এবং সেন বংশের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে সংশয় নেই, কিন্তু আদি মধ্যকালীন বাংলায় তাদের সমকালীন শক্তি হিসেবে সমতট ও বঙ্গ এলাকায় রাজত্ব করতেন চন্দ্র রাজাগণ (আনু. ৯০০-১০৫৫), বর্মণ বংশীয় শাসকগণ (১০৫৫-১১৪৫) এবং পরবর্তী দেববংশীয় রাজাগণ (বারো শতকের শেষার্ধ থেকে ১২৯০ পর্যন্ত)। ৭৫০-১২০০ পর্যন্ত বাংলার কোনও শাসকই স্বর্ণমুদ্রা জারি করেননি। আদি মধ্যযুগীয় বাংলার অগ্রগণ্য শক্তি হওয়া সত্ত্বেও পাল এবং সেন রাজাগণ বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে কোন ধাতবমুদ্রা জারি করেননি। অথচ পাল-সেন লেখমালায় নিয়মিত উল্লিখিত হয়েছে বিবিধ মুদ্রানাম, যেমন, পুরাণ, ধরণ, দ্রম্ম। এই পরিভাষাগুলি ৩২ রতি ওজনের (ু৫৭.৬ গ্রেণ) বা কার্ষাপণ তৌলরীতির রৌপ্য মুদ্রা বুঝাতে ব্যবহূত হতো। সেন রাজাদের ও তাঁদের সমকালীন অন্যান্য রাজাদের লেখমালায় বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে ‘কপর্দক-পুরাণ’ পরিভাষাটি দেখা যায়। কর্পদক বলতে কড়ি বুঝায়; আর ‘পুরাণ’ অবশ্যই একপ্রকার রৌপ্যমুদ্রা। যুগ্মশব্দ ‘কর্পদক-পুরাণ’ বলতে এমন এক বিনিময়ের মাধ্যম বুঝিয়েছে যার গুণগতমান এক পুরাণ বা রৌপ্যমুদ্রার (৫৭.৬ গ্রেণ) সমান, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে যার গণনা হতো সমানুপাতিক কড়ির দ্বারা। বাংলার সনাতন পাটীগণিতে যে সারণি পাওয়া যায়, তাতে এক রৌপ্য মুদ্রার (পুরাণ বা দ্রম্ম) বদলে ১২৮০টি কড়ি পাওয়া যেত। অর্থাৎ পুরাণ ও কপর্দকের অনুপাত ১:১২৮০। আদি মধ্যকালীন বাংলায় কড়ি যে বহুল প্রচলিত ছিল তার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া গেছে পাহাড়পুর ও কলগং-এর (ভাগলপুরের নিকট, বিহার) উৎখনন থেকে।

আদি মধ্যকালীন বাংলায় মূল্যবান ধাতব মুদ্রার দুষ্প্রাপ্যতা ও কড়ির বহুল প্রচলন দেখা যায়। এই সময়ে ধাতব মুদ্রার কার্যত অনুপস্থিতির ব্যাখ্যা পন্ডিতগণ খুঁজেছেন দূর পাল্লার বাণিজ্যে অধোগতির মাঝে। বাণিজ্য-নির্ভর নগরাশ্রয়ী অর্থনীতির অবক্ষয় এক স্বনির্ভর, স্বয়ংসম্পূর্ণ, আবদ্ধ, গ্রামীণ অর্থনীতির জন্ম দেয়। এই গ্রামমুখী অর্থনীতি, তাঁদের বিচারে, আদি মধ্যকালীন ভারতে ও বাংলায় সামন্ত ব্যবস্থার অভিঘাতেই উদ্ভূত হয়েছিল। এই অর্থনৈতিক পরিস্থিতি দূরপাল্লার বাণিজ্য ও উচ্চমানের মুদ্রাব্যবস্থার পরিপন্থী ছিল। এই পন্ডিতবর্গের ধারণা যে কড়ি কখনও বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে ধাতবমুদ্রার মতো উপযুক্ত ছিল না; কারণ কড়ি দিয়ে বড় জোর স্থানীয় পর্যায়ে ছোটমাপের দৈনন্দিন লেনদেন চলতে পারত।

কিন্তু কড়ি যে দূরপাল্লার বাণিজ্যের পক্ষে প্রতিবন্ধক, এই ধারণা মেনে নেওয়া কঠিন। কারণ কড়ি বাংলার নিজস্ব সামগ্রী নয়। আদি মধ্যকালে বাংলায় কড়ি প্রচুর পরিমাণে সমুদ্রপথে আমদানি করা হতো সুদূর মালদ্বীপ থেকে; পরিবর্তে মালদ্বীপে বাংলা থেকে রপ্তানি হতো চাল। এ দিক দিয়ে বিচার করলে কড়ি কখনওই দূরপাল্লার বাণিজ্যের প্রতিবন্ধক নয়; কড়ির উপস্থিতি দূরপাল্লার বাণিজ্যের অবক্ষয়কেও নির্দেশ করে না, বরং বাংলার অর্থনৈতিক ইতিহাসে কড়ি দূরপাল্লার সমুদ্রবাণিজ্যের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। (দেখুন  ব্যবসা-বাণিজ্য)।

রৌপমুদ্রা ( খিস্টীয় ১৬ শতক), সম্রাট হুমায়ন

পাল-সেন শাসিত ভূখন্ডে যদিও কোন মুদ্রা জারি করা হয়নি, কিন্তু বাংলার দক্ষিণ-পূর্বতম এলাকায় এক বিপরীত চিত্র দেখা যায়। সপ্তম থেকে তের শতক পর্যন্ত হরিকেল এলাকায় যে অব্যাহতভাবে অতি উচ্চমানের রৌপ্য মুদ্রা প্রচলিত ছিল, সেকথা সুবিদিত। সপ্তম-অষ্টম শতকের রৌপ্য মুদ্রার মতোই পরবর্তীকালের হরিকেল মুদ্রায় কোন শাসক বা রাজবংশের নাম উৎকীর্ণ করা হয়নি। কিন্তু অষ্টম শতকের পরবর্তী পর্যায়ের হরিকেলীয় রৌপ্য মুদ্রায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। পরবর্তী পর্যায়ের মুদ্রার মাত্র মুখ্য দিকেই উপবিষ্ট বৃষমূর্তি, ত্রিমুখী নকশা এবং ‘হরিকেল’ অভিলেখটি উৎকীর্ণ হতো। গৌণ দিকটি সম্পূর্ণ খালি, নকশা ও অভিলেখ বিহীন। পরবর্তী পর্যায়ের মুদ্রাগুলির পাত বৃহত্তর ও পাতলা। ‘হরিকেল’ অভিলেখটির হরফ পরীক্ষা করে পন্ডিতগণ অভিমত দিয়েছেন যে, অভিলেখ সম্বলিত মুদ্রাগুলি প্রস্ত্তত হয়েছিল আট/নয় শতক থেকে বারো-তের শতক পর্যন্ত। পরবর্তী পর্যায়ের হরিকেলের রৌপ্যমুদ্রায় সবচেয়ে লক্ষণীয় পরিবর্তন আসে তাদের তৌলরীতিতে। দুই তৌলরীতির ধারায় এগুলি নির্মিত। প্রথম ধারায় এদের ওজন ২.৩৮০০-৩.৩৬০০ গ্রাম এবং দ্বিতীয় ধারায় মুদ্রার ওজন ০.৮৩৯২-১.৯৯১২ গ্রাম। এই দুই ধারার রৌপ্যমুদ্রার ওজন ৩.৭৩১৪ গ্রাম মানের উপর প্রতিষ্ঠিত। ৩.৭৩১৪ গ্রামের তৌলমানটি নিঃসন্দেহে অতীতের কার্ষাপণ (৩২ রতি বা ৫৭.৬ গ্রেণ) তৌলরীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত। পাল-সেন অভিলেখতে যে পুরাণ বা দ্রম্ম নামক মুদ্রানাম বারবার উল্লিখিত, হরিকেলের পরবর্তী পর্যায়ের রৌপ্যমুদ্রাগুলি তৌলমানের ভিত্তিতে বোধ হয় তাদের সমতুল। অন্যদিকে সংস্কারের পর আরব দুনিয়ার রৌপ্য দিরহাম মুদ্রার সঙ্গে হরিকেলের পরবর্তী পর্যায়ের সাদৃশ্য যেমন আকারে, তেমন ওজনেও। আদি মধ্যকালে হরিকেল অঞ্চল আরবি দুনিয়ার সঙ্গে নিয়মিত বাণিজ্য সম্পর্কে বিধৃত ছিল। আদি মধ্যকালীন বাংলায় উচ্চমানের দামি ধাতব মুদ্রার অভাব নিয়ে যে সযত্নলালিত ধারণা রয়েছে, হরিকেলের অব্যাহত রৌপ্যমুদ্রা সেই তত্ত্বকে নস্যাৎ করে দেয়। যেহেতু হরিকেলের রৌপ্যমুদ্রা (পুরাণ, ধরণ বা দ্রম্ম পরিভাষায় চিহ্নিত) সহজেই কড়ির সঙ্গে বিনিময়যোগ্য ছিল (১ পুরাণ = ১২৮০ কড়ি), তাই পাল-সেন শাসিত এলাকায় ধাতবমুদ্রার অভাব দিয়ে প্রমাণ করা কঠিন যে আদিমধ্যকালীন বাংলায় ব্যবসা-বাণিজ্যে অধোগতি দেখা দিয়েছিল।

স্বর্ণমুদ্রা সম্রাট আকবর, (১৫৫৬-১৬০৫ খিস্টাব্দ)

সেন আমলের কয়েকটি লেখতে একটি নতুন পরিভাষা পাওয়া যায়। এই শব্দটি ‘চূর্ণী’, অর্থাৎ চূর্ণীকৃত বা গুঁড়ো করা বা খন্ডীভূত কোন সামগ্রী। বহুক্ষেত্রেই ‘চূর্ণী’ কথাটি পুরাণ বা রৌপ্যমুদ্রা নামের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। তাই মনে হয় ‘চূর্ণী’ বলতে এক জাতীয় বিনিময়ের মাধ্যমকেই বোঝাত। দামোদরদেবের মেহার তাম্রশাসনে (১২৩৪ খ্রি) ‘পুরাণ’ ও ‘চূর্ণী’ পরিভাষা দুটি কার্যত সমার্থক শব্দরূপেই প্রযুক্ত। অতএব মুদ্রাতত্ত্ববিদগণ যুক্তিযুক্ত ব্যাখ্যা দেন যে ‘চূর্ণী’ (যা পুরাণ জাতীয় রৌপ্যমুদ্রার সমার্থক) হচ্ছে চূর্ণীকৃত খাঁটি রূপা। ওজনে এক ‘চূর্ণী’ এক পুরাণ/দ্রম্ম/ধরণ-এর সমান অর্থাৎ ৩২ রতি বা ৫৭.৬ গ্রেণ। আল মার্ভাজি বিবরণ (১১৪২ খ্রি) এবং আদি মধ্যকালীন একটি তিববতী বিবরণের যৌথ সাক্ষ্য থেকে বোঝা যায় বারো-তের শতকে বাংলায় খাঁটি সোনা ও রূপার চূর্ণ (‘চূর্ণী’ পরিভাষা দ্বারা চিহ্নিত) বিনিময়ের ধাতব মাধ্যম হিসেবে রৌপ্যমুদ্রার সঙ্গে সমান্তরালভাবে প্রচলিত ছিল। এর ফলে ঐ নির্দিষ্ট ওজনের রৌপ্য চূর্ণ (৫৭.৬ গ্রেণ বা ৩২ রতি) সমান তৌলরীতির পুরাণ জাতীয় রৌপ্যমুদ্রার সঙ্গে সহজেই বিনিময় যোগ্য ছিল। একইভাবে ১ পুরাণ/দ্রম্ম যেমন ১২৮০টি কড়ির সঙ্গে বিনিময়যোগ্য, তেমনই সমান ওজনের চূর্ণীও (রৌপ্যচূর্ণ) ১২৮০টি কড়ির সঙ্গে সহজেই বদলে নেওয়া যেত।

রৌপমুদ্রা, সম্রাট আকবর, (১৫৫৬-১৬০৫ খিস্টাব্দ)

অতএব আদি মধ্যপর্বে বাংলার মুদ্রাশ্রয়ী অর্থনীতি দারিদ্র্য পীড়িত ছিল না; বাণিজ্যের (বিশেষত দূরপাল্লার বাণিজ্যের) অবক্ষয়ও বিশেষ চোখে পড়ে না। বরং আদি মধ্যকালে বাংলায় একটি জটিল ত্রিস্তর বিশিষ্ট মুদ্রাব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। এই ত্রিস্তর মুদ্রাব্যবস্থার সর্বনিম্নপর্যায়ে ছিল কড়ি, যার ব্যবহার বাংলায় সুদীর্ঘকাল ধরে অব্যাহত ছিল। সর্বোচ্চ স্তরে দেখা যায় অতিউচ্চমানের রৌপ্য মুদ্রা, যা প্রধানত মেঘনা নদীর পূর্বদিকস্থ সমতট-হরিকেল এলাকায় অত্যন্ত সক্রিয় ছিল। এই দুই-এর মধ্যবর্তী স্তরটিতে দেখা যায় ‘চূর্ণী’ বা ‘ধাতবচূর্ণ’ যা ছিল যুগপৎ কড়ি ও রৌপ্যমুদ্রার সঙ্গে সহজেই বিনিময়যোগ্য। তের শতকে বাংলার মুদ্রাব্যবস্থায় স্বর্ণমুদ্রার পুনরাবির্ভাব ঘটে বাংলার সুলতানদের উদ্যোগে। সুলতানি শাসনব্যবস্থার আদর্শে মুদ্রাজারির এক বিশেষ রাজনৈতিক মাত্রা ছিল। মুদ্রাজারি করে সুলতান তাঁর স্বাধীন ও সার্বভৌম রাজনৈতিক শক্তির ঘোষণাও প্রতিষ্ঠা করতে পারতেন।  [রণবীর চক্রবর্তী]

গ্রন্থপঞ্জি  J Allan, A Catalogue of Indian Coins in the British Museum, Catalogue of the Coins of the Gupta Dynasties and of Sasanka, King of Gauda, London, 1914; BD Chattopadhyaya, ‘Currency in Early Bengal’, Journal of Indian History, LV, 1977; BN Mukherjee, Coins and Currency System in Gupta Bengal (c AD 320-550), Delhi, 1992; Coins and Currency System in Post-Gupta Bengal, Delhi, 1993; Coins and Currency Systems of Early Bengal up to c AD 300, Calcutta, 2000.

সুলতানি মুদ্রা  মুসলিম শাসন ব্যবস্থায় শাসকের স্বনামে মুদ্রা প্রচলন এবং খুৎবায় নিজ নাম প্রচার রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতো। এজন্য ক্ষমতা গ্রহণ অথবা স্বাধীনতা ঘোষণা এবং কোন কোন ক্ষেত্রে বিজয়কে স্মরণীয় করার জন্য শাসকগণ মুদ্রা জারি করতেন। ১২০৫ খ্রিস্টাব্দে গৌড় বিজয়ের স্মরণে সেনাপতি বখতিয়ার খলজী সুলতান মুহম্মদ বিন সামের নামে গৌড় থেকে মুদ্রা জারি করেন। এটিই ছিল বাংলায় জারিকৃত প্রথম মুসলিম মুদ্রা। বখতিয়ার খলজীর গৌড় বিজয়ের সময়কাল থেকে বাংলায় স্বাধীন সালতানাত প্রতিষ্ঠার (১৩৩৮ খ্রি) পূর্ব পর্যন্ত কিঞ্চিদধিক ১৩০ বৎসর বাংলা দিল্লির সুলতানদের অধীন একটি প্রদেশ হিসেবে এবং পরবর্তী দুশ বছর (১৩৩৮ থেকে ১৫৩৮ খ্রি) স্বাধীন সুলতানি হিসেবে শাসিত হয়। বাংলার প্রাদেশিক গভর্নরগণ দিল্লি সালতানাতের মুদ্রার অনুকরণে বাংলা থেকে স্বীয় প্রভুদের নামে মুদ্রা জারি করেন। গভর্নরদের মধ্যে অন্তত চারজন স্ব স্ব সুলতানদের সঙ্গে মুদ্রায় নিজের নাম উৎকীর্ণের অনুমোদন লাভ করেছিলেন। তাছাড়া কয়েকজন গভর্নর বিদ্রোহ ঘোষণা করে নিজ নামে মুদ্রা প্রচলন করেন। বাংলার স্বাধীন সুলতানদের সকলেরই স্বনামে উৎকীর্ণ মুদ্রা পাওয়া গেছে। স্বল্প সময়ের জন্য ক্ষমতা লাভকারী এঁদের কয়েকজন সুলতান ব্যতীত সবারই বিভিন্ন ধরনের এবং ভিন্ন ভিন্ন ডিজাইনের প্রচুর রৌপ্যমুদ্রা আবিষ্কৃত হয়েছে। সাধারণত বাংলায় তিন প্রকার ধাতুর মুদ্রার কথা জানা যায়- স্বর্ণ, রৌপ্য ও তাম্র। বেশ কয়েকজন সুলতানের স্বর্ণমুদ্রা পাওয়া গেছে। তবে প্রত্যেক সুলতানের রৌপ্যমুদ্রা ছিল। তাম্রমুদ্রার প্রাপ্তি অত্যন্ত নগণ্য সংখ্যক, কারণ প্রাচীনকাল থেকেই ছোটখাট লেনদেনে বাংলায় কড়ির ব্যবহার প্রচলিত ছিল।

বৈশিষ্ট্য  সুলতানি বাংলার মুদ্রায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। যেমন:

১. মধ্যযুগের মুসলিম মুদ্রা প্রথমে সিন্ধুর প্রাদেশিক আরব গভর্নররা উৎকীর্ণ করেন। সাত ও আট শতকের সিন্ধুর মুদ্রা ছিল উমাইয়া মুদ্রার সরাসরি অনুকৃতি। এগার শতকে ভারতে সুনির্দিষ্টভাবে মুসলিম মুদ্রা উৎকীর্ণ হয়। এই সময়ে দুই ধরনের মুদ্রা উৎকীর্ণ হতে থাকে : (ক) গজনীর সুলতানদের মুদ্রার অনুকৃতি। এসব মুদ্রা আরবি লিপিতে উৎকীর্ণ করা হতো; (খ) উত্তর ভারতে জারিকৃত মুদ্রা। এ ধরনের মুদ্রার লিপি ছিল আরবি ও সংস্কৃতের মিশ্রণ।

২. মুসলিম মুদ্রায় হিন্দু সংস্কৃতির প্রভাব। এক্ষেত্রে কতিপয় উদাহরণ সংযোজন করা যায়। বখতিয়ার খলজীর মুদ্রায় ঘোড়সওয়ারের ছবি এবং নাগরি লিপিতে ‘গৌড় বিজয়’, আলীমর্দান খলজীর স্বর্ণ মুদ্রায় ঘোড়সওয়ার প্রতিকৃতি, নাসিরুদ্দীন মাহমুদ শাহ ও জালালুদ্দীন মাহমুদ শাহ এর মুদ্রায় সিংহ প্রতীকের ব্যবহার, জালালুদ্দীন ফতেহ শাহ এর মুদ্রায় সাতরশ্মি সংযুক্ত সূর্যের প্রতীক।

দিল্লির প্রদেশ হিসেবে ১৩০ বৎসরের শাসনামলে বাংলায় দ’ুধরনের মুদ্রার প্রচলন ছিল:

(১)  দিল্লি সুলতানদের নামে জারিকৃত মুদ্রা এবং (২)  বাংলায় বিদ্রোহ ঘোষণাকারী শাসকদের মুদ্রা।

প্রথম বিভাগের মুদ্রাগুলিকে দুটি উপবিভাগে বিভক্ত করা যায়: (ক) দিল্লি সুলতানদের নামাঙ্কিত মুদ্রা এবং (খ) দিল্লির সুলতান ও বাংলার গভর্নরদের যৌথ নামের মুদ্রা।

বাংলার টাকশাল থেকে জারিকৃত এ যাবৎ ঘোরের একজন ও দিল্লির ছয়জন সুলতানের নামাঙ্কিত মুদ্রা পাওয়া গেছে। প্রাদেশিক গভর্নরগণই এ মুদ্রা জারি করতেন। যাঁদের মুদ্রা পাওয়া গেছে তাঁরা হলেন- মুইজউদ্দীন মুহম্মদ বিন সাম (১২০৩-১২০৬ খ্রি), সুলতান শামসুদ্দীন ইলতুৎমিশ (১২১০-১২৩৬ খ্রি), সুলতান জালালউদ্দীন রাজিয়া (১২৩৬-১২৪০ খ্রি), সুলতান নাসিরুদ্দীন মাহমুদ (১২৪৬-১২৬৬ খ্রি), সুলতান গিয়াসউদ্দীন বলবন (১২৬৬-১২৮৭ খ্রি), সুলতান গিয়াসউদ্দীন তুগলক (১৩২০-১৩২৫ খ্রি) এবং সুলতান মুহম্মদ বিন তুগলক (১৩২৫-১৩৫১ খ্রি)। এঁদের মধ্যে মুহম্মদ বিন সাম ও ইলতুৎমিশ স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা জারি করেন। বাকি সবারই রৌপ্য মুদ্রা পাওয়া গেছে। একমাত্র মুহম্মদ বিন তুগলকের স্বর্ণ, রৌপ্য ও তাম্র মুদ্রা পাওয়া গেছে।

স্বর্ণমুদ্রা, সম্রাট শাহজাহান, (১৬২৮-১৬৫৮ খিস্টাব্দ)

বখতিয়ার খলজী বাংলা বিজয়ের স্মরণে মুহম্মদ বিন সামের নামে ৬০১ হিজরিতে গৌড় থেকে স্বর্ণ মুদ্রা জারি করেন। এই মুদ্রার মুখ্য দিকে আরবিতে উপাধিসহ সুলতানের নাম এবং গৌণ দিকে দন্ড হাতে ঘোড়সওয়ার এবং প্রান্তে তারিখ ও নাগরী লিপিতে ‘গৌড় বিজয়’ কথাটি উৎকীর্ণ রয়েছে। কিন্তু এই মুদ্রায় বখতিয়ার খলজীর নাম নেই। ৬০১ হিজরিতে গৌড় থেকে উৎকীর্ণ মুহম্মদ বিন সামের ঘোড়সওয়ার শ্রেণির কিছু রৌপ্য মুদ্রাও পাওয়া গেছে।

রৌপমুদ্রা, সম্রাট শাহজাহান, (১৬২৮-১৬৫৮ খিস্টাব্দ)

ইলতুৎমিশ অনুরূপ ঘোড়সওয়ার ধরনের স্বর্ণ মুদ্রা জারি করেন। সাধারণভাবে দিল্লির সুলতানদের রৌপ্য মুদ্রায় মুদ্রার মুখ্য দিকে উপাধিসহ সুলতানের নাম এবং বিপরীত দিকে কলেমা বা বাগদাদের খেলাফতের সঙ্গে সম্পৃক্ততামূলক বাক্য ‘নাসির আমিরুল মুমিনিন’ অথবা খলিফার নামোল্লেখ করে (ফী আহদে ইমাম আল মুস্তাসিম) তার কালে মুদ্রিত বাক্য ব্যবহার করা হয়েছে এবং প্রান্তে (Margine) টাকশাল ও তারিখ হিসেবে সাল উল্লেখ করা হয়েছে। কখনও কখনও মাসের নামের উল্লেখও দেখা যায়। সুলতান নাসিরুদ্দীন মাহমুদের মুদ্রার প্রান্তলিপিতে ‘তান্কাহ’ (সংস্কৃত টঙ্কা) শব্দটি প্রথম ব্যবহূত হয়েছে মুদ্রার নাম ও মূল্যমান হিসেবে। বস্ত্তত এসব রৌপ্য মুদ্রার সবগুলিই ছিল পূর্ণ টাকা, মোটামুটি এক ভরি ওজনের। দুএকটি ব্যতিক্রম ছাড়া সাধারণভাবে বাংলায় কোন অর্ধ, সিকি প্রভৃতি নিম্ন মানের মুদ্রা পাওয়া যায়নি, কেননা কড়ি এ জাতীয় প্রয়োজন মেটাত।

স্বর্ণমুদ্রা,সম্রাট জাহাঙ্গীর (১৬০৫-১৬২৩ খিস্টাব্দ)

দিল্লির চারজন সুলতান এবং বাংলার চারজন গভর্নরের যুক্ত নামে প্রকাশিত মুদ্রা পাওয়া গেছে। তাঁরা হলেন (১) গভর্নর দৌলত শাহ বিন মওদুদ, সুলতান ইলতুৎমিশের সঙ্গে, (২) গভর্নর ইখতিয়ারুদ্দীন ইউযবক তুগরল, সুলতান নাসিরুদ্দীন মাহমুদের সঙ্গে, (৩) গভর্নর নাসিরুদ্দীন ইবরাহিম, সুলতান গিয়াসউদ্দীন তুগলক ও সুলতান মুহম্মদ বিন তুগলকের সঙ্গে এবং (৪) গিয়াসউদ্দীন বাহাদুর, সুলতান মুহম্মদ বিন তুগলকের সঙ্গে। এর সবগুলিই রৌপ্য মুদ্রা। তবে গিয়াসউদ্দীন বাহাদুর ও মুহম্মদ বিন তুগলকের স্বর্ণমুদ্রাও পাওয়া গেছে।

রৌপমুদ্রা,সম্রাট জাহাঙ্গীর (১৬০৫-১৬২৩ খিস্টাব্দ)

এ সকল মুদ্রার একদিকে কখনও কখনও আববাসীয় খলিফা ও সুলতানের নাম এবং অপর দিকে গভর্নরের নাম অথবা একদিকে শুধুমাত্র আববাসীয় খলিফার নাম এবং অপর দিকে সুলতান ও গভর্নরের নাম অথবা একদিকে দিল্লির সুলতানের এবং অপর দিকে উপাধিসহ গভর্নরের নাম এবং প্রান্তে টাকশাল ও তারিখ স্থান পেয়েছে।

বাংলায় স্বাধীন সুলতানদের মুদ্রার দুটি ভাগ রয়েছে: ১২০৫ থেকে ১৩৩৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত দিল্লির নিযুক্ত স্বাধীনতা ঘোষণাকারী গভর্নরদের মুদ্রা এবং ১৩৩৮ থেকে ১৫৩৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে ক্ষমতাধারণকারী স্বাধীন সুলতানদের মুদ্রা।

স্বর্ণমুদ্রা, সম্রাট আওরঙ্গজেব (১৬৫৮-১৭০৭ খিস্টাব্দ)

মোট চারজন গভর্নর বাংলায় নিজস্ব মুদ্রা প্রচলন করেন- (১) আলীমর্দান খলজী, (২) মুগীসউদ্দীন ইউযবক, (৩) মুইজুদ্দীন তুগরল, (৪) নাসিরুদ্দীন মাহমুদ (বুগরা খান)। তাছাড়া ১৩৩৮ খ্রিস্টাব্দে স্বাধীনতা লাভের পূর্বে আরও কয়েকজন স্বাধীন সুলতান মুদ্রা জারি করেন। তাঁরা কোন সময় গভর্নর ছিলেন না, সরাসরি স্বাধীন ক্ষমতা অর্জন করেন। তাঁরা হলেন- (১) গিয়াসউদ্দীন ইওজ খলজী, (২) রুকনুদ্দীন কায়কাউস, (৩) শামসুদ্দীন ফিরুজ ও (৪) গিয়াসউদ্দীন বাহাদুর। এছাড়া শামসুদ্দীনের তিন পুত্র তাঁর জীবদ্দশাতেই স্ব স্ব নামে মুদ্রা প্রচলনের অধিকার পেয়েছিলেন। পুত্রদের মুদ্রায় তাদের পিতাও যে সুলতান ছিলেন সে বিষয়টি নামের শেষে ‘সুলতান বিন সুলতান’ (সুলতানের পুত্র সুলতান) বাক্য যোগ করে বুঝানো হয়েছে।

১৩৩৮ খ্রিস্টাব্দে ফখরুদ্দীন মুবারক শাহ সোনারগাঁয়ে স্বাধীনতা ঘোষণা করে মুদ্রা জারি করেন। তাঁর মুদ্রা ১৩৩৮ খ্রি.(৭৩৯ হি.) থেকে ১৩৪৯ খ্রি. (৭৫০ হি.) পর্যন্ত এবং তাঁর পুত্র ইখতিয়ারউদ্দীন গাজী শাহ এর মুদ্রা ১৩৫২ খ্রি. (৭৫৩ হি.) পর্যন্ত পাওয়া যায়। ফখরুদ্দিনের কয়েকটি স্বর্ণমুদ্রা এবং প্রতিবছরের প্রচুর রৌপ্য মুদ্রা পাওয়া গেছে। গাজী শাহের শুধুমাত্র রৌপ্যমুদ্রা পাওয়া গেছে। অতঃপর ইলিয়াস শাহ  সোনারগাঁও দখল করে সমগ্র বাংলাকে একীভূত করেন এবং বিভিন্ন টাকশাল থেকে মুদ্রা জারি করেন। প্রাথমিক ইলিয়াসশাহী বংশের চারজন শাসকের সকলেরই প্রচুর পরিমাণে রৌপ্য মুদ্রা পাওয়া গেছে এবং একমাত্র শেষ শাসক হামযা শাহ ব্যতীত অন্য তিনজনের স্বর্ণমুদ্রা পাওয়া গেছে।

রৌপমুদ্রা, সম্রাট আওরঙ্গজেব (১৬৫৮-১৭০৭ খিস্টাব্দ)

পরবর্তীসময়ে হামযা শাহের দাস বায়েজীদ এবং তাঁর পুত্র আলাউদ্দীন ফিরুজ তিন বছরের জন্য বাংলা শাসন করেন এবং স্ব স্ব নামে রৌপ্য মুদ্রা জারি করেন। ইতিহাসে এই আলাউদ্দীন শুধুমাত্র মুদ্রার মাধ্যমেই পরিচিত।

অতঃপর রাজা গণেশ ক্ষমতা গ্রহণ করে বাংলায় মুদ্রা জারি করেন। তাঁর মুদ্রায় উৎকীর্ণ বক্তব্য আরবির পরিবর্তে বাংলা লিপিতে পাওয়া যায়; হিজরি সালের পরিবর্তে শকাব্দ ব্যবহূত হয়েছে। তাঁর মুদ্রাগুলি পান্ডুনগর, চাটিগ্রাম ও সুবর্ণগ্রাম থেকে জারিকৃত। রাজা গণেশ এর পর তাঁর পুত্র মহেন্দ্র পিতার অনুকরণে বাংলা লিপিতে মুদ্রা চালু করেন। তাঁর অপর পুত্র যদু ইসলাম ধর্মে দীক্ষা গ্রহণ করে জালালউদ্দীন মুহম্মদ শাহ উপাধি গ্রহণ করেন এবং তিনি মুদ্রায় আরবি লিপি, হিজরি বছর গণনা পুনঃপ্রচলন করেন। এ ছাড়াও দীর্ঘদিন পর তিনি পুনরায় বাংলার মুদ্রায় কলেমার প্রবর্তন করেন। তিনি ১৪১৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৪১৬ খ্রিস্টাব্দ এবং পুনরায় ১৪১৮ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৪৩৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজ্য শাসন করেন। তাঁর পুত্র ও পরবর্তী সুলতান শামসুদ্দীন আহমদ শাহেরও মুদ্রা পাওয়া গেছে। জালালউদ্দীন স্বর্ণমুদ্রাও প্রচলন করেন। সাম্প্রতিককালে ১৪৩৩ খ্রি. (৮৩৭ হি) তারিখ সম্বলিত বাংলার একজন নতুন সুলতান গিয়াসুদ্দীন নুসরত শাহের মুদ্রা পাওয়া যায়। ইতিহাসে এই নামে কোন সুলতানের বর্ণনা পাওয়া যায় না।

১৪৩৪ খ্রি. (৮৩৮ হি.) থেকে পরবর্তী ইলিয়াসশাহী বংশের মোট পাঁচজন সুলতান (১) নাসিরুদ্দীন মাহমুদ শাহ (১৪৩৫-১৪৫৯ খ্রি), (২) রুকনুদ্দীন বারবক শাহ (১৪৫৯-১৪৭৪ খ্রি), (৩) শামসুদ্দীন ইউসুফ শাহ (১৪৭৪-১৪৮১ খ্রি), (৪) নূরুদ্দীন সিকান্দার শাহ (১৪৮১ খ্রি) এবং (৫) জালালুদ্দীন ফতেহ শাহ এর (১৪৮১-১৪৮৭ খ্রি) রৌপ্য মুদ্রা পাওয়া যায়। এঁদের মধ্যে নূরুদ্দীনের মুদ্রা সাম্প্রতিক কালের আবিষ্কার এবং মুদ্রার ভিত্তিতে তাঁর প্রকৃত পরিচয় জানা গেছে। তিনি মাহমুদ শাহের পুত্র এবং বারবক ও ফতেহ শাহের ভাই। খুবই অল্পকাল তিনি ক্ষমতায় ছিলেন।

অতঃপর হাবশী বংশের চারজন শাসক, শাহজাদা বারবক (১৪৮৭-১৪৮৮ খ্রি), সাইফুদ্দীন ফিরুজ (১৪৮৮-১৪৯০ খ্রি), কুতুবউদ্দীন মাহমুদ (১৪৯০ খ্রি), শামসুদ্দীন মুজাফফর (১৪৯০-১৪৯৩ খ্রি) রাজত্ব করেন।

এঁদের মধ্যে শাহজাদা বারবক এবং কুতুবউদ্দীনের মুদ্রা কম পাওয়া যায়। মুজাফফর শাহের  কামতা বিজয়ের স্মারক মুদ্রা, (‘কামতামরদান’ ৮৯৮ লিপি সম্বলিত) সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। হাবশীদের পরে হোসেনশাহী বংশের নিম্নবর্ণিত চারজন শাসকের, আলাউদ্দীন হোসেন শাহ (১৪৯৪-১৫১৯ খ্রি), নাসিরুদ্দীন নুসরত শাহ (১৫১৯-১৫৩২ খ্রি), আলাউদ্দীন ফিরুজ (১৫৩২ খ্রি) এবং  গিয়াসউদ্দীন মাহমুদ শাহ (১৫৩৩-১৫৩৮ খ্রি), স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা পাওয়া গেছে। একমাত্র নুসরত শাহের কয়েকটি তাম্র মুদ্রা আবিষ্কৃত হয়েছে।

হোসেন শাহের ‘কামরূপ-কামতা-জাজনগর ও উড়িষ্যা বিজয়ী’ লিপি সম্বলিত স্মারক মুদ্রা সবিশেষ উল্লেখযোগ্য এবং তা প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। হোসেনশাহী মুদ্রার সংখ্যাধিক্য সমকালীন অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে সমৃদ্ধ বাংলার চিত্রপটই উপস্থাপন করে।

সাধারণত বাংলায় তাম্র মুদ্রার প্রচলন ছিল না বলা যায়। ছোটখাট লেনদেনে কড়িই ছিল প্রচলিত বিনিময় মাধ্যম বা মুদ্রা।

বাংলার মুদ্রা সাধারণত গোল আকৃতির। অবশ্য জালালুদ্দীন মুহম্মদ শাহের একটি ষড়ভুজ আকৃতির ব্যতিক্রমী মুদ্রা পাওয়া গেছে। ওজনের দিক থেকে বাংলার সুলতানি মুদ্রা প্রথমত দিল্লির মুদ্রার অনুকরণে ১৭৭ গ্রেণ বা ১১.৬ গ্রাম ওজন মূল্যমান গৃহীত হয়েছিল, কিন্তু পরবর্তীকালে মুদ্রার ওজন কমে দাঁড়ায় ১৬৬ গ্রেণ বা ১০.৮ গ্রামে।

স্বর্ণমদ্রা তুলনামূলকভাবে সংখ্যায় কম এবং একমাত্র বড় বড় লেনদেনে, স্মারক ও স্যুভেনির হিসেবে এগুলি ব্যবহূত হতো। তবে  ব্যবসায় বাণিজ্যে সাধারণত রৌপ্য মুদ্রার প্রচলন ছিল।

উমাইয়া খলিফা আব্দুল মালিকের সময়ে মুদ্রায় কলেমার ব্যবহার শুরু হয় এবং পরবর্তীকালের মুসলিম শাসকগণের মুদ্রায় কলেমার ব্যবহার বহুলভাবে দেখা যায়। বাংলার সুলতান সকলে না হলেও অনেকেই মুদ্রায় কলেমার ব্যবহার করেছেন। তবে প্রথম দিকের (জালালুদ্দীন মুহম্মদ পূর্ববর্তী) স্বাধীন সুলতানদের মুদ্রায় কলেমার পরিবর্তে খিলাফতের প্রতি আনুগত্য প্রকাশক বাক্যাবলি ব্যবহূত হতো। জালালুদ্দীন মুহম্মদ প্রায় ২০০ বছর পর বাংলার মুদ্রায় পুনরায় কলেমার প্রবর্তন করেন।

খিলাফত বা খলিফার প্রতি মুসলিম শাসকদের মনোভাব তাঁদের মুদ্রায় প্রতিফলিত হতে দেখা যায়। মুসলিম খিলাফতের সীমানা থেকে বিচ্ছিন্ন ও যোগাযোগহীন হওয়া সত্ত্বেও বহু মুসলিম শাসক বা সম্রাট অনেক সময়ে নিজের ক্ষমতা বৈধকরণের জন্য অথবা ইসলামি আন্তর্জাতিকতা সংক্রান্ত আত্মিক যোগ প্রদর্শনের জন্য রাজনৈতিক বা ধর্মীয় কারণে খলিফার অনুমোদনসহ বা তাঁর অজ্ঞাতে খলিফার নাম মুদ্রায় ব্যবহার করতেন। বাংলার স্বাধীন সুলতানদের এবং বাংলায় জারিকৃত দিল্লির শাসকদের মুদ্রায়ও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। বাংলার মুদ্রায় খিলাফতের চার ধরনের প্রকাশ লক্ষ্য করা যায়: (১) মুদ্রায় সরাসরি খলিফার নাম উল্লেখ, যেমন- গিয়াসউদ্দীন ইওজ খলজীর ৬১৯ অথবা ৬১৭ হিজরি (১২২২ বা ১২২০ খ্রি.)ও ৬২১ হিজরির (১২২৪ খ্রি.) মুদ্রা দুটোর মুখ্য দিকে কলেমার পর বাগদাদের খলিফার উদ্দেশ্যে ‘আল নাসির আমির আল মুমিনিন’ কথাটি উৎকীর্ণ হয়েছে; (২) আববাসীয় খলিফাদের নাম অনুপস্থিত ছিল কিন্তু খিলাফতের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করা হয়, যেমন- ৭৮১ হিজরিতে (১৩৭৯ খ্রি.) সুলতান  সিকান্দর শাহ এর (১৩৫৮-১৩৯০ খ্রি) প্রবর্তিত মুদ্রার গৌণ দিকে উৎকীর্ণ রয়েছে ‘ইয়ামিন খলিফাতুল্লাহ নাসির আমির আল মুমিনিন শাসসুল ইসলাম ওয়াল মুসলেমিন খুল্লিদাত খিলাফাতে’; (৩) মুদ্রায় কলেমা ও নবীর প্রতি আনুগত্য বা সম্পর্ক সূচক লিপির উদ্ধৃতি, যেমন- আলাউদ্দীন হোসেন শাহের ৮৯৯ হিজরিতে (১৪৯৩ খ্রি.) উৎকীর্ণ মুদ্রার মুখ্য দিকে রয়েছে কলেমা এবং গৌণ দিকে উৎকীর্ণ রয়েছে ‘আস সুলতান আল আদীল আল বাযিল ওয়ালাদ-ই সাইয়িদ উল মুরসালিন’; (৪) মুদ্রায় নিজেকেই খলিফা বলে ঘোষণা করা, যেমন- সুলতান জালালুদ্দীন মুহম্মদ শাহের ৮৩১ হিজরিতে (১৪২৭ খ্রি.) উৎকীর্ণ মুদ্রার গৌণ দিকে বৃত্তের ভেতর লেখা রয়েছে ‘খলিফাতুল্লাহ নাসির আল ইসলাম ওয়াল মুসলেমিন’।

বাংলার সুলতানি শাসকগণ মুদ্রাকে জনগণের জন্য সহজলভ্য করার উদ্দেশ্যে টাকশালের বিকেন্দ্রীকরণ নীতি গ্রহণ করেন। রাজধানী ছাড়াও দেশের প্রশাসনিক এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থানে টাকশাল স্থাপন করে সেখান থেকে তাঁরা মুদ্রা প্রকাশ করেন। সুলতানি আমলের ২৭টিরও বেশি টাকশালের নাম পাওয়া যায়। এগুলির সব পৃথক পৃথক স্থানে ছিল এমন নয়। সুলতানগণ কখনও কখনও নিজের নামে অথবা পিতার নামে রাজধানী শহরের নামকরণ করেছেন এবং সেই নাম মুদ্রায় উৎকীর্ণ করেছেন। যাহোক টাকশালের নামের পূর্বে বিভিন্ন ধরনের বিশেষণ- হজরত জালাল, ইকলিম, খিত্তা, আরসাহ প্রভৃতি ব্যবহার করা হতো এবং সাল তারিখ সংখ্যার পরিবর্তে কথায় উৎকীর্ণ হতো। গিয়াসউদ্দীন আযম শাহের মুদ্রায় প্রথম সাল তারিখের ক্ষেত্রে সংখ্যার ব্যবহার দেখা যায়। সুলতান নাসিরুদ্দীন মাহমুদ শাহ মুদ্রার প্রান্তে লিপি উৎকীর্ণের ধারা তুলে দেন এবং টাকশালের নাম ও তারিখ সংখ্যায় মুদ্রালিপির সঙ্গে বৃত্তের মধ্যে স্থান পেতে থাকে। এই সময় থেকে টাকশালের নামের পূর্বে বিশেষণের ব্যবহার লুপ্ত হয় এবং মুদ্রার প্রান্তে বিভিন্ন ধরনের অলংকরণ মোটিফের ব্যবহার মুদ্রার শোভা বর্ধন করতে থাকে।

সাধারণভাবে বাংলার সুলতানদের ২৭টি টাকশালের নাম পাওয়া যায়। এগুলি হচ্ছে-  (১) লাখনৌতি, (২) ফিরুজাবাদ, (৩) সাতগাঁও, (৪) সোনারগাঁও, (৫) মুয়াজ্জমাবাদ, (৬) শহর-ই-নও, (৭) গিয়াসপুর, (৮) ফতেহাবাদ, (৯) খলিফাতাবাদ, (১০) হোসেনাবাদ, (১১) মুজাফ্ফরাবাদ, (১২) মাহমুদাবাদ, (১৩) মুহম্মদাবাদ, (১৪) আরাকান, (১৫) তান্ডা, (১৬) রোটাসপুর, (১৭) জান্নাতাবাদ, (১৮) নুসরাতাবাদ, (১৯) চাওয়ালিস্তান ওরফে কামরু, (২০) বারবকাবাদ, (২১) পান্ডুনগর, (২২) সুবর্ণগ্রাম, (২৩) চাটিগ্রাম, (২৪) চন্দ্রাবাদ, (২৫) খলিফাতাবাদ বদরপুর, (২৬) বঙ্গ এবং (২৭) শরিফাতাবাদ।

সংখ্যায় ২৭টি টাকশালের নাম থাকলেও সবগুলির পৃথক সত্তা ছিল না। কারণ অন্যান্য অঞ্চলের মতো বাংলার সুলতানগণও সময় বিশেষে রাজধানী অথবা টাকশাল শহরের নাম পরিবর্তন করতেন। উপরের টাকশালগুলি বিশ্লেষণ করলে নামগুলিকে নতুনভাবে চিহ্নিত করা যায়। যেমন-রোটাসপুর নামের পাঠ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। জান্নাতাবাদ নামটি গৌড়ের সঙ্গে অভিন্ন বলে মনে হয়। শহর-ই-নও, হোসেনাবাদ, নুসরাতাবাদ ও মাহমুদাবাদ গৌড়েরই পরিবর্তিত রূপ। আরাকান কোন শহর নয় বরং বাংলার সীমান্ত অঞ্চল। পান্ডুনগর পান্ডুয়ার সঙ্গে অভিন্ন, আর চট্টগ্রামের সঙ্গে অভিন্ন হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে চাটিগ্রামকে। এই এগারটি নাম একীভূত করলে মোট টাকশাল শহরের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৬টি।

টাকশালের বিকল্প হিসেবে মুদ্রায় আরও দুটি নাম পাওয়া যায়। এ দুটি হচ্ছে- (১) খাজানা ও (২) দার-উয-যারব। ধারণা করা হয় রাজধানীর কোষাগার বুঝাতে ‘খাজানা’ শব্দটি ব্যবহূত হয়েছে। কোষাগার থেকে মুদ্রা জারি সম্ভবত সুলতানদের মুদ্রানীতির কেন্দ্রীয়করণের উদ্দেশ্য প্রতিফলিত করেছে। ‘দার-উয-যারব’ মূলত টাকশাল শব্দেরই প্রতিরূপ। টাকশাল শহর নয়, টাকশাল প্রতিষ্ঠান হিসেবে এই শব্দটি ব্যবহূত হয়েছে।

সুলতানি মুদ্রার লিপিশৈলী ফখরুদ্দিন মুবারক শাহ-এর শাসনকাল পর্যন্ত বেশ ভাল ছিল। পরবর্তীকালের লিপিগুলি ছিল নিম্নমানের। ভট্টশালী ফখরুদ্দীনের মুদ্রার লিপিকে বাংলার সুলতানি মুদ্রার শ্রেষ্ঠ লিপি নিদর্শন হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

বাংলার ইতিহাসের সমকালীন তথ্যের অভাবে সুলতানদের জারিকৃত মুদ্রা ইতিহাসের অনেক শূন্যতা পূরণে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে এবং একমাত্র মুদ্রার সাহায্যে বাংলার বেশ কয়েকজন নতুন সুলতানের পরিচয় জানা গেছে, যাঁদের সম্পর্কে মুদ্রা ছাড়া অন্য কোন সূত্রেই কোন সংবাদ পাওয়া যায়নি। কাজেই সুলতানি বাংলার ইতিহাসে ঐতিহাসিক তথ্য সূত্র হিসেবে মুদ্রা এক বিশিষ্ট স্থান জুড়ে রয়েছে।

লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে স্মরণাতীতকাল থেকে ব্যবহূত হয়ে আসলেও অর্থনৈতিক প্রয়োজনের পাশাপাশি সমকালীন ধর্ম-দর্শন, সাহিত্য, লিপি-শৈলী সর্বোপরি লিখিত ইতিহাসের অনুপস্থিতিতে মুদ্রায় প্রদত্ত টাকশাল ও তারিখ থেকে সংশ্লিষ্ট শাসকের সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি ও শাসনকাল সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। রাজনৈতিক ইতিহাসের সূত্র ছাড়াও সুলতানি মুদ্রা বিশ্লেষণ করে অর্থনৈতিক ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ারও সুযোগ রয়েছে। ফলে ইতিহাসের উপাদান হিসেবে বাংলার সুলতানি যুগের মুদ্রা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

পাঠান (আফগান) মুদ্রা  শের খানের হাতে হোসেনশাহী বংশীয় শেষ সুলতান গিয়াসউদ্দীন মাহমুদের পরাজয়ের পর থেকে অর্থাৎ ১৫৩৮ থেকে মুগল সম্রাট  আকবর কর্তৃক ১৫৭৬ খ্রিস্টাব্দে বাংলা অধিকার করা পর্যন্ত দীর্ঘ প্রায় চল্লিশ বছরের বাংলার ইতিহাস আফগান আমিরদের পারস্পরিক সংঘাত ও সংঘর্ষের ইতিহাস। এই সময়ের প্রথম পনের বছর শেরশাহ ও তদীয় পুত্র ও উত্তরাধিকারী ইসলাম শাহের অধীন বাংলা দিল্লির অধীন প্রদেশ হিসেবে শাসিত হয়। ৯৪৫ হিজরি (১৫৩৮ খ্রি.) তারিখ সম্বলিত শেরশাহের বাংলা থেকে জারিকৃত রৌপ্যমুদ্রা পাওয়া যায়। তবে তিনি শ্রীঘ্রই হুমায়ুনকে সাময়িকভাবে বাংলা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। উক্ত বছরই হুমায়ুন বাংলা অধিকার করেন এবং নয় মাস বাংলায় অবস্থান করেন। তিনি বাংলা থেকে স্বনামে মুদ্রাও জারি করেন। কিন্তু শূরবংশীয় তৃতীয় শাসক মুহম্মদ আদীল শাহের শাসনামলে ইসলাম শাহ নিযুক্ত শূরবংশীয় বাংলার গভর্নর মুহম্মদ শাহ গাজী স্বাধীনতা ঘোষণা করলে বাংলা পুনরায় তার স্বাধীন মর্যাদা ফিরে পায় এবং পরবর্তীকালে এই বংশের চারজন শাসক ও তৎপরবর্তী কররানী বংশের শাসনকাল (১৫৭৫ খ্রি) পর্যন্ত, অর্থাৎ মুগল সম্রাট আকবরের বাংলা অধিকারের পূর্ব পর্যন্ত এই স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ থাকে। সাধারণভাবে এই সময়ের মুদ্রার ছাঁচ বড় এবং লিপিশৈলী চমৎকার। তবে ছোট ছাঁচের এবং অপরিশীলিত লিপি বৈশিষ্ট্যের মুদ্রাও পাওয়া যায়, যা চট্টগ্রাম অঞ্চলে মুদ্রিত বলে মনে করা হয়। এসব মুদ্রায় টাকশালের উল্লেখ নেই।

১৫৩৮-১৫৫৩ সময়কালে শূর বংশীয় শেরশাহ (১৫৩৮-১৫৪৫ খ্রি), ইসলাম শাহ (১৫৪৫-৫২ খ্রি) এবং মুহম্মদ আদীল শাহ (১৫৫৩-৫৬ খ্রি) বাংলা প্রদেশের বিভিন্ন টাকশাল থেকে স্ব স্ব নামে মুদ্রা জারি করেন। এদের সকলেরই রৌপ্য মুদ্রা পাওয়া যায়। এঁদের কোন তাম্র মুদ্রা বাংলায় জারি হয়েছিল বলে জানা যায় না। ক্ষুদ্র লেনদেনে কড়িই প্রচলিত ছিল। যদিও শেরশাহের কিছু স্বর্ণমুদ্রা পাওয়া যায়, কিন্তু বাংলায় মুদ্রিত স্বর্ণমুদ্রা ‘আশরাফী’ সংখ্যায় খুবই কম।

মুগল সম্রাট হুমায়ুন ১৫৩৮ খ্রিস্টাব্দে বাংলা অধিকার করে নয়মাস গৌড়ে অবস্থান করেন। এই সময়ে তাঁর স্বনামে জারিকৃত ‘তান্ডা’, বাঙ্গালা (গৌড়, ৯৪৫ হিজরি) টাকশালের নামযুক্ত এবং টাকশালের নাম ও তারিখ বিহীন বেশ কিছু রৌপ্য মুদ্রা পাওয়া যায়। এগুলি মুগল ‘শাহরুখি’ মুদ্রার আদলে প্রস্ত্তত এবং মুদ্রার একপিঠে কলেমা ও কুরআন শরীফের আয়াত ‘আল্লাহুয়ারযুকু মায়য়াশাউ বিগায়রি হিসাব’ (আল্লাহ যাকে খুশি অফুরন্ত ‘রিযিক’ দান করেন) উৎকীর্ণ। অপর পিঠে উপাধিসহ সম্রাট হুমায়ুনের নাম এবং সাম্রাজ্যের শুভ কামনা সুচক বাক্য ‘আল্লাহ তার রাজস্ব ও প্রভুত্ব দীর্ঘস্থায়ী করুন’ এবং টাকশাল ‘বাঙ্গালা’ ও তারিখ ৯৪৫ হিজরি (১৫৩৮ খ্রি.) উৎকীর্ণ। এ জাতীয় মুদ্রা দিল্লির মুদ্রার অনুরূপ। ওজন এগারো গ্রামের বেশি। অন্যদিকে হুমায়ুনের বাংলায় জারিকৃত বেশ কিছু মুদ্রা পাওয়া যায়, যাতে কোন টাকশাল বা তারিখের উল্লেখ নেই, মুদ্রাগৎ, ব্যবস্থাপনা পূর্বোল্লিখিত মুদ্রার অনুরূপ, তবে লিপি শৈলী অপরিশীলিত এবং ওজন ১০.৬ গ্রাম। এগুলিতে ইতঃপূর্বে বাংলায় প্রচলিত ওজন রীতি অনুসৃত।

শেরশাহ ক্ষমতা লাভের পর প্রশাসনিক ও অন্যান্য বহু বিষয়ে সংস্কার সাধনসহ মুদ্রা ব্যবস্থায়ও এক বিরাট পরিবর্তন সাধন করেন এবং ৯৬ রতি বা একভরি ওজনকে তাঁর রৌপ্যমুদ্রা ‘রুপিয়া’র মান হিসেবে নির্ধারণ করেন। এই মান পরবর্তীকালে মুগলদের দ্বারা অনুসৃত হয়। হোসেনশাহী আমলের ধর্মনিরপেক্ষ বাক্যরীতির পরিবর্তে তিনি মুদ্রায় কলেমার ব্যবহার পুনঃপ্রবর্তনসহ সর্বপ্রথম দেবনাগরী লিপিতে স্বীয় নাম অঙ্কনের প্রথা চালু করেন, যা মুহম্মদ শাহ গাজী ব্যতীত পরবর্তী সকল শূর শাসকগণ অনুসরণ করেন। শেরশাহ বাংলার গুরুত্বপূর্ণ নগরীতে টাকশাল স্থাপন করেন এবং ফতেহাবাদ (৯৪৬-৯৪৯, ৯৫১ হি), শরীফাবাদ (৯৪৬-৪৯, ৯৫১ হি), পান্ডুয়া (৯৪৭-৪৮ হি), সাতগাঁও (৯৪৬, ৯৪৮, ৯৫০ হি) এবং বিহারের পাটনা (৯৫০ হি) ও শেরগড় (৯৪৫-৯৫২ হি) থেকে মুদ্রা জারি করেন। এছাড়াও টাকশালের নাম বিহীন তাঁর ৯৪৫ থেকে ৯৫২ হিজরি সনের মুদ্রা পাওয়া যায়। তিনি মুদ্রার মুখ্য দিকে কলেমা এবং ‘আসসুলতান আল আদিল’ (ন্যায় বিচারক সুলতান), চার খলিফার নাম এবং গৌণ দিকে নিজের নাম ‘ফরিদ্দুনিয়া ওয়াদ দীন আবুল মুজাফফর শেরশাহ আস সুলতান’ বাক্যসহ টাকশালের নাম ও দেবনাগরী লিপিতে ‘শ্রী শেরশাহী’ উৎকীর্ণ করেন।

পিতার অনুকরণে ইসলাম শাহ মুদ্রা জারি করেন, তবে বাংলায় মুদ্রিত তাঁর কোন স্বর্ণমুদ্রা পাওয়া যায় না। বাংলার ফতেহাবাদ (৯৫২ হি), সাতগাঁও (৯৫২-৫৫, ৯৫৭ হি), শরীফাবাদ (৯৫২-৫৩ হি) এবং শেরগড় (৯৫৫-৫৬ হি) টাকশাল থেকে তাঁর মুদ্রিত রৌপ্যমুদ্রা পাওয়া গেছে। টাকশালের নাম বিহীন তাঁর কিছু মুদ্রা পাওয়া যায়। এগুলি গৌড় (৯৫২-৯৬০ হি) থেকে মুদ্রিত বলে অনুমিত হয়। তিনি মুদ্রায় ‘আসসুলতানুল আদিল জালালউদ্দুনিয়া ওয়াদ দীন আবুল মুজাফফর ইসলাম শাহ’ নাম গ্রহণ করেন এবং মুদ্রায় দেব-নাগরী লিপিতে (‘শ্রী ইসলাম শাহী’) উৎকীর্ণ করার রীতি চালু রাখেন।

আদীল শাহ শেরশাহের মুদ্রার অনুকরণে মুদ্রা জারি করেন। তাঁর বাংলার মুদ্রায় টাকশালের নাম পাওয়া যায় না, তবে গৌড় থেকেই এগুলি মুদ্রিত হয়েছিল বলা যায়। তাঁর শুধুমাত্র ৯৬১ হিজরির (১৫৫৩ খ্রি.) মুদ্রা পাওয়া গেছে। তিনিও মুদ্রায় শেরশাহ অনুসৃত দেবনাগরীতে নাম উৎকীর্ণ করার রীতি অব্যাহত রাখেন এবং ‘মুবারিজদ্দুনিয়া ওয়াদ দীন আবুল মুজাফফর সুলতান মুহম্মদ আদীল’ নাম গ্রহণ করেন।

১৫৫৩ খ্রিস্টাব্দে ইসলাম শাহের মৃত্যুর পর বাংলার গভর্নর মুহম্মদ খান শূর স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং মুহম্মদ শাহ গাজী (১৫৫৩-৫৫ খ্রি) নামে মুদ্রা জারি করেন। তিনি শেরশাহের মুদ্রার অনুকরণে মুদ্রা চালু করেন এবং কলেমা ও চার খলিফার নাম একদিকে এবং অন্য দিকে নিজ নাম ‘শামসুদ্দুনিয়া ওয়াদ্দীন আবুল মুজাফফর মুহম্মদ শাহ গাজী’ এবং টাকশাল ও তারিখ মুদ্রণ করেন। তবে তিনি মুদ্রায় দেবনাগরী লিপির ব্যবহার তুলে দেন। তাঁর মুদ্রাগুলি ৯৬২ হিজরি (১৫৫৪-৫৫ খ্রি) তারিখযুক্ত এবং একটি মাত্র টাকশাল ‘আরকান’, যা ‘রিকাব’ পড়াই বেশি যুক্তিযুক্ত, অর্থ যুদ্ধক্ষেত্র বা ভ্রাম্যমাণ টাকশাল থেকে মুদ্রিত। ৯৬৩ হি/১৫৫৫ খ্রি তিনি দিল্লি বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে নিহত হন।

তাঁর পুত্র এবং উত্তরাধিকারী বাহাদুর শাহ গাজীও (১৫৫৫-১৫৬০ খ্রি) শেরশাহের মুদ্রার অনুকরণে মুদ্রা প্রচার করেন এবং মুদ্রায় দেবনাগরী লিপিতে নাম লেখার রীতি পুনরায় চালু করেন। তিনি মুদ্রায় ‘গিয়াসুদ্দুনিয়া ওয়াদ্দীন আবুল মুজাফফর বাহাদুর শাহ গাজী’ নাম গ্রহণ করেন। তাঁর মুদ্রা হাজীপুর (৯৬৮ হি), সাতগাঁও (৯৬৩-৬৫, ৯৬৭ হি) টাকশাল থেকে এবং কিছু মুদ্রা টাকশালের নামহীন (সম্ভবত গৌড়, ৯৬৪-৯৬৮ হি) অবস্থায় পাওয়া গেছে।

বাহাদুর শাহের মৃত্যুর পর তাঁর ভাই জালাল শাহ ‘গিয়াসুদ্দুনিয়া ওয়াদ্দীন আবুল মুজাফফর জালাল শাহ গাজী’ (১৫৬০-১৫৬৩ খ্রি) নামে সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং হাজীপুর (৯৬৮-৯৬৯ হি) সাতগাঁও (৯৬৮, ৯৭০ হি) টাকশাল থেকে মুদ্রা জারি করেন। তাঁর টাকশালের নামহীন (সম্ভবত গৌড়, ৯৬৮-৯৭১ হি) মুদ্রাও পাওয়া গেছে। এই বংশের কোন স্বর্ণ বা তাম্র মুদ্রা প্রাপ্তির খবর জানা যায়নি।

বিহারের আফগান শাসক সুলায়মান কররানী ৯৭১ হি/১৫৬৩ খ্রিস্টাব্দে বাংলার সিংহাসন অধিকার করেন এবং কৌশলে মুগলদের বিরুদ্ধে বাংলার স্বাধীন মর্যাদা টিকিয়ে রাখেন। তিনি সম্ভবত কৌশল হিসেবেই নিজ নামে কোন মুদ্রা জারি করেননি। কিন্তু তাঁর পুত্র দাউদ খান কররানী ১৫৭২ খ্রিস্টাব্দে পিতার উত্তরাধিকারী হিসেবে সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং স্বীয় নাম ও পিতার নামযুক্ত করে পাটনা, সাতগাঁও ও তান্ডা থেকে (৯৮০-৯৮২ হি) মুদ্রা জারি করেন। এসব মুদ্রায় শেরশাহের মুদ্রার অনুকরণে কলেমা, দেব-নগারী এবং এক ভরি ওজনরীতি অনুসৃত হয়। তিনি ১৫৭৬ খ্রিস্টাব্দে মুগলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ধৃত ও নিহত হন। তাঁর মৃত্যুর ফলে বাংলা তার স্বাধীন মর্যাদা হারিয়ে পুনরায় দিল্লির অধীন মুগল সাম্রাজ্যের একটি প্রদেশ হিসেবে শাসিত হয়। দাউদ খানের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলায় সুলতানি শাসনের সমাপ্তি ঘটে।  [মোঃ রেজাউল করিম]

আরও দেখুন মুদ্রাব্যবস্থা

গ্রন্থপঞ্জি  HN Wright, Catalogue of the Coins in the Indian Museum, Vol II, Calcutta, 1907; NK Bhattasali, Coins and Chronology of the Early Independent Sultans of Bengal, Cambridge, 1922; Abdul Karim, Corpus of the Muslim Coins of Bengal (down to AD 1538), Dhaka, 1960; Edward Thomas, The Chronocles of the Pathan Kings of Delhi, Delhi, 1967.