পাঞ্চমার্কড মুদ্রা


পাঞ্চমার্কড মুদ্রা বা ছাপাঙ্কিত মুদ্রা উপমহাদেশ তথা বাংলার প্রাচীনতম মুদ্রা। এর উদ্ভবকাল আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ছয় শতক। বগুড়ার মহাস্থানগড়, রাজশাহী, ময়মনসিংহ এবং নরসিংদী জেলাধীন উয়ারী-বটেশ্বর গ্রাম থেকে ছাপাঙ্কিত রৌপ্য মুদ্রা আবিষ্কৃত হয়েছে। এর মধ্যে একমাত্র মহাস্থানগড় থেকে রীতিসিদ্ধ উৎখননের মাধ্যমে নির্দিষ্ট স্তর থেকে সম্প্রতি (১৯৯৬-৯৭) ৯৩টি রৌপ্য মুদ্রা পাওয়া গেছে। মুদ্রাগুলি বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে সংরক্ষিত রয়েছে। ১৯৭০-এর দশকে ওয়ারী-বটেশ্বর এলাকা থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ছাপাঙ্কিত রৌপ্য মুদ্রা পাওয়া যায়। এগুলি বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরএর সংগ্রহে রয়েছে। বাংলাদেশের কোন অঞ্চল থেকেই ছাপাঙ্কিত তাম্র মুদ্রা প্রাপ্তির খবর আজ পর্যন্ত পাওয়া যায় নি, তবে কিছু ছাঁচে ঢালাই  তাম্রমুদ্রা (Cast Copper Coin) মহাস্থানগড় থেকে আবিষ্কৃত হয়েছে যা সংখ্যায় নগণ্য। মহাস্থানগড়ের যোগীর ভিটায় ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দে হালচাষের সময়ে আবিষ্কৃত ২৪টি ছাপাঙ্কিত রৌপ্য মুদ্রা বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর এ সংরক্ষিত রয়েছে।

পাঞ্চমার্কড মুদ্রা

প্রস্ত্তত পদ্ধতি থেকে এ মুদ্রার নামকরণ করা হয়েছে। সাধারণত রূপার পাতলা পাত থেকে নির্দিষ্ট পরিমাপের কাটা টুকরা অথবা নির্দিষ্ট ওজনের ধাতুকে গলিয়ে বা অন্য কোন জিনিসের উপর ফেলে অথবা গলিত ধাতুর পিন্ড তৈরি করে তাতে প্রতীক চিহ্ন দৃঢ় চাপের সাহায্যে ছাপ এঁকে এগুলি প্রস্ত্তত করা হতো। এ মুদ্রায় এক থেকে পাঁচটি পর্যন্ত, কখনও কখনও আরও বেশি সংখ্যায় ছাপ যুক্ত হতো। বাংলা অঞ্চলে প্রাপ্ত ছাপাঙ্কিত রৌপ্য মুদ্রায় তিনটি, চারটি, এবং পাঁচটি করে ছাপ লক্ষ করা যায়; চারটি ছাপযুক্ত মুদ্রা ওয়ারী-বটেশ্বর অঞ্চলের বাইরে এখনও পাওয়া যায় নি।

প্রাথমিককালের এসব মুদ্রা খ্রিস্টীয় ২য় শতকে তৈরি হলেও দীর্ঘকাল ধরে (খ্রিস্টীয় চার শতক পর্যন্ত) বাংলা অঞ্চলসহ ভারতের বিস্তৃত এলাকা জুড়ে প্রচলিত ছিল। এসব মুদ্রায় কোন লেখ বা লিপি নেই, বরং মনুষ্য মূর্তি, মানুষের তৈরি জিনিসপত্র, অস্ত্রশস্ত্র, চৈত্য ইত্যাদি, পশ্বাদি, গাছ, শাখা ও ফল, শৈব ও সৌর অথবা গ্রহ নক্ষত্রাদি সম্পর্কিত প্রতীক চিহ্ন অঙ্কন করা হতো। প্রতীক চিহ্নগুলির নির্দিষ্ট অর্থ উদ্ধার না হওয়ায় কবে কখন কারা এসব মুদ্রা মুদ্রণ ও প্রচলন করেছিলেন তা সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায় না। তবে সমকালীন লোকেরা এসব প্রতীক চিহ্নের নির্দিষ্ট অর্থ জানতো বলে লেখ্যসূত্র থেকে জানা যায়। সাধারণভাবে ধারণা করা হয় যে, প্রতীক চিহ্নগুলি সমকালীন ধর্মবিশ্বাস, চিন্তা-চেতনা এবং সংস্কৃতিজাত প্রতিচিত্র, একটি বিশেষ সময়ের জীবনধারা, জনগণের রুচি এবং শিল্পবোধ বা একান্তই প্রকৃতিগত প্রতিচিত্রণ। প্রতীকছাপের সম্ভাব্য অর্থ ও এর বিভিন্ন দিক, ধাতুর ওজন, বিশুদ্ধতা ও মিশ্রণ (alloy), বিশেষ বিশেষ শ্রেণির মুদ্রার প্রচলন এলাকা, প্রচলনকারী কর্তৃপক্ষ, ধাতুর সরবরাহ এবং প্রস্ত্তত পদ্ধতি প্রভৃতি বিষয়ে পন্ডিতদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে।

বাংলা অঞ্চলে প্রাপ্ত মুদ্রাগুলিকে মুখ্যদিকের চিহ্নের সংখ্যার ভিত্তিতে বৃহৎ দুটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়: (১) একদিকে পাঁচটি প্রতীক গুচ্ছযুক্ত রাজকীয় (Imperial series) সিরিজভুক্ত মুদ্রা যা ভারতবর্ষের প্রায় সব এলাকা থেকে পাওয়া গেছে এবং বাংলাদেশের সবকটি ছাপাঙ্কিত মুদ্রা প্রাপ্তি অঞ্চল থেকেও আবিষ্কৃত হয়েছে; সংখ্যায় এগুলি বেশি; (২) অনুর্ধ্ব পাঁচ, ৩ বা ৪টি প্রতীক গুচ্ছযুক্ত আঞ্চলিক বা স্থানীয় মুদ্রা। রাজকীয় সিরিজের মুদ্রা মৌর্যযুগে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণাধীনে প্রস্ত্তত এবং প্রচলন করা হয়েছিল বলে পন্ডিতগণের ধারণা। উয়ারী-বটেশ্বর অঞ্চলে প্রাপ্ত এ জাতীয় মুদ্রা সম্ভবত ব্যবসা-বাণিজ্যসূত্রেই এসেছিল।

কেননা অত্র অঞ্চল কখনোই মৌর্য সাম্রাজ্যভুক্ত ছিল বলে কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। রাজকীয় সিরিজভুক্ত মুদ্রায় ব্যতিক্রমহীনভাবে ৫টি ছাপ দেখতে পাওয়া যায়। এরূপ ৫টি ছাপযুক্ত রৌপ্য মুদ্রা মহাস্থানগড়ের খননে মৌর্য যুগীয় স্তর থেকে পাওয়া গেছে এবং এগুলি মৌর্যযুগীয় কর্ষাপণ সিরিজের মুদ্রা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। এ মুদ্রাগুলি খ্রিস্টপূর্ব ৫ম থেকে ২য় শতক সময়কালের। অনুরূপ মৌর্যযুগীয় ৫টি ছাপ চিহ্নযুক্ত রৌপ্য মুদ্রা ওয়ারী-বটেশ্বর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ অঞ্চল থেকেও পাওয়া গেছে। এসব মুদ্রার একদিকে ৫টি প্রতীক ছাপ এবং অপর পিঠে হয় ফাঁকা বা একটিমাত্র ছাপযুক্ত। এসব ছাপের মধ্যে সূর্য, ষড়ভুজ, পাহাড়, হাতি, গরু, পুকুরের মাছ, প্রভৃতি বহুবিধ প্রতীক পাওয়া যায়। এসব প্রতীকের প্রতিটিতেই বিভিন্নতা রয়েছে। মুদ্রাগুলির আকার অসম বা সম আয়তাকার, চতুষ্কোণ এবং গোলাকার। মুদ্রার পরিমাপ কার্ষাপণ বা ৩২ রতি, ৩.৪ থেকে ৩.৫ গ্রাম ওজনের, অর্ধ কার্ষাপণ সাধারণত ১.৬ গ্রাম থেকে ১.৭ গ্রাম ওজনের এবং পরিমাপ ১৬ থেকে ১৯ বা ২০ মিমি দৈর্ঘ্য বা ব্যাস বিশিষ্ট, পুরুত্ব ১.১-১.৫ মিমি।

স্থানীয় বা আঞ্চলিক মুদ্রা হিসেবে বাংলা অঞ্চলের দুই এলাকাকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে অঙ্গ এবং বঙ্গ। মাইকেল মিচেনার বাংলার তিনটি এলাকায় বানগড়, হরিনারায়ণপুর এবং চন্দ্রকেতুগড় খনন থেকে সর্বমোট ২৩টি ছাপাঙ্কিত রৌপ্য মুদ্রা আবিষ্কারের কথা জানিয়েছেন, যা অঙ্গের মুদ্রা হিসেবে চিহ্নিত। এসব মুদ্রার একদিকে (মুখ্যদিক) ৩টি করে ছাপচিহ্ন রয়েছে, গৌণদিকে কখনও কখনও একটি ক্ষুদ্র ছাপ অথবা কোন চিহ্নবিহীন। ছাপ সংখ্যার দিক থেকে কৌশল এবং প্রাথমিক মগধ রাজ্যের মুদ্রার সঙ্গে এসব মুদ্রার মিল পাওয়া গেলেও ছাপচিহ্নের এবং ধাতুর ক্ষেত্রে পার্থক্য বিদ্যমান। অঙ্গের মুদ্রা খাদ মিশ্রিত রূপার তৈরি অপরদিকে অন্যান্য বর্ণিত মুদ্রার রূপার গুণগতমান ভাল। অঙ্গের মুদ্রায় নৌকা জাতীয় একটি চিহ্ন রয়েছে যা সবকটি মুদ্রায় পাওয়া গেছে এবং এ ছাপ অন্য কোন আঞ্চলিক বা সর্বভারতীয় মুদ্রায় পাওয়া যায় নি। প্রাপ্ত দুধরনের মুদ্রা কার্ষাপণ এবং সিকি কর্ষাপণ এর মধ্যে কার্ষাপণ মুদ্রার ওজন ৩.৩ থেকে ৩.৭ গ্রাম এবং সিকি কার্ষাপণ মুদ্রার ওজন ০.৮ থেকে ০.৯ গ্রাম। এসব মুদ্রার সময় ধরা হয়েছে খ্রিস্টপূর্ব পাঁচ শতকের কিছু পূর্বে।

বঙ্গের মুদ্রা হিসেবে চিহ্নিত মুদ্রাগুলি বাংলাদেশের বর্তমান নরসিংদী জেলার ওয়ারী-বটেশ্বর গ্রাম থেকে সাধারণ খোঁড়াখুড়ির সময়ে পাওয়া গেছে। এসব মুদ্রার মুখ্যদিকে (Obverse) ৪টি করে প্রতীক ছাপ রয়েছে; গৌণদিকে (Reverse) ক্ষুদ্রাকৃতির একটি ছাপ বা ফাঁকা। এসব প্রতীকের মধ্যে নৌকা, গলদা চিংড়ি, বড়শিতে মাছ (বা কাঁকড়া বিছে), ‘ক্রসলিফ’, গেছো শামুক (বা সাপুড়ের বাঁশি) এমন কতগুলি প্রতীক ছাপ রয়েছে যা অন্য কোন অঞ্চলের মুদ্রায় পাওয়া যায় না। এছাড়া পাখি, হাতি, মাছ এবং সূর্য ও ষড়ভুজ প্রতীক প্রভৃতি সাধারণ প্রতীকও রয়েছে যা আঞ্চলিক এবং সর্বভারতীয় মুদ্রায় দেখা যায়। তবে বঙ্গের মুদ্রার মাছ অন্যান্য এলাকার তুলনায় অধিকতর বাস্তবধর্মী। অন্যান্য এলাকাগুলিতে অলংকরণ প্রাধান্য পেয়েছে। যদিও বঙ্গের প্রাপ্ত মুদ্রা খননলব্ধ নয় তবুও অঙ্গের মুদ্রার সঙ্গে তুলনা করে এবং এ অঞ্চলের বাইরে এ জাতীয় প্রতীকের অনুপস্থিতির কারণে এ মুদ্রাগুচ্ছকে বিশেষত পানি ও জলাভূমির সাথে সম্পর্কিত নৌকা, গলদা চিংড়ি প্রতীকযুক্ত গ্রুপকে বঙ্গের মুদ্রা হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।

বঙ্গের সব মুদ্রায় সূর্য এবং ষড়বাহু প্রতীক বিদ্যমান যা অন্যান্য রাজকীয় সিরিজভুক্ত মুদ্রাতেও বর্তমান। ৪টি ছাপ চিহ্নযুক্ত বঙ্গের এসব মুদ্রা অপেক্ষাকৃত পাতলা এবং কার্ষাপণ ওজন মানের, তবে প্রাপ্ত সব মুদ্রাই অর্ধ কার্ষাপণ ওজনের, ১.৭ থেকে ১.৯ গ্রাম। পুরুত্ব ০.৬ থেকে ১.০০ মিমি, পরিমাপ গড়ে ১৫২০ মিমি। মুদ্রাবিদগণ ৪টি প্রতীকযুক্ত মুদ্রাশ্রেণিকে ৫টি প্রতীকযুক্ত রাজকীয় সিরিজের পূর্ববর্তী বলে সিদ্ধান্ত করেছেন। ফলে এই আঞ্চলিক মুদ্রাগুলি খ্রিস্টপূর্ব ৫ম শতকের আগের বলে অনুমান করা হয়। অঙ্গের মুদ্রার নৌকার সঙ্গে বঙ্গের মুদ্রার নৌকা এবং মাছের পার্থক্য লক্ষণীয়। নৌকা ও পাখি প্রতীকযুক্ত ৯টি মুদ্রা এবং মাছ ও চিংড়ি প্রতীকযুক্ত ৩টি মুদ্রা ওয়ারী বটেশ্বরে প্রাপ্ত মুদ্রাসমূহের থেকে শনাক্ত করা গেছে; এসব মুদ্রার অন্য দুটি করে প্রতীক সূর্য ও ষড়ভুজ।  [মোঃ রেজাউল করিম]