হোসেন শাহ


হোসেন শাহ (১৪৯৪-১৫১৯)  বাংলার হোসেনশাহী বংশের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি হাবশী সুলতান শামসুদ্দীন মুজাফফর শাহের উজির ছিলেন। তিনি সুলতানকে হত্যা করে সিংহাসন অধিকার করেন। ১৪৯৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি নেতৃস্থানীয় আমীরদের দ্বারা সুলতান নির্বাচিত হন।

হোসেনের প্রথম জীবন সম্পর্কে জোয়াও-ডি-ব্যারোজ,  কৃষ্ণদাস কবিরাজ, ফারিয়া ওয়াই সউজা ও ফ্রান্সিস বুকানন হ্যামিল্টন কর্তৃক বর্ণিত বিবরণের সাথে বস্ত্তনিষ্ঠ ইতিহাসের খুব কমই সামঞ্জস্য আছে। রিয়াজ-উস-সালাতীন-এ বর্ণিত আছে যে, হোসেন মক্কার একজন শরীফ আশরাফ হোসেইনীর পুত্র এবং তিরমিজের (তুর্কিস্থানের একটি শহর) অধিবাসী ছিলেন। ঘটনাচক্রে তিনি বাংলায় আসেন এবং রাঢ় অঞ্চলের চাঁদপাড়া গ্রামের কাজীর বাড়িতে বসবাস করতে থাকেন। এ বাড়িতেই তিনি শিক্ষা লাভ করেন। কাজী তাঁর উচ্চবংশের পরিচয় পেয়ে তাঁর সাথে নিজ কন্যার বিবাহ দেন। হোসেন কালক্রমে মুজাফফর শাহের উজিরের পদ লাভ করেন। চাঁদপাড়াকে মুর্শিদাবাদ জেলার একানী চাঁদপাড়া গ্রামের সাথে অভিন্ন বলে মনে করা হয়। চাঁদপাড়ার আশপাশের গ্রামগুলিতে প্রাপ্ত হোসেন শাহের শাসনের প্রথম দিকের কয়েকটি  শিলালিপি এবং ওই এলাকায় ১৪৯৪ খ্রিস্টাব্দে হোসেন শাহ কর্তৃক একটি মসজিদ নির্মাণের দ্বারা মুর্শিদাবাদের ওই এলাকার সঙ্গে হোসেনের সম্পর্কের প্রমাণ পাওয়া যায়। ফিরিশতা ও সলিম উভয়ই তাঁকে ‘সৈয়দ’ বলে উল্লেখ করেন। এতে মনে হয় তিনি আরব বংশোদ্ভূত। একথা মুদ্রার সাক্ষ্যেও প্রমাণিত হয়েছে। তাঁর মুদ্রায় প্রায়শ ‘সুলতান হোসেন শাহ বিন সাইয়িদ আশরাফ-উল-হুসেইনী’ অভিধা উৎকীর্ণ দেখা যায়। কাজেই রিয়াজে প্রাপ্ত তথ্যে কিছুটা হলেও সত্যতা রয়েছে।

আলাউদ্দীন হোসেন শাহের রাজত্বকালে বাংলার সালতানাতের ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটে। লোদী আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য তিনি তাঁর পশ্চিম সীমান্ত সুরক্ষিত করেন এবং জৌনপুরের বিতাড়িত শর্কি সুলতানকে আশ্রয় প্রদান করেন। তিনি কামরূপের বিরুদ্ধে কয়েকটি অভিযান পরিচালনা করেন। তিনি কামরূপের খেন রাজবংশকে উৎখাত করে  কামরূপ ও  কামতকে বাংলারাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন। অতঃপর তিনি আসামের অন্তর্গত ব্রহ্মপুত্রের উপত্যকা পর্যন্ত অগ্রসর হন। উড়িষ্যারাজ প্রতাপরুদ্রদেবের সঙ্গে সংঘর্ষেও তিনি সাময়িক সাফল্য অর্জন করেন। ১৪৯৪ থেকে ১৫১৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়ে জারিকৃত মুদ্রায় তাঁকে ‘কামরূপ ও কামতা এবং জাজনগর ও উড়িষ্যা বিজয়ী’ রূপে উল্লেখ করা হয়েছে। ত্রিপুরার রাজা ধন্যমানিক্যের সঙ্গে তার কয়েকটি সংঘর্ষ হয়। প্রথম দিকে কিছু ব্যর্থতা সত্ত্বেও তিনি ত্রিপুরার একাংশ নিজ রাজ্যভুক্ত করতে সক্ষম হন। চট্টগ্রামের অধিকার নিয়ে বাংলা, ত্রিপুরা ও আরাকানের শাসকদের মধ্যে সংঘটিত ত্রিপক্ষীয় যুদ্ধে হোসেন শাহ চট্টগ্রাম দখল করতেও সক্ষম হন। ১৫৩৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত চট্টগ্রাম হোসেনশাহী রাজ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। হোসেন শাহের রাজত্বের শেষ দিকে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের উদ্দেশ্যে একটি পর্তুগিজ প্রতিনিধিদল বাংলায় আগমন করে। ১৫১৯ খ্রিস্টাব্দে হোসেন শাহের রাজত্বের অবসান ঘটে।

আলাউদ্দীন হোসেন শাহের শাসনাধীনে দেশে নিরবচ্ছিন্ন শান্তি বিরাজ করছিল। সমকালীন কবি বিজয়গুপ্ত তাঁকে নৃপতিতিলক, জগৎভূষণ ও কৃষ্ণ-অবতার বলে উল্লেখ করেছেন। হিন্দুদের প্রতি তিনি সহনশীল ও উদারনীতি পোষণ করতেন। হিন্দুরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদেও অধিষ্ঠিত ছিলেন। রূপ গোস্বামী ছিলেন সাকার মালিক, সনাতন গোস্বামী ছিলেন দবির-ই-খাস, জগাই ও মাধাই ছিলেন নবদ্বীপের কোতোয়াল, গোপীনাথ বসু ছিলেন তাঁর মন্ত্রী, মুকুন্দদাস ব্যক্তিগত চিকিৎসক, কেশব খান ছত্রী ছিলেন তাঁর দেহরক্ষী বাহিনীর প্রধান এবং অনুপ ছিলেন টাকশালের দায়িত্বে নিয়োজিত। তাঁর অধীনস্থ প্রাদেশিক শাসনকর্তা  পরাগল খান ও ছুটি খান মহাভারতের বাংলা অনুবাদক কবীন্দ্র পরমেশ্বর এবং শ্রীকর নন্দীর পৃষ্ঠপোষকতা করেন।

বৈষ্ণব কাব্যসমূহে হোসেন শাহের উদার দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে যে,  শ্রী চৈতন্যএর প্রতি তিনি খুবই শ্রদ্ধাশীল ছিলেন এবং তাঁকে তিনি ঈশ্বরের অবতার বলে মনে করতেন। শ্রী চৈতন্যের ধর্ম প্রচারের ক্ষেত্রে হোসেন শাহ সার্বিক সুবিধা প্রদান করেছেন। হোসেনশাহী বাংলায় জিজিয়ার প্রচলন ছিল না। হোসেন শাহ এবং তাঁর উত্তরাধিকারিগণ ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে বিভিন্ন শ্রেণির জনগণের সমর্থন ও সহযোগিতার মাধ্যমে রাষ্ট্রের ভিত্তিকে সুদৃঢ় করার কাজে সচেষ্ট ছিলেন। মধ্যযুগের বাংলার ইতিহাসে হোসেন শাহের রাজত্বকাল একটি অত্যুজ্জ্বল অধ্যায়।  [আবদুল মমিন চৌধুরী]