কৃষ্ণদাস কবিরাজ


কৃষ্ণদাস কবিরাজ ষোল শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বৃন্দাবনবাসী এক বৈষ্ণব ভক্ত এবং কৃষ্ণ চৈতন্যের (১৪৭৮-১৫৩৩) সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ চরিত গ্রন্থ  চৈতন্য চরিতামৃত-এর রচয়িতা হিসেবে সর্বাধিক পরিচিত। চৈতন্য চরিতামৃত বাংলা ও সংস্কৃতের মিশ্রণে রচিত প্রায় ২৪,০০০ (চবিবশ হাজার) চরণ বিশিষ্ট একটি জীবনী গ্রন্থ ও ধর্মতাত্ত্বিক পুথি। কৃষ্ণদাস ব্রজে রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলা কীর্তন করে নান্দনিক পরিশীলিত সংস্কৃত কাব্য গোবিন্দলীলামৃতও রচনা করেন এবং তিনি বিল্বমঙ্গলের কৃষ্ণ কর্ণামৃতের সংস্কৃত ভাষ্যও প্রণয়ন করেন। তিনি কৃষ্ণবিষয়ক অসংখ্য ছোট কীর্তন পদেরও রচয়িতা।

কৃষ্ণদাস জন্মসূত্রে ছিলেন বৈদ্য। তিনি চৈতন্যের দীর্ঘদিনের সহচর নিত্যানন্দ দ্বারা স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে তাঁর নিজগ্রাম ঝামটপুর (পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার নৈহাটির কাছাকাছি) ত্যাগ করে তীর্থকেন্দ্র ব্রজধামে (চৈতন্য চরিতামৃত ১.৫.১৫৯-৭৭) গোস্বামী নামে পরিচিত বৈষ্ণব শাস্ত্র বিশ্লেষকদের সঙ্গে জীবনযাত্রা শুরু করেছিলেন। ব্রজে কৃষ্ণদাসের গুরু ছিলেন রঘুনাথ দাস এবং তাঁর শিক্ষাগুরু ছিলেন রূপ গোস্বামী। চৈতন্য চরিতামৃত এর সবটা জুড়ে ওই দুজন সম্পর্কে বারবার প্রশংসাবাণী আছে। কৃষ্ণদাস আটজন আদি গোস্ব^ামীর প্রত্যেকের কাছে পড়েছিলেন এবং মিশেও ছিলেন প্রত্যেকের সঙ্গে। সম্ভবত তিনিই প্রথম এবং একমাত্র পন্ডিত যিনি এরকম করতে পেরেছিলেন। এ সম্পর্কের তাৎপর্য চৈতন্য চরিতামৃতে তাত্ত্বিক সমন্বয়ে রূপায়িত হয়ে গোস্বামীদের তত্ত্বচিন্তার সারসংক্ষেপ ও তাদের প্রধান রচনা কর্মের পূর্ণতা দিয়েছিল। এগুলির মধ্যে রয়েছে রূপ গোস্বামীর নান্দনিক রসতত্ত্বের ভক্তিমূলক রূপভাষ্য, জীব গোস্বামীর দার্শনিক ভাবনা, সনাতন গোস্বামী ও গোপাল ভট্টের শাস্ত্র বিষয়ক সংশ্লেষী চিন্তা এবং লোকনাথ, ভূগর্ভ, রঘুনাথ দাস ও রঘুনাথ ভট্ট প্রমুখ গোস্বামীর ভক্তিমূলক ধ্যানচিন্তার পরিচয়। এসব মহান ভক্তের ছাত্র কৃষ্ণদাসের মধ্যে গোস্বামীদের শাস্ত্রসাহিত্য একটা শৃঙ্খলা হিসেবে সংশ্লেষিত হয়েছিল যা চৈতন্যের নিজের জীবনে ওই ধর্মতত্ত্বের অত্যুজ্জ্বল প্রয়োগরূপে অটুট অভিব্যক্তি লাভ করেছিল। কৃষ্ণদাস কবিরাজের চৈতন্য চরিতামৃত লেখার পরই কেবল গোস্বামীদের শাস্ত্রীয় রচনা গৌড়ীয় ধর্মতত্ত্বের আদর্শ মানদন্ডে পরিণত হয়েছে। এ ব্যাপারে তাঁর নিজের মহিমা এমনই ছিল যে, পরবর্তীকালের বৈষ্ণব সমাজ কর্তৃক ধ্যান কর্মের জন্য অবলম্বিত অষ্ট গোস্বামীর অন্যতম ভূগর্ভ বা লোকনাথের বিকল্প রূপে তাঁকেই প্রায় ভাবা হতো।

কৃষ্ণদাসের চৈতন্য গ্রন্থ বাংলায় নিয়ে আসা হয় এবং গোস্বামীদের কাছে শিক্ষাপ্রাপ্ত ত্রয়ী শিষ্য শ্রীনিবাস আচার্য, নরোত্তম দাস ও শ্যামানন্দ দ্বারা তা ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়। কথিত আছে যে, বিষ্ণুপুরের মহারাজা বীর হাম্বীর, যাঁকে আবুল ফজলের আইন-ই-আকবরী গ্রন্থে ষোলো শতকের শেষ দশকের লোক বলা হয়েছে, পুঁথিটি চুরি করেছিলেন। নিত্যানন্দ দাসের প্রেম-বিলাস গ্রন্থের মুদ্রিত সংস্করণের একটি অতি বিতর্কিত অংশে (সর্গ ২৪) লেখা আছে, যখন পুঁথিটির হারিয়ে যাওয়ার সংবাদ ব্রজে পৌঁছায়, কৃষ্ণদাস সঙ্গে সঙ্গে পড়ে গিয়ে মারা যান। এতে তাঁর মৃত্যু ১৫৯৯ খ্রিস্টাব্দের দিকে হয়েছে ধরা যায়, কিন্তু অনেক পন্ডিত বিশ্বাস করেন যে, ওই সময়ের আরও পনেরো বছর পরে ওই পুথিটির রচনা সমাপ্ত হয়েছে। কাহিনীটি মোটেও অসংগত নয়, যেহেতু এর পক্ষে অন্য কোনো জোরালো সমর্থন নেই কেবল পুঁথিতে উল্লেখ্য কৃষ্ণদাসের নিজের প্রতিবেদন ছাড়া, যেখানে তিনি বলেছেন পুঁথিটি যখন সমাপ্ত হয় তখন তিনি ছিলেন অতি বৃদ্ধ। তিনি বার বার উল্লেখ করেছেন, এ কাজ শেষ করার আগেই তিনি সম্ভবত মারা যাবেন। শেষ সর্গে শীলিত বিনয়ের সঙ্গে তিনি লিখেছেন ‘আমি বৃদ্ধ ও জীর্ণ, বধির ও অন্ধ, আমার হাত কাঁপে, আমার মন স্থিত নয়। আমি রোগগ্রস্ত, আমি বসতেও পারি না, চলতেও পারি না এবং দিন ও রাতে আমি পঞ্চরোগের (অজ্ঞতা, অহমিকা, ক্রোধ, দ্বেষ ও পার্থিব মোহের) যন্ত্রণা অনুভব করি’ (চৈতন্য চরিতামৃত ৩.২০.৮৪-৮৫)। চৈতন্যকে যারা কখনও দেখেন নি, কিন্তু চৈতন্যের তীর্থভ্রমণ ও পুরীতে সন্ন্যাস জীবনের বছরগুলির বিবরণ, কিংবা ঐসব কথা যেমন কৃষ্ণদাসের গুরু রঘুনাথ দাস চৈতন্যের ব্যক্তিগত শ্রুতিলেখক স্বরূপ দামোদরকে পরিচর্যা করে ঘটনাসমূহ সম্ভবত অন্য কেউর চেয়ে বেশি জানতেন ইত্যাকার বৃত্তান্ত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে জানতে আগ্রহী এমন কিছুসংখ্যক ব্রজবাসী ভক্তের উপরোধে তিনি গ্রন্থটি লিখেছেন। কৃষ্ণদাস উল্লেখ করেন যে, পুঁথিটি রচনার সিদ্ধান্ত তাঁর কুলদেবতা মদন গোপালের স্বীকৃতি লাভ করে এভাবে যে, তার মূর্তি থেকে একটি মালা খসে পড়ে যাতে এ রকম ইংগিত মেলে যে, এ দায়িত্ব তাঁকে পালন করতে হবে। কিন্তু অকিঞ্চন দাসের বিবর্ত বিলাসকে যদি বিশ্বাস করতে হয়, তাহলে প্রথম দিকে কেউ সন্তুষ্ট ছিলেন না যে, কৃষ্ণদাস তাঁর পুথিতে এত কিছু তুলে ধরবেন। চৈতন্য চরিতামৃতের ওপর তান্ত্রিক সহজিয়া ভাষ্য বিবর্ত বিলাস-এর মতে, রক্ষণশীল জীব গোস্বামী এতই বিরক্ত হয়েছিলেন যে, তিনি কৃষ্ণদাসের নিবাস রাধাকুন্ডের জলে পুঁথিটি নিক্ষেপ করেছিলেন। কিন্তু পুঁথিটি অক্ষত অবস্থায় ভেসে ওঠে। এতে জীব গোস্বামী প্রত্যয় পেলেন যে, তিনি অন্যায়ভাবে বিরূপতা প্রকাশ করেছেন (বিবর্ত বিলাস, বিলাস ২)। ‘জল পরীক্ষা’ অবশ্য অতিমানবীয় পুরাণ শাস্ত্রের পরিচিত গূঢ় উক্তি যা বেশির ভাগ পন্ডিত গল্প কাহিনি ধারণায় পরিত্যাগ করে কিংবা রূপকাত্মকভাবে এটি পড়ে।

এ বিবরণের সঙ্গে আরও কিছু মূল্যবান অতিরিক্ত বৃত্তান্ত যুক্ত হতে পারে। উৎসসমূহের উল্লেখ না করে পন্ডিতগণ সাধারণভাবে মেনে নিয়েছেন যে, কৃষ্ণদাস ১৫১৭ ও ১৫২৮-এর মধ্যে কোনো এক সময়ে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ভগীরথ, আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক এবং তাঁর মা সুনন্দা উভয়ই তাঁর অতি তরুণ বয়সে পরলোক গমন করেন এবং তিনি ও তাঁর ছোট ভাই শ্যামানন্দ আত্মীয় স্বজনদের পরিচর্যায় বড় হয়েছেন। কৃষ্ণদাস একটি ঘটনার বিবরণ দেন যে, এক কীর্তনের আসরে চৈতন্য ও নিত্যানন্দের গুণ মাহাত্ম্য বর্ণনার সময় তাঁর ভাই বিখ্যাত বৈষ্ণব মহাজন মীনকেতন রামদাসের সঙ্গে তর্ক করছিলেন, এতে কৃষ্ণদাস দারুণভাবে মর্মপীড়িত হয়েছিলেন (চৈতন্য চরিতামৃত, ১.৫ ১৩৯-৫৮)। কবিকর্ণপুরের গৌরগণদ্দেশদীপিকা কৃষ্ণদাসের পরিচিতি দিয়েছিল কৃষ্ণের নিত্যলীলায় কস্ত্তরী মঞ্জরী রূপে, যে ছিল রাধা ও অন্য গোপীদের পরিচারিকা এবং যার বিশেষ কাজ ছিল খাদ্য প্রস্ত্তত ও পরিবেশনা।  [টনি কে. স্টুয়ার্ট]