পুন্ড্রবর্ধন


পুন্ড্রবর্ধন প্রাচীন বাংলার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি জনপদ। এর নামকরণ হয়েছে পুন্ড্র জনগোষ্ঠীর নামানুসারে। ঐতরেয় ব্রাহ্মণে (খ্রি.পূ. ৮ম শতক) প্রথমবারের মতো উপজাতি গোষ্ঠীরূপে পুন্ড্রের উল্লেখ রয়েছে। অন্ধ্র, শবর, পুলিন্দ ও মুতিব জনগোষ্ঠীর সমন্বয়ে পুন্ড্ররা একটি স্বতন্ত্র জাতি হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। অন্যান্য সাহিত্যসূত্রেও নামটি পাওয়া যায়। পরবর্তীকালের বৈদিক সাহিত্যে পুন্ড্র জাতি ও তাদের আবাসস্থল বৈদিক সংস্কৃতির পরিমন্ডলের বাইরে অবস্থিতির কারণে অপবিত্র হিসেবে ধিকৃত হয়।

একটি জনগোষ্ঠীর নামানুসারে গঠিত পুন্ড্র ক্রমশ রাষ্ট্রীয় এককে পরিণত হয়। লেখতাত্ত্বিক বিচারে মৌর্য যুগের (আনু. খ্রি.পূ তৃতীয় শতক) মহাস্থান ব্রাহ্মীলিপির আবিষ্কার করতোয়া নদীর ডান তীরস্থ বগুড়া জেলার মহাস্থানের সঙ্গে পুন্ড্রনগরের শনাক্তীকরণ নিশ্চিত করেছে। পুন্ড্রনগর ছিল একটি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় কেন্দ্র।

গুপ্তযুগের পুন্ড্রবর্ধন বা পৌন্ড্রবর্ধন একটি গুরুত্বপূর্ণ ভুক্তি বা রাষ্ট্রীয় বিভাগে পরিণত হয়। উত্তর বঙ্গ থেকে প্রাপ্ত গুপ্ত যুগীয় লেখতাত্ত্বিক উপাদানসমূহের দ্বারা পরিষ্কার বোঝা যায় যে, পুন্ড্রবর্ধন ভুক্তি কয়েকটি বিষয় বা জেলায় বিভক্ত ছিল। বিষয়গুলি আবার কয়েকটি করে বীথি ও মন্ডলে বিভক্ত ছিল। গুপ্ত সম্রাট কর্তৃক সরাসরি নিযুক্ত একজন উপরিক বা উপরিকমহারাজের (প্রাদেশিক শাসনকর্তা) উপর এ ভুক্তির শাসনভার ন্যস্ত ছিল।

দক্ষিণে পদ্মা, পশ্চিমে গঙ্গা এবং পূর্বে হয় করতোয়া অথবা যমুনা দ্বারা পরিবেষ্টিত পুন্ড্র, পুন্ড্রবর্ধন বা পৌন্ড্রবর্ধন নামে আখ্যায়িত অঞ্চলটি বাংলাদেশের রাজশাহী, বগুড়া, দিনাজপুর (ভারত ও বাংলাদেশ উভয়ের অন্তর্গত) এবং প্রাচীন বরেন্দ্র নিয়ে গঠিত ছিল। বুধগুপ্তের রাজত্বকালের (আনু. ৪৭৬-৯৪ খ্রি.) দামোদরপুর তাম্রশাসন অনুসারে পুন্ড্রবর্ধনের উত্তর-সীমা ছিল হিমালয় (হিমাবচ্ছিখর)।

পাল যুগে পুন্ড্রবর্ধনের প্রশাসনিক ও রাষ্ট্রীয় সীমানা প্রসার লাভ করে। পাল, চন্দ্র ও সেন যুগে উত্তরবঙ্গের ভৌগোলিক সীমানার অতিক্রান্ত অঞ্চলসমূহ পুন্ড্রবর্ধনের অন্তর্ভুক্ত হয়। শ্রীচন্দ্র এর ধুল্ল তাম্রশাসনে পুন্ড্র ভুক্তির খদিরবিল্লি বিষয়ের বল্লিমুন্দ খন্ডলে একটি ভূমিদানের উল্লেখ রয়েছে। বল্লিমুন্দ ও খদিরবিল্লিকে যথাক্রমে মাণিকগঞ্জ জেলার বল্লিসুদ ও খল্লি গ্রামের সাথে শনাক্ত করা হয়।

লড়হচন্দ্রের ময়নামতী ও দামোদরদেবের (১২৩৪ অব্দ) মেহর তাম্রফলক থেকে জানা যায় যে, সমতট মন্ডল পুন্ড্রবর্ধনভুক্তির অন্তর্গত ছিল। শ্রীচন্দ্রের (৯৩০ অব্দ) পশ্চিমভাগ তাম্রশাসনে পুন্ড্রবর্ধনভুক্তির অন্তর্গত শ্রীহট্ট মন্ডলের আওতাধীন গরল, পোগর ও চন্দ্রপুর বিষয়সমূহে ভূমিদানের প্রমাণ রয়েছে। অতএব বঙ্গের উত্তর পূর্ব প্রান্তে সিলেট অঞ্চল পুন্ড্রবর্ধনভুক্তির অন্তর্ভুক্ত ছিল। পাল-সেন যুগের ভূমিদানের দলিল থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, ভৌগোলিক দিক থেকে পূর্ববঙ্গের প্রায় সমগ্র অঞ্চলের সঙ্গে সমবিস্তৃত বঙ্গ প্রশাসনিক একক পুন্ড্রবর্ধনের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিল (পৌন্ড্রবর্ধনভুক্ত্যন্ত পাতিবঙ্গে বিক্রমপুরভাগে)।

পরবর্তীকালে রাঢ় ও দন্ডভুক্তি সমন্বয়ে গঠিত বাংলার পশ্চিমাঞ্চল ব্যতীত প্রায় সমগ্র বাংলা পুন্ড্রবর্ধন বা পৌন্ড্রবর্ধনের আখ্যাধীনে চলে আসে। লেখতাত্ত্বিক সূত্রের তুলনামূলক গবেষণা থেকে এ সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা পাওয়া যায়। ভাগীরথীর পূর্বাঞ্চল পুন্ড্রবর্ধনরূপে উল্লিখিত হলেও এর পশ্চিমাঞ্চল অনুরূপ নামে উল্লিখিত নয়।

পুন্ড্রবর্ধনভুক্তি দ্বারা যখন বৃহত্তর অঞ্চল বোঝাত তখনও উত্তর বঙ্গ যে পুন্ড্রবর্ধনভুক্তিরই অন্তর্গত ছিল তা বোঝা যায়। বর্মণরাজের একটি লিপিতে কৌশম্বি অষ্টগচ্ছ খন্ডলের (রাজশাহীর নিকটস্থ কুসুম্ব) উল্লেখ থেকে।

চীনের সঙ্গে মগধের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলের উপর পুন্ড্রবর্ধনের অবস্থিতি এর গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়। খ্রিস্টীয় সাত শতকের দ্বিতীয়ার্ধে এতদঞ্চলে আগমনকারী পরিব্রাজক হিউয়েন সাং এর বিবরণও এ অঞ্চলের সমৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়। হিউয়েন সাং ক-চু-উ-খি-লো (রাজমহলের নিকটে কজঙ্গল) থেকে পূর্ব দিকে যাত্রা শুরু করে, গঙ্গা পেরিয়ে পুন-ন-ফ-তন-ন (পুন্ড্রবর্ধন) অঞ্চলে পৌঁছান। সেখান থেকে তিনি আরও পূর্ব দিকে গমন করেন এবং কিয়-মো-লু-পো (কামরূপ) পৌঁছাতে এক বিশাল নদী অতিক্রম করেন। সুতরাং কজঙ্গল থেকে পুন্ড্রবর্ধন হয়ে কামরূপ পর্যন্ত একটি পথ ছিল। সুতরাং মধ্যগাঙ্গেয় উপত্যকার সংস্কৃতির বিস্তার ঘটাতে পুন্ড্রবর্ধনের অবস্থিতি ছিল খুব অনুকূল।

করতোয়ামাহাত্ম্য থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী বারো শতক পর্যন্ত পুন্ড্রনগর একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ স্থল হিসেবে বিদ্যমান ছিল। মধ্যযুগে পুন্ড্রনগর এবং এর সঙ্গে সঙ্গে পুন্ড্রবর্ধনও বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যায়। এ সময় অঞ্চলটি মহাস্থান নামে আখ্যাত হয়। [সুচন্দ্রা ঘোষ]