ইলতুৎমিশ


ইলতুৎমিশ (১২১০-১২৩৬)  দিল্লি সালতানাতের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে বিবেচিত শামসুদ্দীন ইলতুৎমিশ তুর্কিস্তানের ইলবারি গোত্রের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। এরূপ জনশ্রুতি আছে যে, ইলতুৎমিশের বুদ্ধিমত্তা, বিচক্ষণতা ও সুদর্শন চেহারা তাঁর ভাইদের মনে ঈর্ষার উদ্রেক করে এবং তারা তাঁকে বাল্যকালে ক্রীতদাসরূপে বিক্রি করে দেয়। অবশ্য দুর্ভাগ্য তার গুণাবলিকে বিনষ্ট করতে পারেনি। দিল্লির শাসনকর্তা কুতুবউদ্দীন তার নৈপূণ্যে আকৃষ্ট হয়ে তাকে উচ্চমূল্যে ক্রয় করেন। ইলতুৎমিশের পদমর্যাদা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেতে থাকে। তিনি দিল্লির সুলতান কুতুবউদ্দীনের অধীনে বদায়ুনের শাসনকর্তা নিযুক্ত হন। তার সঙ্গে সুলতানের এক কন্যার বিবাহ দেওয়া হয়। ইলতুৎমিশ ১২১০ খ্রিস্টাব্দে দিল্লির সিংহাসনে আরোহণ করেন।

সিংহাসনে আরোহণ করার পর ইলতুৎমিশ বহুবিধ সমস্যার সম্মুখীন হন। তখন বাংলার পশ্চিম ও উত্তর অঞ্চলই শুধু মুসলিম অধিকারভুক্ত ছিল। ইলতুৎমিশের সিংহাসন লাভের পূর্বেই আলী মর্দান খলজীর নেতৃত্বে লখনৌতির মুসলিম রাজ্য স্বাধীনতা ঘোষণা করে।

আলী মর্দানের নিকট থেকে গিয়াসউদ্দীন ইওজ খলজী ক্ষমতা কেড়ে নেন এবং তিনিও দিল্লির কর্তৃত্ব অস্বীকার করেন। অন্যত্র ব্যস্ত থাকার কারণে ইলতুৎমিশ লখনৌতির দিকে নজর দিতে পারেন নি। ১২২৫ খ্রিস্টাব্দের দিকে সুলতান নিজেই ইওয়াজের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেন। একটি সন্ধির মাধ্যমে যুদ্ধের অবসান ঘটে। সন্ধির শর্তানুসারে ইওজ খলজী ইলতুৎমিশের নামে খুতবাপাঠ ও মুদ্রা চালু করতে এবং যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ বাবদ ৮০ লক্ষ টাকা ও ৩৮টি হাতি প্রদানের অঙ্গীকার করেন। বিহারকে তখন বাংলা থেকে পৃথক করে আলাউদ্দীন জানীকে বিহারের শাসনকর্তা নিযুক্ত করা হয়। কিন্তু সুলতান দিল্লিতে ফিরতে না ফিরতেই ইওজ আবার বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। তিনি আলাউদ্দীন জানীকে বিহার থেকে বিতাড়িত করেন। সুলতান তখন আলাউদ্দীন জানীসহ তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র নাসিরউদ্দীন মাহমুদকে ইওয়াজের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেন। যুদ্ধে ইওজ নিহত হন এবং লখনৌতি আবার দিল্লি সালতানাতের একটি প্রদেশে পরিণত হয় (১২২৭)। শাহজাদা নাসিরউদ্দীন ১২২৯ খ্রিস্টাব্দে তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত বাংলা শাসন করেন। বাংলার পরবর্তী শাসনকর্তা ছিলেন আলাউদ্দীন দৌলত শাহ খলজী (১২২৯-১২৩০)। কিন্তু শীঘ্রই ইখতিয়ার উষ্টিন বলকা খলজী তাঁকে ক্ষমতাচ্যূত করেন। এ অবস্থায় বিদ্রোহ দমনের জন্য ইলতুৎমিশ পুনরায় বাংলা অভিমুখে অভিযান করেন। বলকা খলজী পরাজিত হন এবং ১২৩১ খ্রিস্টাব্দে তাকে হত্যা করা হয়। অতঃপর ইলতুৎমিশ বাংলায় শান্তিশৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারের জন্য মালিক আলাউদ্দীন জানীকে নিয়োগ করেন। তিন বছর শাসনের পর আলাউদ্দীন জানী স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এ সংবাদ পেয়ে সুলতান ইলতুৎমিশ আলাউদ্দীন জানীকে প্রত্যাহার করে সাইফউদ্দীন আইবককে বাংলার শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন। কিন্তু অচিরেই সাইফউদ্দীনের মৃত্যু ঘটে। এরপর ইলতুৎমিশ ইজ্জউদ্দীন তুগরল তুগান খানের ওপর বাংলার শাসনভার ন্যস্ত করেন। ইলতুৎমিশের প্রতি ইজ্জউদ্দীন বিশ্বস্ত ছিলেন। এভাবে বাংলায় ইলতুৎমিশের কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। সুলতান শামসুদ্দীন ইলতুৎমিশের মৃত্যু হয় ১২৩৬ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল মাসে। [এ.বি.এম শামসুদ্দীন আহমদ]