দাউদ খান কররানী


দাউদ খান কররানী (১৫৭৩-১৫৭৬)  বাংলার সর্বশেষ স্বাধীন সুলতান। তিনি বায়েজীদ কররানীর কনিষ্ঠ ভাই। হানসুর ষড়যন্ত্রে বায়েজীদ কররানী নিহত হলে সুলায়মান কররানীর বিশ্বস্ত পারিষদবর্গের সমর্থনে তিনি বাংলার সিংহাসনে আরোহণ করেন। তিনি তাঁর ভাইয়ের স্বাধীন নীতি বজায় রেখেছিলেন। তিনি নিজ নামে খুতবা পাঠ এবং মুদ্রা প্রচলন করেন।

দাউদ কররানী এক বিশাল সেনাবাহিনী এবং সমৃদ্ধ রাজকোষের উত্তরাধিকারী হন। তাঁর অধীনে ১ লক্ষ ৪০ হাজার বিভিন্ন শ্রেণির পদাতিক সৈন্য, ৪০ হাজার অশ্বারোহী সৈন্য বিভিন্ন আকারের ২০ হাজার কামান, ৩ হাজার ৬শত হাতি এবং কয়েকশত রণতরী ছিল বলে শোনা যায়। শক্তিবলে তিনি নিজেকে আকবরের সমকক্ষ ও প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করেন। গুজরাট ও রাজ-পুতানায় আকবরের ব্যস্ততার সুযোগ নিয়ে দাউদ খান কররানী গাজীপুরের নিকট যামানিয়া দুর্গ অবরোধ করেন। আকবর জৌনপুরের শাসনকর্তা মুনিম খানকে দাউদ কররানীর বিরুদ্ধে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দেন। নির্দেশানুসারে মুনিম খান পাটনা অভিমুখে যাত্রা করেন। কিন্তু দাউদের দক্ষ প্রধানমন্ত্রী লোদী খান তাঁর সম্মুখীন হলে মুনিম খান সহজ শর্তে শান্তির প্রস্তাব দেন। এ সন্ধিতে আকবর বা দাউদ কেউই সন্তুষ্ট ছিলেন না। দাউদ কররানী প্রধানমন্ত্রী লোদী খানকে হত্যা করেন এবং রাজক্ষমতাবলে তাঁর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেন। অন্যদিকে আকবর মুনিম খানকে পুনরায় বাংলা ও বিহার আক্রমণের আদেশ দেন।

১৫৭৩ খ্রিস্টাব্দে মুনিম খান বিহার আক্রমণ করেন এবং এ যুদ্ধে দাউদ পশ্চাদপসরণ করে পাটনায় আশ্রয় নেন। মুনিম খান পাটনা অবরোধ করেন এবং আকবরের নিকট অধিকতর শক্তি বৃদ্ধির আবেদন করেন। ১৫৭৪ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট টোডরমল এবং মানসিংহকে সঙ্গে নিয়ে নিজেই দাউদ কররানীর বিরুদ্ধে অগ্রসর হন। তিনি প্রথমে সরাসরি হাজীপুর আক্রমণ করেন। গঙ্গার অপর তীরে অবস্থিত হাজীপুর শহর হতে পাটনায় প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি সরবরাহ করা হতো। হাজীপুর আকবরের অধিকারে আসে এবং অনতিবিলম্বে পাটনারও পতন ঘটে। মুনিম খানকে বিহার ও বাংলার গভর্নর নিযুক্ত করে আকবর রাজধানীতে প্রত্যাবর্তন করেন। তিনি মুনিম খানকে সহায়তা করার জন্য টোডরমলকে রেখে যান। আগ্রায় ফেরার আগে তিনি বৃদ্ধ সেনাপতিকে দাউদ কররানীর বিরুদ্ধে আক্রমণ অব্যাহত রাখার নির্দেশ দিয়ে যান।

সম্রাটের নির্দেশানুযায়ী মুনিম খান বাংলায় তাঁর অভিযান অব্যাহত রাখেন এবং তান্ডা ও সাতগাঁও-এ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। সামান্য প্রতিরোধের পর দাউদ উড়িষ্যা অভিমুখী হন। মুনিম খান এবং টোডরমলও তাঁকে অনুসরণ করেন। দাউদ যুদ্ধের প্রস্ত্ততিরূপে পরিখা খনন করেন এবং প্রতিরক্ষামূলক দেওয়াল তৈরি করেন। উভয় বাহিনী ১৫৭৫ খ্রিস্টাব্দের ৩ মার্চ সুবর্ণরেখার তীরে অবস্থিত বর্তমানে মেদেনীপুরের অন্তর্গত তুকারয় নামক স্থানে মিলিত হয় এবং এক ভয়াবহ যুদ্ধে লিপ্ত হয়। যুদ্ধের প্রাথমিক পরিস্থিতি আফগানদের অনুকূলে ছিল। তাঁরা খান-ই-জাহানকে হত্যা করে এবং মুনিম খানকে অনেক দূর পর্যন্ত পিছু হটতে বাধ্য করে। আফগান সেনাপতি গুজর খান ক্রমাগত মুনিম খানের অনুসরণ করতে থাকেন। কিন্তু অবশেষে দাউদ কররানী পরাজিত হন এবং কটক দুর্গে আশ্রয় গ্রহণ করেন। মুনিম খান দুর্গ অবরোধের জন্য প্রস্ত্তত হন। পুনরায় প্রতিরোধে অসমর্থ দাউদ কররানী মুগল সেনাপতির সঙ্গে তাঁর শিবিরে সাক্ষাৎ করে শান্তি স্থাপনের আবেদন জানান। অবশেষে ১৫৭৫ খ্রিস্টাব্দে সন্ধি সম্পাদিত হয়। সন্ধির শর্তানুসারে দাউদ বাংলা ও বিহারের নিয়ন্ত্রণ মুগলদের নিকট ছেড়ে দেন। উড়িষ্যা তাঁর দখলে থাকে।

ছয় মাস পর, ১৫৭৫ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর-এ মুনিম খান আকস্মিক ভাবে মৃত্যুবরণ করেন। দাউদ কররানী উড়িষ্যা থেকে বাংলায় প্রবেশ করে তেলিয়াগড়ি পর্যন্ত অগ্রসর হন। এভাবেই তিনি পুনরায় উড়িষ্যা এবং উত্তর ও পশ্চিম বাংলায় অধিপতিতে পরিণত হন।

হুসেন কুলী খানকে ‘খান জাহান’ উপাধি প্রদান করে আকবর তাকে বাংলার গভর্নর নিয়োগ করেন এবং দাউদকে আক্রমণের নির্দেশ দেন। খান জাহানের অধীনে মুগল বাহিনী অগ্রসর হলে দাউদ ৩ হাজার নির্বাচিত আফগানকে তেলিয়াগড়ি গিরিপথ প্রতিরক্ষায় নিযুক্ত করেন। তিনি নিজে অবশিষ্ট বাহিনীসহ রাজমহল পাহাড়ে অবস্থান নেন। তেলিয়াগড়িতে খান জাহান এবং আফগানদের মধ্যে প্রচন্ড যুদ্ধ হয়। এরপর তিনি দাউদের বিরুদ্ধে রাজমহল যাত্রা করেন। কিন্তু প্রায় চার মাস প্রতীক্ষার পর তিনি দাউদকে আক্রমণ করতে সক্ষম হন। একটি খন্ডযুদ্ধে মুগলগণ পরাজিত হয় এবং ঐ বাহিনীপ্রধান নিহত হন। ক্ষুব্ধ আকবর বিহারের গভর্নর মুজাফফর খান তুরবাতিকে খান জাহানের সাহায্যে এগিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। অন্যান্য সেনানায়কদেরও নৌকাবোঝাই রসদ ও যুদ্ধের মালামাল নিয়ে খান জাহানের সঙ্গে যোগ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। জুনায়েদ, কুতলু খান এবং কালাপাহাড়ের মতো সকল আফগান নেতা দাউদের পক্ষে সম্মিলিতভাবে যুদ্ধ করার জন্য একত্রিত হন। অবশেষে ১৫৭৬ সালের ১২ জুলাই রাজমহলে এক চূড়ান্ত নিষ্পত্তিকারী যুদ্ধ সংঘটিত হয়। যথেষ্ট শৌর্যবীর্যের সঙ্গে যুদ্ধ করা সত্ত্বেও দাউদ পরাজিত হন। বন্দি দাউদকে হত্যা করা হয় এবং তাঁর মস্তক সম্রাট আকবরের নিকট প্রেরিত হয়।

আর এরই সঙ্গে বাংলা, বিহার এবং উড়িষ্যার সর্বশেষ আফগান শাসক দাউদ কররানীর সংগ্রামী জীবনের অবসান ঘটে। তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে বাংলায় স্বাধীন মুসলিম শাসনকালেরও পরিসমাপ্তি ঘটে।  [এ.বি.এম শামসুদ্দীন আহমদ]