বঙ্গ


বঙ্গ  বাংলার একটি সুপ্রাচীন মানব-বসতির স্থান বা জনপদ, যা  চৌদ্দ শতকে মুসলমান শাসনামলে পরিবর্তিত রূপে বাঙ্গালাহ হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে। বাংলার অন্যান্য ভৌগোলিক ইউনিটের মতো বঙ্গের ভৌগোলিক গূঢ়ার্থও ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে পরিবর্তিত হয়েছে।

ঐতরেয় আরণ্যক-এ সর্বপ্রথম মগধের সাথে বঙ্গ নামক একটি জনগোষ্ঠীর কথা উল্লিখিত হয়েছে। বৌধায়ন ধর্মসূত্রে একটি জনগোষ্ঠী হিসেবে বঙ্গ নামের উল্লেখ রয়েছে, যারা আর্যসভ্যতার সীমার বাইরে কলিঙ্গের পাশেই বসবাস করত। পুরাণে এদের উল্লেখ রয়েছে পূর্বাঞ্চলীয় অন্যান্য জনগোষ্ঠী যেমন অঙ্গ, মগধ, মুদগরক, পুন্ড্র, বিদেহ, তাম্রলিপ্তি ও প্রাগজ্যোতিষ-এর সাথে। রামায়ণ এ অযোধ্যার সাথে বঙ্গের মৈত্রীবন্ধনের কথার উল্লেখ রয়েছে। মহাভারত এর ‘দিগ্বিজয়’ অধ্যায়ে বর্ণনা করা হয়েছে যে, ভীম মোদগিরির রাজাকে হত্যা করেন এবং পুন্ড্রের শাসক ছাড়াও কৌশিকী নদীর তীরবর্তী এলাকা শাসনকারী অপর একজন শাসককে দমন করেন। এরপর তিনি তাম্রলিপ্তি, করবট, সুহ্ম এবং সমুদ্রতীরবর্তী এলাকার জনগোষ্ঠীকে দমন করে লৌহিত্যের (ব্রহ্মপুত্র) তীরে এসে পৌঁছেন। মহাকাব্যটির পরবর্তী অধ্যায় থেকে জানা যায়, বঙ্গদের রাজ্য সমুদ্র পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করেছিল।

কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে বঙ্গ নামের উল্লেখ রয়েছে একটি সর্বপ্রাচীন ভৌগোলিক ইউনিট হিসেবে। এখানে বলা হয়েছে যে, এই অঞ্চলটিতে উৎকৃষ্ট মানের সাদা ও নরম সুতি বস্ত্র উৎপন্ন হতো (শ্বেতম্ স্নিগ্ধম্ দুকূলম্)। মহানিদ্দেশ (আনু. খ্রি. দ্বিতীয় শতক) এবং মিলিন্দপনহো (আনু. খ্রি. প্রথম ও দ্বিতীয় শতক) প্রদত্ত তথ্যে বঙ্গের অন্তর্গত এলাকা সমুদ্রতীরবর্তী ছিল বলে ইঙ্গিত পাওয়া যায়। উপরোল্লিখিত তথ্যানুযায়ী পুন্ড্র, সুহ্ম, তাম্রলিপ্তি, অঙ্গ, মুদগরক, মগধ এবং প্রাগজ্যোতিষ এর সান্নিধ্যে বঙ্গ ছিল পূর্বাঞ্চলীয় একটি দেশ, যা সমুদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। কিন্তু কেউই এর সঠিক অবস্থানের ইঙ্গিত করেন নি।

কালিদাসের রঘুবংশে (খ্রি. চার ও পাঁচ শতক) বঙ্গের অবস্থান সর্ম্পকে কিছুটা ইঙ্গিত পাওয়া যায়। রঘুর বিজয়াভিযান বর্ণনার সময় উল্লেখ করা হয় যে, সুহ্মদের পরাজিত করার পর নৌ-বিদ্যায় (নৌসাধনোদ্ধতান্) বিশেষ পারদর্শী বঙ্গীয়দেরকেও তিনি পরাজিত করেন। তিনি গঙ্গার দুই মোহনার অন্তর্বর্তী (গঙ্গাস্রোতোন্তরেষু) বদ্বীপে বিজয়স্তম্ভ নির্মাণ করেন। এটি সুস্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করে যে, গঙ্গার দুই প্রধান স্রোতোধারা ভাগীরথী ও পদ্মার মধ্যবর্তী ত্রিভুজাকৃতির ভূখন্ডটিই বঙ্গ। আর এরূপ জলমগ্ন প্লাবনভূমির অধিবাসীদের পক্ষে নৌবিদ্যায় দক্ষ হওয়াটাই স্বাভাবিক। প্রাচীন গ্রিক ও ল্যাটিন ক্ল্যাসিক্যাল লেখকগণ এই অঞ্চলকেই গঙ্গারিডাই বলে আখ্যা দিয়েছেন। চৈনিক গ্রন্থ Wei-lueh (খ্রি. তিন শতক)-তে বঙ্গ (Pan-yueh)-কে Han-yueh (Xan-gywat) বা গঙ্গার একটি দেশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রথম খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে প্রথম খ্রিস্টাব্দ কালে লিখিত জৈন উপাঙ্গ পন্যবণা (প্রজ্ঞাপনা)-তে কিছুটা বিস্তৃতভাবে বঙ্গ এর উল্লেখ পাওয়া যায়। এখানে তাম্রলিপ্তিকে (তমলুক, মেদিনীপুর জেলা) বঙ্গের অন্তর্গত হিসেবে দেখানো হয়েছে। মহাবংশ-এর কিংবদন্তি থেকে জানা যায়, অশোকের সময়ে তমলিতি থেকে সিংহলে বোধিবৃক্ষ পাঠানো হয়েছিল। এই কিংবদন্তি সত্য হলে বন্দর হিসেবে তাম্রলিপ্তির অস্তিত্ব মৌর্যযুগ থেকেই ছিল বলে মেনে নিতে হয়। সুতরাং এটি অসম্ভব নয় যে, আদি ঐতিহাসিক যুগে ভাগীরথীর পশ্চিম তীরবর্তী কিছু এলাকা বঙ্গের অন্তর্গত ছিল। অবশ্য গুপ্তপরবর্তী যুগে বর্তমান পশ্চিম বাংলার ভাগীরথীর পশ্চিম তীরবর্তী এলাকার সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে গৌড় ও রাঢ়-এর জনপ্রিয়তার কাছে বঙ্গ তার গুরুত্ব হারায়। দন্ডীর দশকুমারচরিত-এ দামলিপ্তকে (তাম্রলিপ্তির রূপভেদ) সুহ্ম-এর একটি নগর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

শক্তিসঙ্গমতন্ত্র-এর সৎপঞ্চাশোদ্দেশবিভাগে বলা হয়েছে যে, সমুদ্র থেকে ব্রহ্মপুত্র পর্যন্ত বঙ্গের বিস্তৃতি ছিল। এর মাধ্যমেই সম্ভবত বঙ্গের উত্তর ও পূর্বদিকের সীমানা চিহ্নিত করা হয়েছিল। বাৎস্যায়ন-এর কামসূত্র সম্পর্কে যশোধর প্রদত্ত মন্তব্য অনুযায়ী লৌহিত্যের পূর্বে বঙ্গ অবস্থিত ছিল। এটিকে বঙ্গ এলাকার সম্প্রসারিত অর্থে গ্রহণ করা যেতে পারে। এই বিস্তৃতি ছিল ব্যাপক এলাকা জুড়ে বঙ্গের রাজনৈতিক সম্প্রসারণেরই ফল।

সেন যুগের লিপি সাক্ষ্যে বঙ্গের ‘বিক্রমপুরভাগ’ ও ‘নাব্যভাগ’-এর উল্লেখ রয়েছে, যা বর্তমান বাংলাদেশের বৃহত্তর ঢাকা, ফরিদপুর ও বরিশাল এলাকা নির্দেশ করে। বৈদ্যদেবের কমৌলি তাম্রশাসনে ‘অনুত্তর বঙ্গ’ অথবা দক্ষিণ বঙ্গের উল্লেখ আছে। বিশ্বরূপসেনের সাহিত্য পরিষদ তাম্র্র্র্রশাসনে বঙ্গের নাব্য এলাকার রামসিদ্ধি পাটক-এর ‘বঙ্গাল-বড়াভূ’-এর কথা বলা হয়েছে। রামসিদ্ধিকে বৃহত্তর বরিশাল জেলার গৌরনদীর সঙ্গে অভিন্ন হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। তাই বলা যায়, বাংলাদেশের দক্ষিণ অংশ বঙ্গের নাব্যভাগ দ্বারাই গঠিত। চন্দ্র তাম্রশাসনে উল্লিখিত চন্দ্রদ্বীপও একই এলাকা নির্দেশ করে এবং এটিও বঙ্গেরই একটি অংশ ছিল।

বঙ্গের এ সকল ভাগ ছাড়াও প্রাথমিক যুগের কিছু লিপি ও লিখিত সূত্রে আরও কয়েকটি উপবিভাগের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। বৃহৎসংহিতায় প্রদত্ত দক্ষিণ-পূর্ব ভারতের দেশগুলির তালিকায় ‘উপবঙ্গ’-এর উল্লেখ রয়েছে। বঙ্গও এই তালিকার অন্তর্ভুক্ত ছিল। ষোল শতকের দিগ্বিজয় প্রকাশ-এ ‘উপবঙ্গ’-কে যশোর ও তৎসংলগ্ন বনাঞ্চলের সাথে উল্লেখ করা হয়েছে। খুব সম্ভবত এটি ছিল সুন্দরবনের অংশ। বঙ্গের দক্ষিণ অংশের সমুদ্র তীরবর্তী অংশটি ছিল বঙ্গাল, ইতিহাসের কোন এক সময়ে যার ছিল পৃথক ভৌগোলিক অস্তিত্ব।

উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে এটি সুস্পষ্ট যে, অন্যান্য এলাকার মতো বঙ্গ নামটিও জাতিগতভাবে উদ্ভূত। ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে এর সীমানা সঠিকভাবে নির্দিষ্ট করা কঠিন, তবে মোটামুটিভাবে বর্তমান বাংলাদেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বাংশের একটি নির্দিষ্ট এলাকায় বঙ্গের অস্তিত্ব ছিল। প্রথমদিকে খুব সম্ভবত পশ্চিম বাংলার দক্ষিণ অংশেও এর বিস্তৃতি ছিল। তবে গঙ্গার দুই প্রধান ধারার (ভাগীরথী থেকে পদ্মা-মেঘনা) অন্তর্বর্তী এলাকা নিয়ে এই ভৌগোলিক ইউনিটের মূল কেন্দ্র গড়ে ওঠে এবং এখানেই স্বাধীন বঙ্গ রাজ্যের বিকাশ ঘটে।

বাংলায় মুসলিম শাসনের প্রথম দিকে এই ইউনিট ‘বং’ নামে উল্লিখিত হয়। খ্রিস্টীয় চৌদ্দ শতকে সমগ্র বাংলা (বর্তমান বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিম বাংলা) ‘বাঙ্গালাহ’ নামে পরিচিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ‘বং’ নামটিই প্রচলিত থাকে।  [আবদুল মমিন চৌধুরী]

গ্রন্থপঞ্জি  Amitabha Bhattacharyya, Historical Geography of Ancient and Early Mediaeval Bengal, Calcutta, 1977; এ.এম চৌধুরী, ‘বাংলার ভৌগোলিক পরিচয়’, আনিসুজ্জামান (সম্পাদিত), বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, ১ম খন্ড, ঢাকা, ১৯৮৭; Bn Mukherjee, Indian Museum Bulletin, XXV, Calcutta, 1990.