রাঢ়


রাঢ়  প্রাচীন বাংলার একটি স্বতন্ত্র ভূ-রাজনৈতিক এলাকা (জনপদ)। সম্ভবত বর্তমান ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের একটি বড় অংশ এর অন্তর্ভুক্ত ছিল। জৈন ঘটনাপঞ্জি আচারঙ্গসূত্রে সর্বপ্রথম রাঢ়/রারহ/লাঢ়/লার-এর উল্লেখ পাওয়া যায়। সেখানে বর্ণিত হয়েছে যে, খ্রি.পূ ছয় শতকে মহাবীর ধর্ম প্রচারকালে বজ্জভূমি ও শুব্ভভূমির অন্তর্ভুক্ত পথহীন লাঢ় দেশ পরিভ্রমণ করেন। এ সময় জনপদটি ছিল ‘দুর্গম ও নৈরাজ্যময়’ এবং সেখানকার অধিবাসীরা মহাবীরের প্রতি রূঢ় আচরণ করে। দীপবংশ ও মহাবংশে এরূপ জনশ্রুতির উল্লেখ রয়েছে যে, বিজয় শ্রীলংকা আবাদ করে সেখানে জনবসতি গড়ে তুলেছিলেন এবং এই বিজয় ছিলেন ‘লাল’-এর অন্তর্গত সিংহপুরের অধিবাসী। এই ‘লাল’ রাঢ়ের সঙ্গে শনাক্তীকৃত। মথুরায় প্রাপ্ত একটি শিলালিপিতে লিপিবদ্ধ আকারে সম্ভবত সর্বপ্রথম রাঢ়ের উল্লেখ পাওয়া যায়, যাতে ‘রাঢ়’ রাজ্যের অধিবাসী এক জৈন সন্ন্যাসীর অনুরোধে একটি জৈন মূর্তি নির্মাণের উল্লেখ আছে। খাজুরাহোতে প্রাপ্ত শিলালিপির বিবরণে চন্দেলারাজের হাতে রাঢ়সহ বিভিন্ন রাজ্যের রানীদের বন্দি হওয়ার ঘটনার উল্লেখ আছে।  বল্লালসেনের নৈহাটী তাম্রশাসনে রাঢ়কে সেন রাজাদের পিতৃভূমি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ভট্টভবদেবের ভুবনেশ্বর লিপিতে উল্লেখ আছে যে, রাঢ় ছিল একটি জলশূন্য শুষ্ক ও জঙ্গলাকীর্ণ অঞ্চল। বাংলার পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে এ বর্ণনার মিল রয়েছে। দিগ্বিজয়প্রকাশ-এ উল্লিখিত একটি জনশ্রুতিতে দামোদর নদের উত্তরে ও গৌড়ের দক্ষিণে রাঢ়ের অবস্থান নির্দেশ করা হয়েছে। তবকত-ই-নাসিরীর বর্ণনায়ও গঙ্গার দক্ষিণে রাঢ়ের অবস্থান নির্দেশিত হয়েছে।

খ্রিস্টীয় নয় ও দশ শতকের শিলালিপি ও সাহিত্যে রাঢ়ের দুটি বিভাগের উল্লেখ আছে, যথা দক্ষিণ রাঢ় ও উত্তর রাঢ়। এ বিভাজন প্রাচীনকালের ‘বজ্জভূমি’ ও ‘সুহ্মভূমি’র অবস্থানের সঙ্গে অনেকটা অভিন্ন। রাজেন্দ্র চোলের (খ্রিস্টীয় এগারো শতক) তিরুমুলাই শিলালিপিতে স্পষ্টভাবে রাঢ়ের দুটি ভাগের উল্লেখ রয়েছে, উত্তর ও দক্ষিণ রাঢ়। এ লিপিতে তক্কন-লাড়মকে (দক্ষিণ রাঢ়) দন্ডভুক্তি, বাঙ্গালাদেশ ও লাড়ম (উত্তর রাঢ়) থেকে স্বতন্ত্র বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বাকপতি মুঞ্জর গাওনরি লিপি (দশ শতক), শ্রীধরাচার্যের ন্যায়কন্দলী, মন্ধত-এর অমরেশ্বর মন্দির লিপি (মধ্য প্রদেশের নিমার জেলা), কৃষ্ণ মিশ্রের প্রবোধচন্দ্রোদয় এবং মুকুন্দরামের চন্ডীমঙ্গল (১৫৯৩-৯৪ খ্রি.) কাব্যে দক্ষিণ রাঢ়ের উল্লেখ রয়েছে।

উপরিউক্ত তথ্যাবলি থেকে জানা যায় যে, পশ্চিবঙ্গের আধুনিক হাওড়া, হুগলি ও বর্ধমান জেলার বিভিন্ন বৃহদাকার বসতি স্থানসমূহ বা অজয় ও দামোদর নদের মধ্যবর্তী অংশে অবস্থিত পশ্চিমবঙ্গের উল্লেখযোগ্য অংশ দক্ষিণ রাঢ়ের অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং এর দক্ষিণ সীমা সম্ভবত রূপনারায়ণ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল ও পশ্চিম সীমা প্রসারিত ছিল দামোদর নদের অপর পারে অবস্থিত আরামবাগ মহকুমা পর্যন্ত। অপরো মন্ডল একটি অঞ্চল হিসেবে দক্ষিণ রাঢ়ের সাথে অতি নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত ছিল এবং খ্রিস্টীয় এগারো শতকে একই শাসক পরিবারের (শূর) অধীনে ছিল। এ মন্ডল সম্ভবত হুগলির আরামবাগ মহকুমার মান্দারানের সাথে অভিন্ন। রাঢ়ের প্রধান প্রধান বসতিগুলি সম্পর্কে বলা যায় যে, শ্রীধরাচার্য ও কৃষ্ণমিশ্র ভুরিসৃষ্ট বা ভুরিশ্রেষ্ঠিকা ও নবগ্রাম নামে দুটি গ্রামের নাম উল্লেখ করেছেন। মুকুন্দরামও তাঁর নিজ গ্রাম দামুন্যা বা দামিন্যার উল্লেখ করেছেন। ভুরিসৃষ্ট বা ভুরিশ্রেষ্ঠিকা হাওড়া জেলার বর্তমান ভুরাসুত গ্রামের সাথে অভিন্ন বলে প্রমাণিত হয়েছে। পক্ষান্তরে নবগ্রাম ও দামুন্যা বা দামিন্যা যথাক্রমে হুগলি ও বর্ধমান জেলার একই নামের দুটি গ্রামের সঙ্গে অভিন্ন বলে ধরে নেয়া যায়।

চোলরাজা দেবেন্দ্র বর্মনের ছয় শতকের শিলালিপিতে উত্তর রাঢ় সম্পর্কে প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায়। রাঢ়ের এ অংশটিকে রাজেন্দ্র চোলের এগারো শতকের তিরুমুলাই শিলালিপিতে সুস্পষ্টরূপে একটি স্বতন্ত্র ভৌগোলিক এলাকা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ভোজবর্মনের বেলাভ তাম্রলিপিতে উত্তর রাঢ়ের সিদ্ধলা গ্রামকে ভট্টভবদেবের জন্মস্থান হিসেবে নির্দেশ করা হয়েছে। বল্লালসেনের নৈহাটী লিপিতেও উত্তর-রাঢ় মন্ডলের স্বল্পদক্ষিণবীথীর অন্তর্গত বল­হিত্তহ নামে একটি গ্রামের উল্লেখ আছে। সিদ্ধলাকে পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান বীরভূম জেলার সিদ্ধলা গ্রামের সঙ্গে এবং নৈহাটী লিপিতে উল্লিখিত বল্লহিত্তহ গ্রামকে বর্ধমান জেলার উত্তর প্রান্তের বালুটিয়ার সাথে শনাক্ত করা হয়েছে। এখানে উল্লেখ্য যে, লক্ষ্মণসেনের শক্তিপুর ভূমিদান-লিপিতে উত্তর রাঢ় কঙ্কগ্রামভুক্তির অন্তর্ভুক্ত বলে উল্লেখ করা হয়েছে; পক্ষান্তরে নৈহাটী লিপিমতে উত্তর রাঢ় ছিল বর্ধমানভুক্তির অংশ।

অজয় নদকে উত্তর ও দক্ষিণ রাঢ়ের মধ্যবর্তী বিভাজন-রেখা বলে সাধারণত ধরে নেওয়া হয়। বিভিন্ন উৎকীর্ণ লিপি থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে অনুমান করা যায় যে, উত্তর রাঢ় বর্তমান মুর্শিদাবাদ জেলার পশ্চিমাংশ, সাঁওতাল পরগনার কিছু অংশসহ সম্পূর্ণ বীরভূম জেলা এবং বর্ধমান জেলার কাটোয়া মহকুমার উত্তরাংশ নিয়ে গঠিত ছিল।

রাঢ়ের (উত্তর ও দক্ষিণ) ভৌগোলিক এলাকায় প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র, বৃহদায়তন গ্রাম এবং গুচ্ছ গ্রাম সমন্বয়ে গঠিত বিশাল জনপদের অস্তিত্ব থেকে সঙ্গত কারণেই এরূপ ধারণা করা যায় যে, মহানদ, বেতুর (হাওড়া জেলায়), সপ্তগ্রাম, গড় মান্দারন (হুগলি জেলায়), ভরতপুর, মঙ্গলকোট (বর্ধমান জেলায়) এবং সম্ভবত দিহার ও পুষ্করণ (বাঁকুড়া জেলায়) দক্ষিণ রাঢ়ের অন্তর্ভুক্ত ছিল। পক্ষান্তরে রাজবাড়িডাঙ্গা ও গীতগ্রাম (মুর্শিদাবাদ জেলায়), পাইকোর, বটিকর, বহিরি, কাগাস, কোটাসুর (বীরভূম জেলায়) এবং বল্লাল রাজার ঢিবি (নদীয়া জেলায়) এলাকাগুলি উত্তর রাঢ়ের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এসব স্থানের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও জনশ্রুতি থেকে সেখানে জনপদের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়। এসব তথ্য মধ্যযুগের প্রথম দিকে একটি স্বতন্ত্র ভূ-রাজনৈতিক এলাকা হিসেবে রাঢ়ের উত্থানকে প্রতিষ্ঠিত করতে সহায়ক হতে পারে। [রূপেন্দ্র কে. চট্টোপাধ্যায়]

মানচিত্রের জন্য দেখুন ইতিহাস (প্রাচীন যুগ)।