তবকাত-ই-নাসিরী


তবকাত-ই-নাসিরী মিনহাজ-ই-সিরাজ জুর্জানি রচিত মধ্যযুগের সাধারণ ইতিহাস গ্রন্থ। এ গ্রন্থে ইসলামের বিভিন্ন নবী-রসুলের ইতিহাস থেকে শুরু করে মিনহাজ তাঁর নিজের সময় পর্যন্ত ঘটনাবলি বর্ণনা করেছেন। বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার ইতিহাস পুনর্গঠনের জন্য এটি অতি গুরুত্বপূর্ণ আকর গ্রন্থ। বাংলা মুলুকে মুসলিম শাসনের প্রথম ৫০ বছরের ইতিহাস একমাত্র এ গ্রন্থেই পাওয়া যায়।

ঘোরের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে অবস্থিত জুর্জান ছিল মিনহাজের পরিবারের আদি নিবাস। তিনি ১১৯৩ হিজরির কাছাকাছি কোনো এক সময়ে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ঘোরী সুলতানদের অধীনে কাজীর পদে নিযুক্ত ছিলেন। ৩৪ বছর বয়সে মিনহাজ ভারতে আসেন। সমসাময়িক মানদন্ডে তিনি উচ্চশিক্ষিত ছিলেন এবং তাঁর কিছু কূটনৈতিক অভিজ্ঞতাও ছিল। তিনি প্রথমে উচ্চ-এ নাসিরুদ্দীন কুবাচার দরবারে যোগদান করেন। কুবাচা তাঁকে কাজী পদে নিযুক্তি দেন। কুবাচার নিকট থেকে শামসুদ্দীন ইলতুৎমিশ মুলতান দখল করে নিলে মিনহাজ দিল্লিতে চলে আসেন। দিল্লিতে মিনহাজ তাঁর মেধা বিকাশের অনুকূল রিবেশ পান এবং একাধারে ইমাম, কাজী, খতিব প্রভৃতি পদে অধিষ্ঠিত হন ও দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি দিল্লি সুলতানদের সাহচর্যে আসেন এবং মাদ্রাসার অধ্যক্ষ, ইমাম, খতিব, কাজী ও সদর-ই-জাহান পদে নিয়োগ লাভ করেন। সুলতান নাসিরুদ্দীন মাহমুদের রাজত্বকালে দিল্লির কাজী থাকা অবস্থায় তিনি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ তবকাত-ই-নাসিরী রচনা করেন এবং ক্ষমতাসীন সুলতানের নামে এটি উৎসর্গীকৃত হয়। তাঁর বয়স যখন ষাটের কোঠার শেষ দিকে, তখন তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, স্বাস্থ্য ভাল থাকলে ইতিহাসের ধারাবিবরণী অব্যাহত রাখবেন। কিন্তু তাঁর এ আশাবাদ বাস্তবায়িত হয় নি। কারণ হিসেবে বলা যায় যে, হয়ত তাঁর মৃত্যু হয়, অথবা গ্রন্থের যে অংশে তিনি ১২৫৯ পরবর্তী ইতিহাস লিপিবদ্ধ করেন তা আমাদের হাতে পৌঁছে নি।

বখতিয়ার খলজীর বিজয় থেকে শুরু করে ১২৫৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাংলার ইতিহাসের একমাত্র নির্ভরযোগ্য উৎস হলো তবকাত--নাসিরী। অন্যান্য সমসাময়িক উৎস হিসেবে কিছু শিলালিপিমুদ্রা পাওয়া যায়। শুধু সমসাময়িক গ্রন্থ বলে নয়, অন্য আরও দুটি কারণে গ্রন্থটি গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, মিনহাজ স্বয়ং বাংলায় আসেন, দুবছরের মতো এখানে অবস্থান করে তাঁর রচনার জন্য তথ্যাদি সংগ্রহ করেন এবং এখানকার রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহেও অংশ নেন। দ্বিতীয়ত, বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার ইতিহাস তিনি তাঁর গ্রন্থের সম্পূর্ণ এক অধ্যায় জুড়ে (তবকাত) বর্ণনা করেন। গ্রন্থের এ বিশেষ অংশে লখনৌতির খলজী মালিকদের বর্ণনা ছাড়াও তিনি সুলতান শামসুদ্দীন ইলতুৎমিশ ও তাঁর বংশধরদের অধীনে বাংলার ইতিহাস আলোচনা করেন। তিনি অন্য অধ্যায়ে শামসি মালিকদের বা সুলতান শামসুদ্দীন ইলতুৎমিশের সভাসদদেরও বিবরণ দেন। তাঁদের মধ্যে অনেকে আবার বাংলার গভর্নর হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন।

১২৪২ খ্রিস্টাব্দে কারায় মালিক ইজ্জউদ্দীন তুগরল তুগান খানের সঙ্গে মিনহাজের দেখা হয়। অতঃপর তিনি বাংলার রাজধানী লখনৌতিতে আসেন। বাংলায় দুবছরের মতো তিনি অবস্থান করেন এবং অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার প্রত্যদর্শী হন। উড়িষ্যার বিরুদ্ধে অভিযানে তিনি তুগান খানের সঙ্গে যোগ দেন, এবং লখনৌতি অধিকার নিয়ে তাঁর পৃষ্ঠপোষক (তুগানখান) ও অযোধ্যার গভর্নর মালিক তামার খান কিরানের মধ্যে যখন বিবাদ বাঁধে তখন তিনি মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নেন। বাংলার রাজধানীতে অবস্থানকালে তিনি বখতিয়ারের বাংলা বিজয় সম্পর্কে তাঁর বেঁচে থাকা সহযোগীদের নিকট থেকে তথ্য সংগ্রহ করেন। দিল্লি সুলতানদের বাংলায় অভিযান কালে আসা দিল্লিবাসীদের নিকট হতে তথ্য সংগ্রহ করেও তিনি ইতিহাস রচনার কাজে লাগান।

বাংলায় মুসলিম সমাজের বিকাশ সম্বন্ধেও ঐতিহাসিক মিনহাজ তাঁর তবকাত-ই-নাসিরীতে ধারণা দেন। তিনি জানান যে বখতিয়ার খলজী রাজধানী লখনৌতিতে মসজিদ, মাদ্রাসাখানকাহ প্রতিষ্ঠা করেন এবং তাঁর পারিষদবর্গও তাঁকে অনুসরণ করেন। সুলতান ইওজ খলজীও মসজিদ এবং মাদ্রাসা নির্মাণ করেন। তদুপরি তিনি ইসলামিক বিষয়াবলির উপর আলোচনার (তাজকির) ব্যবস্থা করতেন। মুসলিম সংস্কৃতির পাদপীঠ মধ্য এশিয়া থেকে আসা মুসলিম তাত্ত্বিকরা এ সকল আলোচনা সভায় ভাষণ দিতেন। এ সকল পন্ডিতের মধ্যে জামালুদ্দীন গজনভীর ছেলে জালালুদ্দীন অন্যতম ছিলেন। তিনি সুলতান গিয়াসউদ্দীন ইওজ খলজীর সভাকক্ষে জ্ঞানগর্ভ ভাষণ দেন।  [আবদুল করিম]

গ্রন্থপঞ্জি  Minhaj-i-Siraj, Tabaqat-i-Nasiri, Biblotheca Indica, Calcutta, 1864; HG Raverty (tr), Tabaqat-i-Nasiri, Calcutta, 1880; KA Nizami, On History and Historians of Medieval India, New Delhi, 1983.