রুকনুদ্দীন বারবক শাহ


রুকনুদ্দীন বারবক শাহ (১৪৫৯-১৪৭৪)  বাংলার পরবর্তী ইলিয়াসশাহী বংশের দ্বিতীয় সুলতান। পিতা নাসিরুদ্দীন মাহমুদ শাহের মৃত্যুর পর ৮৬৪ হিজরিতে (১৪৫৯ খ্রি) তিনি সিংহাসন আরোহণ করেন। সিংহাসন লাভের পূর্বে তিনি পিতার অধীনে সাতগাঁয়ের শাসনকর্তা ছিলেন।

বাইরে থেকে বাংলায় মুসলমানদের আগমন ও বসতি স্থাপনের প্রক্রিয়া বারবক শাহের রাজত্বকালেও অব্যাহত ছিল। এই প্রক্রিয়ার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো একশ বিশজন সঙ্গিসহ শাহ ইসমাইল গাজী (রঃ) র আগমন।  লখনৌতিতে পৌঁছার পর ছুটিয়া পুটিয়া নদীর উপর সাফল্যের সঙ্গে একটি সেতু নির্মাণ করে তিনি সুলতানের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এবং সুলতানের অনুগ্রহ লাভ করেন।

বারবক শাহের রাজত্বকালে মুসলিম সালতানাতের ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটে। রিসালত-উস-শুহাদার বর্ণনানুযায়ী সুলতান শাহ ইসমাইল গাজীকে মান্দারনের বিদ্রোহী রাজা গজপতির বিরুদ্ধে প্রেরণ করেন। যুদ্ধে গজপতি পরাজিত, বন্দি ও নিহত হন। শাহ ইসমাইল গাজীর নেতৃত্বে কামরূপের রাজা কামেশ্বরের বিরুদ্ধেও একটি অভিযান প্রেরিত হয়। যুদ্ধে ইসমাইল গাজী পরাজিত হলেও তাঁর চরিত্র মাধুর্যে মুগ্ধ হয়ে কামরূপরাজ স্বেচ্ছায় ইসমাইল গাজীর নিকট আত্মসমর্পণ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। রাজা কর দিতে সম্মত হন এবং মুসলিম অধিকৃত এলাকা ছেড়ে চলে যান। ফলে বাংলার উত্তর-পূর্ব সীমা করতোয়া নদী বরাবর বিস্তার লাভ করে।

হাজীপুর দুর্গ এবং এর সন্নিহিত এলাকাসমূহ এক সময় সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহের রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। পরবর্তী সময়ে তা জৌনপুরের শর্কি রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। বারবক শাহ আফগান দলপতিদের সহায়তায় ৮৭৫ হিজরিতে (১৪৭০ খ্রি.) ত্রিহুত আক্রমণ করে হাজীপুর দুর্গ ও পার্শ্ববর্তী এলাকার ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। এই নতুন বিজয়ের ফলে উত্তরে বুড়ীগন্দক নদী পর্যন্ত তাঁর কর্তৃত্ব সম্প্রসারিত হয়। সিলেটে প্রাপ্ত হাটখোলা শিলালিপি থেকে জানা যায় যে, সিলেটে বারবক শাহের কর্তৃত্ব অব্যাহত ছিল। মির্জাগঞ্জের শিলালিপি থেকে আরও প্রমাণ পাওয়া যায় যে, বাকেরগঞ্জ অঞ্চলও তাঁর সালতানাতের অন্তর্ভুক্ত ছিল। বারবক শাহের রাজত্বকালের শেষের দিকে চট্টগ্রামে তাঁর কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলার উত্তর, পূর্ব, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব অংশের অধিকাংশ এলাকা ও পশ্চিমবঙ্গ এবং বিহারের অংশে তাঁর রাজ্য বিস্তৃত ছিল।

বারবক শাহ আট হাজার হাবশী ক্রীতদাসকে সেনাবাহিনী ও রাজ্যের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ করেন। বিপুলসংখ্যক হাবশীর এই অনুপ্রবেশ বাংলার ইতিহাসে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে।

সুশাসক ও ন্যায়বিচারের প্রতি অনুরাগী বারবক শাহ ছিলেন উদারমনা ও সদাশয় প্রজাহিতৈষী সুলতান। তাঁর রাজত্বকালে মুসলমানদের পাশাপাশি হিন্দুরাও রাজ্যের সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন। কৃত্তিবাসের বর্ণনায় বারবক শাহের যেসব হিন্দু সভাসদ ও পদস্থ কর্মচারীর উল্লেখ পাওয়া যায় তাঁরা হলেন কেদার রায়, নারায়ণ দাস, জগদানন্দ রায়, সুনন্দ, গন্ধর্ব রায়, তারনি ও মুকুন্দ।

বারবক শাহ মুসলিম ও হিন্দু উভয় ধর্মাবলম্বী পন্ডিত ও কবিদের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে সুখ্যাতি অর্জন করেন। তিনি ছিলেন বিদ্বান এবং নিজেকে ফাজিল ও কামিল বলে দাবি করতেন। বাংলা সাহিত্যের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ ছিল। তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় জৈনুদ্দীন রসুল বিজয় কাব্য এবং ইবরাহিম কাওয়াম ফারুকী ফারহাঙ-ই-ইবরাহিম নামে একটি ফারসি অভিধান রচনা করেন। অভিধানটি শরফনামাহ নামে সমধিক পরিচিত। এই অভিধানে তৎকালীন কয়েকজন পন্ডিত ও কবির নাম পাওয়া যায়। এঁরা হলেন আমীর জয়েনউদ্দীন হারবী, আমীর শিহাবউদ্দীন হাকিম কিরমানী, মনসুর শিরাজী, মালিক ইউসুফ বিন হামিদ, সাইয়িদ জালাল, সাইয়িদ মুহম্মদ রুকন, সাইয়িদ হাসান ও শেখ ওয়াহেদ। যে সকল হিন্দু পন্ডিত বারবক শাহের অনুগ্রহ লাভ করেছিলেন তাঁদের মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য হলেন রায়মুকুট বৃহস্পতি মিশ্র, মালাধর বসুকৃত্তিবাস ওঝা। বারবক শাহ মালাধর বসুকে ‘গুণরাজ খান’ এবং তাঁর পুত্রকে ‘সত্যরাজ খান’ উপাধি দিয়ে সম্মানিত করেন। তিনি জনৈক কুলধরকেও ‘সত্য খান’ ও ‘শুভরাজ খান’ উপাধি দিয়ে সম্মানিত করেন।

বারবক শাহ একজন বিখ্যাত নির্মাতা ছিলেন। তিনি গৌড় ও দেওতলায় অনেক মসজিদ নির্মাণ করেন। ন্যায়পরায়ণ, উদার, বিদ্বান, বিজ্ঞ ও প্রগাঢ় ধার্মিক বারবক শাহ পনেরো বছর রাজত্ব করার পর ৮৭৯ হিজরিতে (১৪৭৪ খ্রি) তাঁর মৃত্যু হয়।  [এ.বি.এম শামসুদ্দীন আহমদ]