গিয়াসউদ্দীন বলবন


গিয়াসউদ্দীন বলবন (১২৬৬-১২৮৭ খ্রি.)  ভারতের মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক যুগের সুলতান। ইলতুৎমিশ (১২৩৬)-এর রাজত্বের দীর্ঘ প্রায় ত্রিশ বছরের অরাজক পরিস্থিতির অবসান ঘটিয়ে গিয়াসউদ্দীন বলবন রাজ্যে শান্তি ও শৃঙ্খলা এবং পূর্ববর্তী সুলতানদের মর্যাদা ফিরিয়ে আনতে সমর্থ হন। তিনি শামসুদ্দীন  ইলতুতমিশ এর গুলামান-ই-চিহিলগানী বা চল্লিশজন ক্রীতদাসের একজন ছিলেন। তুর্কিস্থানের ইলবারী বংশোদ্ভুত বলবন ১২৬৬ খ্রিস্টাব্দে দিল্লীর সিংহাসনে আরোহন করেন। বলবন প্রাথমিক তুর্কি সুলতানী আমলের প্রসিদ্ধ সুলতানদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন।

বাংলা প্রদেশ সর্বদাই দিল্লি সুলতানদের মাথা ব্যাথার কারণ ছিল। কেন্দ্রীয় শক্তির দুর্বলতা এবং বাংলার স্বতন্ত্র ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলার শাসকগণ সুযোগ পেলেই কেন্দ্রীয় শক্তির বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে উঠতেন। যে কারণেই বাংলাকে বলা হত বিদ্রোহীর শহর বা বুলগাকপুর।

সুলতান গিয়াসউদ্দীন বলবন বাংলার রাজনৈতিক কর্মকান্ড ও গভর্নরদের কার্যপ্রণালীর ব্যাপারে সচেতন ছিলেন এবং বাংলার ক্ষমতা করায়ত্ত করে শাসকদের অধীনস্ত করার ব্যাপারে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলেন। যে উদ্দেশ্যেই তিনি বাংলার গভর্নর আমিন খানের অধঃস্তন হিসেবে তাঁর বিশ্বস্ত ও অনুগত তুগান খানকে বাংলায় প্রেরণ করেন। কিন্তু উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে মোঙ্গলদের ব্যাপারে সুলতানের ব্যস্ততা ও পরবর্তী পর্যায়ে তাঁর অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে ১২৭৭ খ্রিস্টাব্দে তুগরল তুগান খানও স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।

ক্ষমতা গ্রহণের পর দিল্লির সুলতান একটি পত্রের মাধ্যমে তুগরল খানকে যথাযথ পন্থায় ক্ষমতাহরণের ক্ষণকে উদযাপন করার আদেশ প্রদান করেন। তুগরল সুলতানের আদেশ অনুসরণ করার পরিবর্তে তাঁর সেনা বাহিনী নিয়ে বিহারের অভিমুখে অগ্রসর হন এবং দিল্লি বাহিনীর মুখোমুখি হওয়ার অপেক্ষা করেন। বলবন একটি শান্তিপূর্ণ সমঝোতার মাধ্যমে তুগরলের সঙ্গে সন্ধি করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। কিন্তু এ চেষ্টা ব্যর্থ হলে ১২৭৭ খ্রিস্টাব্দে বলবন অযোধ্যার শাসক আমিন খানকে তুগরলের বিরুদ্ধে স্বসৈন্যে প্রেরণ করেন। আমিন খান গোগরা নদী তীরে এক যুদ্ধে তুগরল বাহিনীর কাছে পরাজিত হন। ১২৭৮ খ্রিস্টাব্দে মালিক তুরমাতির নেতৃত্বে অপর একদল সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করলেও সেনাপতি যুদ্ধে পরাজিত হন ও অযোধ্যায় পালিয়ে যান। ১২৭৯ খ্রিস্টাব্দে অযোধ্যার আমীর সাহাবুদ্দিন বাহাদুরের নেতৃত্বে তৃতীয় অভিযানটিও তুগরল বাহিনীর নিকট নতিস্বীকার  করে ফিরে যেতে বাধ্য হয়।

বারবার দিল্লি বাহিনীর পরাজয়ে ক্ষুব্ধ ও লজ্জিত বলবন নিজেই তুগরলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ যাত্রা করতে মনস্থির করেন। বলবন ১২৮০ খ্রিস্টাব্দে পুত্র বুগরা খানকে সঙ্গী করে প্রায় দুই লাখ সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী সহযোগে পূর্বের দিকে অগ্রসর হন। নদীবিধৌত বাংলায় যুদ্ধ সামগ্রী বহনের জন্য বলবনের সঙ্গে যুদ্ধের একটি নৌ বহরও ছিল। তুগরল দিল্লি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে বুদ্ধিমানের কাজ হবে না বলে মনে করেন। এমনকি তিনি তাঁর রাজধানী সুরক্ষার জন্য কোন ব্যবস্থাও গ্রহণ করেন নি। তিনি তাঁর সৈন্য বাহিনী, সম্পদ ও সাধারণ জনগণের মধ্যে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সঙ্গে নিয়ে রাজধানী লখনৌতি থেকে পলায়ন করেন। ফলে লখনৌতিতে প্রবেশ করে সুলতান বলবন রাজধানীকে প্রায় জনশূন্য অবস্থায় পান। বাংলার রাজধানীর তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব হিসামুদ্দিনের হাতে ন্যাস্ত করে সুলতান গিয়াসুদ্দিন বলবন পলাতক তুগান খানের সন্ধানে অগ্রসর হন। তুগরল-এর বাহিনীকে দক্ষিণ দিকে অগ্রসরে বাধা প্রদান করার উদ্দেশ্যে সুলতান সোনারগাঁও-এর  দনৌজ রায়ের সঙ্গে এক চুক্তিতে আবদ্ধ হন। এ সংবাদে তুগরল তড়িঘড়ি করে তাঁর নারকিল্লা দুর্গের অবস্থান তুলে নিয়ে জাজনগরের দিকে অগ্রসর হন।

স্থানীয় জনগণের নিকট তুগরল এতই জনপ্রিয় ছিলেন যে, বলবন তাঁর অবস্থান সম্পর্কে কোনো তথ্যই জনগণের নিকট থেকে সংগ্রহ করতে পারেন নি। ফলে বলবন মূল বাহিনী থেকে পৃথক করে মালিক বেকতুরসের নেতৃত্বে অগ্রগামী সৈন্য দলকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভাগে বিভক্ত করে প্রেরণ করেন। এমন এক ক্ষুদ্র বাহিনীর প্রধান শের আন্দাজ তুগরলের সন্ধান পান ও তাঁর শিবিরে হানা দিয়ে তুগরলকে হত্যা করেন।

বলবন লখনৌতিতে প্রবেশ করে তুগরলের আত্মীয় ও অনুসারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করেন। তিনি তাদেরকে খোলা বাজারে জনসম্মুখে ফাঁসির আদেশ দেন এবং বাংলা প্রদেশের উপর দিল্লির শাসনক্ষমতা স্থায়ী করণের লক্ষ্যে সেখানে কিছুদিন অবস্থান করেন। তিনি বাংলা প্রদেশকে এতই গুরুত্ব দেন যে, তিনি তাঁর একমাত্র জীবিত সন্তান বুগরা খানকে প্রশাসনের প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখার নির্দেশ দিয়ে দায়িত্ব অর্পণ করেন। ১২৮৭ খ্রিস্টাব্দে গিয়াসউদ্দীন বলবনের মৃত্যু হয়। [এ.বি.এম. শামসুদ্দীন আহমদ]