প্রশাসন


প্রশাসন বাংলায় কখনো কোন বিশেষ প্রশাসনিক ব্যবস্থা বলবৎ ছিল না। প্রত্যেক নতুন বিজয়ের পরপরই নতুন ধরনের শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হতো, অন্তত উর্ধতন পর্যায়ে। হিন্দু-বৌদ্ধ যুগে প্রশাসনিক ব্যবস্থা বিকাশ লাভ করে। মুসলিম শাসন আমলে  প্রশাসনিক গঠন প্রকৃতিতে বিপুল পরিবর্তন আসে। তবে প্রশাসনিক ব্যবস্থার কিছু মূল বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ণ থাকে। উপনিবেশিক শাসকদের সময়ে প্রশাসনিক ব্যবস্থা আবার নতুন মোড় নেয়। সনাতন ব্যবস্থায় সংযুক্ত হয় ব্রিটিশ ধারণা ও প্রতিষ্ঠান।

প্রাচীনযুগ  প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে মুসলমানদের আগমন পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে বাংলার প্রশাসনিক ইতিহাস রচনার পথে প্রধান অন্তরায় হচ্ছে পর্যাপ্ত তথ্যের অভাব। এক্ষেত্রে কেবল সমসাময়িক লিপিমালায় প্রাপ্ত তথ্যই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎস। কিন্তু একমাত্র লিপিমালার উপর ভিত্তি করে শাসন ব্যবস্থা সম্পর্কে পরিপূর্ণ ধারণা লাভ করা সম্ভব নয়। শিলালিপি থেকে প্রাপ্ত তথ্যের সীমাবদ্ধতা প্রাচীন বাংলার শাসন ব্যবস্থার বিবরণকে অনেকাংশে অসম্পূর্ণ করে রেখেছে। সমসাময়িক বাংলার প্রশাসনিক রূপরেখার গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলি পুনর্গঠনের যে কোন প্রয়াসে এই সীমাবদ্ধতার কথা মনে রাখা দরকার।

মৌর্য-পূর্ববর্তী যুগে বাংলার রাজ্যশাসন পদ্ধতি সম্বন্ধে কোন সঠিক বিবরণ পাওয়া যায় না। পরবর্তী সময়ের সাহিত্যে পাওয়া কিছু গল্প ও পৌরাণিক কাহিনী এবং ক্লাসিক্যাল বিবরণ থেকে জানা যায় যে, তৎকালে সম্ভবত বাংলায় প্রচলিত ছিল রাজতন্ত্র। গ্রিক ও লাতিন বিবরণে খ্রি.পূ চতুর্থ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বাংলায় সামরিক দিক থেকে শক্তিশালী গঙ্গারিডাই নামে গাঙ্গেয় অঞ্চলের এক শক্তিশালী জাতি বা রাষ্ট্রের অস্তিত্বের উল্লেখ পাওয়া যায়। সুশৃঙ্খল ও উন্নত সামরিক শক্তিসম্পন্ন ‘গঙ্গারিডাই’ রাজ্যের বিবরণ খুবই উন্নত রাষ্ট্র সংগঠনের ইঙ্গিত বহন করে। ‘গঙ্গারিডাই’ রাজ্য ছাড়াও সমসাময়িক বাংলায় আরও কতগুলি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্য ছিল বলে মনে করা হয়। এসকল রাজ্য কেবল তাদের স্ব স্ব এলাকায় শাসনকর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল। এদের সঙ্গে গঙ্গারিডাই রাজ্যের সম্পর্ক কেমন ছিল তা নির্ধারণ করা কঠিন। মহাভারতে উল্লেখ আছে যে, ওই সকল রাষ্ট্রের মধ্যে সাধারণ রাষ্ট্রীয় সচেতনতার অভাব ছিল না। কখনও কখনও অভিন্ন শত্রুকে মোকাবিলা করার জন্য ছোট ছোট রাজ্য একত্র হয়ে শক্তিশালী রাজ্যসংঘ প্রতিষ্ঠা করত। তারা বিদেশি শাসকদের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কও বজায় রাখত।

বাংলা সম্ভবত শক্তিশালী মৌর্য সাম্রাজ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল, যা সুদৃঢ় সুনিয়ন্ত্রিত ও জ্ঞানদীপ্ত শাসনব্যবস্থা হিসেবে চিহ্নিত।   সাধারণভাবে মৌর্য শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকলেও বাংলায় মৌর্যদের শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য নেই। মৌর্যবংশের পতনের পর বাংলায় প্রায় পাঁচশত বছরব্যাপী বিরাজমান স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহের রাজ্যশাসন পদ্ধতি সম্বন্ধেও কোন সঠিক বিবরণ পাওয়া যায় না। তবুও এটা ধরে নেয়া যায় যে, মৌর্যদের গড়ে তোলা প্রাদেশিক শাসনকাঠামো বাংলায় শক্ত ভিত রচনা করেছিল।

মহাস্থানে প্রাপ্ত এক প্রস্তরলিপি (খ্রি.পূ ৩য় শতকের) থেকে জানা যায় যে, পুন্ড্রনগর ছিল মৌর্যযুগের ‘মহামাত্র’ নামক রাজকর্মচারীর শাসনকেন্দ্র। বাংলা মৌর্য সাম্রাজ্যের অধীন একটি প্রদেশ হিসেবে শাসিত হতো কিনা বা মৌর্য সম্রাটের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণাধীনে ছিল কিনা তার উল্লেখ এ প্রস্তর লিপিতে নেই। তবে এই লিপির বিষয়বস্ত্ত একটি সুসংগঠিত ও জনকল্যাণমুখী শাসনব্যবস্থার ইঙ্গিত দেয়।

খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকের শুরুতে মৌর্যবংশের পতনের পর রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। পরবর্তী প্রায় পাঁচশত বছরব্যাপী উত্তর ভারতে কোন শক্তিশালী সার্বভৌম শাসকের পরিচয় পাওয়া যায় না। মৌর্য-পরবর্তী যুগের শিলালিপিসমূহে কিছুসংখ্যক স্থানীয় রাজবংশ বা শাসকের উল্লেখ পাওয়া যায়। এদের রাজ্যসীমার মধ্যে বাংলা অন্তর্ভুক্ত ছিল। বস্ত্তত খ্রিস্টীয় চার শতকের শুরুতে গুপ্তশাসন প্রতিষ্ঠিত হলে এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটে এবং সূচিত হয় শান্তি ও সমৃদ্ধির যুগ। যে সকল স্থানীয় রাজবংশ বা শাসক বাংলার অন্তর্ভুক্ত এলাকায় শাসন করতেন তাদের মধ্যে প্রসিদ্ধ ছিলেন সুসুনিয়া লিপির (চার শতকের শুরুতে) বর্মণ এবং সমতটের খড়গবংশীয় শাসকগণ (সাত শতক)। এ সময় বঙ্গ অঞ্চলের স্থানীয় শাসক ধর্মাদিত্য, গোপচন্দ্র ও সমাচারদেব এবং কর্ণসুবর্ণের শাসক জয়নাগ ও ত্রিপুরার বৈন্যগুপ্তের উল্লেখ পাওয়া যায়।

খ্রিস্টীয় চার শতকের শুরুতে শাসনব্যবস্থায় রাজা সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী হন এবং তার উপাধি হয় ‘মহারাজা’। পুষ্করণের (বাঁকুড়া জেলার পোখর্ণা) অধিপতি সিংহবর্মা ও তাঁর পুত্র চন্দ্রবর্মা ‘মহারাজা’ উপাধি গ্রহণ করেন। সমুদ্রগুপ্তের এলাহাবাদ প্রশস্তি থেকে জানা যায় যে, চন্দ্রবর্মা ছিলেন ঐ সময় আর্যাবর্তের শক্তিশালী শাসকদের অন্যতম। দামোদরপুর তাম্রশাসনসমূহ (৪৪৪ খ্রি, ৪৪৮ খ্রি, ৪৮২ খ্রি এবং ৪৭৬-৯৫ খ্রি) থেকে জানা যায়, গুপ্ত সম্রাটগণ ‘পরমদৈবত পরমভট্টারক-মহারাজাধিরাজ’ উপাধি গ্রহণ করতেন। বঙ্গদেশ গুপ্ত সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত গণ্য হলেও সমগ্র বঙ্গ গুপ্ত সম্রাটদের প্রত্যক্ষ শাসনাধীন ছিল না। বাংলার স্থানীয় শাসকদের মধ্যে ধর্মাদিত্য, গোপচন্দ্র ও সমাচারদেব (খ্রিস্টীয় ছয় শতক) এবং জয়নাগ (খ্রিস্টীয় ছয় শতক) ‘মহারাজাধিরাজ’ উপাধি ধারণ করেছিলেন। শশাঙ্ক একই উপাধি গ্রহণ করেন। বাংলায় অনেক সামন্ত রাজাও ‘মহারাজা’ উপাধি গ্রহণ করতেন। গুণাইঘর তাম্রশাসনে (১৮৮ গুপ্তাব্দ) বর্ণিত আছে যে, মহারাজা বৈন্যগুপ্তের অধীনে মহারাজা রুদ্রদত্ত ও মহারাজা-মহাসামন্ত বিজয়সেন নামে দুজন সামন্ত রাজা ছিলেন যারা অনুরূপ উপাধি গ্রহণ করেন। কিছুসংখ্যক সামন্ত শাসকদের ‘মহাসামন্ত’ ও ‘মহারাজা’ উপাধি গ্রহণ থেকে স্পষ্টতই বোঝা যায় যে, রাজ্যের অংশবিশেষ তাদের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে ছিল। গুণাইঘর তাম্রশাসন থেকে আরও প্রমাণিত হয় যে, বিজয়সেন নামক সামন্ত রাজা ‘দূতক’, ‘মহাপ্রতীহার’, ‘মহাপিলুপতি’, ‘পঞ্চধিকরপরিক’, ‘পট্যুপরিক’ ও ‘পুরপালোপরিক’ উপাধি গ্রহণ করেন। একজন সামন্ত রাজা কর্তৃক উপরিউক্ত উপাধিসমূহ ধারণ নিঃসন্দেহে রাষ্ট্রীয় কর্মকান্ডে তার গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানের কথা প্রমাণ করে। তাই এরূপ মনে করা অযৌক্তিক হবে না যে, কোন একটি স্বাধীন রাজ্যের অংশবিশেষের প্রশাসনে সামন্ত রাজারা এক ধরনের স্বাধীনতা ভোগ করতেন। উদাহরণ হিসেবে মল্লসারুল  তাম্রশাসনে উল্লিখিত মহারাজ বিজয়সেন কর্তৃক নিজস্ব সিলমোহর ব্যবহার এবং রাজকর্মচারীদের প্রতি প্রশাসনিক আদেশ জারি করার ব্যাপারটি উল্লেখ করা যেতে পারে।

গুপ্ত সম্রাটগণ কর্তৃক শাসিত বঙ্গরাজ্য অনেকগুলি ধারাবাহিক প্রশাসনিক ভাগে বিভক্ত ছিল, যেমন ‘ভুক্তি’, ‘বিষয়’, ‘মন্ডল’, ‘বীথি’ ও সর্বনিম্নে ‘গ্রাম’। এ সকল প্রশাসনিক ভাগের প্রত্যেকটির একটি করে প্রধান কেন্দ্র বা ‘অধিকরণ’ (অধিষ্ঠান) ছিল। ‘ভুক্তি’ (আধুনিক বিভাগ-এর অনুরূপ) ছিল সর্ববৃহৎ প্রশাসনিক বিভাগ এবং সম্রাটের একজন প্রতিনিধি তা শাসন করতেন। সমসাময়িক লিপিমালায় পুন্ড্রবর্ধন (সমগ্র উত্তরবঙ্গ) ও বর্ধমান (প্রাচীন রাঢ়ের দক্ষিণাংশ) নামে দুটি ভুক্তির নাম জানা যায়। গুপ্তযুগের শিলালিপিতে নামবিহীন এক ভুক্তিরও উল্লেখ আছে। এর সদর দফতর ছিল নব্যবকাশিকা এবং সুবর্ণবীথি এর অন্তর্ভুক্ত ছিল। সম্রাট কর্তৃক সরাসরি নিয়োগকৃত একজন শাসনকর্তা ভুক্তির শাসনকার্য পরিচালনা করতেন। গুপ্ত সম্রাটদের দামোদরপুর তাম্রশাসনে পুন্ড্রবর্ধনভুক্তির শাসনকর্তাকে সম্রাটের সঙ্গে সম্পর্ক নির্দেশ করে ‘তৎপাদপরিগৃহীত’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথম কুমারগুপ্তের সময় ভুক্তির প্রশাসককে ‘উপরিক’ এবং বুধগুপ্তের সময় ‘মহারাজ উপরিক’ বলা হতো। দামোদরপুর তাম্রশাসনে (৫৪৩ খ্রি) উল্লিখিত পুন্ড্রবর্ধনভুক্তির শাসনকর্তার ‘উপরিক মহারাজ মহারাজপুত্র-দেব-ভট্টারক’ উপাধি থেকে মনে হয় যে, কোন কোন সময় রাজকুমার বা রাজপরিবারের সদস্যদের পুন্ড্রবর্ধনভুক্তির প্রশাসক নিয়োগ করা হতো। তবে প্রাদেশিক শাসনকর্তা কি পদ্ধতিতে শাসনকার্য পরিচালনা করতেন সে সম্পর্কে খুব কম তথ্যই পাওয়া যায়। ১৫৯ গুপ্তাব্দের (৪৭৯ খ্রি) পাহাড়পুর তাম্রশাসন থেকে জানা যায় যে, পুন্ড্রবর্ধন শহরে পুন্ড্রবর্ধনভুক্তির ‘অধিকরণ’ (সদর দফতর) অবস্থিত ছিল। সাধারণত উল্লেখ করা যায় যে, প্রাদেশিক শাসনকর্তা তার কার্যাবলির জন্য সরাসরি সম্রাটের কাছে দায়ী থাকতেন, কারণ তার নিয়োগ সম্রাটের ইচ্ছা বা মঞ্জুরীর উপর নির্ভর করত।

‘ভুক্তি’র পরবর্তী প্রশাসনিক বিভাগের নাম ‘বিষয়’। ‘বিষয়’ দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রশাসনিক ইউনিট এবং শাসনক্ষেত্রে এর ভূমিকা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিষয়গুলি ছিল আধুনিক জেলার অনুরূপ। বিষয়ের শাসনকর্তাকে প্রথম গুপ্তযুগে বলা হতো ‘কুমারমাত্য’ এবং পরবর্তী গুপ্তযুগে ‘’আযুক্তক’। উত্তরবঙ্গে পরবর্তী গুপ্তদের শাসনকালে বিষয়ের শাসনকর্তাকে ‘বিষয়পতি’ বলা হতো। সাধারণত ‘ভুক্তি’র শাসনকর্তাই তার অধীন বিষয় বা জেলার প্রশাসক নিয়োগ করতেন। বৈগ্রাম তাম্রশাসনে জেলার শাসনকর্তা সরাসরি ভট্টারকের কাছে দায়ী ছিলেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ থেকে মনে হয় যে, কোন কোন ক্ষেত্রে সম্রাট স্বয়ং উল্লিখিত পদে নিয়োগ দান করতেন। খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতকে দক্ষিণ ও পূর্ব বঙ্গে স্বাধীন রাজাদের শাসনামলে ‘ভুক্তি’র শাসনকর্তা সাধারণত বিষয়পতিকে নিয়োগ দান করতেন।

সমসাময়িক কালের শিলালিপি থেকে মাত্র কয়েকটি ‘বিষয়’-এর নাম জানা যায়। দামোদরপুর তাম্রশাসনসমূহ (নং ১, ২, ৪ ও ৫) থেকে পুন্ড্রবর্ধনভুক্তির অধীন কোটিবর্ষ বিষয়ের নাম পাওয়া যায়। প্রথম কুমারগুপ্তের ধনাইদহ তাম্রশাসনে (৪৩২-৩৩ খ্রি) ঐ একই ভুক্তির অধীন খাটাপাড়া বা খাদাপাড়া নামে বিষয়ের উল্লেখ আছে। বৈগ্রাম তাম্রশাসনে একটি ‘বিষয়’-এর উল্লেখ পাওয়া যায় যার সদর দফতর ছিল পঞ্চনগরী। এটাই স্বাভাবিক যে, এই বিষয়েরও নাম ছিল পঞ্চনগরী। এ ‘বিষয়’টি পুন্ড্রবর্ধনভুক্তির অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে প্রতীয়মান হয়। ধর্মাদিত্য ও গোপচন্দ্রের ফরিদপুর তাম্রশাসনে নব্যবকাশিকার প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণাধীন বরাকমন্ডল নামে একটি বিষয়ের উল্লেখ পাওয়া যায়। এছাড়াও কর্ণসুবর্ণ এর রাজা জয়নাগের বপ্পাঘোষবাট তাম্রলিপিতে ঔদম্বরিক-বিষয়ের নাম পাওয়া যায়।

দামোদরপুর তাম্রশাসনের (নং ১-৫) বিবরণ থেকে এটা প্রায় স্পষ্ট যে, জেলা প্রশাসকের সদর দফতরে (অধিষ্ঠান-অধিকরণম) তার শাসনকেন্দ্র (অধিকরণ) ও তার অধীন কর্মচারীরা ছিল। এসকল কর্মচারীর মধ্যে দলিল-রক্ষক (পুস্তপাল) ভূমি দান-বিক্রয় সংক্রান্ত কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন। শিলালিপিই হচ্ছে ভূমি দান বা বিক্রয় সংক্রান্ত তথ্যের এবং একাজে অধিকরণের ভূমিকা সর্ম্পকে জানার একমাত্র উৎস। সম্ভবত বিষয়াধিকরণের কার্যক্রম কেবল ভূমি হস্তান্তর সংক্রান্ত কাজে সীমাবদ্ধ ছিল না। ভূমি দান-বিক্রয় সংক্রান্ত কার্যাবলি ছাড়াও বিষয়াধিকরণ আরও অনেক প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করত। দুর্ভাগ্যবশত তথ্যের অপ্রতুলতার কারণে তাদের অপরাপর সম্ভাব্য কার্যক্রম নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। দামোদরপুর তাম্রশাসনে (২, ৪ ও ৫নং) কোটিবর্ষ-বিষয়ের বিষয়পতির সহায়করূপে এক উপদেষ্টামন্ডলীর কথা উল্লেখ আছে। সেকালের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শ্রেণির প্রতিনিধিত্বকারী চারজন সদস্য ও স্বয়ং বিষয়পতি সমন্বয়ে এ উপদেষ্টামন্ডলী গঠিত হতো। এ উপদেষ্টা-সভার সদস্যরা ছিলেন ‘নগরশ্রেষ্ঠী’, ‘প্রথম-সার্থবাহ’, ‘প্রথম-কুলিক’, এবং ‘প্রথম-কায়স্থ’। ‘নগরশ্রেষ্ঠী’ ছিলেন শহরের বিভিন্ন গিল্ড বা কর্পোরেশনের অথবা ধনী ব্যাঙ্কারদের সংস্থার সভাপতি। ‘প্রথম-সার্থবাহ’ ছিলেন বণিক সম্প্রদায় বা বিভিন্ন ব্যবসায়িক গিল্ডের প্রতিনিধিত্বকারী প্রধান ব্যবসায়ী। ‘প্রথম-কুলিক’ ছিলেন বিভিন্ন কারিগর শ্রেণির প্রতিনিধিত্বকারী প্রধান কারিগর এবং ‘প্রথম কায়স্থ’ ছিলেন কায়স্থ শ্রেণির প্রতিনিধিত্বকারী প্রধান করণিক অথবা বর্তমান কালের অফিস সচিব ধরনের রাষ্ট্রীয় কর্মচারী। তবে অধিকরণের প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন বিষয়পতি। উপদেষ্টামন্ডলীর সদস্য নগরশ্রেষ্ঠী, প্রথম-সার্থবাহ ও প্রথম-কুলিক সরকার কর্তৃক মনোনীত হতেন নাকি নিজ নিজ সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের দ্বারা নির্বাচিত হতেন তা নির্ধারণ করা কঠিন। তবে একথা সুস্পষ্টভাবে বলা যায় যে, তারা ছিলেন জেলার প্রধান শহরের বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের প্রতিনিধি।

ধর্মাদিত্যের ফরিদপুর তাম্রশাসনে ‘বিষয়পতি’র অধিকরণ ছাড়াও ’বিষয় মহত্তর’ (জেলার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি) এবং অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ (পুরোগঃ প্রকৃত্যশ্চ) সমন্বয়ে গঠিত এক পরিষদের উল্লেখ পাওয়া যায়। রমেশচন্দ্র মজুমদার মনে করেন যে, অতিরিক্ত সদস্যদের নাম ও পদবির পরে ‘পুরোগঃ’ শব্দের ব্যবহার থেকে বোঝা যায় যে, সম্ভবত ‘তারা ছিলেন অধিকরণের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং সাধারণ উপদেষ্টাদের চেয়েও অনেক বেশি অধিকার ও সুবিধা তারা ভোগ করতেন।’ গুপ্ত তাম্রশাসনে বিষয়াধিকরণে কর্মরত দলিলপত্রাদি সংরক্ষণের দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মচারীদের উল্লেখ পাওয়া যায়। জেলার প্রশাসনে বিভিন্ন উপদেষ্টামন্ডলীর বর্ণনা নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করে যে, প্রশাসনে স্থানীয় জনগণের সংযোগ ছিল এবং স্থানীয় প্রশাসনে গণতান্ত্রিক রীতিনীতি অনুসরণ করা হতো।

‘বিষয়’ বা জেলার পরবর্তী প্রশাসনিক বিভাগ ‘বীথি’র শাসনব্যবস্থা প্রাচীন বাংলার প্রশাসনের অপর এক গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।‘বীথি’ শব্দটির প্রকৃত অর্থ অস্পষ্ট। কখনও কখনও বীথি ‘ভুক্তি’ বা ‘মন্ডল’-এর উপ-বিভাগ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। কিছুসংখ্যক শিলালিপিতে এ প্রশাসনিক ইউনিটের উল্লেখ আছে। সমাচারদেবের গুগ্রাহটি তাম্রশাসনে নব্যবকাশিকায় অবস্থিত সুবর্ণবীথিকে ‘স্বর্ণবাজার’ বলা হয়েছে। প্রশাসনিক বিভাগ হিসেবে ‘বীথি’র উল্লেখ মল্লসারুল তাম্রশাসন থেকেও জানা যায়। এই একই লিপিতে কোন ‘বিষয়’-এর উল্লেখ ছাড়াই বর্ধমানভুক্তির অন্তর্ভুক্ত বক্কটক্কবীথির নাম পাওয়া যায়। ১৫৯ গুপ্তাব্দের পাহাড়পুর তাম্রশাসনে বীথির অপর একটি উল্লেখ রয়েছে। সেখানে দক্ষিণাংশক-বীথিকে পুন্ড্রবর্ধনভুক্তির অন্তর্ভুুক্ত বলা হয়েছে। পাহাড়পুর তাম্রশাসনে বীথ্যধিকরণের অবস্থান সম্পর্কে সুস্পষ্ট উল্লেখ থাকলেও কিভাবে এ অধিকরণ গঠিত হতো তা সঠিকভাবে বলা হয় নি। ভূমি দান-বিক্রয় সংক্রান্ত ব্যাপারে বীথ্যধিকরণের দায়িত্ব ছিল বিষয়াধিকরণের অনুরূপ। মল্লসারুল তাম্রশাসনের সাক্ষ্যে জানা যায় যে, বীথির অধিকরণকে সহায়তা দানের জন্য বিশিষ্ট লোকদের সমন্বয়ে একটি পরিষদ থাকত। বীথির অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন এলাকার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিগণের মধ্যে ‘মহত্তর’, ‘অগ্রহঋণ,’ ‘খড়গী’ (অসি যোদ্ধা) এবং অন্ততপক্ষে একজন ‘বহনায়ক’ (যানবাহন তত্ত্বাবধায়ক) মিলে এ পরিষদ গঠিত হতো। এরূপ ধারণা করা অযৌক্তিক হবে না যে, গুপ্ত শাসনামলেও বাংলায় এ ধরনের অধিকরণ ছিল।

প্রাচীন বাংলার সামগ্রিক প্রশাসন ব্যবস্থায় গ্রাম তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। গ্রামই ছিল তখন সবচাইতে ছোট প্রশাসনিক ইউনিট। সমসাময়িক শিলালিপিতে গ্রামের স্বাভাবিক নাম উল্লেখ করা হয়েছে। আবার কোন কোন লিপিতে গ্রামের নামের শেষে ‘অগ্রহার’ যুক্ত করে উল্লেখ করা হয়েছে। বৈন্যগুপ্তের গুনাইঘর তাম্রশাসনে (৫০৭ খ্রি) গুনেকগ্রহার গ্রাম এবং ১৬৯ গুপ্তব্দের (৪৮৮ খ্রি) নন্দপুর লিপিতে ‘অম্বিল-গ্রাম-অগ্রহার’-এর উল্লেখ পাওয়া যায়। মনে হয়, প্রশাসনিক দিক থেকে ‘অগ্রহার’কে প্রায়শ গ্রাম অপেক্ষা বেশি গুরুত্বপূর্ণ ও উন্নততর বলে বিবেচনা করা হতো। প্রাচীনকালে কয়েকটি গ্রামের সমন্বয়ে প্রশাসনিক ইউনিট গঠনের ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল বলে মনে হয়। বুধগুপ্তের দামোদরপুর তাম্রশাসনে (৪৮২ খ্রি) ‘পলাশ-বৃন্দকে’র নাম পাওয়া যায় যার আয়তন ছিল গ্রামের স্বাভাবিক আয়তনের চেয়ে বড়। ১২৮ গুপ্তাব্দের বৈগ্রাম তাম্রশাসনে ছোট ছোট গ্রাম মিলে গঠিত সম্ভবত গুচ্ছগ্রামের একটি উদাহরণ রয়েছে। তাম্রশাসনে একে বৈ-গ্রাম বলা হয়েছে এবং ত্রিবৃতা ও শ্রীগোহালি নামে দুটি পৃথক এলাকা এর অন্তর্ভুক্ত দেখানো হয়েছে।

গ্রামের প্রধান ব্যক্তিরাই গ্রাম-প্রশাসন ও স্থানীয় ব্যাপারে জড়িত থাকতেন। তারা সম্ভবত শাসনকার্যে সরকারি কর্মচারীদের সাহায্য করতেন। ‘বিষয়’ ও ‘বীথি’ অধিকরণের মতো গ্রাম-শাসনযন্ত্রেও মহত্তর ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ভূমিকা লক্ষ করা যায়। প্রতিটি গ্রামেই যে প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে গ্রামিক ছিলেন তা পুরোপুরি প্রমাণ করা যায় না। আবার যে সকল গ্রামের শাসনযন্ত্রে ‘গ্রামিক’ জড়িত ছিলেন না ঐ সকল গ্রামের শাসনযন্ত্রের প্রধান কে ছিলেন লিপিমালা থেকে তাও নির্ণয় করা যায় না। পাহাড়পুর লিপি সাক্ষ্যে জানা যায় যে, ‘ব্রাহ্মণ’, ‘মহত্তর’, ‘কুটুম্বি’ ছিলেন গ্রামের প্রশাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বেসরকারি ব্যক্তি। বুধগুপ্তের দামোদরপুর তাম্রশাসনে (৪৭৬-৯৫ খ্রি) উল্লিখিত হয়েছে যে, ‘চন্ডগ্রামে’র শাসনে ‘ব্রাহ্মণ’ ও ‘কুটুম্ব’দের নেতৃত্বে গণ্যমান্য বেসরকারি ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। এ ধরনের ‘গ্রাম’ প্রশাসনের প্রকৃতি অন্যান্য গ্রামের শাসনব্যবস্থার তুলনায় আলাদা ছিল। শেষোক্ত গ্রামের শাসনযন্ত্রে ‘ব্রাহ্মণ’, ‘মহত্তর’ ও ‘কুটুম্ব’ প্রভৃতির পাশাপাশি ‘গ্রামিক’ ও ‘অষ্টকুলধিকরণে’র ভূমিকার উল্লেখ পাওয়া যায়। এ ধরনের গ্রাম-প্রশাসনে অধিকরণেরও অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়। এ অধিকরণ সম্ভবত আটজন প্রধান ব্যক্তি ও গ্রামিকের সমন্বয়ে গঠিত ছিল। এ সকল গ্রামে ভূমি দান-বিক্রয় সংক্রান্ত দলিলপত্রাদি সংরক্ষণের একটি কার্যালয় থাকত। খ্রিস্টীয় ছয় শতকে দক্ষিণ ও পূর্ব বাংলার স্বাধীন রাজাদের সময়ে গ্রামের অধিকরণ সম্পর্কে কোন তথ্য পাওয়া যায় না। সম্ভবত গ্রাম-অধিকরণের যথার্থ গঠন বিভিন্ন সময় ভিন্ন ভিন্ন ধরনের ছিল।

বাংলার অর্থনীতিতে ভূমি এক বিশিষ্ট ভূমিকা পালন করে। ভূমিই ছিল বাংলার ধনসম্পদের প্রধান উৎস এবং মানুষের জীবনের প্রধান অবলম্বন। গুপ্ত ও গুপ্ত-পরবর্তী যুগের তাম্রশাসন থেকে জানা যায় যে, প্রাচীন বাংলার ভূমির বিভিন্ন অংশের পরিমাপ, সীমানা নির্দেশ, ভূমির স্বত্বাধিকারসহ ভূমি দান-বিক্রয় প্রভৃতি ব্যাপারে দলিলপত্র স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের দায়িত্ব পালনের জন্য ‘পুস্তপাল’ পদধারী এক শ্রেণির কর্মচারীর অস্তিত্ব ছিল। কিন্তু এ ধরনের দলিলপত্রের কোন অংশও আজ পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয় নি। এরূপ কোন রেকর্ড না পাওয়ায় প্রাচীনকালে ভূমিব্যবস্থা সম্পর্কে সঠিক বিবরণের প্রধান উৎসই হচ্ছে সমসাময়িক কালের তাম্রশাসন। এসকল লিপিমালায় ভূমির মালিকানা, ভূমি দান-বিক্রয় সংক্রান্ত এবং ভূমিস্বত্ব নির্ধারণ সম্পর্কিত তথ্য জানা যায়। এখানে উল্লেখ্য যে, প্রাচীন বাংলার সকল অঞ্চলে ভূমি ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য একই রকম ছিল না। স্থানীয় অবস্থা, রীতিনীতি ও ঐতিহ্য বিভিন্ন এলাকায় ভূমি ব্যবস্থায় বিভিন্ন মান নির্ধারণে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে। সেকালে ভূমির মালিকানা সম্পর্কিত বিষয়টি নির্ধারণ করা ছিল খুবই কঠিন। এক্ষেত্রে পন্ডিতদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। ইউ.এন ঘোষাল মনে করেন যে, প্রাচীন বাংলায় রাজাই ছিলেন ভূমির একক স্বত্বাধিকারী। অন্যদিকে আর.জি বসাকের মতে, সমগ্র গ্রামবাসী যৌথভাবে বা কৃষকরা এককভাবে ভূমির প্রকৃত মালিক ছিল। বাংলার প্রথম দিকের ভূমি লেনদেনের পাথুরে দলিল থেকে জমি বিক্রয় বা ধর্মীয় উদ্দেশ্যে পতিত জমি দান করার অসংখ্য উল্লেখ পাওয়া যায়। ভূমি দান বা বিক্রয়কালে ভূমির সীমানা অন্য ভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন করে তা সুস্পষ্টভাবে নির্দিষ্ট করা হতো। তাম্রশাসনে এ সীমানা নির্ধারণের বিস্তৃত বর্ণনা পাওয়া যায়। সমসাময়িক দলিলে দেখা যায় যে, ভূমি হস্তান্তর সাধারণত নিম্নবর্ণিত শর্তগুলির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতো, যেমন ‘নীবিধর্ম’ (দামোদরপুর তাম্রশাসন ১নং), ‘অক্ষয়নীবিধর্ম’ (বৈগ্রাম তাম্রশাসন), অথবা ‘অপ্রদধর্ম’ (দামোদরপুর তাম্রশাসন ৫নং)। নীবিধর্মের মূল বৈশিষ্ট্য হলো যে, এটি একটি অ-হস্তান্তরযোগ্য স্থায়ী দান বা বিক্রয়। এ আইনের মাধ্যমে যে ভূমি দান-বিক্রয় করা হতো তা ছিল হস্তান্তরের অযোগ্য এবং ভূমি গ্রহীতা তা চিরকাল ভোগ দখল করতে পারতেন (পুত্র পৌত্র-ক্রমেণ ও চন্দ্র-তারকা-স্থিতিকাল সম্ভোগ্যম)। এখানে উল্লেখ করা যায় যে, জমি ক্রয়কালে ‘নীবিধর্ম’ বাতিল করে এ ধরনের সীমাবদ্ধতা পরিহার করা যেত অর্থাৎ হস্তান্তরের ক্ষমতা প্রদান করা যেত। ‘অক্ষয় নীবিধর্ম’ কথার দ্বারা জমি হস্তান্তরের উপর স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা বোঝাত বলে মনে হয়। ভাস্করবর্মার নিধনপুর তাম্রশাসনে ষষ্ঠ ও সপ্তম শতাব্দীতে বাংলায় ধর্মীয় উদ্দেশ্যে নিষ্কর ভূমিদানের উল্লেখ পাওয়া যায়। পাল, সেন ও অন্যান্য রাজবংশের শিলালিপিতে ধর্মীয় উদ্দেশ্যে ভূমি দানের কিছুটা ভিন্নধর্মী উদাহরণ পাওয়া যায়। এ যুগে রাজা কর্তৃক মন্দির, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, পুরোহিত ও শিক্ষিত ব্রাহ্মণদের এবং অনেক সময় প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিবর্গকে যৌথভাবে ভূমি দানের উল্লেখ পাওয়া যায়।

প্রাচীন বাংলায় অধিকাংশ ভূমি ‘অপ্রদ’ (অনুৎপাদনশীল জমি), ‘অপ্রহত’ (অকর্ষিত জমি) ও ‘খিল’ (পতিত জমি) এ তিন ভাগে ভাগ করা হতো। লিপিসাক্ষ্যে অন্যান্য ধরনের যেমন ‘ক্ষেত্র’, ‘খিল’ ও ‘বাস্ত্ত’ ভূমির উল্লেখও পাওয়া যায়। ‘ক্ষেত্র’ ছিল চাষের আওতাধীন ভূমি, ‘খিল’ ভূমি ‘অপ্রহত’ ভূমির সঙ্গে অভিন্ন অর্থাৎ অকর্ষিত ভূমি এবং ‘বাস্ত্ত’ হচ্ছে লোকের বসবাসের ভূমি অর্থাৎ বাস্ত্তভিটা। গুপ্ত আমলে জমি বিক্রয় সংক্রান্ত তাম্রশাসনে জমির পরিমাপের বিবরণও রয়েছে। ভূমির যথার্থ পরিমাপের দায়িত্ব সম্ভবত সে সংস্থার উপরই ন্যস্ত করা হতো যে সংস্থা ক্রয়ের জন্য আবেদনপত্র গ্রহণ করত। সমগ্র বাংলায় ভূমির পরিমাপ একই ধরনের ছিল না। গুপ্তযুগে জমির পরিমাপের একক ছিল ‘কুল্যবাপ’ ও ‘দ্রোণবাপ’। এক ‘কুল্য’ পরিমাপের বীজ দ্বারা যে পরিমাপের জমি বপন করা যায় ‘কুল্যবাপ’ শব্দ দ্বারা সাধারণত ঐ পরিমাণ জমিকে বোঝাত। ‘কুল্যবাপে’র আট ভাগের এক ভাগকে ‘দ্রোণবাপ’ বলা হতো। প্রাচীনকালের ‘কুল্যবাপে’র সঠিক পরিমাণ নির্ণয় করা খুবই কঠিন। কোন কোন পন্ডিত মনে করেন যে, এটি ছিল প্রায় তিন বিঘার সমান। শিলালিপিতে জমির পরিমাপের একক হিসাবে আরও শব্দের উল্লেখ পাওয়া যায়, যেমন- ‘পাটক’ অথবা ‘ভূপাটক’। বৈন্যগুপ্তের গুণাইঘর তাম্রশাসনে ধর্মীয় উদ্দেশ্যে একজন ব্রাহ্মণকে পাঁচটি ভূমিখন্ডে এগার ‘পাটক’ অকর্ষিত ভূমিদানের উল্লেখ রয়েছে। ঐ একই সূত্রে এক ‘পাটক’ ভূমি চল্লিশ ‘দ্রোণ’ বা ‘দ্রোণবাপে’র সমান বলে নির্দেশ করা হয়েছে। ভূমি পরিমাপের ক্ষেত্রে উপরিউক্ত এককগুলি ছাড়াও ‘আঢক’ বা ‘আঢবাপ’, ‘উন্মান’ বা ‘উদান’, ‘কাক’ বা ‘কাকিনি’, ‘ভূ-খাদি’, ‘খাদিক’, ‘হাল’, ‘দ্রোণ’ প্রভৃতি এককসমূহ প্রচলিত ছিল। কিন্তু এগুলির কোনটির পরিমাণ কত ছিল তা যথাযথভাবে নির্ণয় করা খুবই দুষ্কর। গুপ্ত ও গুপ্ত পরবর্তী যুগের লিপিমালায় ভূমির পরিমাপের প্রকৃত একক হিসাবে ‘নলে’র ব্যবহারের উপর আলোকপাত করা হয়েছে। বৈগ্রাম তাম্রশাসন ও ধর্মাদিত্যের ফরিদপুর তাম্রশাসনে ‘অষ্টক-নবক-নলেন’ অথবা ‘অষ্টক-নবক-নলাভ্যম’ শব্দের উল্লেখ পাওয়া যায়।

গুপ্ত তাম্রশাসনে ভূমি বিক্রয় পদ্ধতি সম্বন্ধে তথ্য পাওয়া যায়। প্রথমে ক্রেতা সংশ্লিষ্ট অধিকরণে কি উদ্দেশ্যে, কোন্ জমি এবং কতখানি ক্রয়ে ইচ্ছুক তা উল্লেখ করে আবেদন করতেন। আবেদনকারীকে স্থানীয় প্রচলিত মূল্য অনুযায়ী উক্ত জমির মূল্যদানের স্বীকৃতি তার আবেদনে উল্লেখ করতে হতো। তাছাড়া প্রস্তাবিত জমির নির্ধারিত মূল্য প্রচলিত স্থানীয় মূল্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ কিনা এবং তা অহস্তান্তরযোগ্য কিনা তাও আবেদনে উল্লেখ করতে হতো। জমি ক্রয়েচ্ছু ব্যক্তির নিকট থেকে আবেদন প্রাপ্তির পর সংশ্লিষ্ট অধিকরণ আবেদনপত্রটি দলিল-সংরক্ষকের (পুস্তপালের) দপ্তরে প্রেরণ করত। আবেদনটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আবেদনকারী কর্তৃক উল্লিখিত শর্তে তাকে জমিটি দেওয়া যায় কিনা সে সম্পর্কে তাদের মতামত দিতে হতো। ‘পুস্তপালে’র দপ্তর বিক্রয় অনুমোদন করলে এবং ভূমির মূল্য রাজকোষাগারে জমা হলেই কেবল ভূমি ক্রয়ে আগ্রহী ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ ভূমির অধিকার লাভ করতেন এবং বিক্রয়কার্য সম্পাদিত হতো। এরপর বিক্রয়কার্য সম্পাদন তাম্রশাসনে পট্টীকৃত হতো এবং বিক্রিত ভূমির উপর অধিকারের দলিল হিসেবে তাম্রশাসনটি ক্রেতার হাতে তুলে দেওয়া হতো।

ভূমির মূল্য কিভাবে পরিশোধ করা হতো এ সম্পর্কে কোন ব্যাখ্যা গুপ্ত লিপিমালায় নেই। বিক্রিত ভূমির মূল্যের তারতম্য ছিল। ভূমির ধরন অথবা বিভিন্ন এলাকায় প্রচলিত দরের পার্থক্যের কারণে এ তারতম্য দেখা দিত। গুপ্ত আমলের লিপি থেকে প্রতীয়মান হয় যে, ভূমি ক্রয়ের জন্য জেলা বা গ্রামের যে কর্তৃপক্ষের নিকট আবেদন পেশ করা হতো সেখানেই ভূমির পূর্বনির্ধারিত মূল্য জমা দিতে হতো। ভূমির মূল্য সরাসরি ‘বিষয়’ বা ‘গ্রাম’ কর্তৃপক্ষ সংগ্রহ করত কিনা বা অন্য কোন সরকারি কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তা করা হতো কিনা তা নির্ধারণ করা কঠিন। তবে এ প্রসঙ্গে তাম্রশাসনসমূহে অন্য কোন সরকারি সংস্থার নামোল্লেখ না থাকায় এটি মনে করা যেতে পারে যে, ভূমি গ্রহীতাদের নিকট থেকে মূল্য সংগ্রহের দায়িত্ব স্থানীয় প্রশাসনকেই পালন করতে হতো।

লিপিমালা ভিত্তিক উপরিউক্ত আলোচনা থেকে এটি স্পষ্টরূপে প্রতীয়মান হয় যে, পাল-পূর্ব যুগে বাংলার রাজ্যশাসন পদ্ধতি পুরোপুরি সুবিন্যস্ত না হলেও এক্ষেত্রে ঐ যুগে কিছু অগ্রগতি সাধিত হয়েছিল। সমসাময়িক শিলালিপি থেকে প্রাপ্ত সাক্ষ্যের ভিত্তিতে প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকর্তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে বর্ণনা দেয়া হয়েছে। এটি উল্লেখযোগ্য যে, পূর্বোল্লিখিত প্রশাসনিক কাঠামো আমাদের আলোচ্য সম্পূর্ণ সময়কালে প্রচলিত ছিল না। এটি ছিল প্রশাসনিক সংস্থার প্রাথমিক পর্যায়ের অবস্থা যা পরবর্তীকালে উন্নততর করা হয়েছিল।

পাল বংশের দীর্ঘ শাসনে বাংলায় প্রথমবারের মতো এক শক্তিশালী ও স্থায়ী রাষ্ট্রপ্রশাসন ব্যবস্থা সূচিত হয়। কিন্তু পরিতাপের বিষয় এ যে, প্রাপ্ত উপাদানসমূহ থেকে পাল প্রশাসন-ব্যবস্থার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ পাওয়া যায় না। তবে প্রাপ্ত উপাদানের ভিত্তিতে প্রশাসন ব্যবস্থার বিভিন্ন দিকের এক রূপরেখা প্রণয়ন করা সম্ভব। বাংলায় প্রচলিত গুপ্ত প্রাদেশিক শাসন কাঠামোর উপরই পাল রাজাদের আমলে শক্তিশালী কেন্দ্রীয় শাসন কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হয়। এ যুগেও পূর্ববর্তী যুগের ন্যায় রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। রাজার জ্যেষ্ঠ পুত্র ‘যুবরাজ’ নামে অভিহিত হতেন। যুবরাজের  দায়-দায়িত্ব ও অধিকার সম্বন্ধে বিশেষ কিছু জানা যায় না। গুপ্তযুগের মতো এ যুগেও রাজপুত্রকে ‘কুমার’ নামে অভিহিত করা হতো। ‘কুমার’ প্রাদেশিক শাসনকর্তার পদের মতো উচ্চ প্রশাসনিক দায়িত্ব পেতেন। এ পদে থাকাকালে কুমারগণ রাজার সামরিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতেন।

সাম্রাজ্য প্রশাসনে পাল রাজাদের বহুসংখ্যক কর্মচারী ছিলেন যাদের প্রধান ছিলেন ‘মন্ত্রী’ বা ‘সচিব’। পাল রাজাদের শাসনামলেই সর্বপ্রথম রাজ্যের একজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তার উল্লেখ পাওয়া যায় যার পদমর্যাদা প্রধানমন্ত্রীর অনুরূপ। দেবপালের বাদল স্তম্ভলিপি থেকে এ পদের ক্ষমতা ও মর্যাদার বিষয়টি জানা যায়। ধর্মপালের রাজত্বকালে গর্গ নামে একজন ব্রাহ্মণের পরিবারের সদস্যদের জন্য বংশানুক্রমে প্রধানমন্ত্রীর পদ সংরক্ষিত ছিল। গর্গের বংশধরগণ (দর্ভপাণি, সোমেশ্বর, কেদারমিশ্র ও গুরবমিশ্র) পরবর্তী এক শত বছর প্রধানমন্ত্রীর পদ অলংকৃত করেন। তারা সকলেই পাল বংশের শাসন প্রতিষ্ঠা ও সুদৃঢ়করণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তীকালে এরূপ আর এক মন্ত্রী বংশের পরিচয় পাওয়া যায়। যোগদেব ছিলেন তৃতীয় বিগ্রহপালের এবং তাঁর উত্তরাধিকারী বৈদ্যদেব ছিলেন কুমারপালের প্রধানমন্ত্রী। রাজ্যের উচ্চপদে নিয়োগের ক্ষেত্রে এই বংশানুক্রমিক নীতি পরবর্তী চন্দ্র ও যাদব রাজবংশের ক্ষেত্রেও প্রচলিত ছিল। ভট্ট ভবদেবের ভুবনেশ্বর প্রশস্তি থেকে এর প্রমাণ মেলে।

পাল রাজাদের অধীনে অনেক সামন্ত রাজা ছিলেন। পাল তাম্রশাসনে তাদেরকে ‘রাজন’, ‘রাজন্যক’, ‘রণক’, ‘সামন্ত’ ও ‘মহাসামন্ত’ ইত্যাদি নামে অভিহিত করা হয়েছে। এ সকল পদবির প্রকৃত অর্থ ও তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ধারণ করা কঠিন। তবে একথা স্পষ্টভাবে বলা যায় যে, তারা ছিলেন শক্তিশালী কেন্দ্রীয় শাসনের নিয়ন্ত্রণাধীন। কেন্দ্রীয় রাজশক্তির দুর্বলতার সুযোগে এ সামন্ত রাজারা নিজেদের ক্ষমতা বৃদ্ধি করে স্বাধীনতা ঘোষণা করতেন। বরেন্দ্র পুনরুদ্ধারের জন্য রামপালের চৌদ্দ জন সামন্তের সহায়তা চাওয়ার ঘটনা থেকে প্রমাণিত হয় যে, কখনও কখনও সামন্ত প্রধানদের সাহায্যের উপর পাল রাজাদের অনেকাংশে নির্ভর করতে হতো।

পূর্ববর্তী যুগের ন্যায় পাল যুগেও বিভিন্ন প্রশাসনিক ইউনিট যেমন ‘ভুক্তি’, ‘বিষয়’, ‘মন্ডল’সহ অন্যান্য ছোট ছোট বিভাগের প্রচলন ছিল। পাল যুগের লিপিমালায় বাংলায় পুন্ড্রবর্ধনভুক্তি, বর্ধমানভুক্তি ও দন্ডভুক্তি, উত্তর বিহারে তীরভুক্তি, দক্ষিণ বিহারে শ্রীনগরভুক্তি এবং আসামে প্রাগজ্যোতিষভুক্তির উল্লেখ পাওয়া যায়। পাল লিপিমালা থেকে অনেক ‘বিষয়’ ও ‘মন্ডল’ এর নামও জানা যায়। এছাড়া ‘খন্ডল’, ‘আবৃত্তি’ ও ‘ভাগ’ নামে বহুসংখ্যক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রশাসনিক বিভাগের উল্লেখ রয়েছে। ‘আবৃত্তি’সমূহ বিভিন্ন ‘চতুরকে’ এবং ‘চতুরক’গুলি সম্ভবত বিভিন্ন ‘পাটকে’ বিভক্ত ছিল। এ বিভাগগুলির যথার্থ প্রকৃতি নির্দিষ্টভাবে জানা যায় না। পাল শিলালিপিতে বিভিন্ন প্রশাসনিক বিভাগের সঙ্গে সম্পৃক্ত কর্মচারীদের উল্লেখ পাওয়া যায়। পাল ভূমিদান-লিপিতে প্রশাসনিক বিভাগগুলির দায়িত্বে নিয়োজিত রাজকর্মচারীদের সুদীর্ঘ তালিকা থেকে বোঝা যায় যে, এ বংশের শাসনামলে রাজ্যশাসন ব্যবস্থা দক্ষ ও খুবই বিশদ ছিল। তবে এ সকল রাজকর্মচারীর ক্ষমতা ও দায়-দায়িত্ব সম্পর্কে জ্ঞান সীমিত। রাজকর্মচারীদের এ সুদীর্ঘ তালিকা থেকে পাল প্রশাসনযন্ত্রের ব্যাপক পরিধিসহ বিভিন্ন বিভাগ সম্পর্কে একটি সাধারণ ধারণা লাভ করা যায়। একটি বিষয় এ ক্ষেত্রে লক্ষণীয় যে, পাল লিপিমালায় কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থার উপর বেশ আলোকপাত করা হলেও সেগুলিতে সমসাময়িক প্রাদেশিক ও স্থানীয় শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু উল্লেখ নেই। এ যুগে পূর্ববর্তী যুগের ন্যায় বিভিন্ন ‘অধিকরণের’ প্রচলন অব্যাহত ছিল কিনা বা থাকলেও তাদের গঠন কেমন ছিল তা জানার কোন উপায়ই লিপিগুলিতে বা অন্যত্র কোথাও নেই। তবে কিছুটা পরিবর্তিত আকারে হলেও এ অধিকরণগুলির অব্যাহত ব্যবহারের সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

পাল যুগের শাসনব্যবস্থায় রাজা ছিলেন সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী। তিনি প্রকৃতপক্ষে সীমাহীন ক্ষমতা ভোগ করতেন। রাজা কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক কর্মকর্তারা রাজ্যশাসনে ক্ষমতা প্রয়োগ ও দায়িত্ব পালন করতেন। ‘যুবরাজ’ ও প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও এ যুগে রাজ্যে আরও অনেক ‘মন্ত্রী’ ছিলেন। এদের মধ্যে ‘মহাসান্ধিবিগ্রহিক’, ‘রাজমাত্য’, ‘মহাকুমারমাত্য’ এবং ‘দূত’ ছিলেন প্রধান। ‘মহাসান্ধিবিগ্রহিক’ ছিলেন যুদ্ধ ও শান্তি বিষয়ক দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী অর্থাৎ অনেকটা আজকের দিনের পররাষ্ট্র মন্ত্রীর অনুরূপ। ‘রাজমাত্য’ বলতে সম্ভবত সাধারণভাবে কনিষ্ঠ মন্ত্রীদের বোঝাত। ‘মহাকুমারমাত্যে’র প্রকৃত অবস্থান নির্ণয় করা যায় না। ‘দূত’ ছিলেন বিদেশি রাজ্যের সঙ্গে যোগসূত্র রক্ষাকারী রাষ্ট্রদূত। উপরিউক্ত উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারীদের পরেই এ যুগে ‘অমাত্য’ নামক পদস্থ রাজকর্মচারীর নাম পাওয়া যায়। অন্যান্য উচ্চ রাজকর্মচারীর মধ্যে ‘অঙ্গরক্ষ’ (সম্ভবত রাজার দেহরক্ষী দলের প্রধান) এবং ‘রাজস্থানীয়’র (সম্ভবত রাজ প্রতিনিধি বা প্রাদেশিক শাসনকর্তা) নাম উল্লেখ করা যায়। ‘অধ্যক্ষ’ নামে কেন্দ্রীয় শাসনের সঙ্গে জড়িত আরও এক ধরনের রাজকর্মচারী থাকতেন যার দায়িত্ব ছিল সাধারণভাবে সামরিক প্রশাসন বিভাগের তত্ত্বাবধান করা। ‘প্রমাতৃ’ ও ‘ক্ষেত্রপ’ নামে আরও দুধরনের কর্মচারীর নাম পাওয়া যায় যারা কেন্দ্রীয় শাসনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। সম্ভবত তাদের কার্যক্রম সম্পত্তি সংক্রান্ত বিরোধে সীমাবদ্ধ ছিল অথবা তারা ছিলেন জমি জরিপ বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মচারী। কোন কোন পন্ডিত মনে করেন যে, ‘প্রমাতৃ’ ছিলেন দীউয়ানি মামলার বিচারক।

রাজস্ব প্রশাসন রাজস্ব প্রশাসনের ক্ষেত্রে উল্লেখ রয়েছে যে, এ যুগে বিভিন্ন ধরনের রাজস্ব আদায়ের জন্য ভিন্ন ভিন্ন কর্মচারী নিযুক্ত ছিল। কৃষিভূমির রাজস্ব আদায় করতেন বিভিন্ন প্রশাসনিক বিভাগের প্রধানগণ যেমন ‘উপরিক’, ‘বিষয়পতি’, ‘দাশগ্রামিক’ ও ‘গ্রামপতি’। রাজস্বের খাত ছিল ‘ভাগ’, ‘ভোগ’, ‘কর’, ‘হিরণ্য’, ও ‘উপরিকর’ প্রভৃতি। এ সকল করের প্রকৃতি নির্ণয় করা কঠিন। তাম্রশাসনে ‘ষষ্ঠাধিকৃত’ নামে রাজস্ব কর্মচারীর উল্লেখ পাওয়া যায়। তিনি কৃষকদের নিকট থেকে রাজস্বের এক-ষষ্ঠাংশ রাজার প্রাপ্য হিসেবে আদায় করতেন। ‘ভোগ’ কর আদায়ের দায়িত্বে সম্ভবত নিয়োজিত ছিলেন ‘ভোগপতি’। খেয়া পারাপার ঘাট থেকে সম্ভবত রাষ্ট্রের আয় হতো এবং খেয়াঘাটের মাশুল সংগ্রহ করত ‘তরিকা’ নামক কর্মচারী। উপশুল্ক ও আবগারি কর আদায় বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন ‘শৌল্কিক’। চোর-ডাকাতদের হাত থেকে প্রজাদের রক্ষার জন্য আরোপিত কর আদায়ের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন ‘চৌরোদ্ধরণিক’। ফৌজদারি অপরাধের জন্য আরোপিত অর্থদন্ড আদায় বিভাগের কর্মকর্তা ছিলেন ‘দশাপরাধিক’। শিলালিপিতে উল্লিখিত ‘মহাক্ষপটলিক’ নামীয় রাজস্ব কর্মকর্তা ‘জ্যেষ্ঠ কায়স্থ’ নামক কর্মচারীর সহযোগিতায় হিসাব বিভাগের কার্যাবলি নিয়ন্ত্রণ করতেন। ‘মহাদন্ডনায়ক’ ছিলেন বিচার বিভাগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা। ‘মহাপ্রতিহার’,’দন্ডিক’, ‘দন্ডপাশিক’ ও ‘দন্ডশক্তি’ উপাধিধারী কর্মকর্তারা পুলিশ বিভাগ পরিচালনা করতেন। ‘খোল’ সম্ভবত ছিলেন গুপ্তচর বিভাগের দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তা।

সামরিক প্রশাসন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সামরিক কর্মকর্তা ছিলেন ‘সেনাপতি’ বা ‘মহাসেনাপতি’। তিনি ছিলেন রাজার সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক। পদাতিক, অশ্বারোহী, হস্তি ও উষ্ট্র বাহিনী এবং নৌবাহিনীর জন্য মহাসেনাপতির অধীনে একজন করে স্বতন্ত্র কর্মকর্তা নিযুক্ত থাকতেন। পাল রাজাদের অধিকাংশ শিলালিপিতে ‘গৌড়-মালব-খাশ-হুণ-কুলিক-কর্ণাট-লাট বাক্যের উল্লেখ পাওয়া যায়। এ থেকে বোঝা যায় যে, ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের এ সকল উপজাতীয় লোকদের মধ্য থেকে সৈন্য সংগ্রহ করে পাল রাজারা রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনী গঠন করতেন। শিলালিপিতে বিশেষ কর্মচারী হিসেবে দুর্গাধিপতি ‘কোট্টপাল’ এবং রাজ্যের সীমান্ত রক্ষক ‘প্রান্তপাল’- এর উল্লেখ রয়েছে। এছাড়াও পাল তাম্রশাসনে আরও অনেক রাজ কর্মচারীর উল্লেখ পাওয়া যায়। কিন্তু ঐ সকল কর্মচারীর নামের প্রকৃত অর্থ অনুধাবন করা কঠিন বিধায় তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে নিরূপণ করা যায় না।

চন্দ্র, বর্মন ও সেন আমলের লিপিফলকে শাসন ব্যবস্থা সম্পর্কে যে বিবরণ রয়েছে তা পাল আমলের বিবরণের অনেকটা অনুরূপ। অবশ্য এসব লিপির কোথাও কোথাও কিছু নতুন তথ্য পাওয়া যায়। দুটি নতুন রাজকর্মচারীর নাম যেমন ‘মহাব্যূহপতি’ (প্রধান সামরিক কর্মকর্তা) এবং ‘মহাপীলুপতি’ (হস্তি বাহিনীর ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) যথাক্রমে চন্দ্র, বর্মণ ও সেন তাম্রশাসনে এবং বর্মণ ও সেন লিপিফলকে পাওয়া যায়। এছাড়াও রাজকর্মচারীদের তালিকায় এ যুগের উল্লেখযোগ্য সংযোজন হচ্ছে ‘মহাধর্মাধ্যক্ষ’ (প্রধান বিচারকের দায়িত্ব পালনকারী), ‘মহাপুরোহিত’ (প্রধান পুরোহিত), ‘মহাসর্বাধিকৃত্ব’ (রাষ্ট্রীয় সকল বিভাগের প্রধান তত্ত্বাবধায়ক) এবং ‘মহাগস্থ’ (সম্ভবত উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা যিনি বিভিন্ন সামরিক বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন)। সেন তাম্রশাসনে ‘রাজ্ঞী’র উল্লেখ পাওয়া যায়। এ থেকে রাজ্যশাসন বিষয়ে রানীর রাজনৈতিক প্রাধান্যের সম্ভাব্যতার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। পাল-পরবর্তী যুগের রাজ্যশাসন বিষয়ের অপর এক গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ব্রাহ্মণ পুরোহিতের প্রাধান্যের সরকারি স্বীকৃতি। বর্মণ ও সেন রাজাদের রাজত্বকালে উচ্চ রাজকর্মচারীর মর্যাদাসহ পুরোহিতের প্রাধান্যের স্বীকৃতি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। এ প্রসঙ্গে বিনয়চন্দ্র সেনের মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য: ‘The interest of such an officer whose position in the social sphere was one of the unquestioned domination, would naturally lie in the administration becoming a tool of the priesthood.’

প্রাক-পাল ও পাল যুগের প্রশাসনিক বিভাগসমূহ পরবর্তী কয়েক যুগ ধরে প্রচলিত ছিল। পাল যুগের পুন্ড্রবর্ধনভুক্তি (উত্তরবঙ্গের বৃহৎ অংশ এর অন্তর্ভুক্ত ছিল) পরবর্তী যুগে পৌন্ড্রবর্ধনভুক্তি নামে পরিচিত হয়। সেন রাজাদের আমলে ক্রমান্বয়ে পৌন্ড্রবর্ধনভুক্তির সীমা বৃদ্ধি পায়। এটি ছিল বাংলার সর্ববৃহৎ প্রশাসনিক বিভাগ। উত্তরবঙ্গ ছাড়াও দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গ (সমতট) ও পূর্ববঙ্গ (বঙ্গ) এ ভুক্তির অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ যুগে কঙ্কগ্রামভুক্তি নামে অপর এক নতুন ভুক্তি গড়ে উঠে। এযুগের প্রধান ‘বিষয়’গুলি ছিল ‘মহান্ত প্রকাশ-বিষয়’, ‘স্থলিক্কট-বিষয়’, ‘কোটীবর্ষ-বিষয়’, ‘ক্রিমিল-বিষয়’, ‘কক্ষ-বিষয়‘, ‘গয়া-বিষয়’, খাটিক বা ‘খাড়ি-বিষয়’, ‘শুভুঙ্গ-বিষয়’ ও ‘বড়-বিষয়’। ‘বিষয়’ থেকে বৃহত্তর প্রশাসনিক বিভাগ ‘মন্ডল’ এর কয়েকটি নামের উল্লেখ পাওয়া যায়, যেমন ‘ব্যাঘ্রতটীমন্ডল’, ‘কামরূপমন্ডল’, ‘গোকালিকামন্ডল’, ‘হলাবরত্বমন্ডল’, ‘ব্রাহ্মণীগ্রামমন্ডল’, ‘উত্তররাঢ়মন্ডল’ ইত্যাদি। প্রধান প্রধান প্রশাসনিক বিভাগ ছাড়াও তৎকালে ‘পাটক’, ‘চতুরক’ ও ‘আবৃত্তি’ নামক ছোট ছোট প্রশাসনিক বিভাগেরও উল্লেখ পাওয়া যায়।

রাজস্ব প্রশাসনের ক্ষেত্রে এ যুগের লিপিফলকে ‘হট্টপতি’ (সম্ভবত হাট বাজারের তত্ত্বাবধায়ক) নামক কর্মচারীর উল্লেখ পাওয়া যায়। এ সময়ে ভূমি পরিমাপের ক্ষেত্রে কোন কোন অঞ্চলে সুনির্দিষ্ট মানদন্ড অনুসরণ করা হতো। ভূমি সংক্রান্ত দলিলসমূহ রাজকীয় সিলমোহর দ্বারা চিহ্নিত করা হতো এবং রাজকীয় সিলমোহরের দায়িত্বে নিয়োজিত রাজকর্মচারীর নাম ছিল‘’মহামুদ্রাধিকৃত’। সেন রাজাদের ভূমিদান-সংক্রান্ত অনুশাসনগুলিতে তৎকালীন বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে ভূমি পরিমাপের মানদন্ড হিসেবে নলের ব্যবহারের উল্লেখ পাওয়া যায়। বিজয়সেনের বারাকপুর তাম্রশাসনে সমতট ও পুন্ড্রবর্ধনভুক্তির খাড়ি-বিষয়ে জমি পরিমাপের জন্য নলের ব্যবহারের উল্লেখ রয়েছে। বল্লালসেনের নৈহাটি তাম্রশাসনে বিজয়সেন কর্তৃক প্রবর্তিত ‘বৃষভ-শংকর-নলে’র প্রচলন ছিল বলে জানা যায়। লক্ষ্মণসেনের আনুলিয়া তাম্রশাসনে বৃষভ-শংকর-নলের উল্লেখ রয়েছে। লক্ষ্মণসেনের তর্পণদীঘি তাম্রশাসনে ‘তত্রত্য-দেশ-ব্যবহার নলেন’ কথাটির উল্লেখ রয়েছে। এর অর্থ হচ্ছে, যে অঞ্চলে ভূমি পরিমাপের কোন নির্দিষ্ট মানদন্ড ছিল না সে অঞ্চলে প্রদত্ত ভূমি মাপা হতো ঐ অঞ্চলে প্রচলিত নলের সাহায্যে। কোন কোন পন্ডিত মনে করেন যে, ‘হস্ত’ ছিল প্রতিটি ক্ষেত্রেই জমি পরিমাপের ভিত্তি। ‘বৃষভ-শংকর-নল’ শব্দ থেকে অনুমিত হয় যে, বিজয়সেনের হাতের মাপই পরিমাপের একক হিসেবে বিবেচিত হতো। লক্ষ্মণসেনের গোবিন্দপুর তাম্রশাসন থেকে জানা যায় যে, নলের পরিমাপ ছিল ৫৬ হাত। আসলে নলের প্রকৃত দৈর্ঘ্য নির্ণয় করা খুবই কঠিন। হয়ত বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন ব্যক্তির হস্ত দ্বারাই নলের প্রকৃত দৈর্ঘ্য নির্ধারণ করা হতো।

লিপিফলক থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে আলোচিত প্রাচীন বাংলার প্রশাসনিক ইতিহাস অনেকাংশে অসম্পূর্ণ হলেও একথা অনস্বীকার্য যে, ঐ যুগে বাংলায় একটি সুসংগঠিত প্রশাসনযন্ত্র কার্যকর ছিল। ভূমিদান-লিপিতে উল্লিখিত রাজকর্মচারীদের সুদীর্ঘ তালিকা ছাড়াও প্রশাসন ব্যবস্থার আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানা যায়। সময়ের চাহিদা মেটানোর প্রয়োজনে প্রশাসনিক ব্যাপারে কিছু পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করা হলেও এর কাঠামো বা রূপরেখা মোটামুটি সমগ্র প্রাচীনকালে একই ধরনের ছিল।

মধ্যযুগ  মধ্যযুগে বাংলার শাসন ব্যবস্থা গড়ে উঠে পূর্বতন যুগের প্রশাসনিক কাঠামোর উপর ভিত্তি করে। মধ্যযুগের শাসন প্রণালীর বশেষত্ব এই যে, শাসককুলের সতত পরিবর্তন সত্ত্বেও তুর্কি-আফগান জাতি যে সকল পুরাতন প্রশাসনিক সংগঠন নিয়ে ভারতে আসে সেগুলি বহু শতাব্দী ধরে তাদের মূল বৈশিষ্ট্য বজায় রাখে। ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রথমে (আনু. ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে) ইখতিয়ারউদ্দীন মুহম্মদ বখতিয়ার খলজী কর্তৃক বাংলায় মুসলিম রাজ্য প্রতিষ্ঠার সূচনালগ্ন থেকে শুরু করে ১৩৩৮ খ্রিস্টাব্দে বাংলার ব্যাপক অংশ জুড়ে স্বাধীন সালতানাত প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত অঞ্চলটি দিল্লি সালতানাতের প্রদেশ হিসেবে শাসিত হয়। বাংলার রাজধানী  গৌড় বা  লখনৌতি দিল্লি সালতানাতের প্রধান নীতিমালা অনুসরণ করে এবং এখানে যে শাসন কাঠামো গড়ে তোলা হয় তা ছিল ইলতুৎমিশ বংশের শাসকদের প্রচলিত প্রশাসন পদ্ধতির অনুরূপ। বিকেন্দ্রীকৃত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সার্বভৌম শাসকদের সামন্ততান্ত্রিক প্রশাসন অনুসৃত হয় এখানে। অবশ্য ইলিয়াস শাহী (১৩৪২-১৪১৫ এবং ১৪৪২-১৪৮৭) এবং হোসেন শাহী (১৪৯৪-১৫৩৮) বংশের শাসনামলে এ অবস্থার কিছুটা উন্নতি ঘটে। মুগলদের বঙ্গ বিজয়ের পর (১৫৭৬) গৌড়রাজ্য আবার দিল্লি সাম্রাজ্যের একটি প্রদেশে পরিণত হয় এবং এখানে মুগল শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়। শেরশাহর স্বল্প কালের শাসন সময়ে এই ব্যবস্থা কিছুটা পরিবর্তিত ও পরিমার্জিত হলেও মোটামুটি সুলতানি আমলের প্রশাসনিক ধারাই অব্যাহত থাকে।

সমসাময়িক ইতিহাস সাহিত্যে প্রশাসনিক ব্যবস্থার বিস্তারিত বিবরণের অনুপস্থিতি বাংলার প্রশাসনিক সংগঠনগুলির, বিশেষ করে মধ্যযুগের প্রথম দিকের, ব্যাপক বর্ণনা তুলে ধরা সুকঠিন। রাজকীয় ঘটনাপঞ্জিতে বাংলার মতো দূরবর্তী প্রদশের প্রশাসন ব্যবস্থা সম্বন্ধে তেমন কোন তথ্য নেই। বিদেশি পর্যটকদের বিবরণ ও অন্যান্য সাহিত্যিক উপকরণ থেকে এই অভাব কিছুটা পূরণ করা যায়। তবে সাহিত্য-উপকরণ দিয়ে শুধু ধর্ম ও ভাবাবেগ সম্পর্কে ধারণা করা যায়, কিন্তু প্রশাসন সম্পর্কে নির্দিষ্ট কিছু বলা সম্ভব নয়। সমসাময়িক মুদ্রা ও লেখমালা মধ্যযুগে বাংলার প্রশাসন সম্পর্কে মূল্যবান তথ্য প্রদান করে। এই সকল বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিন্যস্ত করে মধ্যযুগে বাংলার শাসন কাঠামো সম্পর্কে ধারণা করা যায়।

বাংলায় মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কৃতিত্ব বখতিয়ার খলজীর প্রাপ্য, তবে তিনি সুলতান উপাধি ধারণ করেন নি বা নিজ নামে মুদ্রা চালু করেন নি। এ বিশেষ অধিকারটি তিনি তাঁর অধিরাজ ঘোরের মুইজুদ্দীন মুহম্মদ বিন সামের জন্য নির্দিষ্ট রাখেন। অবশ্য মালিক-উস-শার্ক (পূর্বাঞ্চলের অধিপতি) হিসেবে তিনি তাঁর অধিকৃত এলাকা ইকতায় (প্রদেশ) বিভক্ত করেন এবং এগুলির বেশির ভাগই ভারতে ভাগ্যান্বেষণে আগত তাঁর সহযাত্রী তুর্কি ও খলজীদের নিয়ন্ত্রণে ন্যস্ত করেন। এ প্রদেশসমূহের বেশির ভাগ সীমান্ত অঞ্চলে অবস্থিত ছিল এবং নিয়োজিত গভর্নরগণ ছিলেন বিশিষ্ট সামরিক ব্যক্তিত্ব। প্রাথমিক পর্যায়ে প্রাদেশিক শানসকর্তাদের মুকতা (গভর্নর) বলা হতো। ফলে প্রথম পর্যায়ের শাসন কাঠামো অনেকটা খলজী গোত্রীয় সামন্ততন্ত্রের রূপ নেয়। ইকতার শাসনকর্তাকে ইকতাদারও বলা হতো। তাঁরা সামরিক দায়িত্ব পালন ছাড়াও ইকতার বেসামরিক শাসন পরিচালনা করতেন।

বখতিয়ারের উত্তরসূরিগণ স্বাধীনতা ঘোষণা করে সুলতান উপাধি ধারণ করেন কিন্তু বেশিদিন তাঁরা এ স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখতে পারেন নি এবং একাধিকবার গৌড়/লখনৌতি রাজ্য দিল্লি সালতানাতের অধীনস্থ প্রদেশে পরিণত হয়। দিল্লি থেকে অঞ্চলটির দূরত্ব, ভাল যোগাযোগ ব্যবস্থার অনুপস্থিতি এবং লখনৌতিতে ক্ষমতা লাভের জন্য অব্যাহত দ্বন্দ্ব বা ষড়যন্ত্রের কারণে কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে বাংলার উপর বেশিদিন নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা সহজ ছিল না। অবশেষে ১৩৩৮ খ্রিস্টাব্দে স্বাধীন সালতানাত প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ইলিয়াস শাহী ও হোসেন শাহী বংশ দুটি (মধ্যখানে ১৪১৫-৪২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত স্বল্প বিরতিসহ) ১৫৩৮ খ্রিস্টাব্দে আফগানদের দ্বারা উৎখাত না হওয়া পর্যন্ত দুইশত বছর বাংলা শাসন করে। ইলিয়াস শাহী বংশের প্রতিষ্ঠাতা শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ এর আমলে প্রায় সমগ্র বাংলা বিজিত হয় এবং প্রথমবারের মতো এর উপর তাঁর একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। এজন্য তাঁকে শাহ-ই-বাঙ্গালাহ ও সুলতান-ই-বাঙ্গালাহ বলা হতো। তখন থেকে অঞ্চলটি ‘বাঙ্গালাহ’ নামে পরিচিত হয়।

স্বাধীন সুলতানি আমল  সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী সুলতানগণ নানা উচ্চ উপাধি যেমন সুলতান-উল-আজম, সুলতান-উল-মুয়াজ্জম এবং এমন কি সিকান্দর-উস-সানি (দ্বিতীয় আলেকজান্ডার) গ্রহণ করতেন। খলিফার নাম খোদিত মুদ্রার সাক্ষ্যে প্রমাণিত হয় যে, সুলতানগণ মুসলিম বিশ্বের ধর্মীয় নেতা খলিফার প্রতি আনুগত্য জ্ঞাপন করতেন। কোন কোন উচ্চাকাঙ্ক্ষী নৃপতি ইয়ামিন-আল-খিলাফাত, বা ইয়ামিন-ই-খলিফাতুল্লাহ প্রভৃতি বিশেষণও স্বীয় নামের সঙ্গে সংযুক্ত করতেন। সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে সুলতানগণ উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী নিয়োগ ও আইন প্রণয়ন করতেন। প্রধানত ইসলামি বিধি-বিধান মতে রাষ্ট্র পরিচালিত হতো।

সুরক্ষিত প্রাসাদে সুলতানদের দরবার বসত। এখানে তাঁরা অমাত্যবর্গ ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে মিলিত হতেন, খেতাব ও পদমর্যাদাসূচক পোশাক-পরিচ্ছদ বিতরণ করতেন এবং বিদেশি অতিথিদের সাক্ষাৎকার দিতেন। রাজদরবারের জাঁকজমক বজায় রাখার জন্য বিপুল সংখ্যক কর্মী বাহিনীর দরকার ছিল। বিরাট প্রাসাদ রক্ষীদল ছাড়াও রাজপরিবারে অনেক খোজা ও দাস-দাসী ছিল।

সুলতানের সান্নিধ্যলাভ গৌরব ও ক্ষমতার উৎস বলে বিবেচিত হতো। এজন্য রাজদরবার ছিল রাষ্ট্রের সম্মানিত ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের মিলনক্ষেত্র। আরব, পাঠান, মুগল এবং বাঙ্গালি সমন্বয়ে গঠিত অভিজাত সম্প্রদায় বংশানুক্রমিক ছিল না, অভিজাতবর্গ নানা উচ্চ উপাধি লাভ করতেন এবং প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন। উত্তর ভারতের মতো বাংলাতেও তাদের একশ্রেণি জায়গির (ভূমি বরাদ্দ) প্রাপ্তির বিনিময়ে রাজস্ব আদায়ের কাজে নিয়োজিত ছিলেন। বাংলায় সুলতানি আমলের শাসন প্রণালী কোন কোন ক্ষেত্রে ছিল পাল ও সেন যুগের মতো সামন্ততান্ত্রিক। সরকারি শাসনযন্ত্র যথাযথভাবে সচল রাখার জন্য প্রশাসন অর্থ, সংবাদ আদান-প্রদান, পুলিশ, বিচার, সামরিক প্রভৃতি বিভাগে বিভক্ত ছিল। এ সকল বিভাগের কর্মপরিধি সঠিকভাবে নির্ধারণ করা না গেলেও তাদের কর্মকান্ড সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

সুলতানের পরেই ছিল উজিরএর স্থান। তিনি ছিলেন বেসামরিক প্রশাসনের প্রধান। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সকল বিভাগের ওপর উজির কর্তৃত্ব করতেন। রাজস্ব বিভাগ সম্বন্ধে বিস্তারিত বিশেষ কিছু জানা যায় না, তবে সমগ্র রাজ্যের ভূমিকর, শুল্ক এবং নানা ধরনের আয়ের উৎস এ বিভাগের আওতাধীন ছিল।

সম্ভবত সংবাদ আদান-প্রদান বিভাগ কেন্দ্রীয় সচিবালয়ের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ছিল। বিভাগটি দবির-ই-খাস (একান্ত সচিব) এর অধীনে ন্যস্ত থাকত। তিনি কর্মকর্তা-কর্মচারী, করদরাজ্য এবং বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে সুলতানের বার্তাবিনিময় ও খবরাখবর আদান-প্রদান নিয়ন্ত্রণ করতেন। এ বিভাগে অনেক দবির (সচিব) ছিলেন।

প্রতিটি প্রদেশে পুলিশ বিভাগ বা দীউয়ান-ই-কোতোয়ালী একজন পুলিশ কর্মকর্তা বা কোতোয়াল-বকালির উপর অর্পিত থাকত। তাঁর অধীনে অনেক কোতোয়াল ছিল। শান্তি শৃংখলা বজায় রাখা ছিল তাদের দায়িত্ব। তারা শহরে আগন্তুকদের গতিবিধির ওপর নজর রাখত। অপরাধ দমন সংক্রান্ত বিচারালয়ের সঙ্গেও পুলিশ বিভাগের যোগাযোগ ছিল। এ বিচারালয়ের দায়িত্বে থাকতেন একজন বিচারক বা মুন্সেফ। তিনি অপরাধের বিচার করতেন। দলিলাদির সাক্ষ্যে বোঝা যায় যে রাজ্যে সু-গঠিত গুপ্তচর প্রথা চালু ছিল। রাজ্যের বিভিন্ন অংশে সংঘটিত খবরাখবর গুপ্তচরেরা সুলতানকে সরাসরি জানাত।

বিচার বিভাগ সংক্রান্ত তথ্যাদি অল্প, তবে এ স্বল্প তথ্য থেকে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, সুলতান ছিলেন সর্বোচ্চ বিচারক এবং ‘শরিয়া’ আইন অনুসারে বিচার কাজ সম্পাদিত হতো। সাধারণ বিচার কাজ পরিচালনার জন্য শহর ও গ্রামে কাজী (বিচারক) নিয়োজিত ছিলেন। আইন বিষয়ক জটিল মামলাগুলি প্রধান আইনবিদ নিষ্পত্তি করতেন, আর ‘শরিয়া’ আইনের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে সমস্যা দেখা দিলে উক্ত আইনে বিশেষজ্ঞ মালিক-উল-উমারা ওয়াল-ওয়াজারা এর সমাধান দিতেন। সুলতান আইনের ঊর্ধে ছিলেন না এবং কাজী তাঁর বিচার করতে পারতেন। সাধারণত বেত্রাঘাত ও নির্বাসন এ দুধরনের শাস্তির বিধান ছিল। তখন প্রাতিষ্ঠানিক জেলখানা ছিল না। কয়েদিদের কোন কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে রাখা হতো।

গ্রাম্যঞ্চলে পঞ্চায়েত বিচারকাজ পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। অন্যদিকে হিন্দু জনগোষ্ঠী সামাজিক বিষয়াদিতে হিন্দু ধর্মীয় আইন ও প্রথামত বিচার পেত।

ভারত উপমহাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো বাংলায়ও সামরিক শক্তির উপর সুলতান ব্যাপক ভাবে নির্ভরশীল ছিলেন এবং প্রত্যেক সুলতানের সুসংগঠিত শক্তিশালী সেনাবাহিনী ছিল। অধিকৃত অঞ্চলে ক্ষমতা বহাল ও বিদ্রোহপ্রবণ এলাকায় অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং দিল্লি সুলতানদের সম্প্রসারণনীতি মোকাবেলার জন্য বাংলার সুলতানদের শক্তিশালী প্রতিরক্ষা বাহিনী রাখা জরুরি ছিল। বাংলার বাহিনী অশ্বারোহী, পদাতিক, গোলন্দাজ, এবং হস্তি ও নৌ বাহিনী নিয়ে গঠিত ছিল। সুলতান স্বয়ং সম্মিলিত বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ছিলেন।

বাংলার প্রাকৃতিক গঠন ও জলবায়ু জনিত কারণে সারা বছর ধরে এখানে অশ্বারোহী বাহিনী কার্যকর ছিল না। উপমহাদেশের এ অংশে উন্নতমানের ঘোড়া পাওয়া যেত না এবং সুলতানকে ঘোড়ার জন্য বিদেশি চালানের ওপর নির্ভর করতে হতো। সর-ই-খইল অশ্বারোহী বাহিনীর প্রধান ছিলেন। সম্ভবত বাংলার প্রতিরক্ষা বাহিনীর মধ্যে এটি ছিল দুর্বলতম অংশ।

সেনাবাহিনীর গোলন্দাজ শাখা গুরুত্বপূর্ণ ছিল এবং মুগল সম্রাট বাবুর এ শাখাকে বাংলা বাহিনীর এক অতি সক্রিয় অংশ বলে অভিহিত করেন। ডি ব্যারোস আরাকান ও ত্রিপুরা সেনাদের উপর বাংলা বাহিনীর সামরিক প্রাধান্য বজায় রাখার প্রধান কারণ হিসেবে গোলন্দাজ বাহিনীর দক্ষতার কথা উল্লেখ করেন। গোলন্দাজ বাহিনী বিভিন্ন মাপের কামান ও বন্দুক ব্যবহার করত।

এ যুগে পাইকগণ বাংলার পদাতিক বাহিনীর মূল ভিত্তি ছিল। এমনও সময় গেছে যখন পাইকেরা রাজনৈতিক পরিস্থিতিও নিয়ন্ত্রণে রাখত। তীর-ধনুক ও বন্দুক সজ্জিত পদাতিক সৈনিকদের যুদ্ধ কৌশল বাবুরের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। মনে হয়, হাতি বাংলা বাহিনীতে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। যুদ্ধে ব্যবহূত মালামাল বহন করা ছাড়াও সেনাদের একস্থান থেকে অন্য স্থানে আনা-নেওয়ার জন্য হাতির ব্যবহার ছিল। নদীমাতৃক বাংলায় হাতি ধীর গতি হলেও এর ব্যবহার খাট করে দেখার উপায় নেই। নদীমাতৃক বাংলাদেশে নৌ বাহিনীর প্রয়োজন ছিল সর্বাধিক। প্রকৃতপক্ষে অশ্বারোহী বাহিনী বছরের ছয়মাস দেশরক্ষা নিশ্চিত করতে পারত, আর বাকি ছয়মাস পাইকদের সমর্থনপুষ্ট নৌবহর ক্ষমতা বজায় রাখত। ইওজ খলজীর সময় থেকে নৌবহর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছিল। নৌবাহিনীর প্রধান মীর-ই-বহর এর বহুবিধ দায়িত্ব ছিল। তাঁর দায়িত্বের মধ্যে ১. নদী পরিবহণের জন্য হরেক রকমের নৌকা তৈরি, ২. যুদ্ধে ব্যবহূত হাতি পারাপারের জন্য মজবুত নৌকা সরবরাহ, ৩. কর্মপটু নাবিক নিয়োগ, ৪. নদীর তত্ত্বাবধান এবং ৫. ফেরি ঘাটে শুল্ক আদায় ছিল বলে মনে হয়। সামরিক বিভাগের এক অপরিহার্য অঙ্গ হলেও হোসেন শাহী আমলের শেষদিকে নৌবাহিনীর কর্মদক্ষতা বহুগুণে কমে যায়।

প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সুদক্ষ সেনাবাহিনী মোতায়েন রাখা ছাড়াও সুলতানকে প্রতিরক্ষার জন্য সুরক্ষিত দুর্গ-প্রাচীরের উপর বেশি নির্ভর করতে হতো। দুর্ভেদ্য দুর্গ, যেমন একডালা, বসনকোট প্রভৃতি দিল্লির পুনঃ পুনঃ আগ্রাসন থেকে বাংলার সার্বভৌমত্ব রক্ষার সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তড়িতগতিতে নির্মিত মাটির দুর্গ বাংলার প্রতিরক্ষা নীতিতে খুবই পরিচিত কৌশল ছিল। সৈন্যদেরকে নগদ বেতন দেওয়া ও খাদ্য সরবরাহ করা হতো। সৈন্য বিভাগের বেতনাদি দেওয়ার কাজে নিয়োজিত কর্মকর্তা ছিলেন আরিজ-ই-লস্কর।

মধ্যযুগ  এর বাংলার ভূমি-রাজস্ব বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানা যায় না, তবে এটা অনুমেয় যে দিল্লি সালতানাতের প্রবর্তিত পদ্ধতির উপর ভিত্তি করেই এখানকার কাঠামো গড়ে উঠে। দিল্লির সুলতানগণ বিজিত অঞ্চল সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে বিলি-বণ্টন করার নীতি অনুসরণ করে সঠিক নিয়ন্ত্রণে আনার প্রয়াস পেতেন। অবস্থা দৃষ্টে মনে হয়, প্রয়োজনে কিছু পরিবর্তন পরিবর্ধন করে বাংলার সুলতানগণও এ নীতি গ্রহণ করেন। অবশ্য স্থানীয় নেতা ও গ্রাম প্রধানদের মাধ্যমে ভূমিরাজস্ব আদায়ের স্থানীয় প্রথা সুবিধাজনক বিবেচনা করে প্রায় কোন হস্তক্ষেপ ছাড়াই অব্যাহত রাখা হয়।

সুলতানি আমলে রাজস্বের প্রধান উৎস ছিল গণিমাহ (যুদ্ধলব্ধ সম্পদ), ভূমিরাজস্ব, উপশুল্ক এবং অন্যান্য কর। এগুলির মধ্যে ভূমিকরই ছিল রাজস্বের প্রধান উৎস। আবুল ফজলের বর্ণনামতে প্রাক-মুগল আমলে বাৎসরিক প্রাপ্য কর ৮টি মাসিক কিস্তিতে পরিশোধ করা যেত। প্রাপ্ত খাজনা সরাসরি খালসাতে (সরকারি কোষাগার) নগদ প্রদানের নিয়ম প্রচলিত ছিল। খাজনা নির্ধারণ উৎপাদিত ফসলের সম্ভাব্য পরিমাণের উপর ভিত্তি করে করা হতো, ভূমি জরিপ এবং ভূমির পরিমাণের উপর জোর দেওয়া হতো না। আবুল ফজল আরও উল্লেখ করেন যে, সাধারণত প্রজাগণ ছিল অনুগত এবং তারা নিয়মিত কর পরিশোধ করত।

অবশ্য গোটা বাংলার সাধারণ অবস্থা একরকম ছিল না। নগদ পরিশোধ ব্যবস্থার সঙ্গে সঙ্গে কোন কোন এলাকায় উৎপাদিত শস্য ভাগাভাগির নিয়মও চালু ছিল। আবার বাংলার ভৌগোলিক ও জলবায়ুজনিত কারণে, বিশেষ করে দেশের দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলে কৃষকদের নিকট থেকে সরাসরি কর আদায় করার সুবিধা ছিল না। তাই অনুমোদিত প্রতিনিধি, যেমন ইজারাদার, মজুমদার প্রভৃতি মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে খাজনা আদায় করার নিয়ম বাংলার সুলতানগণ প্রচলন করেন। মুগল আমলে এই সকল অনুমোদিত কর আদায়কারীদেরকে জমিদার (জমির মালিক) বলে অভিহিত করা হতো।

নদী বন্দর ও বাজার হাট থেকে আমদানি-রপ্তানি শুল্ক আদায় করা হতো। বিভিন্ন বন্দরে শুল্কভবন ছিল। শুল্ক দফতরের কর্মকর্তা সরাসরি সুলতান কর্তৃক নিয়োজিত হতেন। ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিমাণ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে, বিশেষ করে হোসেনশাহী শাসনামলে সাতগাঁও ও চট্টগ্রাম সমৃদ্ধ বন্দরে পরিণত হয়।

মধ্যযুগে বাংলার প্রদেশসমূহ ইকলিম, মুলক বা আরসাহ এবং দিয়ার নামে পরিচিত ছিল। প্রতিটি প্রদেশ সর-ই-লস্কর ওয়া উজির উপাধিধারী কর্মকর্তার অধীনে ন্যস্ত ছিল। উপাধি দৃষ্টে মনে হয়, প্রাদেশিক গভর্নরগণ অর্থ ও সামরিক উভয় বিভাগের প্রধান ছিলেন। তাদের উপর সুলতানের কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় ছিল, কেননা তিনি যে কোন সময় তাদের বরখাস্ত করতে পারতেন। শাসনকার্যের সুবিধার জন্য প্রদেশকে মহল, শিক এবং গ্রামে ভাগ করা হয়। প্রতিটি মহলে দুজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা শিকদার ও জঙ্গদার যথাক্রমে খাজনা আদায় ও সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রণ করতেন। বেসামরিক বিষয়াবলি ও ধর্মীয় স্থাপনাদির তত্ত্বাবধান ছিল প্রাদেশিক কাজীর একক কর্তৃত্বাধীন।

মুগল বিজয়ের পর বাংলা রাজ্য পুনরায় দিল্লি সাম্রাজ্যের একটি প্রদেশ বা সুবাহ নামে পরিচিত হয়। তবে এ অঞ্চলে আফগানদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রয়াস এবং স্থানীয় নেতাদের (বারো ভূঁইয়াগণ) বিদ্রোহী মনোভাবের কারণে বাংলার পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলে মুগলদের ক্ষমতা সুপ্রতিষ্ঠিত হতে সময় লাগে। ১৬১৩ খ্রিস্টাব্দের পূর্বে এ প্রক্রিয়া শেষ হয় নি। রাজধানী থেকে বাংলার দূরত্ব ও এর বিশেষ ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের জন্য সম্রাটের সক্রিয় তত্ত্বাবধানে সুবাহদারের (গভর্নর) মাধ্যমে বাংলা শাসিত হতো। শাসন কার্যের সুবিধার জন্য সুবাহকে সরকার, এবং সরকারকে আবার মহল বা পরগণায় ভাগ করা হয়।

প্রাদেশিক প্রশাসনের প্রধান হিসেবে সুবাহদার শান্তি-শৃংখলা বজায় রাখাসহ দেশরক্ষা এবং বেসামরিক প্রশাসন এ দুধরনের দায়িত্ব পালন করতেন। প্রদেশ প্রধানের সনাতন উপাধি সিপাহসালার (সশস্ত্র বাহিনীর অধিনায়ক) পরবর্তীকালে অপ্রচলিত হয়ে পড়ে এবং সেই জায়গায় নাজিম-ই-সুবাহ শব্দটি চালু হয়, তবুও বাংলার সুবাহদার উভয় দায়িত্ব (দেশরক্ষা ও বেসামরিক প্রশাসন) নির্বাহ করতে থাকেন। ‘নাজিম-ই-সুবাহ’ হিসেবে তিনি প্রতিরক্ষা ও ফৌজদারি মামলার বিচারের সার্বিক দায়িত্বে ছিলেন। মধ্যযুগে বেসামরিক প্রশাসন প্রধানত রাজস্ব ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত থাকত। এ জন্য সুবাহদারকে চাষাবাদ সম্প্রসারণ ও কৃষকদেরকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদানের ব্যাপারে নজর রাখতে হতো। তাঁর অন্যান্য দায়দায়িত্বের মধ্যে পুকুর, কূপ ও খাল খনন; সরাইখানা তৈরি ও প্রয়োজনীয় সরকারি স্থাপনা নির্মাণ অন্তর্ভুক্ত ছিল।

উজিরে-আলার (প্রধান মন্ত্রী) পরামর্শক্রমে সাধারণত ৪-৫ বছর মেয়াদের জন্য সম্রাট কর্তৃক সুবাহদার নিযুক্ত হতেন। তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে ছিলেন। প্রাদেশিক কর্মকর্তাগণ যদিও সুবাহদারের সাধারণ তত্ত্বাবধানে কাজ করত তারা মূলত কেন্দ্রে তাদের প্রতিরূপ কর্মকর্তার নিকট জবাবদিহি করত। প্রাদেশিক প্রশাসনের উপর এরূপ নিয়ন্ত্রণের ফলে অধস্তন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অযথা হয়রানি বা স্বীয় কর্তব্যে অবহেলা করা সুবাহদারের পক্ষে কঠিন ছিল। সুবাহ বাংলার প্রাচুর্য ও রাজধানী থেকে এর দূরত্ব সুবাহদারকে স্বাধীনতা ঘোষণা করতে প্রলুব্ধ করত। এরূপ পদক্ষেপ গ্রহণ থেকে বিরত রাখার জন্য সুবাহদারদের ওপর সতত নজরদারি করার প্রয়োজন ছিল। অবশ্য মুগল রাজত্বের স্বর্ণযুগে এমন ব্যবস্থা বেশ ফলপ্রসূ হয় কিন্তু  আওরঙ্গজেব এর মৃত্যুর পর পরই (১৭০৭) কেন্দ্রীয় সরকারের দুর্বলতা এবং বাংলার রাজস্বের ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরতার কারণে সুবাহ ও বাংলায় অর্ধ স্বাধীন নওয়াবী আমলের সূচনা হয়। তখন থেকে সুবাহদারি বংশানুক্রমিক হয়ে পড়ে এবং নওয়াবী দখলের দ্বন্দ্বে সফল ব্যক্তি সম্রাটের নিকট থেকে স্বীকৃতির দলিল হিসেবে ফরমান আদায় করতেন। এক কালের ঐশ্বর্যশালী বাংলায় সুবাহদারি লাভের প্রতিযোগিতায় ও ষড়যন্ত্র পাল্টা ষড়যন্ত্রে নওয়াবের ক্ষমতা নিদারুণভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সুযোগ বুঝে ইংরেজ  ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলা সুবাহয় ক্ষমতা দখল করে। এ সময়ে বিহার ও  ঊড়িষ্যা সুবাহ-বাংলার অন্তর্ভুক্ত ছিল। বাংলা প্রদেশে সুবাহদার ছাড়াও দীউয়ান,  বখশী, সদর, কোতোয়াল, মীরবহর এবং ওয়াকিয়ানবিস প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা নিয়োজিত ছিলেন।

অর্থবিভাগের প্রধান হিসেবে প্রাদেশিক দীউয়ানের মুখ্য কাজ ছিল রাজস্ব প্রশাসনের খবরদারি করা। সুবাহদারের ন্যায় দীউয়ানও কেন্দ্রীয় দীউয়ানের সুপারিশক্রমে সম্রাট কর্তৃক নিয়োজিত হতেন। এবং কেন্দ্রীয় দীউয়ান সরাসরি তাঁর কাজের তদারক করতেন। দীউয়ান কোন ভাবেই সুবাহদারের অধীনস্থ ছিলেন না। সুবার আয়-ব্যয় নিয়ন্ত্রণের ভার ছিল তাঁর উপর। দীউয়ানের এ সুবিধাজনক অবস্থান সুবাহদারকে প্রয়োজনীয় অর্থ-প্রাপ্তির জন্য তাঁর উপর নির্ভরশীল করে তোলে। এ ভারসাম্য নীতির ফলে দীউয়ান প্রাদেশিক নির্বাহী কর্মকর্তা সুবাহদারের অধীনে হওয়া সত্ত্বেও তাঁর নিয়ন্ত্রণমুক্ত ছিলেন। অনেক সুবাহদার এ ব্যবস্থা পছন্দ করতেন না এবং সময়ে সময়ে তাদের মধ্যে সংঘাত দেখা দিত এবং তা নিরসনের জন্য সম্রাটকে হস্তক্ষেপ করতে হতো।  মুর্শিদকুলী খান এর সময় থেকে (১৭১৭-১৭২৭) সম্রাট কর্তৃক দীউয়ান নিয়োগের প্রথা বন্ধ হয়ে যায় এবং তিনি নিজে দীউয়ান ও সুবাহদার উভয় দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীকালে সম্রাটের নামমাত্র সম্মত্তি নিয়ে নওয়াব সুবাহদার প্রাদেশিক দীউয়ান নিযুক্ত করতেন। প্রকৃতপক্ষে এ সময় থেকে সুবাহ-বাংলার উপর সম্রাটের ক্ষমতা বিলুপ্ত হয়ে যায়।

ভূমি প্রশাসনকে কার্যকর করার জন্য দীউয়ান গ্রাম প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র পরগনার রাজস্ব কর্মচারীদের ওপর সদা সতর্ক দৃষ্টি রাখতেন। তাঁর দফতরে পরগনা হতে পাঠানো সকল প্রকার রাজস্ব নির্ধারণ ও সংগ্রহের বিবরণ কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর জন্য নিরীক্ষা, পুনর্বিন্যাস ও সারাংশ তৈরি করা হতো। রাষ্ট্রের পাওনা নির্ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্যাবলি দীউয়ানের কার্যালয়ে সংরক্ষিত থাকত। কৃষকদের সঙ্গে যথাযথ আচরণ এবং চাষিদের সকল প্রকার উৎসাহ দেওয়ার জন্য দীউয়ানের ওপর বিশেষ নির্দেশ ছিল।

মীর বখশীর (কেন্দ্রীয় বখশী) প্রাদেশিক প্রতিরূপ ছিল বখশী। তিনি সামরিক বাহিনীর প্রশিক্ষণ, দক্ষতা ও শৃংখলার তত্ত্বাবধান করতেন এবং তাঁর সুপারিশক্রমেই দীউয়ান তাদের বেতন দিতেন। সামরিক ব্যাপারে সুবাহদার তাঁর পরামর্শ নিতেন এবং প্রয়োজনে অভিযানের ব্যবস্থাদি সম্পন্ন করার দায়িত্বও তাঁর ওপর পড়ত। বখশীর মাধ্যমে ওয়াকিয়ানবিসের প্রতিবেদন কেন্দ্রীয় সরকারের নিকট পাঠানো হতো।

প্রাদেশিক সদর ধর্মীয় বিষয়াবলি দেখাশোনা করতেন। কাজীর অনুপস্থিতিতে সদরের ওপর বিচার কাজ সম্পন্ন করার দায়িত্ব পড়ত। ধর্ম, শিক্ষা ও অন্যান্য দাতব্য প্রতিষ্ঠানের লাখেরাজ জমি বরাদ্দের জন্য কেন্দ্রীয় সদরের নিকট তিনি সুপারিশ পাঠাতেন।

পুলিশ প্রশাসনের প্রধান হিসেবে কোতোয়াল প্রধানত অভ্যন্তরীণ শান্তি ও নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন। বিভিন্ন জায়গায় নিয়োজিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে তিনি রাজধানী, শহর, নগর ও বন্দরে বদলোক ও আগন্তুকদের গতিবিধির ওপর নজর রাখতেন।

প্রদেশে নিযুক্ত  মীর বহর নাওয়ারার (ক্ষুদ্র জাহাজের বহর) প্রধান ছিলেন। তাঁকে নদী ও সমুদ্রসমূহ ভাল অবস্থায় রাখতে হতো। তিনি নদীপথ পাহারা ও তত্ত্বাবধানের ব্যবস্থা করতেন এবং তাঁকে ক্ষুদ্র জাহাজের বহর কার্যপোযোগী করে রাখতে হতো। নদীমাতৃক বাংলায় নওয়ারার বহুল ব্যবহার ও প্রয়োজন ছিল। মীর বহর প্রায়ই সুবাহদার ও বখশীকে নৌ-বহরের যোগান দিয়ে সাহায্য করতেন। ওয়াকিয়ানবিস প্রদেশে সংঘটিত ঘটনাবলির বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারকে জ্ঞাত রাখতেন। বহু সংখ্যক সওয়ানিহনবিসের (গুপ্ত সংবাদ দাতা) সহায়তায় ওয়াকিয়ানবিস কেন্দ্রে গুপ্ত প্রতিবেদন পাঠাতেন।

প্রশাসনিক বিভাগের মধ্যে সরকার এবং পরগণা উল্লেখযোগ্য। মুগল আমলে সুবাহ-বাংলা ১৯টি সরকারে বিভক্ত ছিল। এর প্রতিটি এক একজন ফৌজদারের (সামরিক প্রধান) অধীনে ন্যস্ত থাকত। উজিরের পরামর্শে সম্রাট কর্তৃক ফৌজদার নিযুক্ত হতেন। তিনি শান্তি রক্ষা ও সম্রাটের নির্দেশাবলি বাস্তবায়নের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। সুবাহদারের তত্ত্বাবধানে ফৌজদার অবাধ্য জমিদার ও রায়তদের (কৃষকদের) নিকট থেকে রাজস্ব আদায়ের ব্যাপারে কর আদায়কারীদের সহায়তা দিতেন।

প্রতিটি সরকার অনেকগুলি পরগণায় বিভক্ত ছিল এবং আঠারো শতকের প্রথম দিকে মুর্শিদকুলী খান যখন বাংলায় দীউয়ান হন তখন এখানে ৬২৮টি পরগনা ছিল বলে জানা যায়। পরগনা ছিল মুখ্যত রাজস্ব বিভাগ। এক একটি পরগনার প্রধান ছিলেন আমিল এবং তাঁর সহায়তায় ছিলেন আমিন, কারকুন ও কানুনগো। রাজস্ব আদায়ের সঙ্গে আইন শৃংখলা পরিস্থিতি সংশ্লিষ্ট ছিল বলে পরগনা কর্মচারীগণকে প্রশাসনিক কাজকর্ম করতে হতো। তারা ছাড়াও সেখানে চৌধুরী নামধারী ব্যক্তিবর্গ ছিল যারা প্রধানত কৃষকদের প্রতিনিধি হিসেবে তাদের অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা নিয়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখত। অপরদিকে মুকাদ্দম (গ্রাম প্রধান) রাজস্ব কর্মচারীদের সহজে খাজনা আদায়ের ব্যাপারে এবং স্থানীয়ভাবে শান্তি-শৃংখলা বজায় রাখতে সাহায্য করত।

রাজস্ব ব্যবস্থার লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ ব্যতীত মধ্যযুগীয় বাংলার প্রশাসন ব্যবস্থার বর্ণনা অপূর্ণ থেকে যায়। প্রচলিত স্থানীয় প্রথা ও সুলতানি আমলে প্রবর্তিত রাজস্ব ব্যবস্থার উপর ভিত্তি করে মুগলগণ ব্যাপক ভিত্তিক প্রশাসন গড়ে তোলে। মুগল আর্থিক ব্যবস্থাপনার মূল ভিত ভূমি-রাজস্ব হওয়ার কারণে ভূমি সংক্রান্ত বিষয়াদিতে শাসকগণ যথাযথ মনোযোগ নিবদ্ধ রাখতেন। দেশের সমৃদ্ধি কৃষককূলের কল্যাণের উপর নির্ভরশীল এ সত্যটি শাসকবর্গ উপলব্ধি করেন। এ জন্য তাঁরা কৃষকদের সুযোগ সুবিধা ও স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য সর্বাধিক যত্ন নিতেন এবং তাদেরকে অধিকতর ভূমি চাষের আওতায় আনার জন্য উৎসাহিত করতেন।

ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় বাংলার ভূমিব্যবস্থা ভিন্নতর ছিল। এখানে সরকার সরাসরি ভূমি নিয়ন্ত্রণ করত না। বাংলার ভূমি সমতল, নদী বহুল ও বর্ষাকালে পানির নিচে থাকার কারণে ভূমি সংক্রান্ত সঠিক তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ খুব কঠিন ছিল।   তদুপরি বাংলার বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ভৌগোলিক গঠন ও জলবায়ূ যাতায়াত ব্যবস্থা ও সামরিক চলাচল কঠিন বিধায় সুবাহ-বাংলায় ভূমি রাজস্ব আদায়ের জন্য মুগল সরকার অনেক রকমের মধ্যস্বত্ত্বভোগী প্রতিনিধি নিয়োগ করে যাদের সাধারণ নাম দেয় হয় জমিদার। সম্ভবত অনুরূপ ব্যবস্থার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য ছিল বিজয়ী শাসক এবং বিজিত নেতাদের মধ্যকার দূরত্ব কমিয়ে বিজেতা বিজিত সম্পর্ক সুদৃঢ় করা। মধ্যস্বত্ত্বভোগী ও ছোট মাপের জমিদারদের অবস্থান সরাসরি প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনা হয়। তাদের ক্ষমতা ও দায়দায়িত্ব সম্রাটের সনদে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ থাকত। ফারসি ভাষায় যদিও ‘জমিদার’ শব্দের আভিধানিক অর্থ ‘ভূমির অধিকারী’, সুবাহ-বাংলায় কিন্তু জমিদারেরা ভূমির অধিকারী ছিল না। তারা কেবল বন্দোবস্তকৃত ভূ-খন্ডের রাজস্ব আদায়ের অধিকার পেত। এভাবে, জমিদারগণ, বিশেষ করে বংশগত জমিদারগণ বংশগতভাবে, ভূমি-রাজস্বের মালিকরূপে গণ্য হয়, যদিও ভূমির উপর তাঁদের মালিকানার অধিকার কখনও ছিল না। প্রকৃতপক্ষে জমির অধিকারী ছিল ‘রায়ত’ শ্রেণী।

সরকারি আয়ের প্রধান উৎস ভূমি-রাজস্ব ব্যতীত মধ্যস্বত্বাধিকারী কর আদায়কারিগণ ‘সায়ের’ নামে শুল্ক ও কর আদায় করত। সাধারণভাবে ঘাট বা চৌকি এবং হাট-বাজার থেকে আদায়কৃত হলেও বিক্রয় স্থলে বাজার সুবিধা ভোগের জন্য সকল প্রকার মালামালের উপরই সায়ের ধার্য করা হতো। সরকারী রাজস্বের আরেক উৎস ছিল ‘বাজে-জমা’। জরিমানা, বাজেয়াপ্তকৃত সম্পদ এবং মৌলভী ও ব্রাহ্মণদের দেয় বিবাহ কর, মাদক দ্রব্য বিক্রি, চারণ ভূমি ব্যবহার, কাঠ কাটা প্রভৃতির জন্য ধার্য শুল্কের একক নাম বাজে-জমা।

প্রত্যেক অর্থবছরের প্রথমে দুটি বন্দোবস্ত সম্পাদন করার নিয়ম ছিল। প্রথমটির নাম সদর বন্দোবস্ত। এটি সম্পাদিত হতো জমিদার ও সরকারের মধ্যে। আর দ্বিতীয়টির নাম মফস্বল বন্দোবস্ত যা সম্পাদিত হতো রায়ত ও জমিদারের মধ্যে। জমিদারের প্রদেয় করের পরিমাণ কর তালিকায় নির্দিষ্ট করা থাকলেও কৃষকদের উপর কর ধার্য করতো জমিদার নিজে এবং এর ভিত্তি ছিল স্থানীয় প্রথা। ভূমির উৎপাদন ক্ষমতা, মজুরি হার, সেচের সুযোগ-সুবিধা এবং সামাজিক ও ভূমি সংক্রান্ত প্রথার জন্য আরোপিত করের তারতম্য হত। কিন্তু আসল বা মূল খাজনা উৎপাদিত ফসলের ১/৩ বা ১/২ অংশ হিসেবে ধার্য করা হতো। রাজকীয় ফরমানে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ নিষিদ্ধ ছিল, দুস্থ রায়তদের কৃষি উপকরণ, বাসন-কোসন, বীজ এবং তাকাভি (ঋণ) প্রভৃতির মাধ্যমে সহায়তা দেওয়ার জন্যও এতে জোর নির্দেশ থাকত। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, টোডরমল এবং মুর্শিদকুলীর সময়কার মধ্যে বিবিধ আবওয়াব (নানান শুল্ক) এবং মাথট (মাথা পিছু দেয় কর) কৃষকের ওপর আরোপিত করের বোঝা বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। মুর্শিদকুলী খানের সময়ে প্রতি বিঘা বা কানিতে দশ আনা হারে আরোপিত কর ১৭৬১ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ বেশি না হোক কমপক্ষে দুই টাকায় বর্ধিত হয়। আবওয়াব এবং মাথট ছাড়া প্রতি বিঘায় খাজনার পরিমাণ বাইশ টাকার কম ছিল না। ঐগুলি পৃথকভাবে আদায় করা হতো।

রাজস্ব ছিল মুগল প্রশাসনের সর্বাধিক সংঘটিত বিভাগ। এর লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য ছিল বহুমাত্রিক ব্যবস্থাপনা। কেন্দ্রে দীউয়ান-ই-সুবাহ থেকে শুরু করে গ্রাম পর্যায়ে পাটওয়ারী পর্যন্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের রাজস্ব আদায় ও ব্যয়ে সুসংজ্ঞায়িত দায়-দায়িত্ব ন্যাস্ত ছিল। খাজনা আদায় নিশ্চিত করণ ও তা নিয়মিত কর্তৃপক্ষের নিকট প্রেরণের দায়িত্ব ছিল ফৌজদারের। অপরদিকে কানুনগোর দফতর গ্রাম, জমি, খাজনার পরিমাণ, বিক্রির দলিল এবং বহুবিধ স্থানীয় আচার-আচরণ, এবং অনেক ক্ষেত্রে জমি অঘোষিত রাখা বা অবৈধভাবে হস্তান্তর করা, রায়তদের উপর অধিক করের বোঝা চাপানো প্রভৃতির বিস্তারিত বিবরণ নথিবদ্ধ করে জমিদার, তালুকদার ও অন্যান্য খাজনা আদায়কারীদেরকে ক্ষমতা অপব্যবহার করা থেকে বিরত রাখত। আবার প্রতি সরকারে রাজস্ব আদায় ও তত্ত্বাবধানের জন্য একজন করে আমিল থাকত। তাকে সহায়তার জন্য ছিল অধস্তন  আমিল,  শিকদার, আমিন, বিতিকচি, মুন্সিফ, থানাদার, পাটওয়ারী এবং অন্যান্যরা। মুর্শিদকুলী খানের সময় থেকে আমিলের গুরুত্ব বাড়তে থাকে। তিনি যখন প্রদেশের দীউয়ান সুবাহদার ছিলেন তখন রাজস্ব বিভাগে কিছু উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনা হয়। তাঁর ‘মাল-জামিনী’ প্রথার মাধ্যমে (১৭২২) তিনি রাজস্ব আয় বাড়ানোর এবং রাজস্ব খেলাপীদের নিয়ন্ত্রণে আনার প্রয়াস পান। বাংলার অনেক উর্বর জায়গির-ভূমি তিনি অধিগ্রহণ করে জায়গীরদারদেরকে ঊড়িষ্যাতে কম উর্বর ভূমি বরাদ্দ দেন। এভাবে অনেক উর্বর জমি রাজস্ব আরোপের আওতায় এসে যায়। তদুপরি তিনি ভূমি জরিপ করান এবং কয়েক বছরের গড় নিয়ে দেয় রাজস্ব নির্ধারণ করেন। আমিল নিযুক্ত করে কঠোর তত্ত্বাবধানের মাধ্যমে তিনি নির্ধারিত রাজস্ব আদায় করান। রাজস্ব আদায়ের খরচ কমানো ও দ্রুত খাজনা পাওয়ার জন্য তিনি সমগ্র সুবাকে ১৩টি চাকলায় (রাজস্ব বিভাগ) ভাগ করেন এবং ছোট জমিদারদের বড় জমিদারের অধীন করে বড় জমিদারদের চাকলাদার হিসেবে নিয়োগ দেন। বাস্তবিক পক্ষে তিনি নতুন চাকলাদারদের দায়িত্ব দিয়ে বহু পুরানো জটিল রাজস্ব ব্যবস্থাপনা পরিহার করে কোন ব্যর্থতা ছাড়াই সরকারি পাওনা পুরাপুরি আদায় করতে চেয়েছিলেন।

উপনিবেশিক যুগ  প্রাক-উপনিবেশিক ও উপনিবেশিক প্রশাসনের মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য এই যে, প্রাক-উপনিবেশিক প্রশাসনিক কাঠামো ছিল মূলত চলমান এবং পূর্ব নির্ধারিত, কিন্তু উপনিবেশিক প্রশাসনিক কাঠামো ছিল পরিবর্তনশীল এবং রাজস্বমুখী। উপনিবেশিক রাষ্ট্রের ব্যবস্থায় ক্রমাগত পরিবর্তন হয়েছে। বাংলায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এর উপনিবেশিক রাজ্য প্রতিষ্ঠার আদি লক্ষ্য ছিল মূল্যবান ধাতুর জন্য ইংরেজ সরকারের ওপর নির্ভর না করে এ অঞ্চলে ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার বৃদ্ধি করা। তাই দেখা যায় যে, পুরো প্রশাসনকেই তখন ক্রমবর্ধমান রাজস্ব বৃদ্ধির কাজে নিয়োজিত। ১৭৮৪ সাল থেকে পার্লামেন্টের চাপে প্রশাসনের এ পদ্ধতি পরিবর্তন করা হয়। ১৭৮৪ সালের পিট-এর ভারত আইন কোম্পানিকে সুশাসনের প্রতি দৃষ্টি প্রদানের জন্য নির্দেশ দেয়। এরই প্রতিফলন পাওয়া যায় ১৭৯৩ সালের কর্নওয়ালিস কোড-এ। তবে তা শুধু বাংলার ওপরই প্রযোজ্য থাকে। উনিশ শতকের প্রথম নাগাদ সারা ভারতে উপনিবেশিক শাসন প্রসারিত করার ফলে উপনিবেশিক প্রশাসন ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা হয়। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে লর্ড কর্নওয়ালিস কর্তৃক প্রবর্তিত সর্ব-শ্বেতাঙ্গ শাসনের সম্ভাব্যতা চলে যায়। সাম্রাজ্যকে টিকিয়ে রাখার জন্য ভারতীয়দেরকে প্রশাসনে সম্পৃক্ত করতে হয়েছে। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিপ্লব প্রয়োজনীয় সংস্কারকে অপরিহার্য করে তোলে।

উপনিবেশিক শাসনের পরবর্তী অর্ধশতককালে সাংগঠনিক এবং আদর্শগতভাবে উপনিবেশিক প্রশাসন পদ্ধতিতে ব্যাপক পরিবর্তন সাধন করতে হয়। ভারতীয় প্রশাসনে সমকালীন ইংরেজ প্রশাসনের উদারনীতির চিন্তাধারা প্রবর্তনের প্রচেষ্টা নেওয়া হয়। পশ্চিমা প্রতিনিধিত্বমূলক বিধিবিধানসমূহ এ প্রত্যয় নিয়ে চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয় যে, কালক্রমে ভারত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের একটি ডমিনিয়ন হবে এবং চিরকাল এর অংশ হয়ে থাকবে। কিন্তু জাতীয়তাবাদ ও বৈপ্লবিক সন্ত্রাসবাদের প্রতিষ্ঠা এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের পতন সংঘঠিত হয় পর্যায়ক্রমে। ইংরেজ শাসনের শেষ অর্ধশতককালে প্রশাসন ক্ষেত্রে নানাবিধ শাসনতান্ত্রিক সংস্কার সাধন করা হয় যার চরম পরিণতি ছিল ১৯৪৭ সালের ভারত স্বাধীনতা আইন।

দ্বৈতশাসন (১৭৬৫-১৭৭১)  নওয়াব অথবা কোম্পানি কেউই বাইরের সহায়তা ছাড়া স্ব স্ব দায়িত্ব পালনে সমর্থ ছিল না। নওয়াব নাজমুদ্দৌলা ছিলেন নাবালক এবং কোম্পানির ছিল না সরাসরিভাবে প্রশাসনিক দায়িত্ব গ্রহণের জন্য কোন অভিজ্ঞতা অথবা লোকবল। তাই রবার্ট ক্লাইভ দ্বৈত পদ্ধতির মাধ্যমে সমাধান খুঁজে পেলেন। সৈয়দ মুহম্মদ রেজা খানকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নামে দীউয়ান নিয়োগ করা হয়। রবার্ট ক্লাইভ তার রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নাবালক নওয়াবের তরফ থেকে রেজা খানকে নায়েব নাজিম হিসেবেও নিয়োগ দেন। তাই একদিকে দীউয়ান ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং অন্যদিকে নাবালক নাজিম নওয়াব নাজমুদ্দৌলার মধ্যে যোগসূত্র স্থাপনকারী হিসেবে রেজা খান দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। কোম্পানির নায়েব দীউয়ান হিসেবে রেজাখানকে কোম্পানির রাজস্ব সংক্রান্ত নিষ্পত্তি ও আদায়ের যাবতীয় কাজ করতে হতো। একইভাবে নায়েব নাজিম হিসেবে তাকে দায়িত্বপালন করতে হতো নিজামত প্রশাসনেরও। রবার্ট ক্লাইভের পদ্ধতি মোতাবেক প্রকৃত ক্ষমতা যায় কোম্পানির হাতে, কিন্তু নায়েব নাজিমের ওপর অর্পিত হয় পুরো দায়িত্ব। অন্যভাবে বলতে গেলে বলা যায় যে, কোম্পানিকে দেওয়া হয় পুরো ক্ষমতা, কিন্তু ছিল না কোন দায়িত্ব এবং নায়েব নাজিম ও নায়েব দীউয়ানকে প্রদত্ত হয় পুরো দায়িত্ব কিন্তু ছিল না কোন প্রকৃত ক্ষমতা। এ পদ্ধতি মোতাবেক ফোর্ট উইলিয়ম কর্তৃপক্ষ চুক্তি অনুযায়ী সম্রাট ও নাজিমকে প্রদত্ত নির্ধারিত পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করার পর বাংলা ও বিহারের উদ্বৃত্ত রাজস্বের সবটাই পাবে।

রেজা খানকে প্রধান করে ঐতিহ্যবাহী দেশিয় সংস্থাসমূহের মাধ্যমে রবার্ট ক্লাইভের দীউয়ানী প্রশাসন ব্যবস্থাপনায় প্রকৃতপক্ষে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সার্ভিস ও ব্যবস্থাপনা ক্ষেত্রে তেমন কোন কিছু বিনিয়োগ না করেই কিছুটা বিনা পরিশ্রমে বাড়তি আয়ের সুযোগ পায়। রবার্ট ক্লাইভের ১৭৬৭ সালে বাংলা ত্যাগ করা পর্যন্ত তার প্রণীত পদ্ধতি মোতাবেক কাজ চলে। কিন্তু ফোর্ট উইলিয়মে তার উত্তরাধিকারীরা এ পদ্ধতি কার্যকরভাবে চালিয়ে যেতে ভীষণভাবে ব্যর্থ হয়। কোম্পানি কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত ব্যবসার কারণে দেশিয় ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রভূত ক্ষতি সাধন হয়। কোম্পানির স্বার্থে রাজস্ব বৃদ্ধি করতে এবং কঠোরভাবে তা আদায়ের জন্য রেজা খানের উপর অত্যধিক চাপ প্রয়োগ করা হয়। রেজা খান এ ধরনের রাজস্ব নীতির ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে কোম্পানির কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করতে দ্বিধা করেন নি। কিন্তু দেশের অর্থনীতির কথা বিবেচনা না করে কোম্পানি তার রাজস্ব বৃদ্ধির নীতিতেই স্থির প্রতীজ্ঞ থাকে। ফলে দেশের রাজস্ব আদায়ের উৎসসমূহ ভীষণভাবে কমে যায়। ফোর্ট উইলিয়ম কর্তৃপক্ষ রাজস্ব আদায়ের এ অবনতির জন্য রেজা খানকে দায়ী করেন এবং নায়েব দীউয়ানের কর্মচারীদের কার্যকলাপের তত্ত্ববধান করার জন্য ১৭৬৯ সালে প্রতিটি রাজস্ব জেলায় ইউরোপীয় তত্ত্বাবধায়ক নিয়োগ করা হয়। এ জেলা তত্ত্বাবধায়কগণ স্থানীয়ভাবে নিজেরাই একচেটিয়া ব্যবসায়ী রূপে পরিগণিত হন। ফলে ১৭৬৯-৭০ সালে দেখা দেয় মহা দুর্ভিক্ষ।

এ পরিস্থিতিতে ১৭৭২ সালের মে মাসে কোর্ট অব ডাইরেক্টর্স এক ঘোষণা বলে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দীউয়ানি প্রশাসনভার সরাসরি কোম্পানির হাতে নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং রাজস্ব সংক্রান্ত নিস্পত্তি ও রাজস্ব আদায়ের একটা যথাযোগ্য ব্যবস্থা প্রণয়নের জন্য প্রত্যয় ব্যক্ত করে। ফোর্ট উইলিয়মের গভর্নর ওয়ারেন হেস্টিংসকে সরকারের জন্য একটা নতুন পদ্ধতি প্রণয়নের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়। নায়েব দীউয়ান রেজা খানের অফিসকে অবলুপ্ত করা হয়। হেস্টিংস দীউয়ানি অফিস মুর্শিদাবাদ থেকে কলকাতায় স্থানান্তরিত করেন এবং কলকাতায় রাজস্ব সংক্রান্ত একটি কমিটি গঠন করেন। মফস্বল কানুনগোদের অফিসসমূহ তুলে দেওয়া হয়। হেস্টিংস রাজস্ব প্রশাসনের জন্য বাংলাকে অনেকগুলি জেলায় বিভক্ত করেন এবং প্রতিটি জেলা একজন ইউরোপীয় জেলা কালেক্টরের অধীনে ন্যস্ত করেন। তাকে সহায়তা করবেন একজন দেশিয় দীউয়ান অথবা অর্থনৈতিক উপদেষ্টা। কাউন্সিলের চারজন কনিষ্ঠ সদস্য নিয়ে গঠিত হয় একটি কমিটি অব সার্কিট। কমিটি অব সার্কিট সর্বোচ্চ রাজস্ব প্রদানকারীকে পাঁচ বছরের জন্য ভূসম্পত্তি ইজারা দেয় জমিদারদের দাবিদাওয়ার প্রতি কোন তোয়াক্কা না করে। কোম্পানি আশা করেছিল যে, এ ইজারা পদ্ধতি বাংলার ভূসম্পত্তির প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করতে সক্ষম হবে।

ওয়ারেন হেস্টিংসের এ সমস্ত ব্যবস্থায় একটা জিনিস পরিষ্কার হয়ে যায় যে, কোম্পানি তখন থেকে বাংলায় একটি নিয়মিত রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। হেস্টিংস একজন সার্বভৌম কর্তৃপক্ষ হিসেবে আচরণ করতে শুরু করেন। বস্ত্তত তিনি এমনও দাবি করতে শুরু করেন যে, কোম্পানিই দেশের সার্বভৌম কর্তৃপক্ষ। সম্রাটকে নির্ধারিত হারে অধীনতার নির্দশনস্বরূপ কর দেওয়া বন্ধ করে এবং নওয়াবকে প্রদত্ত ভাতার পরিমাণ কমিয়ে দিয়ে প্রকৃত সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। হেস্টিংস প্রশাসন নিজামতের কার্যপরিধির ক্ষেত্রে ক্রমাগতভাবে অধিক পরিমাণে হস্তক্ষেপ করে নওয়াবকে অনেকটা তুচ্ছ বা ক্ষমতাহীন ব্যক্তিত্বে পরিণত করে।

কিন্তু হেস্টিংসের ব্যবস্থা কাউন্সিলের অধিকাংশ সদস্যের বিরোধিতার কারণে স্থগিত থাকে। সার্বভৌম ক্ষমতাকে অস্বীকার করা হয়। নিজামত ক্ষমতাসমূহ পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে এনে রেজা খানকে পুনর্বহাল করা হয়। কলকতায় রাজস্ব সংক্রান্ত বিষয়ে একটা নিয়ন্ত্রণকারী কাউন্সিল প্রতিষ্ঠা করে রাজস্ব প্রশাসনকে আরও বেশি কেন্দ্রীভূত করা হয় এবং কলকাতা, মুর্শিদাবাদ, পাটনা, ঢাকা, বর্ধমান এবং দিনাজপুরে ছয়টি অধীনস্থ প্রাদেশিক কাউন্সিল প্রতিষ্ঠা করা হয়। জেলা কালেক্টরদের পদ বিলুপ্ত করা হয় এবং তাদের স্থলে রাজস্ব আদায় ও বিচার ব্যবস্থা পরিচালনার জন্য নিয়োগ করা হয় স্থানীয় আমিলদের।

এ নতুন ব্যবস্থাপনার ফলাফলও সুবিধাজনক হয় নি। বকেয়া রাজস্বের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় এবং রাজস্ব তহবিল তছরুপের ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়ায় রাজস্ব আদায় অনেকটা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। সারা দেশে কৃষির অবস্থারও অবনতি ঘটতে থাকে। ১৭৭৬ সালে কৃষি ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। আদালতের নির্দেশ মোতাবেক সরকার রাজস্ব ব্যাপারে শুধু জমিদারদের সঙ্গে এক থেকে তিন বছরের এক চুক্তিতে আবদ্ধ হয়। ১৭৮১ সালে বাংলার ছয়টি প্রদেশের প্রতিটিতে একজন বেসামরিক ব্যক্তিকে প্রধান করে একটি প্রাদেশিক দীউয়ানি আদালত গঠন করা হয়।

১৭৮৪ সালের পিটের ভারত আইনের ধারা মোতাবেক বাংলার সরকারকে প্রশাসনিক ব্যাপারে আর কোন পরীক্ষা-নিরীক্ষা পরিচালনা করা থেকে বিরত থাকার এবং দেশ পরিচালনার জন্য স্থায়ী আইন-কানুন প্রণয়ন করার জন্য কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়। উক্ত আইনে পরিষ্কারভাবে বলা হয় যে, বাংলা ব্রিটিশ রাজ্যের অংশ এবং সে কারণে এর সুষ্ঠু শাসন পরিচালনা করাই হবে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রধান কর্তব্য। ব্রিটিশ পার্লামেন্ট লর্ড কর্নওয়ালিসকে প্রায় সর্বময় ক্ষমতা প্রদান করে গভর্নর জেনারেল-ইন-কাউন্সিল নিযুক্ত করে। কর্নওয়ালিস চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ও আইন ব্যবস্থার সংস্কারসহ কাঙ্ক্ষিত সংস্কারমূলক কর্মসূচি গ্রহণের উদ্যোগ নিবেন বলে আশা করা হয়। কর্নওয়ালিস তাঁর পূর্ববর্তী আমলে গৃহীত সাময়িক প্রশাসনিক ব্যবস্থাসমূহের ইতি টানেন। তার পূর্বসূরিদের ন্যায় তিনিও রাজস্ব ও স্থানীয় প্রশাসনক্ষেত্রে কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান। কিন্তু শীঘ্রই তিনি উপনিবেশিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা ও প্রশাসন সর্ম্পকে একটা দৃঢ় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। কর্নওয়ালিস নওয়াবকে পেনশন প্রদান করে নিজামত প্রতিষ্ঠান তুলে দেন এবং নওয়াবের অন্যান্য ক্ষমতা নিজের হাতে তুলে নেন। তিনি প্রশাসন এবং রাষ্ট্রের কার্যপ্রণালী সংক্রান্ত বিধিসমূহ বিস্তারিতভাবে প্রবর্তন করেন। তাঁর প্রণীত ও প্রবর্তিত প্রশাসন পদ্ধতি ও নিয়মনীতি কর্নওয়ালিস কোড নামে পরিচিত।

১৭৯৩ সালের মে মাসে কর্নওয়ালিস কর্তৃক প্রবর্তিত ৪৮টি প্রবিধান সমন্বয়ে কর্নওয়ালিস কোড গঠিত। এ ধারাগুলি ছিল প্রতিষ্ঠানসমূহের নিজ নিজ কাঠামো ও তাদের বিস্তারিত নিয়ম নীতি সংক্রান্ত। কর্নওয়ালিসের ব্যবস্থাধীনে অন্তর্ভুক্ত প্রধান প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে নিম্নরূপে বর্ণনা করা যায়:

১৭৯৩ হতে রাজস্ব প্রশাসন  রাজস্ব আদায়ই ছিল উপনিবেশিক প্রশাসন ব্যবস্থার প্রধান কাজ। কর্নওয়ালিস কর্তৃক যে সমস্ত আইনকানুন ও প্রশাসনিক রীতিনীতি প্রণয়ন করা হয়েছে তার অধিকাংশই রাজস্ব প্রশাসনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষ ভাবে সংশ্লিষ্ট। কর্নওয়ালিসের রাজস্ব প্রশাসনের ভিত্তিই ছিল স্থায়ী বন্দোবস্ত। প্রকৃতপক্ষে, তার চিন্তাধারা ও পরিকল্পনাপ্রসূত পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থাই ছিল এ পদ্ধতিকে ভিত্তি করে। এ পদ্ধতিতে ভূসম্পত্তির ক্ষেত্রে ব্যক্তি মালিকানার রীতি প্রচলন করা হয় এবং জমিদারদেরকে দেওয়া হয় মালিকানা। জমিদারদের মালিকানার অধিকার প্রয়োজনীয় আইন ও সংস্থা দ্বারা রক্ষা করা হয়। জমির সর্বসত্ত্ব মালিক হিসেবে জমিদারদেরকে তাদের ভূসম্পত্তির ক্রয়-বিক্রয় ও দান করা, বন্ধক দেওয়া প্রভৃতি সব ধরনের অধিকারই দেওয়া হয়। সরকারি রাজস্বের পরিমাণ স্থায়ীভাবে নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। রাজস্ব আদায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য, সময়মত রাজস্ব প্রদানে ব্যর্থ জমিদারদের সম্পত্তি দ্রুত প্রকাশ্যে বিক্রি করে দেওয়ার বিধান রাখা হয়। জমিদারদের সব ঐতিহ্যগত প্রশাসনিক, বিচার বিভাগীয় এবং সামরিক ক্ষমতা ও সুযোগ সুবিধা থেকেও বঞ্চিত করা হয়। রাজস্ব এবং রাজস্ব সংক্রান্ত বেসামরিক প্রশাসন বিষয়ক পুরো দায়িত্ব অর্পণ করা হয় তিন সদস্য বিশিষ্ট বোর্ড অব রেভিনিউ-এর উপর। অপ্রাপ্তবয়স্কতা, অসচ্চরিত্রতা, মস্তিষ্কবিকৃতি, উত্তরাধিকার সংক্রান্ত জটিলতা প্রভৃতি কারণে ভূসম্পত্তির অধিকার বিষয়ক জটিলতা নিরসনের জন্য প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল একটি ‘কোর্ট অব ওয়ার্ড’।

বেসামরিক প্রশাসন কর্নওয়ালিসের আগমনের পূর্ব পর্যন্ত বেসামরিক কর্মকর্তাগণ প্রকাশ্যে অথবা গোপনে বিভিন্ন ব্যবসা বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। কর্মকর্তাদের বেতন ছিল খুব কম তাই তাদেরকে ব্যবসা বাণিজ্য করে অথবা অন্য কোন উপায়ে টাকা রোজগারের সুযোগ দেওয়া হতো। এছাড়াও জেলা কালেক্টরদেরকে তাদের স্বাভাবিক বেতনের অতিরিক্ত হিসেবে রাজস্ব আদায়ের জন্য কমিশন দেওয়া হতো। মফস্বলে কর্মরত ব্যবসা বাণিজ্যের দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তাদেরকে সাময়িক প্রশাসনিক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। কর্নওয়ালিস এ সমস্ত ক্ষতিকর অসামঞ্জস্যগুলি রহিত করে দেন। তিনি প্রশাসন থেকে ব্যবসাবাণিজ্য আলাদা করে ফেলেন। বোর্ড অব রেভেনিউ-এর উপর প্রশাসনিক দায়িত্ব অর্পণ করেন এবং বাণিজ্য সংক্রান্ত দায়িত্ব অর্পণ করেন বোর্ড অব ট্রেড-এর উপর। প্রশাসনে নিয়োজিত কর্মকর্তাদেরকে কখনও কোম্পানির ব্যবসা বাণিজ্য বিষয়ক বিভাগে বদলি করা হতো না। একইভাবে ব্যবসা বাণিজ্য বিভাগে নিয়োজিত কর্মকর্তাদেরকে বদলি করা হতো না প্রশাসন বিভাগে। তিনি প্রশাসন সার্ভিসে দুটি ক্যাডার সৃষ্টি করেন- ‘কভিনেন্টেড’ এবং ‘আনকভিনেন্টেড’। কভিনেন্টেড কর্মকর্তাদেরকে নির্বাচিত করত কোর্ট অব ডাইরেক্টর্স এবং ফোর্ট উইলিয়ম সরকার নির্বাচিত করত আনকভিনেন্টেড কর্মকর্তাদেরকে। বেসামরিক চাকুরি থেকে স্থানীয় লোকদেরকে বাদ দেওয়া হয়। ফলে সামগ্রিকভাবে বেসামরিক প্রশাসন শ্বেতাঙ্গদের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। কমিশন এবং অন্যান্য সুযোগ সুবিধার পরিবর্তে এবং বেসামরিক চাকুরিকে আরও বেশি আকর্ষণীয় পেশায় পরিণত করার লক্ষ্যে কর্নওয়ালিস বেসামরিক সার্ভিসের কর্মকর্তাদের, বিশেষ করে কভিনেন্টেড বেসামরিক কর্মকর্তাদের জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয় বেতন প্রদানের ব্যবস্থা করেন। আর এভাবেই উপনিবেশিক সাম্রাজ্যের জন্য পেশাদার বেসামরিক সার্ভিসের গোড়াপত্তন হয়।

পুলিশ প্রশাসন  কর্নওয়ালিস নিজামতের পুলিশী ক্ষমতা রহিত করেন। ১৭৯২ সালের ৭ ডিসেম্বরে জারিকৃত পুলিশ রেগুলেশন মোতাবেক গ্রামাঞ্চলে জমিদার এবং শহরাঞ্চলে কোতওয়ালদের নিকট থেকে ঐতিহ্যগত পুলিশী সুযোগ সুবিধা কেড়ে নেওয়া হয়। অন্যদিকে পুলিশ নিয়ন্ত্রন করার ক্ষমতা দেওয়া হয় ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেটদেরকে। জেলা জজকে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব অর্পণ করা হয় যার ফলে পুলিশ নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্বও তার হাতে আসে। প্রতিটি জেলাকে কতগুলি পুলিশ জোনে ভাগ করা হয়। সাধারণত ৪০০ বর্গ মাইল এলাকা নিয়ে গঠন করা হয় এক একটি পুলিশ জোন। প্রতিটি জোনের দায়িত্ব দেওয়া হতো একজন পুলিশ সুপারিনটেনডেন্টের হাতে যাকে সহায়তা করত কয়েকজন পুলিশ কনস্টেবল। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে জেলা জজ পুলিশ সুপারিনটেনডেন্টকে নিয়োগ করতেন এবং পুলিশ সুপারিনটেনডেন্ট নিয়োগ করতেন পুলিশ কনস্টেবলদের। পুলিশ সুপারিনটেনডেন্টগণ চোরাই মালামাল উদ্ধারের জন্য উদ্ধারকৃত মালামালের মূল্যের ১০ শতাংশ কমিশন হিসেবে পেতেন।

কর্নওয়ালিস বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে আলাদা করেন এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করে আইনের চোখে শাসক ও শাসিত সকলকে সমান বলে পরিগণিত করেন। বিচারকার্য পরিচালনার জন্য জেলা কোর্ট স্থাপন করা হয় যেখানে সাধারণ বিচার ও রাজস্ব সংক্রান্ত বিচারকার্য পরিচালিত হতো। এর উপরে ছিল কলকাতা, মুর্শিদাবাদ, ঢাকা এবং পাটনায় চারটি প্রাদেশিক কোর্ট। সাধারণ বিচারকার্য পরিচালনার জন্য সদর দীউয়ানি আদালত এবং ফৌজদারি বিচারকার্য পরিচালনার জন্য সদর নিজামাত আদালত ছিল সর্বোচ্চ দুটি আদালত। গভর্নর জেনারেল এবং তার কাউন্সিলের সদস্যরা এ সমস্ত সদর আদালতগুলি গঠন করতেন। মুসলিম আইন ও হিন্দু আইন সংক্রান্ত ব্যাপারে পরামর্শ প্রদানের জন্য স্থানীয় উপদেষ্টাদের নিয়োজিত করা হতো।

ব্রিটিশ উপনিবেশিক প্রশাসনের ভিত্তি স্থাপন করেন কর্নওয়ালিস। কিন্তু তার পদ্ধতি শীঘ্রই উপনিবেশিক সাম্রাজ্যের জন্য বেমানান হয়ে পড়ে। কর্নওয়ালিস যখন তার প্রশাসনিক পদ্ধতির নীতিমালা প্রণয়ন করেন তখন সারা ভারতব্যাপী সাম্রাজ্যের কথা তার চিন্তায় ও চেতনায় ছিল না। তার ভারত ত্যাগের এক দশকের মধ্যেই বাংলা রাজ্যের পরিধি উপমহাদেশীয় পর্যায় উন্নীত হয়। রাজ্যের পরিধি চারিদিকে সম্প্রসারিত হওয়ার ফলে কেন্দ্রীয় সরকার কর্নওয়ালিসের মূল কোডকে পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়। এছাড়া উপনিবেশিক পদ্ধতির প্রভাব প্রজাদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে অপরিহার্য অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনের ফলে ১৭৯৩ সালের পদ্ধতিতে বেশ অনিশ্চয়তা ও বৈষম্য দেখা দেয়।

কর্নওয়ালিসের ব্যবস্থার প্রধান বিষয়ই ছিল চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। এর মূল সংবিধান ১৭৯৯ সালের রেগুলেশন দ্বারা মৌলিকভাবে পরিবর্তন করা হয়। এই রেগুলেশনের বলে জমিদারগণ তাদের প্রজাদেরকে উৎখাত ও অত্যাচার করার মতো ক্ষমতা লাভ করেন। তারা তাদের ভূসম্পত্তি যে কোন সময়ের জন্য অন্যকে ভাড়া দেওয়ার অধিকারও পান যা মূল দলিলে সর্বোচ্চ দশ বছরের জন্য সীমাবদ্ধ ছিল (১৮১২ সালের রেগুলেশন ৫ এবং ১৮১৯ সালের রেগুলেশন ৮)। জমিদারগণ চিরস্থায়ীভাবে মধ্যম স্বত্বভোগকারী সৃষ্টি করার অধিকারও লাভ করেন।

১৭৯৩ সালের ব্যবস্থায় স্থানীয় জনগণকে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের জন্য অন্তর্ভুক্ত করা হয় নি। স্থানীয় পর্যায়ে কাজের চাপে ঊনিশ শতকের প্রথম দিকে এ নিয়ম শিথিল করা হয়। ১৮০২ সালে সরকার জেলা পর্যায়ের আদালতে স্থানীয়দের সদর আমীন নামে অভিহিত জজ হিসেবে নিয়োগ করে বহুদিনের জমাকৃত ছোট ছোট মামলার নিস্পত্তি করার সিদ্ধান্ত নেয়। উইলিয়ম বেন্টিঙ্ক এর শাসন আমলে অতিরিক্ত জজের ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব প্রদান করে প্রিন্সিপাল সদর আমীন নামে একটি উচ্চতর বিচারকের পদ সৃষ্টি করা হয়। বেন্টিংয়ের শাসন আমলে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের জন্য ডেপুটি কালেক্টরের পদও সৃষ্টি করা হয়। এছাড়া জেলা জজের কাছ থেকে ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা প্রত্যাহার করে জেলা কালেক্টরের হাতে ন্যস্ত করা হয় এবং জেলা কালেক্টরকে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এবং কালেক্টর হিসেবে অভিহিত করা হয়। এ সংস্কার বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে আলাদা করার নীতির সাথে তাৎপর্যপূর্ণ একটি সুরাহা করেছিল।

রাজস্বসংক্রান্ত বিষয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ এবং জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিয়োগ ও বদলি করার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান বোর্ড অব রেভেনিউকে দুটি কমিটিতে বিভক্ত করা হয় যার একটি হলো বাংলার জন্য (লোয়ার বেঙ্গল) এবং অন্যটি উত্তরাঞ্চলের প্রদেশসমূহের জন্য (আপার প্রভিন্সেস)। ১৮২৯ সালে কয়েকটি সংলগ্ন জেলা নিয়ে একটি করে বিভাগ সৃষ্টি করা হয় এবং বিভাগীয় কমিশনারকে এর দায়িত্ব দেওয়া হয়। বিভাগীয় কমিশনারকে প্রধান করে বিভাগ সৃষ্টির মাধ্যমে বোর্ড অব রেভেনিউ-এর কর্তৃত্ব আরও হ্রাস করা হয়। রাজস্ব বিষয়ক ও জেলা প্রশাসনের উপর কর্তৃত্ব ছাড়াও বিভাগীয় কমিশনারকে পুলিশ প্রশাসনের ওপরও কর্তৃত্ব দেওয়া হয়। এ প্রশাসনিক ব্যবস্থা মোটামুটিভাবে ইংরেজ রাজত্বের শেষ পর্যন্ত বলবৎ ছিল।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অবসান ঘটিয়ে ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক সরাসরিভাবে ভারতীয় প্রশাসনের দায়িত্ব গ্রহণের ফলে নানা ধরনের প্রশাসনিক সংস্কার ঘটে। ফলে আদর্শগত ও আকৃতিগতভাবে কোম্পানির আমল থেকে ব্রিটিশ সরকারের আমলে অনেক পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়, যদিও কোম্পানি আমলে প্রতিষ্ঠিত অনেক আইন পরবর্তী আমলের প্রশাসনেও অব্যহত ছিল। কিন্তু তাদের প্রয়োগ ও কার্যকলাপের ধরন এক ছিল না।

সিভিল সার্ভিস  কোম্পানি আমলের শেষ দশকে সিভিল সার্ভিসের যে পদ্ধতি চালু করা হয়েছিল, ব্রিটিশ রাজের আমলে তা প্রায় অপরিবর্তিত অবস্থায় অব্যাহত ছিল। শুধু পার্থক্য ছিল যে, পূর্বকালীন শেতাঙ্গ সিভিল সার্ভিস ক্রমান্বয়ে ভারতীয় রূপ লাভ করে। ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও কালেক্টর এবং সাব ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও কালেক্টরের শূন্য পদে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভারতীয়দেরকে নেওয়া শুরু হয়। বেতন ও ক্ষমতার বিবেচনায় স্থানীয় বিচার বিভাগীয় চাকরিকে পুনর্বিন্যাস করে তিন শ্রেণীতে বিভক্ত করা হয়। ১৮৬৮ সালের ১৬ নম্বর অ্যাক্টের ধারা মোতাবেক প্রিন্সিপাল সদর আমিন ও সদর আমিন নামে অভিহিত স্থানীয় বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের পদ অবলুপ্ত করে ‘সাবঅর্ডিনেট জজ’ নামে নতুন পদ সৃষ্টি করা হয়।

১৮৭৫ সাল থেকে নিম্নশ্রেণীর আনকভিনেন্টেড সিভিল সার্ভিস অন্যান্য কিছু সংবিধিবদ্ধ (স্ট্যাট্যুটরি) সিভিল সার্ভিসে পদোন্নতি ও সুপারিশের মাধ্যমে ভারতীয়দেরকে অন্তর্ভুক্ত করার প্রচেষ্টা নেওয়া হয়। আনকভিনেন্টেড সিভিল সার্ভিসের নির্বাহি এবং বিচার বিভাগীয় শাখায় শিক্ষিত ভারতীয়দেরকে ব্যাপকভাবে নিয়োগ করা হয়। ইতঃপূর্বে ভারতীয় সিভিল সার্ভিসের কর্মকর্তাদের জন্য নির্ধারিত ছিল এমন অনেক ক্ষমতা ও কর্মকান্ড আনকভিনেন্টেড সিভিল সার্ভিসের কর্মকর্তাদের হাতে হস্তান্তর করা হয়। ১৯২২ সাল থেকে ভারতীয় সিভিল সার্ভিসের পরীক্ষা একই সঙ্গে ভারত ও ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত হওয়া শুরু হয়। ফলে অধিক সংখ্যায় শিক্ষিত ভারতীয়রা উচ্চতর পদমর্যাদার সার্ভিসে যোগদানের সুযোগ পায়। এছাড়া ভারতীয় সিভিল সার্ভিসের কর্মকর্তাদের প্রায় সমতুল্য ক্ষমতা ও দায়িত্ব প্রদান করে সৃষ্টি করা হয় বেঙ্গল সিভিল সার্ভিস। ১৯৩৫ সাল নাগাদ ভারতীয় সিভিল সার্ভিসের অর্ধেকের চেয়ে বেশি পদে ভারতীয়রা আসীন হন এবং পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তিরা বিকল্প হিসেব বেঙ্গল সিভিল সার্ভিসের বিভিন্ন পদে আত্তীকরণ হতে থাকেন।

পুলিশ প্রশাসন  ১৮৬০ সালে গঠিত পুলিশ কমিশন কোম্পানি আমলের থানা ভিত্তিক পুলিশ পদ্ধতির কার্যাবলি পর্যালোচনা করে। কমিশনের সুপারিশ মোতাবেক ১৮৬১ সালের পুলিশ অ্যাক্ট ৫ বিধিবদ্ধ করা হয় উপনিবেশিক প্রশাসন উপযোগী পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলার উদ্দেশ্য নিয়ে। ইন্সপেক্টর জেনারেলের অধীনে কনস্টেবল বাহিনীসহ একটি আলাদা পুলিশ বাহিনী গঠন করা হয়। তার দায়িত্ব ছিল পুরো পুলিশ বিভাগের দক্ষতা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা। বিভাগীয় কমিশনারদের নির্বাহি ক্ষমতা তুলে দেওয়া হয়। পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেলকে সহায়তা করার জন্য একজন ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেলের পদ সৃষ্টি করা হয়। জেলা পুলিশ সুপারিনটেনডেন্টদেরকে ইতপূর্বে বিভাগীয় কমিশনারগণ নিয়ন্ত্রণ করতেন কিন্তু পুলিশ ইন্সপেক্টর জেনারেলের পদ সৃষ্টি হওয়ার পর থেকে তিনিই হন জেলা পুলিশ সুপারিনটেনডেন্টদের নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তা। জেলা পুলিশ সুপারিনটেনডেন্টদের কাজে সহায়তা করার জন্য সৃষ্টি করা হয় সহকারি জেলা পুলিশ সুপারিনটেনডেন্ট-এর পদ। পুলিশের নিম্নতর পদবিন্যাসে ইন্সপেক্টর জেনারেলের পরে ছিল প্রধান কনস্টেবল, সার্জেন্ট এবং সব শেষে কনস্টেবল।

জেল প্রশাসন  পরিচালনার জন্য তৈরি করা হয়েছিল একটি জেলকোড। ১৮৬১ সালে প্রণীত পুলিশ অ্যাক্ট-৫ মোতাবেক পুলিশ ও জেল পদ্ধতির যে ধারা সৃষ্টি করা হয়েছিল সেটা প্রয়োজনমতো ছোট খাট সাংগঠনিক পরিবর্তন করে উপনিবেশিক শাসনের শেষ অবধি চালু রাখা হয়েছিল। এমনকি আজও বাংলাদেশের পুলিশ প্রশাসন মোটামুটিভাবে ১৮৬১ সালে প্রণীত ’পুলিশ অ্যাক্ট-৫’ মোতাবেক পরিচালিত।

উপনিবেশিক সরকার মুগল সম্রাটদের প্রবর্তিত গ্রাম চৌকিদারি ব্যবস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করে দেয়। ঐ সময় সকল জমিদার ও তালুকদারদেরকে নিজস্ব খরচে ‘সেবানদিজ’ নামে চৌকিদার অথবা গ্রাম্য পুলিশ রাখতে হতো। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালু হওয়ার পর ঐ ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। কিন্তু অনেক জমিদার তাদের তালুকে অঘোষিতভাবে চৌকিদার রেখে দিয়েছিল। ১৮৭০ সালের চৌকিদারি অ্যাক্ট মোতাবেক ১৮৭০ সালে পুনরায় চৌকিদারি ব্যবস্থা চালু করা হয়। এ অ্যাক্ট জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রতিটি গ্রামের জন্য তিন-বছর মেয়াদী একটি কমিটি অথবা পঞ্চায়েত নির্বাচন ও নিয়োগ করার ক্ষমতা প্রদান করে। ম্যাজিস্ট্রেট চৌকিদারদেরকে নিয়োগ করত কিন্তু গ্রাম্য পঞ্চায়েত তাদের পরিচালনা করত। গ্রাম্য চৌকিদারদের বেতন প্রদানের জন্য পঞ্চায়েতকে চৌকিদারি কর তোলার ক্ষমতা দেওয়া হয়। গ্রামে আইন শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য ১৮৭০ সালের চৌকিদারি অ্যাক্ট কার্যকর ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ হয়।

স্থানীয় সরকার  ১৭৯৩ সালে প্রণীত কর্নওয়ালিস কোড স্থানীয় শাসকদের দ্বারা পরিচালিত স্থানীয় সরকার পদ্ধতি বন্ধ করে দেয়। কর্নওয়ালিস কোড জেলা কালেক্টরকে স্থানীয় প্রশাসনের প্রধান এজেন্ট করা হয়। গ্রাম ও পরগনার সকল স্থানীয় সরকার সংস্থা তুলে দেওয়া হয়। জমিদারদের কাছ থেকে আইন শৃঙ্খলা বজায় রাখার দায়িত্ব কেড়ে নেওয়া হয়। যে কাজী এতোদিন স্থানীয় বিচারক হিসেবে কাজ করতেন তাকে শুধু মুসলমানদের বিবাহ অনুষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়।

ইংরেজ জেলা কালেক্টরগণ জেলার সর্বময় ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে পরিগণিত হন। কোম্পানি শাসনের শেষ দশক থেকে স্থানীয় পৌরসভার বিষয়টি চিন্তা ভাবনা করা হয়। ১৮৫০ সালের ২৬ নং অ্যাক্ট মোতাবেক সর্বপ্রথম প্রধান প্রধান শহরগুলির জন্য পৌরসভা প্রতিষ্ঠার বিষয়টি গ্রহণ করা হয়। প্রকৃতপক্ষে ১৮৬৪ সালের পৌরসভা উন্নয়ন অ্যাক্ট মোতাবেক পৌরসভা গঠনের কাজ শুরু হয়। জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে পৌরসভার চেয়ারম্যান করা হয়। চেয়ারম্যানকে সহায়তা করত মনোনীত কমিশনারগণ যাদের মধ্যে কমপক্ষে সাতজন কমিশনার স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের মধ্য থেকে মনোনয়ন করা হতো। পৌরসভার আয়ের উৎস ছিল ফেরী চলাচল থেকে আয়, বাজারের টোল এবং রাস্তা ঘাটের আয়কর। ১৮৬৮ সালের জেলা শহর অ্যাক্ট অথবা ’মিউনিসিপ্যাল অ্যাক্ট-৬’ দ্বারা ছোট ছোট শহরগুলিতে পৌরসভা চালু করা হয়।

গ্রাম অঞ্চলে ১৮৭০ সালের বেঙ্গল ভিলেজ চৌকিদারি অ্যাক্ট দ্বারা এক ধরনের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা চালু করা হয়। এ ব্যবস্থায় গ্রাম অঞ্চলকে প্রায় দশ অথবা বারো বর্গমাইল এলাকা নিয়ে ইউনিয়নে বিভক্ত করা হয়। এ অঞ্চলসমূহকে ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক মনোনীত পঞ্চায়েত অথবা কমিটির নিয়ন্ত্রাণাধীন করা হয়। এ পঞ্চায়েতগুলিকে চৌকিদার নিয়োগ এবং এ ব্যবস্থা চালু রাখার জন্য গ্রামের লোকদের কাছ থেকে কর আদায়ের ক্ষমতা প্রদান করা হয়।

গ্রাম অঞ্চল ও শহর এলাকায় এ সমস্ত স্থানীয় সরকার পদ্ধতি চালু করার প্রধান উদ্দেশ্যই ছিল সারা সাম্রাজ্যব্যাপী দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে উপনিবেশিক সরকারের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহে সরকারি প্রতিনিধিরাই ছিলেন প্রকৃত ক্ষমতাবান। তাই স্থানীয় সরকার পরিচালনাই ছিল জেলা ম্যাজিস্ট্রেটদের অন্যতম কাজ। তবে ১৮৮৫ সালের ৩নং অ্যাক্ট স্থানীয় সরকারের পরিধি অনেকটা বাড়িয়ে দেয়। এ অ্যাক্ট প্রতিটি জেলায় পরোক্ষভাবে নির্বাচিত জেলা বোর্ড এবং জেলার প্রতিটি মহাকুমায় লোক্যাল বোর্ড গঠনের সুযোগ করে দেয়। এ অ্যাক্ট জেলার অন্তর্গত কোন মহকুমার প্রতিটি গ্রামে অথবা কয়েকটি গ্রামের জন্য একটি করে নির্বাচিত ইউনিয়ন কমিটি গঠনের ব্যবস্থা করে দেয়। কয়েকজন সদস্য নিয়ে গঠিত হতো লোক্যাল বোর্ড-এর দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য নির্বাচিত এবং এক-তৃতীয়াংশ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক মনোনীত ছিল। তবে জেলা বোর্ডের অর্ধেক সংখ্যক সদস্য থাকত নির্বাচিত এবং বাকি অর্ধেক থাকত মনোনীত। সাধারণত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট থাকতেন জেলা বোর্ডের চেয়ারম্যান। ইউনিয়ন কমিটির সদস্যরা নির্বাচিত করতেন কমিটির চেয়ারম্যানকে।

তত্ত্বীয়ভাবে ১৮৮৫ সালের স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন আইনের আওতায় প্রবর্তিত স্থানীয় সরকার পদ্ধতির উদ্দেশ্য ছিল জনগণকে স্বশাসনে প্রশিক্ষণ প্রদান করা। কিন্তু বাস্তবে এ ব্যবস্থা তার ঘোষিত উদ্দেশ্যকে বাস্তবায়িত করে নি। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সব সময়ই এ ব্যবস্থাকে ঐ সময়কার জাতীয়তাবাদী আন্দোলন দমন করার কাজে ব্যবহার করার চেষ্টা করতেন। সরকার কখনও স্থানীয় সরকার সংস্থাসমূহকে প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা দিতে এগিয়ে আসেনি। তাদেরকে স্থানীয়ভাবে কর আরোপ করে অর্থ সংগ্রহের জন্য বলা হতো যা খুব একটা সহজসাধ্য ব্যাপার ছিল না। তাছাড়া স্থানীয়ভাবে আরোপিত এবং সংগৃহীত এ করের পরিমাণ এত কম ছিল যে, তা দিয়ে স্থানীয় সরকারের কার্যাবলি পরিচালনা করা সম্ভব হতো না।

সিপাহি বিপ্লবই কোম্পানির শাসনের পরিসমাপ্তি ঘটাতে সহায়তা করে এবং সূচনা করে প্রশাসনকে ভারতীয়করণের উদ্দেশ্যে সাংবিধানিক সংস্কারের কাজ। ১৮৬১ সালের ভারতীয় কাউন্সিল অ্যাক্ট ভারতে প্রতিনিধিত্বপূর্ণ সরকারের ভিত্তি স্থাপন করে। নির্বাহি কাউন্সিলের প্রত্যেক সদস্যকে নির্দ্দিষ্টভাবে এক একটি বিভাগের দায়িত্ব অর্পণ করে দপ্তর পদ্ধতির (পোর্টফোলিও সিস্টেম) প্রচলন করা হয়। আইন প্রণয়নের উদ্দেশ্যে ছয় থেকে বারো জন নন-অফিসিয়াল সদস্যকে এর অন্তর্ভুক্ত করে কাউন্সিলকে এক ধরনের সংসদে পরিণত করা হয়। এদের মধ্যে তিনজন ছিলেন ভারতীয়। ১৮৬২ সালে বাংলায় একটি আইন প্রণয়নকারী কাউন্সিল গঠন করা হয়। কিন্তু এর আইন প্রণয়ন ক্ষমতা ছিল খুবই সীমিত। প্রতিনিধিত্বমূলক স্বশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য ক্রমাগতভাবে জনগণের চাপ বৃদ্ধির কারণে পার্লামেন্ট ১৮৯২ সালে একটি ভারতীয় কাউন্সিল অ্যাক্ট প্রণয়ন করতে বাধ্য হয় যা গভর্নর জেনারেলের এবং প্রাদেশিক গভর্নরদের আইন প্রণয়নকারী কাউন্সিলের ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।

১৯০৯ সালের মর্লে-মিন্টো সংস্কার আইনের ফলে নির্বাচিত কাউন্সিলের পদ্ধতি চালু হয়। ১৯১৯ সালের ভারত শাসন আইনের আওতায় সে পদ্ধতি আরও বেশি প্রতিনিধিত্বমূলক হয়। ভূসম্পত্তি কর প্রদানের ভিত্তিতে ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের অধীনে সর্বজনীন ভোটাধিকারের ব্যবস্থা করা হয়। ১৯১৯ সালের আইন কিছু ক্ষমতা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে হস্তান্তর করে। এ নির্বাচিত প্রতিনিধিরা হস্তান্তরিত বিষয়গুলি পরিচালনা করার জন্য সরকার গঠন করে। কিন্তু পূর্ণ প্রতিনিধিত্বশীল সরকার গঠন করা হয় ১৯৩৫ সালের অ্যাক্টের আওতায়। এর ফলে বাংলাসহ ইংরেজ শাসনাধীন ভারতের প্রতিটি প্রদেশে দায়িত্বশীল সরকার গঠিত হয়। আর নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে পুরো ক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে হস্তান্তর করা হয় ১৯৪৭ সালের ভারত স্বাধীনতা আইনের আওতা। [চিত্তরঞ্জন মিশ্র ও শিরীন আখতার]