কোটিবর্ষ


কোটিবর্ষ বাণগড়ের (ভারতের পশ্চিম বাংলার দক্ষিণ দিনাজপুর) সাথে শনাক্তকৃত এবং পুনর্ভবা নদীর বাম তীরে অথবা পূর্বদিকে আত্রাই এবং পশ্চিমে পুনর্ভবা নদীর সন্ধিস্থলে অবস্থিত। ১২৮ থেকে ২২৪ গুপ্তাব্দের (৪৪৮-৫৪৪ খ্রি.) মধ্যে প্রকাশিত দামোদরপুরে প্রাপ্ত ৪টি তাম্রশাসনএ কোটিবর্ষকে পুন্ড্রবর্ধন ভুক্তির অন্তর্গত একটি ‘বিষয়’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। হেমচন্দ্রের (এগারো শতক) অভিধানচিন্তামণি গ্রন্থে দেবীকোট, উমাবন, বানপুর এবং শোনিতপুরের সমার্থক হিসেবে কোটিবর্ষের উল্লেখ রয়েছে। বায়ুপুরাণ এবং বৃহৎ সংহিতা’য় কোটিবর্ষকে একটি নগর হিসেবে দেখানো হয়েছে।

বাণগড়ের প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখনন থেকেও কোটিবর্ষের নগর সংস্কৃতির পরিচয় মেলে। মৌর্য যুগ থেকে মধ্যযুগ পর্যন্ত সময়ে এ নগরদুর্গ এলাকায় ৫টি সাংস্কৃতিক স্তর দেখা যায়। ধারণা করা হয় যে, নগরটির যাত্রা শুরু হয়েছিল সাধারণভাবে। সম্ভবত তখন এর প্রাচীর দেওয়াল ছিল মাটির। তবে পরবর্তী পর্যায়ে (২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ৩০০ খ্রিস্টাব্দ) নর্দমাসহ ইটের তৈরী প্রশস্ত প্রতিরক্ষা দেওয়াল, ময়লা পানি জমা হওয়ার কূয়া এবং বড় আকারের পোড়া ইটের তৈরী আবাসিক দালানগুলি এর সমৃদ্ধি ও বিকাশমান নগরায়ণ বৈশিষ্ট্য স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।

যদিও বাণগড় থেকে প্রাপ্ত সামগ্রীসমূহ সমৃদ্ধি ও বৈচিত্র্যের দিক থেকে কুষাণ সাংস্কৃতিক পর্বের সামগ্রীর সাথে তুলনা করা যায় না, তবুও প্রথম কুমারগুপ্ত এবং বুধগুপ্তের দামোদরপুর তাম্রশাসনসমূহ থেকে জানা যায় যে, গুপ্তযুগে একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে এ নগরের অস্তিত্ব অব্যাহত ছিল। তাম্রশাসনসমূহে এ নগরকে ‘অনুবহমান কোটিবর্ষ বিষয়’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এর থেকে আরও জানা যায় যে, ‘কুমারমাত্য’ পদমর্যাদার ‘বিষয়পতি’র অধীনে কোটিবর্ষ ছিল জেলা পর্যায়ের একটি প্রশাসনিক ইউনিট। প্রাদেশিক শাসনকর্তা ‘উপরিক’ কর্তৃক ‘বিষয়পতি’ নিযুক্ত হতেন। প্রশাসনিক কাজে বিষয়পতিকে সাহায্য করত ৪ সদস্যবিশিষ্ট একটি পরিষদ। পরিষদের সদস্যরা হলেন প্রধান ‘গিল্ড’ সভাপতি (নগর শ্রেষ্ঠী), প্রধান ব্যবসায়ী (প্রথম সার্থবহ), কারিগরদের প্রধান (প্রথম কুলিক) এবং প্রধান কারণিক (প্রথম কায়স্থ)। এর থেকে প্রতীয়মান হয় যে, নগরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আর্থ-সামাজিক শ্রেণির প্রতিনিধিগণ স্থানীয় প্রশাসনের সাথে জড়িত ছিলেন। এ কাঠামো ছিল গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং এখানেই আমরা প্রথম স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় জনগণের প্রতিনিধিত্ব দেখতে পাই।

গুপ্ত যুগের শেষ দিকে বাণগড়ের অধঃপতন, বিশেষ করে ভবন নির্মাণ কর্মকান্ডে, পরিলক্ষিত হলেও, তুলনামূলকভাবে পালযুগে এর একটি বিকাশমান নগরের ছবি দেখা যায়। প্রতিরক্ষা দেওয়াল, ভবন পরিবেষ্টন দেওয়াল, আবাসিক ভবন, পরিভ্রমণপথসহ মন্দির ও এর চতুর্দিকের দেওয়াল, আর্দ্রতা প্রতিরোধী শস্যভান্ডার, স্নানাগার, নর্দমা, চাকতি-কূপ প্রভৃতির অস্তিত্বের প্রমাণে প্রতীয়মান হয় যে, নগরটি সমৃদ্ধশালী ছিল। পালযুগে তিনটি মন্ডল ও কয়েকটি গ্রাম কোটিবর্ষ বিষয়ের আওতাধীন ছিল, যদিও স্থানীয় পর্যায়ের প্রশাসনের কোনো উল্লেখ পাওয়া যায় নি। এর প্রমাণ প্রথম মহীপালএর (এগারো শতক) বাণগড় লিপি, তৃতীয় বিগ্রহপালের (বারো শতক) আমগাছি দানপত্র এবং মদনপালের (বারো শতক) মনহলি দানপত্রে পাওয়া যায়।

কোটিবর্ষ ছিল একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, যেখানে নানা ধর্ম ও বর্ণের মানুষের ছিল শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। তবে বিশেষ করে, এটি ছিল বৈষ্ণব মতবাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। পরবর্তীকালেও এটি একটি ধর্মীয় কেন্দ্র হিসেবে টিকে ছিল এবং সে সময়ে নগরটি দেবীকোট বা দেবকোট নামে পরিচিতি লাভ করে। [সুচন্দ্রা ঘোষ]