কানুনগো


কানুনগো মুগল আমলের রাজস্ব কর্মকর্ত্তা। মুগল আমলে প্রত্যেক পরগণার জন্য পাঁচজন করে প্রধান কর্মকর্তা ছিলো। এদের মধ্যে কানুনগো একজন। মুগল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার রাজস্ব প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন। আকবর-এর ভূমি ব্যবস্থা চূড়ান্ত হওয়ার পূর্বে কানুনগো জনসাধারণের প্রতিনিধি রূপে কাজ করতেন এবং ভূমি রাজস্ব থেকে প্রাপ্ত কর-এর ওপর থেকে একাংশ গ্রহণ করতেন। সম্রাট আকবর এ পদকে তিন পর্যায়ের বেতনভোগী কর্মকর্তার পদে পরিণত করেন। সুলতানী আমলের কুট এবং মুকাদ্দাম পদ দু’টি মুগল আমলে ‘চৌধূরী’তে পরিণত হয়। সুলতানী আমলে চৌধুরীগণ ছিলেন গ্রামের প্রধান ব্যক্তি। তাঁদের দায়িত্ব ছিল যার যার অঞ্চলে জমির মূল্য নির্ধারণ করা এবং রাষ্ট্রের চাহিদা মোতাবেক রাজস্ব সংগ্রহ করা। কখনো কখনো চৌধুরীর সঙ্গে কানুনগো- এর পদটি এক করে দেখা হত, যাঁদের প্রধান কাজ ছিলো শস্য উৎপাদনের বিস্তারিত সময়সূচি যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করা। কিন্তু মোগল প্রশাসনের পরগণার অধীনে ‘কানুনগো’ একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে পরিণত হয়। তিনি তাঁর নিজ এলাকার যে জমি চাষাবাদের অধীনে আসত, তার সম্পূর্ণ তথ্য সন্নিবেশ করতেন, শস্যের সঠিক অথবা সম্ভাব্য উৎপাদন মাত্রা নির্ধারণ করতেন এবং আমিল (সরকার এর অধীনে  আমলগুজার, যিনি পরগণার রাজস্ব সংগ্রহ এবং জরিপ এর দায়িত্ব পালন করতেন) কর্তৃক প্রত্যায়ন পত্র প্রদানের পর প্রাদেশিক দীউয়ানের নিকট যে পরিমাণ রাজস্ব কেন্দ্রে পাঠানো হতো, তার বিস্তারিত তথ্য সংরক্ষণ করতেন।

কানুনগো তাঁর কর্তৃত্ত্বাধীন এলাকার ভূমি সংক্রান্ত সকল সম্পত্তির মূল্য নির্ধারনের অনুলিপি প্রদান করতেন। একে বলা হতো ‘পাট্টা’, যার মধ্যে মূল্য নির্ধারণী সকল উপাত্ত সন্নিবেশিত হতো। গ্রহীতা তা গ্রহণের স্বীকৃতিস্বরূপ একটি ‘চুক্তিনামা’ প্রদান করতো। কানুনগো এই দলিল সংরক্ষণ করতেন, যাকে ‘কাবুলিয়াৎ’ বলা হতো। কিন্তু প্রাদেশিক দীউয়ান-এর দফতরে মূল্য নির্ধারণীর কপি প্রেরণ করা হতো। প্রত্যেক পরগাণায় একাধিক কানুনগো থাকতেন যাঁরা বাৎসরিক মধ্যবর্তী সম্ভাব্য উৎপাদিত শস্যের তথে সম্বলিত দলিল সংরক্ষণ করতেন। কিছু নির্দিষ্ট এলাকার জন্য কানুনগো যৌথভাবে চৌধুরীদের সঙ্গে যৌথভাবে দায়িত্ব পালন করতেন এবং তাঁরা পরগণার সার্বিক অবস্থা এবং প্রশাসন সম্পর্কে ভালোভাবে জ্ঞাত থাকতেন।

আবুল ফজল এর বর্ণনায় দেখা যায় যে, সম্রাট  আকবর এর রাজ্য শাসনের পনেরোতম ইলাহী বৎসরে রাজা টোডরমল এবং মোজাফফর খান রাজস্ব আদায়ের জন্য একটি নতুন মূল্য নির্ধারণী ব্যবস্থা প্রবর্তণ করেছিলেন এবং প্রাদেশিক কানুনগো এবং পাটোয়ারীদের নিকট থেকে পরগণা বা প্রদেশ সমূহের রাজস্ব আদায়ের জন্য দশজন নতুন কানুনগোকে নিয়োগ প্রদান করা হয়েছিলো। রিয়াজ-উস-সালাতীন অনুসারে, সুবাহ, সরকার এবং পরগণার মতো তিনটি ভিন্ন প্রশাসনিক স্তরের তিন ধরনের কাজের জন্য তিনজন কানুনগো নিয়োগ দেয়া হয়েছিলো। যেমন, প্রাদেশিক কানুনগো রাজস্ব সংক্রান্ত কাগজপত্র রাজস্ব মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়ার জন্য দীউয়ান কর্তৃক তৈরিকৃত হিসাবসমূহে সত্যায়িত করতেন। সরকার-এর কানুনগো মুয়াজিনা, দস্তর-উল আমল প্রভৃতির মতো রাজস্ব সংক্রান্ত কাগজ সংগ্রহ, গ্রামসমূহের তালিকা তৈরি এবং অন্যান্য বিস্তারিত ব্যাখ্যা সম্বলিত সংক্ষিপ্ত বিবরণ পরগণাসমূহের কানুনগোর নিকট থেকে সংগ্রহ করে তা স্বাক্ষরসহ সত্যায়িত করে রাজস্ব মস্ত্রণালয়ে প্রেরণ করতেন। তাছাড়া সরকার এর কানুনগো, পরগণার কানুনগো এর আচরণ ও অন্যান্য কার্যকলাপ তত্ত্বাবধান করার মতো কর্তৃত্বও আরোপ করতে পারতেন। সাধারণত একটি পরগণায় একজন মাত্র কানুনগো ছিলেন, তবে বিশেষ ক্ষেত্রে একটি পরগণায় একাধিক কানুনগোও থাকতেন। পরগণার অন্যান্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, বিশেষ করে কানুনগো কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক নিয়োগ প্রাপ্ত হতেন এবং তিনি আমিল এর নিয়ন্ত্রণ হতে স্বাধীন ছিলেন।

একজন কানুনগোর সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিলো, পরগণার কৃষি সংক্রান্ত সম্পূর্ণ তথ্য সন্নিবেশিত হতো এমন কয়েকটি রেজিস্ট্রার অনুসরণ করা। তিনি রাজস্ব সংগ্রহের কাগজপত্র এবং হিসাব-এর সকল কপি সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণও করতেন। যেমন- জমিদার বা কৃষকের জন্য নির্ধারিত রাজস্ব বন্দোবস্তের দলিলের কপিসমূহ সংরক্ষণ করা ছিল তাঁর প্রধান দায়িত্ব। পরবর্তী কাজ ছিলো, জমির আগ্রহ সংক্রান্ত বিভিন্ন দিক এবং বিক্রি, বন্দকী বা বিনামূল্যে দেয়া উপহার-এর পরিবর্তন এবং বদলীর ফলাফল লিপিবদ্ধ করে রাখা। সর্বোপরি, কানুনগো সকল প্রকার মূল্য নির্ধারণী কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতেন।

সম্রাট আকবর-এর রাজত্বের প্রথম ভাগে পাটোয়ারী ‘সাদ-দোই’-এর নেতৃত্বে কানুনগো এর রাজস্ব সংগ্রহের অর্ধেক পেতেন অথবা পাটোয়ারীকে দুই শতাংশ লভ্যাংশ দেয়া হত। পরবর্তীতে আকবর এই ব্যবস্থা পরিবর্তন করে এই পদটিকে নির্দিষ্ট অংকের বেতনভোগী পদে রূপান্তর করেন। এই বেতন টাকার অংকে দেয়া হত না বরং তাঁদেরকে যে বেতনের চুক্তিতে নিয়োগ দেয়া হতো তার সমমানে সমর্পিত জমি থেকে নির্ধারিত আয় প্রদান করা হত। আঠার শতকের প্রথমার্ধের সূত্রে দেখা যায় যে, কানুনগোর জন্য নির্ধারিত জমি প্রদান ব্যবস্থা বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিলো এবং রায়তদের নিকট থেকে সংগৃহীত অর্থের একাংশ তাঁদেরকে প্রদান করা হতো। রায়তদের আয়ের ভাগ থেকে কানুনগো দুই শতাংশ সংগ্রহের অনুমতি পেয়েছিলেন এবং এই ভাগকে বলা হতো ‘রুসুম’।

চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত পর্যন্ত কানুগোর পদটি বলবৎ ছিল। এমনকি এর পরও জেলা ও পরগণা পর্যায়ের প্রশাসনে কানুনগো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।  [নাসরীন আক্তার]