পিট-এর ভারত আইন, ১৭৮৪


পিট-এর ভারত আইন, ১৭৮৪  রেগুলেটিং অ্যাক্ট (১৭৭৩) প্রয়োগের কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রণীত সংসদীয় আইন।  রেগুলেটিং অ্যাক্টএর দুটি প্রধান লক্ষ্য ছিল। প্রথমটি হলো শুরু থেকেই ব্রিটিশ প্রশাসনিক নীতি অনুযায়ী নতুন রাজ্য পরিচালনা করার আদর্শ নির্ধারণ এবং অপরটি ছিল বাংলায় কোম্পানির কর্মচারিদের লাগামহীন দুর্নীতি দূর করা। কিন্তু উদ্দেশ্য সাধনে আইনটির প্রয়োগ অকার্যকর প্রমাণিত হয়। কাউন্সিলের অধিকাংশ সদস্য ক্রমাগত হেস্টিংসর বিরোধিতা করতে থাকেন এবং কয়েক বছর তারা গভর্নর জেনারেল ছাড়াই বাংলা শাসন করেন। দুর্নীতি আগের মতোই ব্যাপক থেকে যায়। বহুবিধ দুর্নীতি ও অপকর্মের দায়ে হেস্টিংসের অভিশংসন থেকে বোঝা যায় যে, কর্মচারীদের সর্বোচ্চ পর্যায়েও এ ধরনের নীতিভ্রষ্টতার অভিযোগ ছিল। কাউন্সিল সদস্যদের স্থানীয় রাজা ও জমিদারদের নিকট থেকে অবৈধ অর্থ গ্রহণের অসংখ্য প্রমাণ রয়েছে। এছাড়াও সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক বিচার ক্ষমতার এখতিয়ারের ব্যাপকতার দাবির প্রশ্নে একাধারে ইংরেজ ও দেশিয় জনগণ উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছে। রেগুলেটিং অ্যাক্টে সুপ্রিম কোর্টের বিচার সম্পর্কিত এখতিয়ার কখনোই স্পষ্টভাবে বলা হয় নি। রাজা  নন্দকুমারএর মকদ্দমাটি ছিল সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক আইনের যথেচ্ছ প্রয়োগের জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত।

কোম্পানি ও ভারতবর্ষে নবগঠিত ব্রিটিশ রাজ্যকে ধ্বংসোন্মুখ অবস্থা থেকে রক্ষা করার জন্য ব্রিটিশ পার্লামেন্ট কিছু প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের আবশ্যকতা অনুভব করে। রেগুলেটিং অ্যাক্টের ত্রুটিগুলি দূর করার উদ্দেশ্যে ১৭৮৩ সালে ফক্স-এর কোয়ালিশন সরকার একটি বিল পাস করে। কিন্তু লর্ড-সভা কর্তৃক বিলটি প্রত্যাখ্যাত হয়। ১৭৮৪ সালে ইয়ঙ্গার পিটের নতুন সরকার বিলটিকে সংশোধিত আকারে আইনে পরিণত করে। আইনটির প্রস্তাবনায় বলা হয়, ‘এ আইন তৈরি হয়েছে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কার্যক্রম এবং ভারতবর্ষে ব্রিটিশ অধিকারের সুচারু নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনার জন্য; এবং ইস্ট ইন্ডিজে অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিচারকার্য আরও দ্রুত ও কার্যকরভাবে সম্পন্ন করার উদ্দেশ্যে একটি আদালত প্রতিষ্ঠার জন্য।’

এ আইনের বাংলা রাজ্য শাসনের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি নিম্নরূপ:

মন্ত্রিপরিষদের একজন সিনিয়র সদস্যকে প্রধান করে সর্বোচ্চ ৬ জন পার্লামেন্ট সদস্য নিয়ে একটি বোর্ড অব কন্ট্রোল গঠিত হবে। এর কাজ হবে ইস্ট ইন্ডিজে কোম্পানির রাজ্য পরিচালনার কার্যক্রম তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ করা। কোর্ট অব ডাইরেক্টর্স একটি গোপন কমিটি গঠন করবে যার কাজ হবে বোর্ড অব কন্ট্রোল ও কোর্ট অব ডাইরেক্টর্স-এর মধ্যে সংযোগ রক্ষা করা।

তিনজন সদস্য নিয়ে গভর্নর জেনারেলের কাউন্সিল গঠিত হবে (পূর্বে ছিল চারজন)। এদের মধ্যে একজন থাকবেন ভারতবর্ষে রাজার সেনাবাহিনীর কমান্ডার-ইন-চিফ। কাউন্সিল সভায় উপস্থিত সদস্যদের মধ্যে কোন মতপার্থক্যের ক্ষেত্রে সদস্যগণ সমান দুভাগে বিভক্ত হলে গভর্নর জেনারেল তার নিজের ভোট ছাড়াও নির্ণায়ক ভোট প্রয়োগ করতে পারবেন।

সরকারকে অবশ্যই রাজস্ব প্রশাসন নিয়ে অতিরিক্ত পরীক্ষা নিরীক্ষা বন্ধ করে পরিমিত হারে রাজস্ব চাহিদার বিনিময়ে জমিদারদের সঙ্গে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করতে হবে। নতুন রাজ্য শাসনের জন্য সরকারকে অবশ্যই স্থায়ী বিচার বিভাগীয় ও প্রশাসনিক পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

কর্মে যোগদানের দুমাসের মধ্যে সব সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাকে ভারতবর্ষে ও ব্রিটেনে তাদের যাবতীয় সম্পদের একটি পূর্ণ তালিকা ‘কোর্ট অব ডাইরেক্টর্স’-এর নিকট পেশ করতে হবে।

দুর্নীতির দায়ে দোষী সাব্যস্ত এমন বেসামরিক ও সামরিক কর্মচারীকে সম্পত্তি বাজেয়াপ্তকরণ, চাকরি থেকে অপসারণ ও কারাদন্ডসহ গুরুতর শাস্তি ভোগ করতে হবে।

রাজা, জমিদার ও অন্যান্য ভারতীয়দের নিকট থেকে নগদ টাকায় বা দ্রব্যে ভেট, পুরস্কার বা উপঢৌকন গ্রহণ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হলো। এ সকল অপরাধে দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তি দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হয়ে বিচারের সম্মুখীন হবেন।

এ আইন বাস্তবায়নের জন্য পার্লামেন্ট লর্ড কর্নওয়ালিসকে সরাসরি নিয়োগদান করে। ১৭৮৬ সালে গভর্নর জেনারেল হিসেবে যোগদানের অব্যবহিত পরেই কর্নওয়ালিস পার্লামেন্ট কর্তৃক অর্পিত সংস্কারমূলক দায়িত্ব পালনে তৎপর হন। ১৭৯৩ সালে তিনি তাঁর দায়িত্ব সম্পন্ন করেন। তিনি চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালু করেন, একটি বিচার বিষয়ক কার্যবিধি ঘোষণা করেন এবং প্রশাসনিক ও পুলিশ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। ঐ বছরই (১৭৯৩) তিনি স্বদেশের উদ্দেশ্যে ভারতবর্ষ ত্যাগ করেন।  [সিরাজুল ইসলাম]