ইংরেজ


ইংরেজ  ইংল্যান্ডের লোকেরা ইংরেজ জাতি হিসেবে পরিচিত। তারা সতেরো শতকের মাঝামাঝি সময়ে বাংলায় আগমন করে। ১৬০০ খ্রিস্টাব্দে ৩১ ডিসেম্বরের একটি রাজকীয় সনদ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয় ‘দি ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’। প্রাথমিক অবস্থায় এ কোম্পানি দক্ষিণ ভারতের পশ্চিম ও পূর্ব উপকূলীয় অঞ্চলে বাণিজ্যিক যোগাযোগ স্থাপন করে। ১৬৩৩ খ্রিস্টাব্দে তারা উড়িষ্যা উপকূলে পৌঁছে এবং হরিহরপুর ও বালেশ্বরে কুঠি স্থাপন করে। সম্রাট শাহজাহান এক ফরমান (১৬৫০) দ্বারা তাদেরকে চালানি কর (রাহদারি) প্রদান থেকে অব্যাহতি দেন। ১৬৫১ খ্রিস্টাব্দের প্রারম্ভে ইংরেজরা হুগলিতে একটি কুঠি স্থাপন করতে সক্ষম হয়। সম্ভবত ডক্টর গ্যাব্রিয়েল বাউটনের সক্রিয় পৃষ্ঠপোষকতার ফলে তা সম্ভব হয়েছিল। বাউটন সুবাহদার শাহ সুজার যথেষ্ট সুনজরে ছিলেন।

শাহ সুজা ১৬৫১ খ্রিস্টাব্দে এক ‘নিশান’ জারি করে তাদের অবাধে ব্যবসা করার অনুমতি প্রদান করেন। বার্ষিক ৩০০০ টাকা প্রদানের শর্তে এ সুবিধা দেওয়া হয়। শাহ সুজা ১৬৫৬ খ্রিস্টাব্দে এটি অনুমোদন করেন এবং ১৬৬০ খ্রিস্টাব্দে মীরজুমলা এবং ১৬৭২ খ্রিস্টাব্দে শায়েস্তা খান এ অনুমোদন নবায়ন করেন। শাহজাদা মুহম্মদ আযম (আজিম-উস-শান) পরবর্তীকালে এটি অনুমোদন করেন যদিও এ মর্মে কোনো শাহী ফরমান জারি করা হয় নি। সুবিধা প্রদান ও অনুমোদনের এ দৃশ্যপটের অন্তরালে কোম্পানির কর্মকর্তা ও পরবর্তী সুবাহদারদের মধ্যে তীব্র সংঘাতের উপাদান দানা বাঁধতে থাকে।

ইতোমধ্যে ইংরেজরা বাংলার অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে থাকে। ১৬৫৮ খ্রিস্টাব্দের সম্ভবত কোম্পানির একজন প্রতিনিধি হিসেবে জেমস হার্ট ঢাকা পৌঁছেন বলে মনে হয়। তখনও পর্যন্ত কোম্পানি ঢাকায় কোনো বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করে নি। ১৬৬৯ খ্রিস্টাব্দের গোড়ার দিকে ঢাকায় একটি কুঠি স্থাপিত হয় বলে প্রতীয়মান হয় এবং ‘হারভে‘র তত্ত্বাবধানে ওই শতকের সত্তরের দশকের শেষভাগ ও আশির দশকের শুরুতে এটি সম্প্রসারিত হয়। প্রথম দিকে কুঠিটি তেজগাঁয়ে অবস্থিত ছিল এবং সেখান থেকে ১৭৩৫ খ্রিস্টাব্দে এটি শহরে স্থানান্তরিত হয়।

সমগ্র সতেরো শতক জুড়ে ইংরেজ ও মুগলদের মধ্যে গোলযোগ চলতে থাকে আমদানি-রপ্তানি শুল্ক প্রদানের বিষয়কে কেন্দ্র করে যা থেকে ইংরেজরা ফরমানের ভিত্তিতে অব্যাহতি চেয়ে আসছিল। তাদের একচেটিয়া সুবিধার কঠোর সমালোচনা চলতে থাকার কারণে দেশেও কোম্পানি কঠিন অবস্থার মুখোমুখি হয়। সতেরো শতকের শেষ দিকে কোম্পানির কার্যক্রম পশ্চিম উপকূল থেকে পূর্ব উপকূলে স্থানান্তরিত হয় এবং ফলে বাংলা হয়ে ওঠে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। আঠারো শতকের গোড়ার দিক থেকে আরব বিশ্ব, পারস্য সাম্রাজ্য, মুগল সাম্রাজ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাজ্যসমূহ এবং চীন সাম্রাজ্য কোম্পানির কার্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত হয়। ব্যবসায়ে রমরমা অবস্থা সত্ত্বেও মুনাফার বৃহৎ অংশ চলে যেত কোম্পানির কর্মচারীদের ব্যক্তিগত ব্যবসার খাতে। শুল্ক কর্মকর্তাদের সাথে বিবাদ-বিসম্বাদ লেগে থাকার কারণে বিরাট অংকের অর্থ ব্যয় করতে হতো। বাংলার বাণিজ্যকুঠি মাদ্রাজ কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করা হয় এবং ব্যক্তিগত ব্যবসা বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। উল্লেখ করা যায় যে, মুগল কর্মকর্তারা বাংলায় কোম্পানির ব্যবসাকে গুরুত্ব সহকারে বাধা প্রদান করে নি। অবশেষে  কোর্ট অব ডাইরেক্টর্স মুগলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার সংকল্প ব্যক্ত করে। ১৬৮৬ খ্রিস্টাব্দের গোড়ার দিকে কাসিমবাজার কুঠির কুঠিয়াল জব  চার্নক হুগলিতে পালিয়ে যান। সেখানে তখন শায়েস্তা খানের অশ্বারোহী সৈন্যরা ইংরেজ বাণিজ্য কুঠি দখল করে কিছুসংখ্যক ইংরেজ সৈন্যকে বন্দি করে রেখেছিল। চার্নক তখন ভাগীরথীর ২৬ মাইল ভাটিতে অবস্থিত সূতানটি গ্রামে পালিয়ে যান।

চার্নক ব্যবসায়ী বরমলের মাধ্যমে নওয়াবের কাছে তার দাবি পেশ করেন। এ দাবির অন্তর্ভুক্ত ছিল একটি দুর্গ নির্মাণ, টাকশাল স্থাপন এবং শুল্কমুক্ত ব্যবসার সুযোগ। এ সমঝোতার প্রক্রিয়া চলাকালে ক্যাপ্টেন হিথের নেতৃত্বে একটি নতুন নৌবহর এসে পৌঁছে। হিথ ও চার্নক বালাসোর আক্রমণ করেন এবং আরাকানের রাজার সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে বন্দর দখল করার উদ্দেশ্যে নৌবহর নিয়ে চট্টগ্রাম অভিমুখে যাত্রা করেন। কিন্তু আরাকানরাজ মুগলদের রোষানলে পড়া সমীচীন মনে করেন নি। ফলে ইংরেজদের পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়। ১৬৮৭ খ্রিস্টাব্দের ১৬ আগস্ট শায়েস্তা খান ইংরেজদের হুগলিতে আসার নির্দেশ দেন। চার্নক সূতানটিতে ফিরে আসেন এবং ১৬৮৮ খ্রিস্টাব্দের ৮ নভেম্বর দ্বিতীয় বারের মতো অভিযান প্রত্যাহার করেন। পশ্চিম ভারতে আত্মসমর্পন করার কারণে ১৬৮৯ খ্রিস্টাব্দের শেষ দিকে ইংরেজদের প্রতি মুগল সম্রাট তাঁর মনোভাব পরিবর্তন করেন। ১৬৯০ খ্রিস্টাব্দের ২৩ এপ্রিল তিনি নতুন নওয়াব ইবরাহিম খানকে এ মর্মে আদেশ দেন যে, অনুতপ্ত ইংরেজ কোম্পানিকে ‘পূর্বের মতোই’ ব্যবসায়ে ফিরে আসার অনুমতি দেওয়া যেতে পারে। সম্রাটের আদেশ মোতাবেক বার্ষিক ৩০০০ টাকার বিনিময়ে আমদানি রপ্তানি শুল্ক প্রদান থেকে অব্যাহতি মঞ্জুর করে ইবরাহিম খান ১৬৯১ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারিতে একটি পরওয়ানা ইংরেজদের কাছে প্রেরণ করেন। হিথ ও চার্নক চট্টগ্রাম অধিকার করতে ব্যর্থ হয়ে ১৬৯০ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট মাসে সূতানটিতে ফিরে আসেন এবং তাদের পূর্বের বাণিজ্য কুঠি ধ্বংসপ্রাপ্ত দেখতে পান। তা সত্ত্বেও হুগলিতে যাবার জন্য মাদ্রাজ কর্তৃপক্ষের আদেশ অমান্য করে চার্নক সেখানে অবস্থান করার সিদ্ধান্ত নেন। ইতোমধ্যেই সুবাহদার হুগলির দুমাইল ভাটিতে অবস্থিত একটি জায়গা, সম্ভবত উলুবাড়িয়া, তাদের দেওয়ার প্রস্তাব করেন। ১৬৯৩ খ্রিস্টাব্দের ১০ জানুয়ারি চার্নক মৃত্যুবরণ করেন।

শোভা সিংহরহিম খানএর বিদ্রোহের ফলে সৃষ্ট পরিস্থিতির সুযোগে ইউরোপীয়রা তাদের কুঠিগুলিকে দুর্গ দ্বারা সুরক্ষিত করার কাজ শুরু করে। ইংরেজরা কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তিকে তাদের দুর্গবেষ্টিত স্থানে আশ্রয় দেয়। এ স্থানটিই পরবর্তীকালে ফোর্ট উইলিয়মএর কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। ১৬৯৭ খ্রিস্টাব্দের শেষ দিকে এ এলাকা থেকে বিদ্রোহীদের বিতাড়নের পর ইংরেজরা খালিসা ভূখন্ডের তিনটি গ্রাম সূতানটি, গোবিন্দপুর ও দিহি কলকাতা খাজনার বিনিময়ে বন্দোবস্ত নিতে চায়। জমিদারগণ প্রথম দিকে এতে অস্বীকৃতি জানালেও শেষ পর্যন্ত সুবাহদার শাহজাদা আজিমুদ্দীন তাদের বুঝিয়ে সুজিয়ে তা মেনে নিতে রাজি করান। ১৬৯৮ খ্রিস্টাব্দের ৯ নভেম্বর ১৩০০ সিক্কারুপি পরিশোধ করে বয়নামা বা ক্রয়ের দলিল স্বাক্ষরিত হয়। এ তিনটি গ্রামের বার্ষিক খাজনা ধার্য করা হয় ১১৯৫ টাকা ৬ আনা।

ঐ সময় পর্যন্ত সূতানটির যে জমি ইংরেজরা অবৈধভাবে দখল করে রেখেছিল তা এখন বিধিসম্মত করা হলো। ১৭১৭ খ্রিস্টাব্দের ফরমানে ইংরেজ কর্তৃক জমিদারদের দেওয়া যে ক্ষতিপূরণের পরোক্ষ উল্লেখ পাওয়া যায় তা মোটেও সনাতন পদ্ধতি ছিল না। তা সত্ত্বেও এটি ছিল তালুকদারি স্বত্ব (জমিদারি স্বত্ব নয়) এবং ইংরেজরা কার্যত দেশের আইনের আওতায় এসে যায়। সেকারণে ১৬৯৯ খ্রিস্টাব্দের ন্যায় প্রায়শই একজন কাজী প্রেরণের কথা উঠত। অবৈধ দখলদার হিসেবে ইংরেজরা ১৬৯৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে সেখানে স্থাপিত দোকানগুলি থেকে কর আদায় করত।

প্রথম থেকেই কোম্পানির লন্ডন কর্তৃপক্ষ তাদের সামগ্রিক ব্যয় নির্বাহ এবং সে সাথে অংশীদারদের অর্থ প্রদানের প্রয়োজনে কর আদায়ের জন্য সূতানটি প্রতিনিধিদের তাগিদ দিয়ে আসছিল। ১৬৯৮ থেকে ১৭১৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত যেখানে ‘জমা’ অপরিবর্তিত ছিল, সে অবস্থায় ১৭০৪ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ খাজনা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছিল ৫,৭৬০ টাকায়। ১৭১০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে এ খাজনা ১৬,৫০০ টাকায় বৃদ্ধি পায়। ১৭১০ থেকে ১৭২০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে এ উদ্দেশ্যে নিয়োগকৃত কর সংগ্রহকারীদের আদায়কৃত কর বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ২৩০%-এ দাঁড়ায়। কোম্পানি ফসলের ফলন নির্বিশেষে বিঘাপ্রতি ৩ টাকা কর আরোপ করে। এ ব্যবস্থা ছিল মুগলদের কর পদ্ধতি থেকে ভিন্নতর, কেননা মুগলরা শুধু ফসলের উপরই কর আরোপ করত। দাস বিক্রির উপর দাসপ্রতি ৪ টাকা ৪ আনা হারে করারোপসহ প্রত্যেকটি ক্রয়কৃত ও বিক্রিত দ্রব্যের উপরও কোম্পানি কর ধার্য করে। বাড়ির উপর ৫% হারে কর আরোপ করা হয়েছিল এবং পেশাজীবী মানুষ ও ব্রাহ্মণসহ সকল কারিগরকেই কর প্রদান করতে হতো। আঠারো শতকের বিশের দশক থেকে এ কর আদায়ের ইজারা দেওয়া হয় যদিও সেখানে ‘জিজিয়া’ কর আরোপ করা হয়েছিল। এসব কর ছিল মুগল করব্যবস্থা থেকে ভিন্নতর।

বাংলা থেকে ইংরেজদের রপ্তানি পণ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল প্রধানত সোরা, বস্ত্র, কাঁচা রেশম, তুলার সূতা এবং চিনির মতো ভারী পণ্য যা জাহাজ স্থির রাখতে সাহায্য করত। ১৬৫২ সালে যেখানে বিনিয়োগ ছিল কমবেশি ৭০০০ লিভার্স, আঠারো শতকের শুরুতে তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৩,৩৬,৯৭৩ লিভার্স যাতে ইউরোপে বাংলার সস্তা পণ্যের ক্রমবর্ধমান চাহিদা প্রতিফলিত হয়। কোম্পানির আমদানি পণ্যের মধ্যে ছিল প্রধানত সোনারূপার বার, মশলা, পশমিবস্ত্র ও বনাত (পশমি মোটা কাপড়)। এদের মধ্যে প্রথম দুটি পণ্যই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কাসিমবাজার ছিল আমদানি পণ্যের সর্বপ্রধান কেন্দ্র। পরবর্তী সময়ে আমদানি পণ্যের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে মালদহ, ঢাকা ও হুগলি।

১৭১৫ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে কোম্পানি মুগল সম্রাটের নিকট থেকে একটি ‘হাসব’-উল-হুকুম লাভ করে। এ আদেশ দ্বারা কোম্পানিকে আওরঙ্গজেবএর সময়ের মতোই অবাধে বাণিজ্য করার সুযোগ দেওয়া হয়। এ সময় কোম্পানি একটি ‘ফরমান’ লাভের আবেদন জানায় এবং জন সারম্যানের নেতৃত্বে দিল্লিতে একটি প্রতিনিধিদল পাঠায়। ১৭১৭ খ্রিস্টাব্দের ১ ফেব্রুয়ারি এ প্রতিনিধিদল ‘ফরমান‘ লাভে সমর্থ হয় এবং এতে পূর্বেকার সকল সুযোগ সুবিধা বহাল থাকে। কোম্পানিকে ৩৮টি গ্রাম ক্রয় করার অনুমতি দেওয়া হয় এবং একটি কুঠি স্থাপনের জন্য ৪০ বিঘা জমি প্রদান করা হয়। সুবাহদার মুর্শিদকুলী খান তাদের অবাধে টাকশাল ব্যবহারের অধিকার দেন নি, যেহেতু এ ব্যাপারে ফরমানে কোনো সুস্পষ্ট বক্তব্য ছিল না। তিনি নতুন গ্রাম ক্রয়েও বাধা প্রদান করেন। কেবল ১৭৫৪ খ্রিস্টাব্দে  হলওয়েল বার্ষিক ২,২৮১ টাকা রাজস্বের বিনিময়ে সিমিলিয়া নামক স্থানে সন্নিহিত জমি পেতে সমর্থ হন। পলাশীর যুদ্ধর পর ১৭৫৮ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বরে প্রথম বারের মতো কলকাতা শহর বিনা খাজনায় ভোগ দখলের জন্য মীরজাফর কোম্পানিকে একটি সনদ মঞ্জুর করেন।

১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দের ৯ ফেব্রুয়ারি ইংরেজ ও সিরাজউদ্দৌলার মধ্যে সম্পাদিত চুক্তিতে সিরাজউদ্দৌলা ইংরেজদের বিরুদ্ধে কোনো দফা অন্তর্ভুক্ত করেন নি বা স্বাধীনভাবে টাকশাল ব্যবহার এবং ফরমানে প্রদত্ত অনুমতি মোতাবেক গ্রামগুলির ব্যবহার অনুমোদন করেন নি। মীরজাফরের সাথে ৩ জুন ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে সম্পাদিত চুক্তির ফলে ইংরেজরা কালপি পর্যন্ত তাদের জমিদারি সম্প্রসারিত করা ছাড়াও এসকল সুবিধা লাভ করে। এ সময়ে জমিদারগণ কোনো ক্ষতিপূরণ পান নি। মাত্র ২,২২,৯৫৮ টাকা ১০ আনা ২ পয়সা ৩ পাই-এর বিনিময়ে প্রদত্ত একটি সনদ বলে কোম্পানিকে ২৪ পরগনায় জমিদারি হিসেবে নতুন জমি প্রদান করা হয়, ক্লাইভের মতে যার মূল্য ছিল দশ লক্ষ টাকার অধিক। ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দের ২৩ জুন মীরজাফর ক্লাইভকে ২৪ পরগণায় জায়গির প্রদান করেন এবং পরে একটি ফরমান দ্বারা এ জায়গিরকে দশ বছরের জন্য অনুমোদন করা হয়।

পলাশী যুদ্ধের পর মীরজাফর ইংরেজদের এক কোটি সাতাত্তর লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেন এবং ৫৩ লক্ষ ৯০ হাজার টাকা অনুদান প্রদান করার অঙ্গীকার করেন যে জন্য তাঁকে তাঁর মনিমুক্তা বন্ধক রাখতে হয়। ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দের চুক্তি অনুযায়ী মীর কাসিম বর্ধমান, মেদিনীপুর ও চট্টগ্রামের রাজস্ব-আয় ইংরেজদের প্রদান করেন। কিন্তু কোর্ট অব ডাইরেক্টর্স এ নতুন সুবিধা পাওয়া সত্ত্বেও অসন্তুষ্ট ছিল। গভর্নর হিসেবে ক্লাইভ নওয়াবের সাথে ১৭৬৫ সালের ১৯ আগস্ট এক চুক্তি সম্পাদন করেন। এ চুক্তিমতে নওয়াব সম্রাটকে ২,১৬, ৬৬৬ টাকা ১০ আনা ৯ পয়সা প্রদান করেন এবং প্রতিদানে সম্রাট শাহ আলম ইংরেজ কোম্পানিকে আমদানি-রপ্তানি শুষ্ক প্রদান থেকে অব্যাহতি দিয়ে বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার দেওয়ান নিয়োগ করেন। ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দের ৩০ অক্টোবর ক্লাইভ নওয়াব নাজমুদ্দৌলার সঙ্গে অপর একটি চুক্তি সম্পাদন করেন। এ চুক্তিমতে নাজমুদ্দৌলা ‘নিজামত’-এর জন্য ৫৩,৮৬,১৩১ টাকা ৯ আনা ভাতা গ্রহণে রাজি হন। ইংরেজদের দ্বারা নিয়োগকৃত একজন কর্মচারী ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করত।

১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজ কোম্পানি দেশে পরিপূর্ণ প্রাধান্য বিস্তার করে। কলকাতা ছিল রাজস্ব-মুক্ত রায়তি স্বত্ব এবং তদসংলগ্ন ২৪ পরগনায় কোম্পানির ছিল জমিদারি কর্তৃত্ব। অর্পিত জেলাগুলিতে কোম্পানি সরাসরি রাজস্বকার্য পরিচালনা করত এবং ফৌজদারি মামলা ব্যতীত সরকারের যাবতীয় কার্য সম্পাদন করত। কোম্পানি ছিল বাংলার অবশিষ্ট অংশের দীউয়ান। সম্রাটের ‘দরবারে’ নিয়োজিত ইংরেজ রেসিডেন্ট সকল গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সমাধান করতেন। দীউয়ান হিসেবে কোম্পানি ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, আমদানি-রপ্তানি শুল্ক আদায় এবং আর্থিক ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করত। বাংলায় ইংরেজ কোম্পানির বাণিজ্যিক প্রাধান্য ছিল প্রশ্নাতীত।

১৭৬৬ খ্রিস্টাব্দের ১৭ মে কোর্ট অব ডাইরেক্টর্স নতুন চুক্তিগুলি অনুমোদন করে এবং ইংরেজরা বাংলায় প্রধানতম শক্তিতে পরিণত হয়। পলাশী যুদ্ধের পর মীরজাফরের এক কোটি ত্রিশ লক্ষ টাকার অকৃপণ অনুদানের বদৌলতে কোম্পানির বিনিয়োগ বিস্ময়করভাবে বেড়ে যায়। অধিকন্তু অর্পিত জেলাগুলি থেকে বার্ষিক পঞ্চাশ লক্ষ টাকার এবং কলকাতা ও ২৪ পরগনার জমিদারির আয় মিলে ইংরেজদের হাতে প্রচুর অর্থ সমাগম হয়। ধীরে ধীরে সোনা-রূপার আমদানি বন্ধ হয়ে যায় এবং বাংলা একাধারে কাঁচামালের যোগানদার ও ইংল্যান্ডের তৈরী পণ্যের বাজারে পরিণত হয়।

বাংলার বিশেষত কলকাতার ইংরেজদের সামাজিক জীবন সুস্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ হয়েছে। ইংল্যান্ডের প্রভাবশালী মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আগত এসব লোকদের সামাজিক জীবনধারা ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দের পর পাল্টাতে শুরু করে। দুর্গের অন্ধকার ও নিম্নমানের আবাসস্থলগুলি ধীরে ধীরে রূপ নেয় ইঙ্গ-মুগল স্থাপত্য রীতিতে তৈরী স্তম্ভ-সমৃদ্ধ বাংলোয়, আর তাতে শোভা পায় বিশালাকৃতি শয়নকক্ষ। আঠারো শতকের শেষভাগ পর্যন্ত প্রায় দুহাজার অসামরিক ও সামরিক পুরুষের বিয়ের জন্য ইউরোপীয় নারী খুঁজে পাওয়া এক সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। বাংলায় মাত্র কয়েকশ ইউরোপীয় মহিলার অবস্থানের কারণেই এ অবস্থার সৃষ্টি হয়। ফলে তাদেরকে উপপত্নী ও পরিচারিকা হিসেবে ভারতীয় মহিলাদের গ্রহণ করতে হয়েছে। আঠারো শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ইংরেজদের অনেকেই ভারতীয় উপপত্নীদের গর্ভে সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন। এসব উপপত্নীদের অধিকাংশই ছিল মুসলমান অথবা নিম্নবর্ণের হিন্দু। কোর্ট অব ডাইরেক্টর্স কোম্পানির চাকরিতে নিয়োজিত ইংরেজদের এসব শংকর সন্তানদের কর্মসংস্থানে অস্বীকৃতি জানায়। এ সুস্পষ্ট বৈষম্যমূলক বর্ণবাদী নীতি পর্তুগিজদের সময় থেকেই অনুসৃত হয়ে আসছিল। উনিশ শতকের প্রথম ভাগ পর্যন্তও এ ধরনের অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানরা ব্রিটিশ প্রজা হিসেবে বিবেচিত হয় নি, যদিও তাদেরকে ইংল্যান্ডে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হতো।  [অনিরুদ্ধ রায়]