আজিম-উস-শান


আজিম-উস-শান  সম্রাট আওরঙ্গজেবের পৌত্র এবং শাহজাদা মুয়াজ্জম ওরফে শাহ আলম বাহাদুর শাহের পুত্র। তাঁর প্রকৃত নাম মুহম্মদ আজিমুদ্দীন। ১৬৯৭ খ্রিস্টাব্দে আওরঙ্গজেব তাঁকে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার সুবাহদার নিযুক্ত করেন এবং শাহজাদা বাংলায় না পৌঁছানো পর্যন্ত ইব্রাহিম খানের পুত্র জবরদস্ত খানকে অবিলম্বে বিদ্রোহী রহিম খানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। জবরদস্ত খান বিদ্রোহীকে পরাভূত করেন। বিদ্রোহী অঞ্চলগুলি অধিকার করে তিনি বর্ধমানে অবস্থান  করছিলেন। শাহজাদা আজিমউদ্দীন ১৬৯৭ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বর মাসে বর্ধমানে পৌঁছেন। তিনি জবরদস্ত খানকে আশানুরূপ সম্মান ও সমাদার না করে তার প্রতি তাচ্ছিল্য প্রদর্শন করেন। এতে ক্ষুণ্ণ হয়ে জবরদস্ত খান চাকুরিতে ইস্তফা দেন এবং পিতার সঙ্গে বাংলা ত্যাগ করে দাক্ষিণাত্যে চলে যান (জানুয়ারি, ১৬৯৮ খ্রি.)।

জবরদস্ত খান চলে যাওয়ার পর সুবাহদার আজিমউদ্দীন রহিম খানকে দমন করার জন্য বর্ধমানে প্রায় এক বছর অবস্থান করেন। তিনি প্রথমে শান্তিপূর্ণ উপায়ে বিদ্রোহীদেরকে বশীভূত করতে চেষ্টা করেন। রহিম খান সমঝোতা করার ভান করে আজিমের মন্ত্রীকে নিজ শিবিরে আহবান করে হত্যা করেন। এতে ক্ষুব্দ হয়ে আজিম-উস-শান তার বিরুদ্ধে সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করেন। চন্দ্রকোণার নিকটে এ বাহিনীর সাথে বিদ্রোহীদের এক যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে বিদ্রোহীরা পরাজিত হয়। রহিম খান বন্দি হন এবং তাকে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয় (আগষ্ট, ১৬৯৮ খ্রি.)। এরপর বিদ্রোহীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে।

শোভা সিং-এর বিদ্রোহের কারণে বাংলায় ইউরোপীয় বণিকরা নিজেদের বাণিজ্য ঘাটি সমূহ সুরক্ষণের ব্যবস্থা করার প্রয়োজন বোধ করে। তারা আজিম-উস-শানের অনুমতি ভিক্ষা করে এবং অনুমতি লাভ করে ইংরেজরা কলকাতায়, ওলন্দাজরা চিনমুরায় এবং ফরাসিরা চন্দননগরে নিজেদের বাণিজ্য ঘাটিগুলিতে সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলে। ফলে কলকাতায় ফোর্ট উইলিয়ম, চন্দননগরে ফোর্ট অর্লিন্স এবং চিনমুরায় ফোর্ট গুস্টাভাস গড়ে উঠে। সুবাহদার আজিমউদ্দীনের দৃষ্টি সুশাসনের প্রতি নিবদ্ধ ছিল না। তার মূল লক্ষ্য ছিল বিপুল অর্থের অধিকারী হওয়া। তিনি ব্যক্তিগত ব্যবসায়ে আগ্রহী ছিলেন যাকে তিনি ‘সওদা-ই-খাস’ রূপে অভিহিত করেন। তাঁর এ ব্যক্তিগত ব্যবসায়ের ধরন ছিল উৎপাদনকারীদের কাছ থেকে জোর করে সস্তায় পণ্য ক্রয় করে বাজারে চড়া দামে বিক্রয় করা। সম্রাট এজন্য শাহজাদাকে তীব্রভাবে তিরস্কার করেন। তাঁর মনসব দশ হাজার থেকে নয় হাজারে হ্রাস করা হয়। তিনি বাংলায় ৯ বছর শাসনকালে প্রায় আট কোটি টাকা অর্জন করেছিলেন।

সুবাহদার আজিমউদ্দীনের শাসনকালে ইংরেজ বণিকরা তাঁর কাছে সুতানটি, দিহি কলকাতা ও গোবিন্দপুর-এর জমিদারি সত্বের জন্য আবেদন করে তা লাভ করে। ফলে ১৬৯৮ থেকে ইংরেজদের বাণিজ্য কলকাতা কেন্দ্রিক হয়ে পড়ে এবং পাটনা, রাজমহল ও বালাশের-এ তাদের বাণিজ্য কেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়া হয়।

সম্রাট আওরঙ্গজেব সুবাহদার আজিমউদ্দীনের কার্যকলাপে সন্দিহান হয়ে তার উপর নজর রাখার জন্য করতলব খানকে ( মুর্শিদকুলী খান) বাংলার দীউয়ান নিযুক্ত করে পাঠান। এ নিয়োগে আজিমউদ্দীন সন্তুষ্ট হননি। ফলে শীঘ্রই করতলব খানের সাথে তাঁর বিরোধ বাধে। এ বিরোধ এমন তীব্র হয় যে, করতলব খান ঢাকায় তার অবস্থান নিরাপদ নয় মনে করে তার দপ্তর মাকসুদাবাদে স্থানান্তরিত করেন। পরে তিনি সম্রাটের অনুমতি নিয়ে এর নামকরণ করেছিলেন মুর্শিদাবাদ।

সম্রাট আওরঙ্গজেব বাংলার ঘটনা জানতে পেরে করতলব খান ও সুবাহদার আজিমউদ্দীনের মধ্যকার বিরোধ মিটিয়ে ফেলার জন্য ১৭০৩ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে বিহারের সুবাহদারিও আজিমউদ্দীনের উপর ন্যস্ত করেন। একই সময়ে তিনি করতলব খানকে উড়িষ্যার নায়েব সুবাহদার নিযুক্ত করেন। কিন্তু এ ব্যবস্থার ফলেও সমস্যার কোনো সমাধান হয়নি। তাই সম্রাট শাহজাদা আজিমউদ্দীনকে বিহারে গিয়ে বসবাস করার নির্দেশ দেন (জুলাই, ১৭০৩ খ্রি.)।

সম্রাটের আদেশে সুবাহদার আজিমউদ্দীন তার পুত্র ফররুখ সিয়ারকে বাংলায় তার প্রতিনিধি হিসেবে রেখে পাটনায় চলে যান (১৭০৩ খ্রি.)। এ সময় সম্রাট আওরঙ্গজেব ফররুখ সিয়ারকে করতলব খানকে তার অভিভাবকরূপে মান্য করার নির্দেশ দেন।

১৭০৭ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর পুত্র শাহ আলম বাহাদুর শাহ দিল্লির সিংহাসনে আরোহন করে তাঁর পুত্র আজিমউদ্দীনকে ‘আজিম-উস-শান’ উপাধি প্রদান করেন এবং তাকে বাংলা ও বিহারের সুবাহদারের পদে বহাল রাখেন। সুবাহদার আজিমউদ্দীন বিহারে থাকতেন এবং বিহার থেকেই তার পুত্র ফররুখ সিয়ারের মাধ্যমে বাংলা শাসন করেন। তিনি ১৭১২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাংলার অনুপস্থিত সুবাহদার ছিলেন।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, আজিম-উস-শান-এর শাসনকালের ব্যাপ্তীকাল তত্ত্বীয়ভাবে ১৬৯৭ থেকে ১৭১২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বিস্তৃত থাকলেও কার্যত তাঁর শাসনকালের অবসান ঘটে ১৭০৩ খ্রিস্টাব্দে যখন তিনি ঢাকা ত্যাগ করে পাটনা চলে যান। এর পরবর্তী সময়ে (১৭০৩-১৭১২ খ্রি.) প্রভাবশালী দীউয়ান করতলব খান (মুর্শিদকুলী খান) শাসনকার্য পরিচালনায় প্রধান ভূমিকা পালন করেন।  [অঞ্জলি চট্টোপাধ্যায়]