শোভা সিংহ


শোভা সিংহ  মেদিনীপুরের চন্দ্রকোনা মহকুমার চেতোয়া-বর্দার জমিদার। তিনি ১৬৯৫ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসে বাংলায় মুগল শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। শোভা সিংহের পূর্বপুরুষদের পরিচয় সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কোন কোন পন্ডিত শোভা সিংহকে চন্দ্রকোনার রঘুনাথ সিংহের অধস্তন পুরুষ বলে দাবি করেন। ১৭৩৪ খ্রিস্টাব্দের একটি ফরমান মতে এই রঘুনাথ সিংহ সতের শতকের শেষদিকে চন্দ্রকোনার জমিদার ছিলেন। চন্দননগর থেকে ফরাসিদের লেখা একটি পত্রে শোভা সিংহের পরিবারকে একটি ‘সম্ভ্রান্ত পরিবার’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ থেকে মনে হয় তিনি সাধারণভাবে কথিত‘বাগদি’ নাও হতে পারেন। সম্ভবত তিনি নিম্নবর্ণের ক্ষত্রিয় ছিলেন। এই ফরাসি পত্র অনুযায়ী শোভা সিংহ বর্ধমানের জমিদার ও এই এলাকার মূল ইজারাদার কৃষ্ণরাম রায়ের অধীনে একজন ছোট ইজারাদার ছিলেন। শোভা সিংহ এই ইজারার জন্য বার্ষিক ২২,০০০ টাকা প্রদান করতেন এবং কৃষ্ণরামের ইজারা ছিল ২২ লক্ষ টাকার। এই ইজারার আয় কৃষ্ণরামকে একজন অত্যন্ত ধনী ব্যক্তিতে পরিণত করেছিল।

শোভা সিংহের বিদ্রোহের প্রত্যক্ষ কারণ নিশ্চিত করে বলা যায় না। ফরাসিদের লেখা সমকালীন একটি পত্র থেকে বোঝা যায় যে, শোভা সিংহের বিদ্রোহের উদ্দেশ্য তাঁর ঊর্ধ্বতন ইজারাদারের সঙ্গে নিছক ভূসম্পত্তি নিয়ে কলহের চেয়েও সুদূরপ্রসারী ছিল। পরিস্থিতি তখন বিদ্রোহের অনুকূলে ছিল। কারণ একদিকে সম্রাট আওরঙ্গজেব তখন দাক্ষিণাত্যে মারাঠাদের সঙ্গে যুদ্ধরত এবং অন্যদিকে বাংলার মুগল রাজধানী ঢাকায় সুবাহদার ও দীউয়ানের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী বিরোধের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল।

শোভা সিংহের বর্ধমান আক্রমণ সুপরিকল্পিত হলেও আকস্মিক ছিল না। শোভা সিংহ বর্ধমানে কৃষ্ণরাম রায়কে আক্রমণের পূর্বেই তাদের মধ্যে কয়েকটি খন্ডযুদ্ধ সংঘটিত হয়। সম্ভবত কৃষ্ণরাম এ আক্রমণ প্রত্যাশা করেন নি। সমসাময়িক ইউরোপীয় দলিলপত্র থেকে জানা যায় যে, ১৬৯৫ খ্রিস্টাব্দের শেষের মাসগুলিতে এ আক্রমণ পরিচালিত হয়েছিল। ১৭৩৪ খ্রিস্টাব্দের ফরমান অনুযায়ী কৃষ্ণরামের পরিবারে মৃতের সংখ্যা ছিল বাইশ। তাঁর এক পুত্র জগৎ রায় সেসময় অন্যত্র থাকায় বেঁচে যান। নারীসহ পরিবারের সদস্যদের নিমর্ম হত্যা থেকে বোঝা যায় যে, এই সংঘর্ষ নিছক ভূসম্পত্তিগত বিরোধের ফল নয়, এর গভীরে অপর কোন কারণ নিহিত ছিল। তাঁর জমিদারির অন্তর্গত দাসপুরের একটি মন্দিরের শিলালিপিতে শোভা সিংহকে একজন নিষ্ঠুর লোক হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে।

কৃষ্ণরাম ও তাঁর পরিবারকে নির্মূল করার পর শোভা সিংহ মৃত জমিদারের ভূসম্পদ দখল করতে শুরু করেন। এভাবে বিপুল অর্থের অধিকারী হয়ে শোভা সিংহ উত্তর ভারত থেকে অসন্তুষ্ট আফগানদের নিয়োগ দান শুরু করেন। সমকালীন ইংরেজ প্রতিবেদনে দেশে এ সকল আফগানদের লুটতরাজের ফলে কতিপয় মনসবদারের পতন ও সর্বনাশের কথা উল্লেখ আছে।

সুবাহদার  ইবরাহিম খান ও দীউয়ানের প্রতিদ্বন্দ্বিতার ফলেই ঢাকার মুগল প্রশাসন এই বিদ্রোহের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে। ঢাকা দরবারের অনুগৃহীত ছিলেন জগৎ শেঠের পূর্বপুরুষ মানিকচাঁদ। তাঁর ভাই গোলুলচাঁদ ছিলেন ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চুক্তিবদ্ধ ব্যবসায়ী। তিনি শোভা সিংহের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন এবং স্বজনদের পরামর্শ উপেক্ষা করে তাঁর হুন্ডি নগদায়ন করেন। এই যোগাযোগের সংবাদ পেয়ে সুবাহদার গোপনে মানিকচাঁদ ও গোলুলচাঁদের চিঠিপত্র ও হুন্ডি আটক করতে থাকেন। এর ফলে এই দুই ব্যবসায়ীর পিতা হীরানন্দ শেঠকে সম্ভবত পাটনায় বন্দি করা হয়। এই গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে সেখানে মুদ্রাব্যবসায়ীরা কর্মবিরতি পালন করে। ইবরাহিম খান মানিকচাঁদকেও ঢাকায় গ্রেপ্তার করে কড়া প্রহরায় শৃঙ্খলাবদ্ধ করে রাখেন। গোলুলচাঁদ ঢাকা যাওয়ার পথে এই গ্রেপ্তারের সংবাদ পেয়ে মকসুদাবাদে (পরে মুর্শিদাবাদ নামে পরিচিত) পালিয়ে  যান। সেখানে গিয়ে তিনি জানতে পারেন যে, তাঁর সকল ধনসম্পদ ও ভূসম্পত্তি জব্দ করা হয়েছে। হুগলিতে মুদ্রাব্যবসায়ীরা সম্ভবত দীউয়ানের নীরব সমর্থনে কর্মবিরতি পালন করে। সম্ভবত ১৬৯৬ খ্রিস্টাব্দের আগস্টের আগেই গোলুলচাঁদ কাসিমবাজারে গ্রেপ্তার হন। সুবাহদারের এই পদক্ষেপ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, বিদ্রোহীদের একাংশের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল। কারণ, তাদের সহযোগিতা ছাড়া মানিকচাঁদের চিঠি ও হুন্ডি হাত করা তার পক্ষে কষ্টসাধ্য হতো।

ইত্যবসরে বিদ্রোহ দমনে অবহেলার জন্য সম্রাট সুবাহদারকে ভৎসনা করেন। বর্ধমান হতে শোভা সিংহ কর্তৃক ৩৯ লক্ষ টাকা লুণ্ঠনের পর তাঁকে গ্রেপ্তার করতে ব্যর্থ হওয়ায় ফৌজদার নূরুল্লাহ খানের নিকট থেকে উক্ত অর্থ আদায় করার জন্য সুবাহদারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলে মনে হয়। নির্দেশে এরূপ নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থের উল্লেখ থেকে বোঝা যায় যে, সুবাহদারের বিরুদ্ধে দীউয়ানের অভিযোগ সম্রাটের নিকট পৌঁছেছিল, যদিও দীউয়ান নিজেও ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তারের ফলে ভীত হয়ে পড়েছিলেন, কারণ তাদের কাগজপত্র থেকে বিদ্রোহীদের সঙ্গে তার যোগসাজস প্রকাশ পেতে পারে। ঢাকায় মুগল প্রশাসনে অভ্যন্তরীণ বিরোধ বিদ্রোহে ইন্ধন যোগায় এবং অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে তোলে।

প্রায় আট হাজার ভাড়াটিয়া আফগান অশ্বারোহী সৈনিকের বল্গাহীন লুটপাটের ফলে এ আর্থিক বিপর্যয় চরমে ওঠে। শোভা সিংহও আশপাশের গ্রাম থেকে সম্ভবত কয়েক হাজার বাগদি পদাতিক সৈন্য নিয়োগ করেন। এরূপ নৈরাজ্যকর অবস্থা বণিকদের নিরুৎসাহিত করে এবং ব্যবসাবাণিজ্যে ভাটা পড়ে। বস্ত্র উৎপাদনকেন্দ্র ও বাজার হিসেবে খ্যাত রাধানগর শোভা সিংহের উচ্ছৃঙ্খল সৈন্যদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। অতএব মুদ্রাব্যবসায়ীদের হুগলি ত্যাগ এবং ভাগীরথী অঞ্চলে অর্থনৈতিক লেনদেন ব্যাহত হওয়ার ব্যাপারটি মোটেও অস্বাভাবিক ছিল না।

ইউরোপীয় কোম্পানিগুলি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে শুরু করে। তখন বিদ্রোহীদের অধীন কাসিমবাজারে ওলন্দাজগণ তাদের বাণিজ্যকুঠির চারপাশে উঁচু বেষ্টন-প্রাচীর নির্মাণ করে। ওলন্দাজরা কৃষ্ণরামের নিকট ঋণী থাকায় বিদ্রোহিগণ ওলন্দাজদের কাছে ষাট হাজার টাকা অথবা তাদের গোমস্তাকে বিদ্রোহীদের নিকট প্রত্যর্পণের দাবি জানায়। ওলন্দাজগণ অর্থ প্রদানে অস্বীকৃতি জানালে শোভা সিংহ হুগলিতে তাদের কুঠি পরিদর্শন এবং ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেন। ওলন্দাজগণ কয়েক হাজার টাকা প্রদান করেও শোভা সিংহকে শান্ত করতে পারে নি। এ সময়ের মধ্যে শোভা সিংহ হুগলি ও মকসুদাবাদের মধ্যবর্তী নদীতে চৌকি বসিয়ে চলাচলকারী নৌকা থেকে কর আদায় করতে শুরু করেন।

শাহী দরবারের ভৎসনার ফলে সুবাহদার ইবরাহিম খান তার ছেলে জবরদস্ত খানকে একটি সৈন্যবাহিনী প্রস্ত্তত করার নির্দেশ দেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি কোম্পানির সৈন্যদের শাহী বাহিনীতে যোগ দেওয়ার অনুরোধ জানান। বিদ্রোহিগণ তাদের কুঠি লুট করতে পারে সম্ভবত এ আশংকায় তারা এ অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে। সুবাহদার তিনটি কোম্পানিকে তাদের কুঠি সুরক্ষিত করার জন্য পরওয়ানা জারি করেন। তারা দুর্গ নির্মাণ ও পরিখা খনন করে তাদের কুঠি সুরক্ষিত করে।

বণিকগণ মালামাল প্রেরণে অস্বীকৃতি জানালে বিদ্রোহীদের চৌকিগুলি ভাগীরথী নদীতে ইউরোপীয় নৌযান আটক করতে শুরু করে। কোম্পানির লোকেরা শোভাসিংহের কাছে অভিযোগ জানালে তিনি নৌযানগুলি ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। ১৬৯৬ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিলের শেষ দিকে শোভা সিংহ বলপূর্বক ভূমিরাজস্ব আদায় করতে শুরু করেন এবং নিজ নামে দেশ শাসনের ব্যবস্থা নেন। বিদ্রোহ-পূর্ব সময়ের চেয়ে অধিক হারে কর প্রদানের বিনিময়ে বণিকদের নৌযান চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়।

বিদ্রোহিগণ তাদের কার্যক্রম সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ব্যাপক আগ্রাসী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে শুরু করলে সম্ভবত ১৬৯৬ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে বিদ্রোহের প্রকৃতি পরিবর্তিত হতে থাকে। কিন্তু শোভা সিংহের আকস্মিক দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর ফলে এই কার্যক্রম স্তিমিত হয়ে পড়ে।

ঐতিহাসিক সলিমুল্লাহ ঘটনার ৬৭ বছর পর তাঁর গ্রন্থ লিখতে গিয়ে শোভা সিংহের মৃত্যু সম্পর্কে এক রোমান্টিক কাহিনীর অবতারণা করে বলেছেন যে, কৃষ্ণরামের কন্যার সতীত্ব হরণের চেষ্টাকালে তার ছুরিকাঘাতে তিনি নিহত হন। যদুনাথ সরকার তাঁর হিস্ট্রি অব বেঙ্গল গ্রন্থে (২য় খন্ড, ১৯৪৮) এর স্বীকৃতি দিলেও শাহজাদা আজিমুদ্দীন ১৬৯৮ খ্রিস্টাব্দে শোভা সিংহকে হত্যা করেন বলে প্রচলিত মতের সপক্ষে পূর্বতন মতের গুরুত্ব হ্রাস করেন। দুটি বিবরণের মধ্যে কোনটিই সঠিক বলে মনে হয় না। ১৭৩৪ খ্রিস্টাব্দের ফরমান এবং সমকালীন ইউরোপীয় দলিলপত্রে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে যে, তার একমাত্র পুত্র ছাড়া কৃষ্ণরামের পরিবারের সকল সদস্যই নিহত হয়েছিলেন। এই পুত্রকেই পরে জমিদারি ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ২১ নভেম্বর ১৬৯৬ এবং ১৫ জানুয়ারি ১৬৯৭ তারিখের ফরাসি পত্রসমূহে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে যে, পুরনারীদের সঙ্গে ভোজ উৎসবে মশগুল অবস্থায় উঁচু চত্বর থেকে পড়ে শোভা সিংহ নিহত হন। শাহজাদা আজিমুদ্দীন সম্পর্কিত মতটি সন্দেহজনক, কেননা বিদ্রোহিগণ ১৭০৩-০৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ক্ষমতাসীন ছিল এবং শেষ পর্যন্ত তারা মুর্শিদকুলী খান কর্তৃক বিতাড়িত হয়। মুর্শিদকুলী খান এজন্য সম্রাট কর্তৃক পুরস্কৃত হন। শোভা সিংহের মৃত্যুর পর তাঁর পিতৃব্য মহাসিংহ (এ যাবৎকাল কথিত ভাই নয়) নামেমাত্র বিদ্রোহের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন; প্রকৃতপক্ষে আন্দোলনটি নিয়ন্ত্রণ করতেন আফগান নেতা রহিম খান

বাংলার অর্থনীতি ও রাজনৈতিক অঙ্গনে এ বিদ্রোহের প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। ইউরোপীয় কোম্পানিগুলি তাদের কুঠি সুরক্ষিত করার সুযোগ পায় এবং এতে পরবর্তী সময়ে তারা অতিরাষ্ট্রিক সুযোগ-সুবিধা লাভ করে। ১৬৯৮ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজদের তিনটি গ্রামের স্বত্বলাভ এদেশে তাদের অধিকারের ভিত্তিভূমি রচনা করে এবং একে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে পরবর্তী ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী। এর অপর প্রভাব হলো নতুন সুবাহদার ও দীউয়ান কর্তৃক রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে দমনমূলক ব্যবস্থায় বণিকদের নিকট থেকে অনায়াসলভ্য অর্থ সংগ্রহের মনোভাব, যেমনটি ইতঃপূর্বে ছিল না। ভাগীরথী তীরে শহর এলাকায় বল্গাহীন লুণ্ঠনের ফলে সৃষ্ট নৈরাজ্যকর অবস্থায় বেশ কয়েক বছর ধরে নগদ অর্থের সংকট দেখা দেয়। আঠারো শতকের প্রথম দিকে বাংলার বিশৃঙ্খল রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কাঠামোতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে বিচক্ষণ দীউয়ান মুর্শিদকুলী খানের বেশ কিছু সময় লেগেছিল।  [অনিরুদ্ধ রায়]