মুর্শিদকুলী খান


মুর্শিদকুলী খান (১৭০০-১৭২৭)  বাংলায় নওয়াবী শাসনের প্রতিষ্ঠাতা। বাংলায় মুর্শিদকুলী খানের কর্মজীবন শুরু হয় প্রাদেশিক দীউয়ান হিসেবে। একে একে বাংলা ও উড়িষ্যার নাজিম বা গভর্নর, বিহারের দীউয়ান এবং কয়েকটি জেলার ফৌজদারের পদ অলঙ্কৃত করার পর আঠারো শতকের প্রথম দিকে তাঁর কর্মজীবনের সমাপ্তি ঘটে।

মুর্শিদকুলী খানের পরিবার ও পিতামাতা সম্পর্কে নিশ্চিত কিছু জানা যায় না। ইস্পাহান শহরের হাজী শফি নামক একজন পদস্থ মুগল কর্মকর্তা তাঁকে ইরানে নিয়ে পিতৃস্নেহে লালন-পালন ও প্রয়োজনীয় শিক্ষাদান করেন। হাজী শফির মৃত্যুর পর তিনি ভারতে এসে গোলকুন্ডার দীউয়ান ও ফৌজদার হিসেবে মুগল সরকারের চাকরিতে যোগদান করেন এবং মনসবদারি লাভ করেন। সম্রাট আওরঙ্গজেব বাংলার প্রদেশের জন্য একজন সৎ ও দক্ষ দীউয়ান খুঁজছিলেন। তিনি তরুণ মুর্শিদকুলী খানকে এ পদের যোগ্য মনে করেন এবং ১৭০০ খ্রিস্টাব্দে তাঁকে সম্মানসূচক করতলব খান উপাধি দিয়ে দীউয়ান হিসেবে বাংলায় নিয়োগ প্রদান করেন।

নতুন নিয়োগ পেয়ে করতলব খান ঢাকায় পৌঁছেন। তিনি রাজস্ব ও অর্থনৈতিক প্রশাসনে স্বীয় যোগ্যতার পরিচয় দেন। তিনি ছিলেন সৎ এবং সম্রাটের অত্যন্ত বিশ্বস্ত। কিন্তু রাজকীয় স্বার্থ রক্ষা করতে বাংলার নাজিম ও সম্রাটের দৌহিত্র আজিমুদ্দীনের (পরবর্তী সময়ে আজিম-উস-শান) সঙ্গে তাঁর বিবাদ বাঁধে। ফলে করতলব খানের জীবন হুমকির সম্মুখীন হয়। সম্রাটের হস্তক্ষেপে করতলব খানের প্রতি সুবিচার করা হয়। ১৭০২ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট তাঁকে গঙ্গার তীরবর্তী (ভাগীরথী শাখা) মকসুদাবাদে দফতর স্থানান্তরের অনুমতি দেন। অন্যদিকে সম্রাট তাঁর দৌহিত্রকে পাটনায় প্রেরণ করেন এবং নায়েবের মাধ্যমে প্রদেশ শাসনের আদেশ দেন। করতলব খানের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পায়। ১৭০৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি সম্রাটের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে দাক্ষিণাত্য যান এবং এ সাক্ষাতে তিনি ‘মুর্শিদকুলী খান’ উপাধি লাভ করেন। এভাবে তাঁর পদমর্যাদা আরও বৃদ্ধি পায়। নতুন খেতাব ও অপরাপর মর্যাদাসহ দাক্ষিণাত্য থেকে ফেরার পর ১৭০৪ খ্রিস্টাব্দের প্রথমদিকে ইউরোপীয় কোম্পানির প্রতিনিধিগণ এবং হুগলির ফৌজদার তাঁর সঙ্গে কটক, মেদিনীপুর ও বর্ধমানে সাক্ষাৎ করেন। সম্রাট মকসুদাবাদের নাম পরিবর্তন করে তাঁর নতুন উপাধি অনুসারে মুর্শিদাবাদ রাখার অনুমতি দেন।

১৭০৭ খ্রিস্টাব্দে আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর মুগল সাম্রাজ্যে গোলযোগ শুরু হয় এবং অতি অল্প সময়ের মধ্যে সাম্রাজ্য ধ্বংস হবার উপক্রম হয়। সে সময় অনুপস্থিত নাজিমের পক্ষে তাঁর প্রতিনিধি (নায়েব) বাংলার শাসনকার্য পরিচালনা করতেন। বাহাদুর শাহের রাজত্বকালে মুর্শিদকুলী খানকে দাক্ষিণাত্যে বদলি করা হয়। তবে দুবছরের মধ্যেই ১৭১০ খ্রিস্টাব্দে তাঁকে আবার ফেরত আনা হয়। ১৭১৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি ফররুখ সিয়ার এর নাবালক পুত্র ফরখুন্দ সিয়ারের পক্ষে ডেপুটি সুবাহদার নিযুক্ত হন। তাঁর মৃত্যুর পর তিনি অনুপস্থিত সুবাহদার মীরজুমলার ডেপুটি সুবাহদার হন। মীরজুমলা মুর্শিদাবাদে অবস্থান করতেন। মুর্শিদকুলী খান ঢাকায় সর্বোচ্চ পদমর্যাদার অফিসার হওয়ায় প্রদেশের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা তাঁর হাতেই ছিল। বাংলার জন্য এটা সৌভাগ্য যে, মুর্শিদকুলী খান এই প্রদেশকে সব রকমের বিশৃঙ্খলা থেকে মুক্ত রাখতে সক্ষম হন।

মুর্শিদকুলী খান

১৭১৬ খ্রিস্টাব্দে মুর্শিদকুলী খান বাংলার নাজিম পদে উন্নীত হন। তিনি অসংখ্য উপাধি ও পদবিতে ভূষিত হন। প্রথমে তিনি ‘জাফর খান’ উপাধি পান এবং পরে তাঁকে ‘মুতামিন-উল-মুলক আলা-উদ-দৌলা জাফর খান নাসিরী নাসির জঙ্গ বাহাদুর' উপাধি দেওয়া হয়। তাঁকে সাত হাজারি মনসব প্রদান করা হয়। ১৭১৭ খ্রিস্টাব্দে তিনি প্রাদেশিক রাজধানী ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে স্থানান্তর করেন। সাফল্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন শেষে ১৭২৭ খ্রিস্টাব্দের ৩০ জুন মুর্শিদকুলী খানের মৃত্যু হয়।

মুর্শিদকুলী খান কেবল বাংলার দীউয়ান ও সুবাহদার ছিলেন তা নয়, একই সময়ে তিনি ছিলেন উড়িষ্যার দীউয়ান ও সুবাহদার, বিহারের দীউয়ান এবং কয়েকটি জেলার ফৌজদার। তাঁর নিয়ন্ত্রণে ছিল তিনটি প্রদেশ। এই সুবাদে তিনি তাঁর আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধ-ুবান্ধবদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ করেন। তারা তাঁকে রাজস্বসহ প্রশাসনিক কাজে সহায়তা করেন। ১৭২২ খ্রিস্টাব্দে মুর্শিদকুলী খান পূর্ববর্তী টোডরমল ও শাহ সুজা প্রবর্তিত ভূমিরাজস্ব বন্দোবস্ত পদ্ধতির সংস্কার করে একটি নতুন বন্দোবস্ত প্রবর্তন করেন। রাজস্ব কর্মচারীদের মাধ্যমে তিনি ভূমির উৎপাদনক্ষমতা নিশ্চিত করেন এবং এভাবে সরকারি রাজস্ব বৃদ্ধিরও ব্যবস্থা করেন। তাঁর রাজস্ব ব্যবস্থা মাল জমিনী নামে পরিচিত, অর্থাৎ তিনি জমিদারদের উপর তাদের জমির রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব অর্পণ করেন। তাঁর আমলে বেশ কিছু নতুন ও বৃহৎ জমিদারির পত্তন হয়। তাঁর সময়ে জমিদার হিসেবে সাধারণভাবে হিন্দুরাই অধিকতর পছন্দের ছিলেন। কারণ তিনি মনে করতেন, হিন্দুদের কাছ থেকে সহজে রাজস্ব আদায় করা সম্ভব। রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে মুর্শিদকুলী খান অত্যন্ত কঠোর ছিলেন এবং নিয়ম লঙ্ঘনকারীদের তিনি শাস্তি  দিতেন। এই শাস্তি কখনও কখনও অত্যাচার ও জবরদস্তিতে পরিণত হতো।

মুর্শিদকুলী খানের আমলে অভ্যন্তরীণ ও বহির্বাণিজ্যে বাংলার প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়। আরব, পারস্য ও আর্মেনীয় ব্যবসায়ীরা বাংলায় বেশ সক্রিয় ছিল। সতের শতক থেকে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলি বাংলায় উৎপাদিত সুতা, রেশম ও তা থেকে উৎপন্ন বস্ত্রসামগ্রী ক্রয় শুরু করে। এসব ক্রয়ের জন্য তারা স্বর্ণ ও রৌপ্য আমদানি করত। এর ফলে এদেশে প্রচুর পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়। এই ব্যবসা প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে মুদ্রা ব্যবসায়ী, সাহু বা পোদ্দার, মহাজন, বানিয়া ও দালালরা দ্রুত মহাজনি ব্যবসায় উন্নতি লাভ করে। এ ধরনের বহু মহাজনের মধ্যে জগৎ শেঠ অতি প্রসিদ্ধ হয়ে ওঠেন। মুর্শিদকুলী খান বাণিজ্যের গুরুত্ব অনুধাবন করেন এবং ব্যবসায়ী ও কোম্পানিগুলিকে সৎ ব্যবসায়ে উৎসাহ প্রদান করেন। তিনি অসৎ ব্যবসায়ীদের কঠিন শাস্তিদানের ব্যবস্থা করেন। মুর্শিদকুলী খান সম্রাটের প্রতি এতই কৃতজ্ঞ ছিলেন যে, ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে তিনি কলকাতার আশেপাশে বেশি গ্রাম ক্রয়ের অনুমতি দেননি, এমনকি কোম্পানির রাজকীয় ফরমান লাভের পরও তিনি অনমনীয় ছিলেন।

মুর্শিদকুলী খান মসজিদ নির্মাণে যত্নবান ছিলেন। তিনিই ঢাকার করতলব খান মসজিদ (বেগম বাজার মসজিদ) এবং মুর্শিদাবাদ মসজিদ নির্মাণ করান। ব্যক্তি-জীবনে তিনি অত্যন্ত ধার্মিক ছিলেন এবং স্বহস্তে পবিত্র কুরআনের অনুলিপি তৈরি করে তিনি পবিত্র স্থানে বিতরণ করতেন। তিনি শিয়া মতবাদে বিশ্বাসী ছিলেন।  [আবদুল করিম]