জগৎ শেঠ


জগৎ শেঠ  বাংলার অত্যন্ত ধনী ব্যাংকার ফতেহ চাঁদকে আঠারো শতকের প্রথমার্ধে ‘জগৎ শেঠ’ বা বিশ্বের ব্যাংকার উপাধি প্রদান করা হয়। জগৎ শেঠ পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মানিক চাঁদ। তিনি আঠারো শতকের প্রথম দিকে পাটনা থেকে ঢাকা আসেন এবং এখানে একটি বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। বাংলার দীউয়ান মুর্শিদকুলী খান তার রাজধানী মুর্শিদাবাদে স্থানান্তর করলে, মানিক চাঁদ তার সাথে নতুন রাজধানীতে চলে যান। মুর্শিদাবাদে তিনি ছিলেন নওয়াবের খুবই প্রিয়ভাজন এবং পরে নওয়াবের ব্যাংকার ও অর্থনৈতিক উপদেষ্টার পদ লাভ করেন। ১৭১২ সালে দিল্লির সিংহাসনে আরোহণের পর পরই সম্রাট ফররুখ সিয়ার ‘নগর শেঠ’ (নগরের ব্যাংকার) উপাধি প্রদান করে মানিক চাঁদকে সম্মানিত করেন। ১৭১৪ সালে মানিক চাঁদের মৃত্যুর পর তার ভ্রাতুষ্পুত্র (দত্তক পুত্র) ও উত্তরাধিকারী ফতেহ চাঁদের নেতৃত্বে পরিবারটি বিপুল খ্যাতি অর্জন করে। ১৭২৩ সালে সম্রাট মাহমুদ শাহ ফতেহ চাঁদকে ‘জগৎ শেঠ’ উপাধি প্রদান করলে এ ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানটি দেশে এক অনন্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়। এর সদর দফতর ছিল মুর্শিদাবাদে এবং ঢাকা, পাটনা ও দিল্লিসহ বাংলার গুরুত্বপূর্ণ শহর ও বাংলার বাইরে এ ব্যাঙ্কের শাখা ছিল। সমকালীন দলিল দস্তাবেজে জগৎ শেঠের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কারবার, যেমন ঋণগ্রহণ, ঋণ পরিশোধ, সোনারুপার ক্রয়-বিক্রয় ও অন্যান্য লেনদেনের উল্লেখ রয়েছে। রবার্ট ওর্ম (orme) লিখেছেন যে, এ হিন্দু ব্যবসায়ী পরিবারটি মুগল সাম্রাজ্যে সর্বাধিক ধনবান ছিল; মুর্শিদাবাদ সরকারের উপর এ পরিবার প্রধানের ছিল প্রচন্ড প্রভাব। তিনি অধিকাংশ জমিদারের পক্ষে নিরাপত্তা জামিনদার হতেন এবং তার প্রতিনিধিরা ব্যবসায়ীদের ঋণ দিতেন। রাজ্যের কোথায় কি ঘটছে তা তিনি অন্যদের চেয়ে বেশি জানতেন এবং প্রতিটি জরুরি ব্যয় নির্বাহের ক্ষেত্রে তার সহায়তার প্রয়োজন হতো।

এ প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেনকে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের লেনদেনের সাথে তুলনা করা হয়েছে। আঠারো শতকে ব্যাংক অব ইংল্যান্ড ব্রিটিশ সরকারের জন্য যেমন আর্থিক কর্মকান্ড ও দায়দায়িত্ব পালন করত, এ প্রতিষ্ঠানটিও বাংলার সরকারের পক্ষে অনুরূপ দায়িত্ব সম্পাদন করত। এর আয়ের উৎস ছিল বহুমুখী। এ প্রতিষ্ঠানটি ছিল সরকারি রাজস্ব জমা গ্রহণকারী ও জিম্মাদার। জমিদারগণ এ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সরকারে রাজস্ব জমা দিতেন এবং নওয়াবরাও এর মাধ্যমেই তাদের বার্ষিক প্রদেয় অর্থ দিল্লিতে প্রেরণ করতেন। এ ব্যাংক প্রতিষ্ঠান মুদ্রা তৈরি করত এবং বাংলায় আমদানিকৃত বিপুল পরিমাণ সোনারুপা ক্রয় করত। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি বছরে প্রচুর মুনাফা করত।

ফতেহ চাঁদের পর তার পৌত্র মাহতাব চাঁদ ১৭৪৪ সালে উত্তরাধিকারসূত্রে ‘জগৎ শেঠ’ উপাধি লাভ করেন। তিনি ও তার সম্পর্কিত ভাই মহারাজা স্বরূপ চাঁদ নওয়াব আলীবর্দী খান এর সময়ে অত্যন্ত প্রভাবশালী ছিলেন। আলীবর্দীর উত্তরাধিকারী সিরাজউদ্দৌলা এ পরিবারের দুভাইকে বৈরী করে তোলেন। ফলে তারা তার বিরুদ্ধে ইংরেজদের সাথে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন এবং পলাশীর যুদ্ধ এর আগে ও পরে তাদেরকে বিপুল অর্থ দিয়ে সাহায্য করেন। বাংলার জনগণ বিশ্বাস করে যে, জগৎ শেঠের অর্থ আর ইংরেজদের তলোয়ার মিলে বাংলায় মুসলিম শাসনের পতন ঘটিয়েছে। মীরজাফর এর নওয়াবী আমলেও তাদের শক্তি ও প্রভাব অব্যাহত ছিল। কিন্তু তারা তার উত্তরাধিকারী মীর কাসিমের বিরাগভাজন হন। মীর কাসিম ১৭৬৩ সালে শেঠ পরিবারের নেতৃস্থানীয় এ দুভাইকে হত্যার নির্দেশ দেন। এ ঘটনার পরই নওয়াবের কাছ থেকে ক্ষমতা কোম্পানির হাতে চলে যায় এবং আঠারো শতকের শেষের দিকে এ পরিবারের পতনের সূচনা হয়।

জগৎ শেঠদের সেবার স্বীকৃতিস্বরূপ এ পরিবার বেশ কয়েক বছর কোম্পানির ব্যাংকার ছিল। কিন্তু ১৭৭৩ সালে মুর্শিদাবাদ থেকে কলকাতায় কোষাগার স্থানান্তরিত হলে কোম্পানির ব্যাংকার হিসেবে জগৎ শেঠ পরিবারের কার্যক্রমের অবসান ঘটে। তখনও পরিবারটির সুবিধাজনক হারে মুর্শিদাবাদে মুদ্রা প্রস্ত্ততের সুযোগ ছিল, কিন্তু পূর্বপুরুষদের তুলনায় তাদের ধনসম্পদ এত হ্রাস পেয়েছিল যে তারা এ সুযোগের যথার্থ ব্যবহার করতে পারে নি। মাহতাব চাঁদের উত্তরাধিকারীরা ছয় পুরুষ ধরে ‘জগৎ শেঠ’ উপাধি লাভ করে এসেছেন। জগৎ শেঠ উপাধিধারীদের মধ্যে সর্বশেষ বংশধর হলেন ফতেহ চাঁদ। তার মৃত্যুর পর এ উপাধির আর নবায়ন হয় নি।  [কে.এম মোহসীন]