মহাজন


মহাজন  সংস্কৃত শব্দ, যার আক্ষরিক অর্থ মহৎ মানুষ। তবে প্রায়োগিক অর্থে এর মানে বণিক, ডিলার বা দোকানদার, ব্যাঙ্কার, পোদ্দার এবং উপনিবেশিক ও প্রাক-উপনিবেশিক বাংলার প্রেক্ষাপটে কুসীদজীবী বোঝায়। অদ্যাবধি শব্দটির ব্যাপক প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়। বাংলার সামাজিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসে ‘মহাজন’ শব্দের একটি আপেক্ষিক অর্থ আছে। উৎপাদন প্রক্রিয়ায় যে ব্যক্তি অধস্তনের ভূমিকা পালন করে, তার পরিপ্রেক্ষিতে উৎপাদন প্রকরণ ও বিতরণের মালিক একজন মহাজন। একজন তাঁতিও মহাজন হতে পারে যদি তার ব্যবহূত বুনন সামগ্রী বা তার বুননের স্থান অন্যেরা তার কাছ থেকে ধার নেয়। দোকানির দোকানদারি যদি কারও প্রদত্ত ঋণের অর্থের উপর নির্ভর করে, তবে শেষোক্ত ব্যক্তি প্রথমোক্ত জনের মহাজন। উপনিবেশিক ও প্রাক-উপনিবেশিক যুগে সব ধরনের পাওনাদারকে মহাজন বলা হতো এবং আজও বলা হয়ে থাকে।

আগেকার দিনে যারা বংশগতভাবে সুদের বিনিময়ে টাকা ধার দিত বা বাট্টার বিনিময়ে টাকাকড়ি ভাঙিয়ে দিত অর্থাৎ পোদ্দারি করত তাদেরকেই যথার্থভাবে মহাজন বলা হতো। উনিশ শতকের শেষ দিকে প্রতীক মুদ্রা প্রবর্তনের আগে, বাংলার মুদ্রাব্যবস্থা এর বড় বৈশিষ্ট্য ছিল একাধিক  মুদ্রার উপস্থিতি। একটি অত্যন্ত জটিল বাট্টা ব্যবস্থার মাধ্যমে এই বহুবিধ মুদ্রাকে সর্বসাধারণের গ্রহণযোগ্য একটি একক বৈধ মুদ্রায় রূপান্তরিত করা হতো। বাট্টা বাজার সম্পূর্ণভাবে বানিয়া ও মহাজনদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। প্রকৃতপক্ষে বানিয়াদেরকেও মহাজন বলা হতো। বাট্টা বাজার নিয়ন্ত্রণ ছাড়াও মহাজনরা হুন্ডি ক্রয়-বিক্রয় করত। হুন্ডির মাধ্যমেই মফস্বলে সংগৃহীত খাজনা সদর দপ্তরে বা অন্যান্য জেলা কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছানো হতো। মহাজনরাই আন্তঃজেলা ব্যবসায়ীদের তরফ থেকে হুন্ডি কেনাবেচা করত এবং প্রধানত এদের মাধ্যমেই প্রাগুক্ত ব্যবসায়ীরা লেনদেন সম্পন্ন করত। হুন্ডি ও বাট্টা বাজার ছাড়াও কৃষিঋণের বাজারও মহাজনদের দখলে ছিল। প্রাক-উপনিবেশিক যুগে রায়তরা প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হলে তাকাবি বা কৃষিঋণ পেত, জমিদাররাও খাজনা মওকুফ করতেন। কিন্তু ব্রিটিশ আমলে তাকাবি প্রথা ও খাজনা মওকুফ প্রথা উভয়ই বন্ধ হয়ে যায়। প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ প্রথার অবর্তমানে মহাজনদের কাছ থেকে ঋণ নেওয়া ছাড়া রায়তদের কোন বিকল্প ছিল না। উনিশ শতকে অধিকাংশ ভূস্বামী মহাজনী ব্যবসা করত। রায়তদেরকে তারা কৃষিঋণ দিত এবং সুদসহ সে ঋণ আদায় করত। এর ফলে প্রজাদের উপর তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও পাকাপোক্ত হয়।

ব্রিটিশ আমলে কৃষির বাণিজ্যিকীকরণের ফলে বাংলার কৃষিব্যবস্থা জীবনযাপনের জন্য নেহায়েৎ প্রয়োজনীয় অর্থনীতি থেকে সরে এসে বাজার অর্থনীতির দিকে ঝুঁকে পড়ে। এর ফলে গ্রামীণ ঋণের পরিমাণ বেড়ে যায় এবং বাংলার সমাজ ও অর্থনীতিতে মহাজন শ্রেণির আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। বিশ শতকের গোড়ার দিকে গ্রামীণ অর্থনীতির বড় অংশটি মহাজনদের কাছে বন্ধকী হয়ে পড়ে বলে ধরা হয়। এ সময়ে মহাজনী আধিপত্যের চরম প্রকাশ ঘটে।

১৯৩০-এর দশকে মন্দার প্রভাবে পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করে। বাংলার কৃষক সমাজ মহাজনদের হাতে সম্পূর্ণ বন্দি হয়ে পড়ে। ‘বেঙ্গল মানিলেন্ডারস্ অ্যাক্ট’ (১৯৩৩) ও ‘বেঙ্গল অ্যাগ্রিকালচারাল ডেটরস্ অ্যাক্ট’ (১৯৩৫) এই দুটি আইনের মাধ্যমে ব্রিটিশ সরকার সংকট অতিক্রমের চেষ্টা করে। ‘বেঙ্গল অ্যাগ্রিকালচারাল ডেটরস্ অ্যাক্ট’-এর অধীনে বাংলার প্রতিটি জেলার প্রতিটি ইউনিয়নে ঋণ সালিশি বোর্ড স্থাপন করা হয়। মহাজন ও দেনাদার উভয়কে ডেকে বোর্ড সূতপীকৃত দেনার পরিমাণ কমিয়ে এনে ঋণ নিষ্পত্তির প্রয়াস চালায়। ঋণগ্রস্ত কৃষককুলের বোঝা লাঘব করার জন্য ১৯৪০ সালে ‘বেঙ্গল মানিলেন্ডারস্ অ্যাক্ট’ সংশোধন করা হয়।

পাকিস্তান আমলে বাংলাদেশের সমাজ ও অর্থনীতিতে মহাজনী প্রথার প্রভাব কমতে থাকে। স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর এই ব্যবস্থা আরও সংকুচিত হয়। ইদানীং বড় আকারে প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ-সুবিধা প্রদানের নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। গ্রামীণ তথা মানবসম্পদ উন্নয়নে এনজিওসমূহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। সর্বোপরি গ্রামীণ ব্যাঙ্ক অনুসৃত ক্ষুদ্র-ঋণ প্রকল্প গ্রামীণ অর্থনীতিতে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন সাধন করে চলেছে। এ সবের কারণে ঐতিহ্যগত মহাজনী প্রথা বর্তমানে সেকেলে ও মৃতপ্রায় প্রতিষ্ঠায় পরিণত হয়েছে।  [সিরাজুল ইসলাম]

আরও দেখুন অপ্রাতিষ্ঠানিক ঋণ