হিন্দুধর্ম


হিন্দুধর্ম প্রচলিত অর্থে যাকে হিন্দুধর্ম বলা হয়, তা মূলত সনাতন ধর্ম। ‘সনাতন’ শব্দের অর্থ শাশ্বত বা চিরন্তন; অর্থাৎ যা আগে ছিল, এখনও আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে তাই সনাতন। হিন্দুধর্মের নির্দিষ্ট কোনো শুরু বা একক কোনো প্রবর্তক নেই। যুগযুগ ধরে মুনি-ঋষি এবং মহামনীষীরা জীবন, জগৎ ও জগতের স্রষ্টা সম্পর্কে যেসব চিন্তা-ভাবনা করেছেন, সেসবেরই সমন্বিত রূপ হিন্দুধর্ম। তাঁদের চিন্তা-ভাবনা প্রথম বেদের আকারে প্রকাশ পায় এবং পরে এই বেদের ওপর ভিত্তি করেই হিন্দুধর্মের বিকাশ ঘটে; তাই এ ধর্মের অপর নাম হয় বৈদিক ধর্ম।

হিন্দুরা বিশ্বাস করে যে, সনাতন ধর্মের অভ্যূদয় মানব সৃষ্টির শুরুতেই এবং তা স্থায়ী হবে সৃষ্টির বিলয় পর্যন্ত। এ ধর্ম স্বয়ম্ভূ ঈশ্বরে বিশ্বাস এবং এই বিশ্বের সৃষ্টি, স্থিতি ও লয় এই তিন সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত।

সাধারণভাবে হিন্দুরা জন্মান্তরবাদে বিশ্বাসী। তাদের মতে প্রতিটি জীবই জন্ম, মৃত্যু ও পুনর্জন্মের প্রক্রিয়াধীন। পুনর্জন্মের মাধ্যমে পাপ ক্ষয় দ্বারা মানুষ মোক্ষ লাভ করতে সক্ষম হয়। এ বিশ্বাসই হিন্দুধর্মের মূল ভিত্তি।

বৈদিক যুগ  অধিকাংশের ধারণায় হিন্দুধর্ম বহু দেবদেবী এবং বর্ণাঢ্য বা ভয়ঙ্কর সব ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সমাহার। প্রকৃতপক্ষে এটি একটি গভীর ধর্মদর্শন। এর উদ্ভব ঘটেছে খ্রিস্ট জন্মের কমপক্ষে আড়াই হাজার বছর আগে। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ব্যাখ্যা ও সংস্কারের মাধ্যমে বিবর্তিত হয়ে তা বর্তমান রূপ লাভ করেছে। হিন্দুধর্মের মূল উৎস বেদকে হিন্দুরা ঈশ্বরের বাণী বলে বিশ্বাস করে। পরে আরও অনেক ধর্মগ্রন্থ রচিত হলেও হিন্দুধর্মে বেদের প্রাধান্যই সর্বাধিক।

বেদে বিভিন্ন দেবদেবী, যথা  অগ্নি, ইন্দ্র, বরুণ, ঊষা প্রমুখের বর্ণনা আছে। একটি বিশ্বাসমতে এসকল দেবদেবী প্রকৃতির বিভিন্ন শক্তির আধার; অপর মতে তাঁরা পরমেশ্বরেরই বিভিন্ন রূপের প্রকাশ।

সমগ্র  বেদ  বা বৈদিক সাহিত্য চারটি প্রধান স্তরে সম্পূর্ণ। স্তরগুলি বৈদিক যুগের বিভিন্ন সময়ে গড়ে উঠেছে। প্রথম স্তরটি হলো সংহিতা। এটি বিভিন্ন দেবতার উদ্দেশে নিবেদিত মন্ত্র বা শ্লোকের সমাহার। এসব মন্ত্র বা শ্লোকে দেবতাদের প্রশস্তি এবং তাঁদের নিকট কাঙ্ক্ষিত বিষয়ের প্রার্থনা স্থান পেয়েছে। মন্ত্রোচ্চারণপূর্বক আরাধনা করলে দেবতারা সন্তুষ্ট হয়ে ভক্তদের বর প্রদান করেন।

বেদের দ্বিতীয় স্তর ব্রাহ্মণসাহিত্য। এতে যজ্ঞসংক্রান্ত অনুষ্ঠানাদি বর্ণিত হয়েছে। হিন্দুধর্মে যজ্ঞকে সর্বাপেক্ষা পবিত্র কর্মসমূহের অন্যতম মনে করা হয়। এর অনুশীলনের ফলে স্বর্গের দ্বার উন্মুক্ত হয়। তৃতীয় স্তর হলো আরণ্যক। এ পর্বে ঈশ্বর আরাধনার মাধ্যমে অরণ্যে জীবন কাটানো এবং আধ্যাত্মিক জীবন গঠন সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। বেদের চতুর্থ পর্যায় হলো  উপনিষদ, যাতে বিশ্বের রহস্য উন্মোচনে মানুষের আকুতি প্রকাশ পেয়েছে। এভাবে বৈদিক সাহিত্যে মানুষের বৈষয়িক পরিতৃপ্তি থেকে শুরু করে ঐশিক প্রেরণা অর্থাৎ ঈশ্বরের সান্নিধ্য লাভের ব্যাকুল বাসনা স্থান পেয়েছে।

স্মৃতিযুগ  হিন্দুধর্মে বেদ ভিন্ন ধর্মীয় আচার-আচরণ সংক্রান্ত অনেক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও টীকাগ্রন্থের ব্যবহার প্রচলিত আছে। সেগুলি স্মৃতিশাস্ত্র নামে অভিহিত। স্মৃতিশাস্ত্রের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত নয়, কারণ সময়ের পরিবর্তন ও জ্ঞানের বিকাশ সাপেক্ষে এর সিদ্ধান্ত পরিবর্তিত হয়। তবে হিন্দুধর্মের বহুমাত্রিকতা সম্পর্কে পরিপূর্ণ ধারণা পাওয়ার জন্য বৈদিক সাহিত্যের পাশাপাশি স্মৃতিশাস্ত্রেরও চর্চা প্রয়োজন। সেই সঙ্গে ধর্মীয় মহাকাব্য  রামায়ণমহাভারত, এমনকি পুরাণসমূহ চর্চারও প্রয়োজন আছে। এগুলির ভাষা ও বিশ্লেষণ সহজবোধ্য এবং গল্প ও উপদেশের মাধ্যমে হিন্দুধর্মের মৌলিক সত্যকে সকলের নিকট বোধগম্য করে তোলা হয়েছে।

গীতা হিন্দুধর্মের উপদেশমূলক একটি দার্শনিক গ্রন্থ। গীতা অনুযায়ী হিন্দুধর্ম একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায় বা সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, তা বহুযুগ পার হয়ে মানব সমাজে আবির্ভূত একটি চিরন্তন ধর্ম। গীতায় ব্যবহূত ‘ধর্ম’ শব্দটি নির্দিষ্ট কোনো সম্প্রদায়ের বিশ্বাসকে নির্দেশ করে না। এ শব্দটি দ্বারা এমন একটি বিশ্বাসকে নির্দেশ করা হয়েছে, যা ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষই অনুশীলন করতে পারে। তা হলো মানুষের গুণগত বা পেশাগত ধর্ম। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পূর্বে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে এই ধর্ম পালনের কথাই জোর দিয়ে বলেছেন।

হিন্দুধর্মের অন্যতম মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো ফলের প্রত্যাশা না করে কাজ করা। ভগবদ্গীতায় এ বিষয়টি চমৎকারভাবে বর্ণিত হয়েছে। এ দর্শনের বক্তব্য অনুযায়ী সৃষ্টি রক্ষার্থেই মানুষকে সমাজের প্রতি অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে হবে। কাজ না করলে সৃষ্টি লোপ পাবে। তবে মানুষকে এ কাজ করতে হবে কোনো প্রকার পুরস্কারের প্রত্যাশা না করে। যখন কোনো কাজ পুরস্কার বা প্রতিদানের প্রত্যাশায় করা হয় তখন তা বন্ধনের উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়। অপরদিকে ব্যক্তিক লাভালাভের প্রত্যাশা না করে কোনো কাজ করা হলে তা মোক্ষ লাভের কারণে পরিণত হয়। মানুষ তখন আর ব্যক্তিগত লোভ-লালসা বা পুরস্কারের প্রত্যাশায় আবদ্ধ থাকে না, তখন সে বিশ্বের সকলের সঙ্গে নিজেকে এক করে দেখতে শেখে।

এ বিষয়টি স্বভাবতই একটি প্রশ্নের অবতারণা করে যে, যদি কেউ ব্যক্তিগত লাভালাভের কথা চিন্তা না করে কোনো কাজ করে এবং তার ফলাফলের দ্বারা ব্যক্তিগতভাবে উপকৃত হতে না চায়, তাহলে উক্ত ফলাফলে কে লাভবান হবে? এর উত্তরে গীতায় বলা হয়েছে যে, সকল কাজের ফল ঈশ্বরে সমর্পণ করতে হবে। গীতার মতে ঈশ্বর সর্বভূতে, অর্থাৎ সকল জীব ও জড়ে বিরাজমান। এ দুটি মতবাদকে একত্রে বিবেচনা করলে দেখা যায় যে, কর্মের ফল কোনো একক ব্যক্তির নয় বরং পৃথিবীর সকল প্রাণীর মঙ্গলের জন্য। এই যে বৈশ্বিক মনোভাব এটাই হিন্দুধর্মের মৌলিক বিশেষত্ব।

সকল ক্ষেত্রেই শক্তি প্রয়োগ নীতিবহির্ভূত হিন্দুধর্ম এ দর্শনে বিশ্বাস করে না। উদাহরণ হিসেবে গীতায় বর্ণিত ক্ষত্রিয়ের দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথা বলা যায়। সেখানে রাষ্ট্রে একজন ক্ষত্রিয়ের করণীয় সম্পর্কে সুস্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ধর্মে অবশ্যই রাজনীতি ও শৌর্য-বীর্যের স্থান রয়েছে, তবে প্রেম-ভালোবাসার স্থান সকলের ওপরে। হিন্দুধর্মে সকল প্রাণী এমনকি পশুপাখিদের প্রতিও যথাযথ করুণা প্রদর্শনের নির্দেশ রয়েছে। হিন্দুধর্ম অনুযায়ী মানুষ, পশুপাখি সকল প্রাণীই সমভাবে পবিত্র। ফলে স্বাভাবিকভাবেই হিন্দুরা প্রাণিজগতের নির্বিচার নিধনে আতঙ্কিত হয়, যদিও মানুষের খাদ্য হিসেবে পশুপাখি প্রভৃতি হত্যা এ ধর্মেও স্বীকৃত। হিন্দুধর্মে মাংস ভক্ষণ স্বীকৃত হলেও নিরামিষ ভোজনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। তবে বিশেষ বিশেষ ধর্মীয় অনুষ্ঠানে মাংসভক্ষণ একেবারেই নিষিদ্ধ।

পুরোহিততন্ত্রে নৈতিকতা ও আনুষ্ঠানিক পবিত্রতার মধ্যে বিভ্রান্তি লক্ষ করা যায়। এতে একজন মানুষ হত্যার চেয়ে তার মৃতদেহ স্পর্শ করা গুরুতর অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত। অবশ্য প্রধান শাস্ত্রসমূহে এসবের পরিবর্তে আত্মনিয়ন্ত্রণ ও মানবপ্রেমের ওপরই অধিক জোর দেওয়া হয়েছে। মানুষের কাঙ্ক্ষিত নৈতিক দায়িত্ব পালনের জন্য আত্মনিয়ন্ত্রণের অনুশীলন অত্যাবশ্যক। কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ এগুলি মানুষকে কুপথে পরিচালিত করে নরকের দ্বারে নিয়ে যায়। একজন প্রকৃত হিন্দু এগুলিকে স্বীয় সৎ গুণাবলি দ্বারা দমন করেন। তিনি পবিত্রতা দ্বারা কামকে, প্রেম দ্বারা ক্রোধকে এবং ঔদার্য দ্বারা লোভ ও মোহকে সংবরণ করেন। বেদে বলা হয়েছে: ‘যে বাধা অতিক্রম করা কষ্টকর তা অতিক্রম কর। ক্রোধকে ভালবাসা দ্বারা এবং মিথ্যাকে সত্য দ্বারা জয় কর।’ মহাভারতে বলা হয়েছে: ‘স্বীয় জ্ঞানালোকে আলোকিত মহান ঋষিরা যেসকল ধর্মীয় নিয়ম বা সদাচার শিক্ষা দিয়েছেন, সেসবের মধ্যে আত্মনিয়ন্ত্রণ শ্রেষ্ঠ।’ এই আত্মনিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা অর্জনের জন্য কৃচ্ছ্রতাসাধন ও বৈরাগ্য অবলম্বন প্রয়োজন। কিন্তু আত্মনিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা অর্জিত হয়ে গেলে আর এসবের প্রয়োজন থাকে না।

হিন্দুধর্মে অনুশোচনার পর্যাপ্ত বিধান রয়েছে। যদি কোনো ব্যক্তি পাপ করার পর তার জন্য অনুশোচনা করে বা পাপমুক্তির জন্য প্রবল আকুতি জানায়, তাহলে তার পাপ নষ্ট হয়ে যায়। যদি সে প্রতিজ্ঞা করে যে সে আর কখনই ওই পাপ করবে না, তাহলে সে পবিত্র হয়ে যাবে। হিন্দুধর্মমতে যিনি নিজেকে কর্ম থেকে বিরত রাখেন তিনি প্রকৃত সন্ন্যাসী নন। যোগাভ্যাস ও কর্ম উভয়ই সমার্থক। জ্ঞান ও কর্মের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। জ্ঞানীরা নন, বরং সাধারণ লোকেরাই জ্ঞান ও কর্মকে পৃথক মনে করে। একজন জ্ঞানী ও একজন কর্মীর অর্জিত শান্তি একই। তিনিই প্রকৃত সত্যের সন্ধান পান যাঁর দৃষ্টিতে জ্ঞান ও কর্ম এক।

বর্ণাশ্রম ধর্ম এ সম্পর্কে মনুস্মৃতিতে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। ঋগ্বেদের পুরুষসূক্তে এর বীজ নিহিত, যেখানে সমগ্র মানবসমাজকে এক বিশ্বমানব বা সমাজমানব হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এই বিশ্বমানব বা বিরাটপুরুষের মুখ থেকে ব্রাহ্মণ, বাহু থেকে ক্ষত্রিয়, উরু থেকে বৈশ্য এবং পা থেকে শূদ্রের জন্ম হয়েছে। এভাবেই মাথা (মেধা), বাহু (শক্তি), উরু (ব্যবসা) এবং পা (কৃষি) সমন্বিত এক পুরুষের কল্পনা করা হয়েছে, যিনি অন্য সকল জীবের ওপর কর্তৃত্ব করেন। পুরুষসূক্ত এই বর্ণাশ্রমধর্ম অনুসারে মানুষকে চারটি সাধারণ ভাগে ভাগ করেছে। ভাগগুলি হলো: ক. ব্রাহ্মণ অর্থাৎ জ্ঞান, বিজ্ঞান, সাহিত্য, শিক্ষা ও চিন্তাশক্তিতে পূর্ণ মানব; খ. ক্ষত্রিয় অর্থাৎ শৌর্য-বীর্যেপূর্ণ মানব; গ. বৈশ্য অর্থাৎ ব্যবসা ও অর্থ সংগ্রহে উৎসাহী মানব এবং ঘ. শূদ্র অর্থাৎ স্বল্প বুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তি যারা সীমিত চিন্তা-চেতনার বাইরে কোনো কাজ করতে পারে না এবং যারা শুধুমাত্র কায়িক পরিশ্রমের উপযুক্ত।

সমন্বিত সামাজিক পুরুষের মস্তক থেকে ব্রাহ্মণের উৎপত্তি এবং পা থেকে শূদ্রের উৎপত্তি এ ধারণা একটি সামাজিক বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। জন্ম তথা উৎপত্তিগত কারণে এ ধারণা স্বীকৃতি পেয়েছে যে, সামাজিক অবকাঠামোয় ব্রাহ্মণদের শ্রেষ্ঠতর অবস্থান রয়েছে, যা দ্বারা তারা সামাজে স্বীয় নিয়ন্ত্রণ অক্ষুণ্ণ রাখতে পারে। কিন্তু বর্ণবিন্যাস সম্পর্কে এটি একটি ভুল ধারণা। শূদ্রকে পরমেশ্বরের পা হিসেবে বর্ণনা করে ঋষি বলতে চেয়েছেন যে, সমাজ বিন্যাসে তার অবস্থান অতীব গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তাকে বাদ দিয়ে সমাজ-কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব নয়। সমাজে পর্যাপ্ত সংখ্যক শারীরিকভাবে সক্ষম লোকজন না থাকলে জ্ঞানী ব্যক্তিদের সুচিন্তিত বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হওয়া সম্ভব নয়। ক্ষত্রিয় এবং বৈশ্যদের ক্ষেত্রেও একথা সমভাবে প্রযোজ্য। মানুষের শৌর্য-বীর্য এবং শারীরিক ক্ষমতা প্রণীত পরিকল্পনাকে বাস্তব রূপ দেওয়ার উপযোগী পরিমন্ডল সৃষ্টি করে। অনুরূপভাবে সমাজের প্রগতির জন্য উৎসাহী ব্যবসায়ী সম্প্রদায়েরও একান্ত আবশ্যক। অতএব বিশ্বমানব (পরম পুরুষ) ও তাঁর চারটি অঙ্গ গঠনে চতুর্বর্ণের এই ধারণা সুষ্ঠুভাবে সামাজিক কর্মকান্ড সম্পাদন ও তার উন্নয়নে একটি আদর্শ পরিকল্পনা বলা যায়।

চতুর্বর্গ হিন্দুধর্ম অনুযায়ী জীবনের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য দুটি বিবর্তন ও উন্নয়ন এবং চূড়ান্ত মঙ্গল লাভ। চূড়ান্ত মঙ্গল বলতে এখানে ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ এই চতুর্বর্গকে বোঝানো হয়েছে। ধর্ম বলতে এখানে মানুষের ঐশ্বরিক গুণাবলির সমষ্টিকে বোঝায়, অর্থ হলো তার বৈষয়িক অবস্থা, কাম ইন্দ্রিয়সন্তুষ্টি আর মোক্ষ হচ্ছে সকল দুঃখ, সংশয় ও ভয় থেকে মুক্তি, অর্থাৎ জন্ম-মৃত্যুর আবর্ত থেকে মুক্ত হয়ে ব্রহ্মপ্রাপ্তি। এ সময় সে সর্বপ্রকার অহংবোধ ও বন্ধনদশা থেকে মুক্ত হয়। যখন কোনো ব্যক্তি মোক্ষ লাভ করে তখন সে জীবাত্মা ও পরমাত্মার স্বরূপ বুঝতে পারে।

চতুরাশ্রম  মনুস্মৃতিতে মানবজীবনের চারটি পর্যায়ের কথা বলা হয়েছে, যা আশ্রম বা চতুরাশ্রম নামে পরিচিত। সেগুলি: ক. ব্রহ্মচর্য বা আত্মসংযমের মাধ্যমে শিক্ষাগ্রহণ কাল, খ. গার্হস্থ্য বা সংসার জীবনযাপনের মাধ্যমে সৃষ্টি রক্ষা, গ. বানপ্রস্থ (আভিধানিক অর্থ বনগমন) অর্থাৎ মোক্ষলাভের উদ্দেশ্যে সংসারের মায়া ত্যাগ করে ঈশ্বরের সান্নিধ্য লাভের চেষ্টা এবং ঘ. সন্ন্যাস অর্থাৎ সম্পূর্ণরূপে সংসার ত্যাগ ও ষড়রিপু (কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য) দমন করে মোক্ষ লাভের চেষ্টা। প্রত্যেক ব্যক্তিকে অবশ্যই জীবনের এ চারটি পর্যায় অতিক্রম করতে হয়। এর মধ্য দিয়ে সে তার ব্যক্তিত্বের পূর্ণ বিকাশ ঘটাতে পারে এবং পরম ব্রহ্ম ও নিজের স্বরূপ বুঝতে পারে। ব্রহ্মচারী যখন সংসারজীবনে প্রবেশ করে তখন তাকে একাধিক লোকের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতে হয়, যেমন তার পরিবারের সদস্যবর্গ, বন্ধু-বান্ধব, পাড়াপ্রতিবেশী ইত্যাদি এবং এভাবেই তার ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটে। বৈষয়িক পৃথিবীকে বিদায় জানিয়ে সে যখন বনে যায় তখন তার সম্পর্ক হয় প্রকৃতি তথা গাছপালা, লতাপাতা, নদনদী প্রভৃতির সঙ্গে। চূড়ান্ত পর্যায়ে একজন সন্ন্যাসী হিসেবে তিনি সব রকম সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করেন; তখন তার অহংবোধ সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়।

উপরিউক্ত আলোচনায় এটা প্রতীয়মান হয় যে, হিন্দুধর্ম একটি বাস্তববাদী ধর্ম। এ ধর্মমতে মানুষ কেবল মৃত্যুর পরেই স্বর্গলাভ করে না, পৃথিবীতে থেকেও সে একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্রে (সর্বোদয় সমাজ) বাস করে ইহলৌকিক ও পারলৌকিক কাজে নিজেকে ব্যাপৃত রেখে স্বর্গসুখ লাভ করতে পারে। মনুস্মৃতিতে বলা হয়েছে, যা ইহলোকে অভ্যুদয় (উন্নতি) এবং পরলোকে মোক্ষ লাভ করায় তাই ধর্ম।

কারও কারও মতে চতুর্বর্গের মধ্যে ধর্ম ও অর্থ শ্রেষ্ঠ, কেউ কেউ বলেন কাম (ইন্দ্রিয় সুখ) ও অর্থ (সম্পদ) প্রধান; কারও মতে শুধু ধর্ম এবং কারও মতে শুধু অর্থ প্রধান। কিন্তু চূড়ান্ত সত্য এই যে, অভ্যুদয় (উন্নতি) এককভাবে ধর্ম, অর্থ, কাম কোনোটির ওপরই নির্ভরশীল নয়; এই তিনের সমন্বয়েই তা অর্জন করা সম্ভব। সর্বোচ্চ শান্তি, যাকে হিন্দুধর্মে নিঃশ্রেয়স, নির্বাণ, মোক্ষ, মুক্তি ইত্যাদি নামে অভিহিত করা হয়, তা অর্জিত হয় পরমাত্মার সঙ্গে জীবাত্মার একীভূত হওয়ার মধ্য দিয়ে।

যারা একেশ্বরবাদ বা দেবদেবীতে বিশ্বাস করে না, বা মৃত্যুপরের জীবন সম্পর্কেও যাদের বিশ্বাস নেই, তারাও সামাজিক জীবন-যাপনের জন্য নির্ধারিত আচরণবিধি এবং আইনকে অপরিহার্য বলে স্বীকার করে। এ আইন বা আচরণবিধি দেশ, কাল ও পাত্রভেদে পৃথক হতে পারে, কিন্তু মানুষের খেয়াল-খুশি এবং কুপ্রবৃত্তির নিয়ন্ত্রণ ছাড়া সুন্দর ও নিরাপদ সমাজজীবন সম্ভব নয়। এ কারণেই মানুষের আধ্যাত্মিক সম্পর্কের ভিত্তিতে তার সামাজিক স্বার্থের সমন্বয়ের ধারণা গড়ে উঠেছে।

জন্মান্তরবাদ  হিন্দুধর্মের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কর্মযোগে বিশ্বাস। এ বিশ্বাসমতে প্রতিটি ঘটনা বা ফলই বর্তমান জন্ম বা পূর্বজন্মের কর্মের ফল। আত্মা অবিনশ্বর। এক জনমে একে আবদ্ধ করা যায় না, বা এ পৃথিবীতে কয়েক বছর পরে তা ধ্বংসও হয় না। জীবের দৈহিক মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে আত্মা এক দেহ থেকে অন্য দেহে স্থানান্তরিত হয় মাত্র। এভাবেই দেহ পরিবর্তনের মাধ্যমে পাপ ক্ষয় করে আত্মা মুক্তির দিকে এগিয়ে যায়। চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো পুনর্জন্ম থেকে নিষ্কৃতি, যার মাধ্যমে জীবাত্মা পরমাত্মার সঙ্গে মিলিত হয়।

এই মহাবিশ্বে সবকিছু যথাযথ রাখা, বিশেষত সামাজিক শৃঙ্খলা অক্ষুণ্ণ রাখার ক্ষেত্রে ঐশ্বরিক শক্তির ওপর বিশ্বাস হিন্দুধর্মের একটি অপরিহার্য বিষয়। মহাজাগতিক ঘটনাবলি এবং সামাজিক বিষয়াদি, বিশেষত রাষ্ট্রের শৃঙ্খলাবিধানের মধ্যে এক নিবিড় সম্পর্ক আছে বলে মনে করা হয়। পার্থিব শৃঙ্খলা অক্ষুণ্ণ রাখার স্বার্থে যদি রাজা আইনের শাসন নিশ্চিত করেন এবং যথাযথ সামাজিক সম্পর্ক রক্ষা করেন তাহলে যথাসময়ে বৃষ্টি হবে এবং কখনই কোনো প্রকার অকালমৃত্যু ঘটবে না। ব্যক্তিক বা সামাজিক জীবনে যেকোনো প্রকার দুর্ঘটনা সামাজিক বিশৃঙ্খলার উপস্থিতিকেই নির্দেশ করে এবং উক্ত বিশৃঙ্খলার উৎসকে খুঁজতে উৎসাহিত করে। এ ক্ষেত্রে কর্মবিধি (কর্ম অনুযায়ী ফললাভ) একটি অদৃশ্য ও নৈর্ব্যক্তিক বিধান হিসেবে কাজ করে; কিন্তু বাস্তবে কর্মবিধি বিধাতার একটি হাতস্বরূপ, যার দ্বারা তিনি নৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করেন।

পুনর্জন্মে বিশ্বাস এবং পূর্ববর্তী জন্মের কর্মানুসারে পরবর্তী জীবনে আত্মার দেহ ধারণ একাধিক বিশ্বের (লোক বা ভুবন) অস্তিত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসার সৃষ্টি করে। পুনর্জন্মের বিষয়টি এ ধারণাকে সমর্থন করে যে, পঞ্চেন্দ্রিয়ের মাধ্যমে আমরা যেমন এই বিশ্বের অস্তিত্ব অনুভব করি, তেমনি অন্য ইন্দ্রিয় ও চেতনদ্বারা অপর বিশ্বের অস্তিত্বও অনুভব করা যেতে পারে। এরই মাধ্যমে আত্মা মৃত্যু ও পুনর্জন্মের মধ্য দিয়ে এ পৃথিবীতে এক দেহ থেকে অন্য দেহে গমনাগমন করে; এমনকি মানুষ তার মনে সঞ্চিত আবেগ অনুযায়ী কখনও বেদনাবিধুর, কখনও বা আনন্দময় স্বপ্নও দেখে। হিন্দুধর্মে বিশ্বাস করা হয় যে, কর্মের মাধ্যমে অর্জিত পাপ-পুণ্যের পরিমাণ ও গুণাগুণের ভিত্তিতে একজন মানুষ কোন ধরনের নরকে বা স্বর্গে ঠাঁই পাবে তা নির্ধারিত হয়। এ বিশ্বসমূহকে যেমন স্বর্গ ও নরক এ দুভাগে বিভক্ত করা হয়ে থাকে, ঠিক তেমনি উচ্চমার্গ ও নিম্নমার্গ এবং স্থূল ও সূক্ষ্ম পৃথিবী প্রভৃতি ভাগেও বিভাজন করা হয়ে থাকে।

ব্রাহ্মণ্য ধর্মে বেশ কিছু ধারণা প্রাচীন প্রথা বা বিশ্বাস থেকে প্রচলিত হয়ে আসছে এবং কিছু এসেছে বৈদিক যুগের ধর্মবিশ্বাস থেকে। ব্রাহ্মণ্য ধর্মে শুধুমাত্র প্রকৃতিকেই দেবতা বা অর্ধদেবতা হিসেবে কল্পনা করা হয়নি, বরং পূর্বপুরুষ এবং গোত্রঋষিদেরও কখনো কখনো দেবতার আসনে বসানো হয়েছে। হিন্দুধর্মের এই দেবত্ব আরোপ সাধারণভাবে প্রচলিত মানবিক গুণাবলি পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছে; আর তাই শ্রদ্ধা (বিশ্বাস), মন্যু (ক্রোধ), নির্ঋতি (মৃত্যু), ধী (বুদ্ধিমত্তা), হ্রী (বিনয়), পুষ্টি, মেধা, ধৃতি (ধৈর্য) ইত্যাদি বিমূর্ত গুণও দেবতার মর্যাদা পেয়েছে। উল্লেখ্য যে, বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মে দেবদেবীর পূজার বিধান না থাকলেও বিভিন্ন শ্রেণীর স্বর্গ ও নরক এবং দৈবশক্তিসম্পন্ন প্রাণী, যথা যক্ষ, গন্ধর্ব প্রভৃতির উল্লেখ আছে। এছাড়াও উল্লেখ আছে মৃতের জগতের বা নরকের অধিবাসীদের; এমনকি এসব ধর্মের প্রচারকগণ ভক্তদের নিকট থেকে পূজাও পেয়ে থাকেন।

বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের অভ্যুদয় হিন্দুধর্মের সংসারচক্রের ধারণা অর্থাৎ জন্ম-মৃত্যু ও পুনর্জন্ম-পুনর্মৃত্যু এই প্রায় অন্তহীন জীবনচক্র ভারতীয় জনগণের মানসিকতাকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে ফলে ভারতীয় সমাজজীবনও একটি ভিন্নধর্মী প্রবণতা লাভ করে। এই সীমাহীন পুনর্জন্ম যা দীর্ঘসময় স্বর্গবাসের পরেও ঘটতে পারে, তা অনেকের কাছেই আকর্ষণহীন এবং অনাকাঙ্ক্ষিত মনে হয়। মানব জীবন দ্বন্দ্ব ও কষ্টে পরিপূর্ণ; আর তাই পুনর্জন্মের চিন্তা বর্তমান জন্ম এবং পরবর্তী জন্মের নিরাপত্তার ভাবনাকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়।  বৌদ্ধধর্মজৈনধর্ম এবং সমসাময়িক অপেক্ষাকৃত কম প্রচারিত অন্যান্য ধর্ম এই পুনর্জন্ম সংক্রান্ত মতবাদের ওপরই প্রতিষ্ঠিত, যা বুদ্ধের সময় সর্বজনীনরূপ লাভ করে।

ভারতীয় জনগোষ্ঠীর এক বৃহদংশ এখনও পুনর্জন্ম এবং তার ওপর কর্মের প্রভাব সম্পর্কে আস্থাশীল। উক্ত কর্মবাদ বিশ্বাস করে যে, পূর্বজন্মের কর্মের ওপর পরবর্তী জন্মের সুখদুঃখ নির্ভরশীল। এই পরিপ্রেক্ষিতে মানুষ স্বভাবতই নিজেকে খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখে, নৈতিক স্খলন এবং সামাজিক অনাচার থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে সচেষ্ট হয়; কেননা তারা বিশ্বাস করে, খারাপ কিছু করলে পরবর্তী জীবনে তার ফল ভোগ করতে হবে।

সাকার ও নিরাকার উপাসনা উপনিষদে বর্ণিত নিরাকার ব্রহ্ম সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হলেও সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে উক্ত ধারণার পরিবর্তন ঘটে এবং বর্তমানে হিন্দুরা নিরাকার ব্রহ্মের বিভিন্ন ক্ষমতাকে সাকার কল্পনায় দেবতা হিসেবে পূজা করছে। এ সকল দেবতার প্রতি রয়েছে তাদের প্রগাঢ় ভক্তি-শ্রদ্ধা। নিরাকার ঈশ্বরের চেয়ে সাকার ঈশ্বরের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন বা তাঁর প্রতি শ্রদ্ধার্পণ অনেক সহজ। নিরাকার ঈশ্বর সম্পর্কে উপনিষদীয় মতবাদের সঙ্গে বিভিন্ন দেবতার প্রতি ভক্তিযুক্ত পূজার্চনার মিশ্রণ একটি নতুন ধর্মীয় চেতনার জন্ম দেয়, যা ধর্মীয় চিন্তা-চেতনায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে।

বাকাটক (খ্রি ২য়-৪র্থ), পল্লব (খ্রি ৪র্থ-৬ষ্ঠ), ভগদত্ত (কামরূপ: খ্রি ৭ম-৮ম) এবং অন্যান্য রাজবংশের পৃষ্ঠপোষকতায় বৈদিক ধর্ম প্রসার লাভ করেছিল, যার প্রমাণ পাওয়া যায় তৎকালীন বিভিন্ন শিলালিপিতে বৈদিক আচার-আচরণ ও যজ্ঞসমূহের উল্লেখ থেকে। এ সময়কার ব্রাহ্মণ্য ধর্মের অন্যতম উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো সাম্প্রদায়িক ধর্মবিশ্বাসের সঙ্গে মূল বৈদিক ধর্মের সুষ্ঠু সমন্বয়। এর উল্লেখযোগ্য প্রকাশ দেখা যায়  ব্রহ্মাবিষ্ণুশিব পরমেশ্বরের এই ত্রিমূর্তি কল্পনায়। এঁদের মধ্যে ব্রহ্মা হলেন সৃষ্টিকর্তা, যাঁর মধ্যে ঔপনিষদিক ব্রহ্মের অনেকটা প্রতিফলন দেখা যায়। কিন্তু ব্রহ্মা কখনোই শিব বা বিষ্ণুর মতো প্রাধান্য পাননি। বিভিন্ন সম্প্রদায় ত্রিমূর্তিকে স্বীয় সম্প্রদায়ের ঈশ্বরের তিনটি প্রতিরূপ হিসেবে গ্রহণ করেছে। একারণে হিন্দুসমাজকে দুটি মূল ধারায় ভাগ করা যায়, যথা: ক. সাম্প্রদায়িক ধারা, যারা স্বস্ব সম্প্রদায়ের দেবদেবী, যেমন বিষ্ণু, শিব, কালী প্রভৃতি ব্যতীত আর কাউকে ভক্তি-শ্রদ্ধা করে না এবং খ. সাধারণ ধারা, যারা মূল ব্রাহ্মণ্য ধর্মের অনুসারী এবং প্রায় প্রতিটি দেবদেবীরই পূজার্চনা করে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেবতাবিশেষের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করেও তারা প্রধান প্রধান বৈদিক আচার-আচরণ পালন করে থাকে। এভাবেই স্মার্তরা বিষ্ণু, শিব, দুর্গা, সূর্য এবং গণেশ এই পঞ্চদেবতার নিয়মিত পূজার সুপারিশ করেন। একইসঙ্গে সর্ব দেবতায় বিশ্বাসী হিন্দুরাও স্বাধীনভাবে বিভিন্ন দেবতার পূজা করতে পারেন। সমুচ্চয়বাদ অনুযায়ী একজন হিন্দুর জন্য ব্রহ্মোপাসনার পাশাপাশি স্বীয় সংসারধর্ম পালনও অবশ্য করণীয় এবং সেজন্য কর্মমীমাংসা এবং  বেদান্ত বিষয়ে জ্ঞান থাকা অত্যাবশ্যক। উপবীত ধারণ, গায়ত্রী মন্ত্র জপ এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের জন্য প্রযোজ্য আচার-আচরণও এ মূল নীতির সঙ্গে যোগ করা যেতে পারে।

বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সমন্বয়ের একটি প্রয়াস লক্ষিত হয় বিষ্ণু ও শিবের অভিন্নতা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায়, যার প্রমাণ পাওয়া যায় স্কন্দ উপনিষদে। শিব-পার্বতীর অর্ধনারীশ্বর মূর্তির মতো হরি-হর মূর্তি এ মতবাদেরই বহিঃপ্রকাশ। এমন কিছু সংখ্যক সমর্থক আছে যারা স্বীয় উপাস্য দেবতা ভিন্ন অন্য কোনো দেবতাকে পূজা করে না। এরা ছাড়া সাধারণ হিন্দুরা বিশেষ কোনো দেবতায় বিশ্বাসী হয়েও সকল দেবতার প্রতিই সমান শ্রদ্ধা পোষণ করে। বিভিন্ন প্রস্তরলিপি প্রমাণ করে যে, যুগ যুগ ধরে হিন্দুদের মধ্যে এ প্রথাই চলে আসছে।

এ প্রসঙ্গে বলা যায় যে, হিন্দুদর্শনের ছয়টি শাখার ( ষড়দর্শন) একটির সঙ্গে অপরটির কোনো বিরোধ নেই বরং এর প্রতিটিই একই শাশ্বত সত্য প্রচার করে। খ্রিস্টীয় একাদশ শতকের শেষার্ধে চন্দেল্লরাজ কীর্তিবর্মার দরবারে রচিত সংস্কৃত নাটক প্রবোধচন্দ্রোদয়ে এই দৃষ্টিভঙ্গির প্রথম উল্লেখ দেখা যায়। এ নাটকের একটি বিশেষ দৃশ্যে বৌদ্ধ, জৈন ও অন্যান্য ধর্মমতের অনুসারীদের সঙ্গে ষড়দর্শনে বিশ্বাসী বৈষ্ণব, শৈব ও সৌরদের মধ্যে বিরোধ দেখানো হয়েছে। এ দৃশ্যে ভিন্নমতাবলম্বী হিন্দু ধর্মদর্শনগুলির মধ্যে যে অভ্যন্তরীণ ঐক্য প্রকাশ পেয়েছে, তাই আধুনিক হিন্দুধর্মের মূলস্বরূপ। ষোড়শ শতকের সাংখ্যদার্শনিক বিজ্ঞানভিক্ষু ষড়দর্শনের এই ঐক্যের কথা প্রচার করেন।

বৈষ্ণবধর্ম  রাধাকৃষ্ণের তত্ত্বভিত্তিক বৈষ্ণব মতবাদ এক নতুন পথের সন্ধান দেয়, যার ফলে বৈষ্ণবধর্ম প্রায় সমগ্র ভারতে সকল হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে বিস্তার লাভ করে। পরবর্তী সময়ে বৈষ্ণবধর্মের আধ্যাত্মিকতার অবনতি ঘটে। এই অবনতির যুগে বৈষ্ণবগণ ঈশ্বরপ্রেমের পরিবর্তে লৌকিক প্রেমে জড়িয়ে পড়েন, যা মূলত ভারতীয় সংস্কৃতির পরিপন্থী।

সৌভাগ্যক্রমে এ সময় বাংলায় আবির্ভাব ঘটে চৈতন্যদেবের। তিনি রাধাকৃষ্ণের প্রতি মানুষের অনুরাগকে উচ্চ অধ্যাত্মমার্গে উন্নীত করে ধর্মের এক অপরিহার্য অঙ্গ হিসেবে প্রচার করেন। ফলে বাংলা নৈতিক অবক্ষয়ের হাত থেকে রক্ষা পায়। তিনি ধর্মের নিছক আচার-আনুষ্ঠানিকতাকে বর্জন করে ধর্মের নৈতিকতাকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে স্থান দেন। তাঁর ধর্মানুরাগ, ভক্তি ও ধর্মীয় উৎসাহ-উদ্দীপনা বৈষ্ণবধর্মে একটি বিশুদ্ধ আধ্যাত্মিক বৈশিষ্ট্য সংযোজন করে, যা অবক্ষয়িত রূপের বিপরীতে এক নৈতিক ও ঐশ্বরিক আনন্দময়তায় সমুজ্জ্বল।

ভক্তিবাদের পরিশোধন এবং একে উচ্চমার্গের আধ্যাত্মিক চেতনা ও নৈতিকতায় উন্নীত করার মাধ্যমে চৈতন্যসহ অন্যান্য বৈষ্ণবপন্ডিত মধ্যযুগীয় ধর্ম-সংস্কৃতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন। ধর্ম প্রচারে তাঁদের মূল নীতি ছিল: ক. দেশীয় ভাষায় ধর্ম প্রচার করা; খ. বর্ণপ্রথার বিলোপসাধন ও সকল বর্ণের লোকদের সমান মর্যাদা দেওয়া এবং গ. অপ্রয়োজনীয় আচারসমূহ বর্জন করে নৈতিকতা ও আত্মার পবিত্রতার ওপর গুরুত্বারোপ করা। রামানন্দ স্বামী এবং  চৈতন্যদেব ছাড়া অন্যান্য বৈষ্ণব পন্ডিত মূর্তিপূজাকেও সম্পূর্ণরূপে বর্জন করে এই মতবাদকে এগিয়ে নিয়ে যান।

সংস্কার আন্দোলন আঠারো শতকে ভারতীয় চিন্তাধারায় পাশ্চাত্য প্রভাব পড়ে, যা উনিশ শতকে ধর্মীয় সংস্কারকে ত্বরান্বিত করে। রাজা  রামমোহন রায় ছিলেন এই সংস্কার আন্দোলনের প্রধান পুরুষ। তখন সংস্কারের ফলে একদিকে যেমন  ব্রাহ্ম সমাজ (প্রার্থনা সমাজসহ), আর্য সমাজ ও আধ্যাত্মিক সমাজ প্রতিষ্ঠিত হয়, অন্যদিকে তেমনি রক্ষণশীল হিন্দু সমাজে আমূল পরিবর্তন ঘটে। তখনকার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সংস্কার হলো সতীদাহ প্রথা বিলোপ, বিধবাবিবাহ প্রচলন, বাল্যবিবাহ রোধ ইত্যাদি।  ইসলাম ধর্মেও এ সংস্কারের প্রভাব পড়ে, যা উনিশ শতকের প্রথমদিকে ওহাবী আন্দোলনের জন্ম দেয়।  ওহাবী আন্দোলন প্রাথমিক পর্যায়ে ইসলাম ধর্মের অভ্যন্তরীণ সংস্কারের লক্ষ্যে পরিচালিত হলেও সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তা ব্রিটিশবিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলন হিসেবেও পরিচিতি লাভ করে। এ আন্দোলনের ব্যর্থতার পর স্যার সৈয়দ আহমদের নেতৃত্বে আলীগড় আন্দোলনের সৃষ্টি হয়, যা এখনও মুসলিম সমাজের একটি অনুপ্রেরণা হিসেবে পরিচিত।

আঠারো শতকের শেষদিকে ঠাকুর রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের আবির্ভাব ঘটে। তিনি কেবল যুক্তিবাদের সঙ্গে পূর্ববর্তী সময়কার আবেগ ও আচারনির্ভর গোঁড়া ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতারই সমন্বয় সাধন করেননি, বরং আধ্যাত্মিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে আপাত বিরোধী ধর্মসমূহের মধ্যেও সমন্বয় সাধন করেন। তাঁর অন্যতম প্রধান শিষ্য স্বামী  বিবেকানন্দ গুরু প্রচারিত সর্বজনীন মতবাদকে একটি নির্দিষ্টরূপ দেন। এর মাধ্যমে তিনি বেদান্ত দর্শনকে সর্বসাধারণের জন্য সহজলভ্য ও উন্মুক্ত করে তোলেন। বিবেকানন্দ তাঁর ধর্মগুরুর শিক্ষাকে একটি নির্দিষ্ট ধারায় পরিণত করেন এবং তা প্রচারের জন্য বিশ্বব্যাপী  রামকৃষ্ণ মিশন গড়ে তোলেন। এ মিশন সংস্কারের মাধ্যমে হিন্দুধর্মকে সর্বজনগ্রাহ্য করার চেষ্টা চালাচ্ছে, যদিও এর কর্মকান্ড হিন্দুধর্মের বাইরেও বিস্তৃত। রামকৃষ্ণের মতানুসারে প্রতিটি ধর্মেই মোক্ষলাভের নিজস্ব উপায় আছে এবং হিন্দুধর্মের সঙ্গে অন্য কোনো ধর্মের অন্তর্নিহিত কোনো বিরোধ নেই। এ কারণে রামকৃষ্ণের মতবাদ বিভিন্ন ধর্মের মধ্যকার বাহ্যিক বিরোধ সমাধানে বিশেষ সহায়ক। হিন্দুধর্ম ভারতবর্ষের বিভিন্নমুখী কৃষ্টি ও সভ্যতার একটি অপূর্ব সংশ্লেষ। আস্তিক্যবাদে বিশ্বাস এবং উপনিষদ ও শঙ্করাচার্যের দর্শন সম্মিলিতভাবে একজন হিন্দুকে বিমূর্ত জ্ঞানলাভে সহায়তা করে। শুধুমাত্র  গৌতম বুদ্ধ ও চৈতন্যদেব নন,  যিশুমুহাম্মদ, হযরত (স.), জোরোস্টার এবং অন্যান্য ধর্মের প্রবর্তকগণও হিন্দুধর্মে সমভাবে সম্মানিত।

বাংলাদেশে হিন্দুধর্ম চর্চা বাংলা অঞ্চলে আর্যদের প্রবেশ ঘটেছে অনেক পরে। ভারতবর্ষের অন্যান্য এলাকার তুলনায় এখানে আর্যধর্ম তথা হিন্দুধর্ম ও সভ্যতার বিকাশও ঘটেছে মন্থর গতিতে। বাংলায় লৌকিক ও স্থানিক আচার-অনুষ্ঠান এবং ধর্মবিশ্বাসের প্রভাবই অধিক পরিলক্ষিত হয়। হিন্দুদের প্রধান ধর্মগ্রন্থ বেদের চর্চা এখানে সব সময়েই ছিল সীমাবদ্ধ, যদিও এখানকার হিন্দুরা জানে যে বেদ তাদের প্রধান ধর্মগ্রন্থ। বাংলাদেশের হিন্দুদের নিকট গীতা, চন্ডী, ভাগবত, রামায়ণ এবং মহাভারত  ধর্মগ্রন্থ হিসেবে অধিক জনপ্রিয়। এ গ্রন্থগুলিই এখানে অধিক পঠিত ও চর্চিত হয়। ভারতবিভাজন এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক নানা কারণে এখানে হিন্দুধর্মের অবস্থা এখন ক্ষয়িষ্ণু। এর প্রভাব হিন্দুসমাজদেহে সর্বত্র পরিলক্ষিত হয়। তবে হিন্দুধর্মের মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ বিভিন্ন মাত্রায় এখনও বিদ্যমান। মূলত শ্রুতি, স্মৃতি, তন্ত্র ও পুরাণের দ্বারা হিন্দুধর্মের বিধানসমূহ পরিচালিত। হিন্দুসমাজের বর্ণবিভাজন, জাতিভেদ,  কৌলীন্য প্রথা, নবশাক (গোপ, মালী, তেলী, তন্ত্রী, মোদক, বারুই, কুলাল, কর্মকার ও নাপিত) সহ বিভন্ন গোষ্ঠীবিভক্তি এখানে দুর্বল হলেও এখনও প্রচলিত। পূজা-পার্বণ, ধর্মীয় অনুষ্ঠানে এখনও ব্রাহ্মণ পুরোহিতের প্রাধান্য মেনে নেওয়া হয়।

বাংলাদেশের হিন্দুদের ধর্মীয় কৃত্যাদির সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুদের মিল বেশি। হিন্দুরা বহু দেবতার পূজা করে। এর মধ্যে দেবতা, উপদেবতা এবং অপদেবতাও রয়েছেন। এখানে শক্তি ও মাতৃদেবীর পূজা হয় বেশি। শারদীয়া  দুর্গাপূজা প্রধান ধর্মীয় উৎসব। এ পূজা বসন্তকালে বাসন্তীপূজা নামে অনুষ্ঠিত হয়। দুর্গাপূজার পর ব্যাপকভাবে অনুষ্ঠিত হয়  সরস্বতী পূজা। দুর্গা শক্তির এবং সরস্বতী বিদ্যার দেবী। শক্তির দেবী হিসেবে  কালীপূজা বা শ্যামাপূজাও বাংলাদেশের সর্বত্র প্রচলিত।  জগদ্ধাত্রীপূজা স্বল্পপরিসরে হলেও দেখা যায়। সম্পদের দেবী হিসেবে প্রায় সকল হিন্দুগৃহে পূজিতা হন লক্ষ্মীদেবী। গৃহীদের ঘরে একটি লক্ষ্মীর আসন থাকে। প্রতি বৃহস্পতিবার লক্ষ্মীপূজা হয়। এ পূজায় কোনো ব্রাহ্মণ পুরোহিতের প্রয়োজন হয় না। দুর্গাপূজার পর শারদীয়া পূর্ণিমাতে বিশেষভাবে লক্ষ্মীপূজা হয়। একে বলা হয় কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা। অন্যান্য পূজা ও উৎসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য  দোলযাত্রারথযাত্রা, ঝুলনযাত্রা,  জন্মাষ্টমী, রাসযাত্রা, কার্তিকপূজা, শিবচতুর্দশী, নীলপূজা, অন্নপূর্ণাপূজা, গঙ্গাপূজা, সিদ্ধেশ্বরীপূজা, রটন্তী কালিকাপূজা, নাগপূজা,  মনসাপূজা, সূর্যপূজা, গণেশপূজা,  বিশ্বকর্মাপূজা, শীতলাপূজা, ওলাদেবীর পূজা ইত্যাদি। শ্রীকৃষ্ণের জন্মতিথি উপলক্ষে ঢাকার জন্মাষ্টমী মিছিল বহু প্রাচীন ও বিখ্যাত। দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও জাঁকজমকের সঙ্গে এ মিছিল বের করা হয়। জগন্নাথদেবের রথযাত্রাও ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে পালিত হয়। দক্ষিণবঙ্গে সুন্দরবন এলাকায় দক্ষিণরায় এবং বনবিবির পূজা হয়।

উপরিউক্ত পূজাসমূহের মধ্যে কয়েকটি আছে পেশাভিত্তিক। যেমন গণেশপূজা করে সাধারণত ব্যবসায়ীরা, আর বিশ্বকর্মা পূজা করে কারিগরি পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিরা (কর্মকার, সুতার প্রভৃতি)। সরস্বতী পূজা করে বিশেষ করে ছাত্রছাত্রী এবং অধ্যয়ন-অধ্যাপনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা। তাদের বিশ্বাস, বিদ্যাদেবী খুশি হয়ে তাদের বর প্রদান করবেন এবং তারা প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে উঠবে। মনসাপূজা মূলত সাপের আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য এবং  শীতলাওলাদেবী ইত্যাদির পূজা করা হয় বসন্ত, কলেরা প্রভৃতি রোগব্যাধি থেকে মুক্ত থাকার জন্য।

ক্ষুদ্র পরিসরে কাঙ্ক্ষিত ফল কামনায় আরো অনেক পূজানুষ্ঠান ও ব্রতোপবাস পালিত হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য শনিপূজা, সত্যনারায়ণপূজা, অক্ষয়তৃতীয়া, সীতানবমী,  ভ্রাতৃদ্বিতীয়া, জামাইষষ্ঠী, কাত্যায়নীব্রত,  চৈত্রসংক্রান্তি,  পহেলা বৈশাখ, সাবিত্রীব্রত, শিবরাত্রিব্রত, বিপত্তারিণীব্রত, মঙ্গলচন্ডীব্রত, সুবচনীব্রত, মহালয়া, দীপাবলী, পৌষপার্বণ ইত্যাদি। শনিপূজা শনির কুদৃষ্টি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য করা হয়। ভাইয়ের মঙ্গল কামনায় ভ্রাতৃদ্বিতীয়া এবং জামাইয়ের কল্যাণ কামনায় করা হয় জামাইষষ্ঠী ব্রত। সাবিত্রীব্রত ও শিবরাত্রিব্রত করা হয় ভালো বর পাওয়ার জন্য, আর জন্মাষ্টমী ব্রত করা হয় কৃষ্ণের কৃপা লাভের জন্য। আসলে যেকোনো পূজা বা ব্রতের পশ্চাতেই কোনো-না-কোনো উদ্দেশ্য থাকে এবং ব্রতোপবাস সাধারণত পুরুষদের চেয়ে নারীরাই বেশি করে। এসব ব্যতীত নতুন ফসলাদি আহরণের সময় বা আহরণ শেষে  নবান্ন ধরনের বিভিন্ন অনুষ্ঠান পালিত হয়। রামায়ণগান, কীর্তনগান, রয়ানিগান ইত্যাদি ধর্মীয় অনুষ্ঠান হিসেবে বহুল প্রচলিত।

বাংলাদেশে সাকার দেব-দেবীর উপাসকের সংখ্যা বেশি হলেও নিরাকার ব্রহ্মের উপাসকও রয়েছে বেশকিছু সংখ্যক। তাদের মধ্যে ব্রাহ্মসমাজ এবং স্বরূপানন্দ ব্রহ্মচারীর অনুসারীরা উল্লেখযোগ্য। চৈতন্যদেব প্রবর্তিত বৈষ্ণবধর্মের অনেক অনুসারী আছে এখানকার হিন্দুসমাজে। তাছাড়া অনেক সাধক ও মহাপুরুষের অনুসারীও এখানে দেখা যায়। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব,  লোকনাথ ব্রহ্মচারী, রামঠাকুর,  জগদ্বন্ধু, অনুকূলচন্দ্র, স্বামী প্রণবানন্দ, স্বামী দয়ানন্দ,  হরিচাঁদ ঠাকুর, আনন্দমূর্তি প্রমুখ।

রাজা রামমোহন রায় এবং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের নেতৃত্বে যে ধর্ম ও সমাজ সংস্কার আন্দোলন হয়েছিল, তার প্রভাব এখানেও পড়েছিল। সতীদাহ প্রথা ইংরেজ আমলেই বিলুপ্ত হয়। ধর্মীয় সংস্কারের কারণে এক সময়কার গৌরীদান ও কৌলীন্য প্রথায় বহুবিবাহও বন্ধ হয়েছে। ভারতের তুলনায় এখানকার হিন্দুসমাজ অনেক বেশি সংস্কারমুক্ত।  [রমারঞ্জন মুখার্জী]

গ্রন্থপঞ্জি  RC Majumder, The Cultural Heritage of India (Vol IV), RK Mission Institute of Culture, 1937; AL Basham, The Origins and Development of Classical Hinduism, Beacon Press, Boston, 1989.