মুহাম্মদ, হযরত (স.)


মুহাম্মদ, হযরত (স.) -এর জন্ম সালে আসহাবুল ফীল য়্যামনের শাসনকর্তা আবরাহা (হস্তি-বাহিনীসহ) বায়তুল্লাহ্ শরীফের উপর আক্রমণের চেষ্টা করেছিল। সে হস্তি বছরেই (আমুল দীল) রবী‘উল আউয়াল মাসের সোমবারে মক্কার কুরায়শ গোত্রের হাশিমী শাখায় হযরত মুহাম্মদ (স.)-এর জন্ম। সঠিক তারিখ নির্ধারণে চারটি মত রয়েছে, যথা- রবী‘উল আউয়াল মাসের ৮, ৯, ১০, ও ১২। তবে রবী‘উল আউয়াল মাসের ৮ থেকে ১২ তারিখের মধ্যে সোমবার দিন যে তাঁর জন্ম তা নিঃসন্দেহ। সংখ্যাগরিষ্ঠ ‘উলামার মতে তাঁর জন্ম ১২ রবী‘উল আউয়াল। হাফিয ইব্ন হজর আল্-‘আসকাল্লানী ও ইব্নুল আসীর প্রমুখ এ মতটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে আবরাহার আক্রমণ ২০ এপ্রিল ৫৭০ (বা ৫৭১) সনে (মতান্তরে ১৯ এপ্রিল ও ২১ এপ্রিল) ঘটেছে।

রাসূলুল্লাহ (স.) যখন মাতৃগর্ভে তখন পিতা ‘আবদুল্লাহ্-এর মৃত্যু হয়। ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর মা আমিনা স্বপ্নাদেশ অনুযায়ী তাঁর সন্তানের নাম রাখেন ‘আহ্মদ’। পৌত্র সর্বকালে সর্বজনের নিকট প্রশংসিত হোক এ বাসনায় পিতামহ ‘আবদুল মুত্তালিব তাঁর নাম রাখেন ‘মুহাম্মদ’। মুহাম্মদ (স.) সর্বপ্রথমে তাঁর মাতা আমিনার স্তন্যপান করেন। এর দু’তিন দিন পর তিনি তাঁর পিতৃব্য আবূ লাহাবের দাসী সুত্তয়াইবার দুধ পান করেন। মুহাম্মদ (স.)-এর জন্মের সপ্তম দিনে দাদা ‘আবদুল মুত্তালিব তাঁর ‘আকীকা সম্পন্ন করেন। তিনি খত্নাকৃত অবস্থায় ভূমিষ্ঠ হন। আরবের অভিজাত বংশের প্রচলিত রীতি অনুযায়ী তাইফের সা‘দ গোত্রের জনৈকা ধাত্রী হালীমা সা‘দিয়া (রা.)-এর নিকট তাঁর স্তন্যপান ও লালন-পালনের দায়িত্বভার অর্পণ করা হয়। তথায় তিনি পাঁচ বছর লালিত-পালিত হন।

দুধভাই ‘আব্দুল্লাহসহ মাঠে তিনি ছাগ-মেষ চরাতে যেতেন। কিন্তু তিনি চপলতাসুলভ ক্রীড়া-কৌতুক ও কলহে লিপ্ত হতেন না। একদা মাঠে ছাগ-মেষ চরাবার সময়ে দুজন ফেরেশতা তাঁর বক্ষ বিদারণ করে এক খন্ড কাল জমাট রক্ত ফেলে দিয়ে এতে ঈমানী জ্যোতি পূর্ণ করে দেন। কাল জমাট রক্ত শয়তানী স্বভাব ও যাবতীয় পাপের মূল উৎস। তাই কাল জমাট রক্তটি ফেলে দেওয়া হয়।

মুহাম্মদ (স.)-এর ছয় বছর বয়সে তাঁর মাতা আমিনার মৃত্যু হয়। পিতামহ ‘আব্দুল মুত্তালিব তাঁর লালন পালনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পিতামহ ‘আব্দুল মুত্তালিবের স্নেহ তিনি বেশি দিন ভোগ করতে পারেননি। আট বছর বয়সে পিতামহও ইন্তিকাল করেন। তাঁর লালন-পালনের ভার তখন পিতৃব্য আবূ তালিবের নিকট বর্তায়। তিনি গৃহকর্মে ও মাঠে মাঠে ব্যস্ত থেকে ছাগল বা মেষপাল চরাতেন। প্রকৃতির কোলে অসীম আকাশ আর দিগন্ত বিস্তৃত মরুভূমি ও পাহাড় তাঁর একমাত্র শিক্ষাগার ছিল। মুহাম্মদ (স.)-এর বয়স যখন বারো বছর তখন আবূ তালিব তাঁকে নিয়ে বাণিজ্য ব্যাপদেশে সিরিয়ায় গমন করেন। বিশ বছর বয়সে হযরত মুহাম্মদ (স.) ব্যবসা আরম্ভ করেন।

বাস্তব জীবনে মুহাম্মদ (স.)-এর সততা, মহানুভবতা, সদাচার, আমানতদারী ও দিয়ানতদারী সুখ্যাতি লাভ করে। সকলের কাছেই তিনি বিশ্বাসভাজন হয়ে উঠেন। তিনি ‘আল্-আমীন’ অর্থাৎ আমানতদার বা বিশ্বাসভাজন উপাধিতে ভূষিত হন। কা‘বা ঘরের পুনর্নির্মাণের সময়ে এক সামাজিক সিদ্ধান্তে ‘হজরে আস্ওয়াদ’ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার দায়িত্ব পড়ে আল-আমিন মুহাম্মদ (স.)-এর ওপর।

মক্কায় খাদীজা নাম্নী উচ্চমনা, বিচক্ষণা, বুদ্ধিমতী, নানা বিষয়ে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ধনবতী বিধবা হযরত মুহাম্মদ (স.)-এর কর্তব্যনিষ্ঠা, সততা, বিশ্বস্ততা ইত্যাদি সদগুণের কথা শুনে তাঁকে তাঁর সঙ্গে অংশীদারীত্বে ব্যবসা করার আহবান জানান। খাদীজা (রা.) এ প্রস্তাবে সম্মত হয়ে সিরিয়ার উদ্দেশ্যে বাণিজ্যে যাত্রা করেন। সেখানে পৌঁছে বুদ্ধিমত্তার সাথে ব্যবসার মাল প্রচুর লাভে বিক্রয় করেন এবং সেখান থেকে বিভিন্ন প্রকারের পণ্যদ্রব্য ক্রয় করে মক্কায় ফিরেন ও এই সকল পণ্যদ্রব্য খাদীজা (রা.)-এর হস্তে সমর্পণ করেন। তিনি এ সকল পণ্যদ্রব্য বিক্রয় করে লাভবান হন। মায়সারা নামক খাদীজা (রা.) এর এক ভৃত্য সিরিয়াতে দু’বার বাণিজ্যযাত্রায় মুহাম্মদ (স.)-এর অনুগামী হন। ভৃত্য মায়সারার মুখে প্রতিনিধি মুহাম্মদ (স.)-এর গুণপনার বিবরণ শুনে, তাঁর বাণিজ্য কুশলতা এবং সততার কথা জেনে, তদুপরি তাঁর বিনয়, ভদ্রতা, শিষ্টাচার এবং উত্তম চরিত্রের বিশেষ গুণ দেখে খাদীজা (রা.) তাঁর সাথে বৈবাহিক সূত্রে আবদ্ধ হওয়ার জন্য আগ্রহান্বিতা হন। আবূ তালিবের সম্মতিক্রমে তাঁরা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। এই সময়ে মুহাম্মদ (স.)-এর বয়স পঁচিশ বছর এবং খাদীজা (রা.)-এর বয়স চল্লিশ বছর হলেও তাঁদের এই বিবাহ বন্ধন পরম সুখের হয়েছিল। খাদীজা (রা.)-এর গর্ভে দুই পুত্র (মতান্তরে তিন পুত্র) কাসিম (রা.) ও তাহির (রা.) (তাহিরকে ‘আবদুল্লাহ্ নামে অভিহিত করা হতো) এবং চার কন্যা ফাতিমা (রা.), যায়নব (রা.), রুকায়্যা (রা.) ও উম্মে কুলসুম (রা.) ভূমিষ্ঠ হন। তবে রাসূলুল্লাহ্ (স.)-এর তৃতীয় পুত্র ইব্রাহীম (রা.) মারিয়া কিবতিয়া (রা.)-এর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। পুত্র সন্তানগণ শৈশবেই ইন্তিকাল করেন। খাদীজা (রা.)-এর পয়ষট্টি বছর বয়সে মৃত্যু পর্যন্ত তিনি আর বিবাহ করেননি।

হযরত মুহাম্মদ (স.) বাল্যকাল থেকেই গভীর চিন্তাশীল ছিলেন। বয়োবৃদ্ধির সাথে সাথে আরব গোত্রসমূহের বিবেকবুদ্ধি বর্জিত মূর্তিপূজা ও বর্বরোচিত মারামারি, কাটাকাটি, রাহাজানি, মদ্যপান, জুয়াখেলা, অবিচার, ব্যভিচার ইত্যাদি অনাচার দেখে এসবের সুরাহা নিয়ে তিনি চিন্তা শুরু করেন। গৃহ ছেড়ে মক্কা হতে দু’তিন মাইল দূরে জাবালে নূরের হেরা গুহায় তিনি ধ্যান ও প্রার্থনায় সময় কাটান। মাঝেমধ্যে তিনি গৃহে প্রত্যাবর্তন করতেন। এ সময়ে তিনি একটি স্বর্গীয় আলোক এবং অশ্রুতপূর্ব শব্দতরঙ্গ শুনতে পান। এ সময় থেকেই তিনি স্বপ্নযোগে (রু’ইয়া সাদিকা) যা দেখতে পেতেন তা বাস্তবে পরিণত হত। অবশেষে একদা আল্লাহর দূত ওহীবাহক হযরত জিব্রাঈল (‘আ.) আগমন করে সূরা ‘আলাক্-এর পাঁচটি আয়াত (৯৬ঃ ১-৫) পাঠ করে শুনান। ওহীকালে তাঁর বয়স ছিল চল্লিশ বছর।

ওহী লাভের পর মুহাম্মদ (স.) চিন্তা ও উদ্বেগের মধ্য দিয়ে কিছুদিন অতিবাহিত করেন। তিনি আবার সেই ফেরেশ্তা জিবরাঈল (‘আ.)-কে শূন্যে এক সিংহাসনে উপবিষ্ট দেখতে পান। এই অপরূপ দৃশ্য দেখে তিনি ভয়বিহবল চিত্তে গৃহে ফিরে বস্ত্রাচ্ছাদিত হয়ে শুয়ে পড়েন। তখন সূরা মুদ্দাস্সির-এর সাতটি (৭৪ঃ ১-৭) আয়াত নাযিল হয়।

প্রথম দু’বারের ওহী ছিল খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। ‘‘পাঠ কর প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করিয়াছেন - সৃষ্টি করিয়াছেন মানুষকে ‘আলাক’ হইতে। পাঠ কর, আর তোমার প্রতিপালক মহিমান্বিত, যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়াছেন - শিক্ষা দিয়াছেন মানুষকে যাহা সে জানিত না’’ (৯৬ঃ ১-৫)।  অক্ষরজ্ঞানে বঞ্চিত উম্মী নবীর প্রথম ওহী একটি বিশেষ ইঙ্গিত বহন করে। এই অভিব্যক্তিতে এই নবীর উম্মত জ্ঞানের আলোকে জগতকে উদ্ভাসিত করে। দ্বিতীয়বারের ওহী ছিল- ‘‘হে বস্ত্রাচ্ছাদিত! উঠ, লক্ষ্যভ্রষ্ট অধঃপতিত মানবকুলকে সতর্কবাণী শোনাও, তোমার প্রভুর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা কর, তোমার বহিরাবরণকে পবিত্র কর, অন্তরকে সব দেবদেবীর কলুষ থেকে মুক্ত কর, অধিক পাওয়ার প্রত্যাশায় দান করিও না। এবং তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে ধৈর্য্য ধারণ কর।’’ (৭৪ঃ ১-৭)

রাসূলুল্লাহ (স.) অতি সন্তর্পণে কুরায়শ বংশের আপনজনের মধ্যে ইসলামের দা‘ওয়াত দেন। এ দা‘ওয়াতে সর্বপ্রথম খাদীজা (রা.), আবূবকর (রা.), আলী (রা.), রসূলের পোষ্যপুত্র যায়দ (রা.), ধাত্রী উম্মু আয়মান (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেন। অপরদিকে হযরত আবূবকর (রা.)-এর দা‘ওয়াতে ‘উসমান (রা.), ‘আব্দুর রহমান ইব্ন ‘আওফ (রা.), সা‘দ ইব্ন ওয়াক্কাস (রা.) যুবায়র (রা.), তালহা (রা) প্রমুখ ইসলাম গ্রহণ করেন। এভাবে সংগোপনে তিন বছর ইসলাম প্রচারের কাজ চালাবার পর নুবুওয়তের চতুর্থ বর্ষে রাসূলুল্লাহ্ (স.) প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচারের কাজে আদিষ্ট হন। ‘‘তুমি যে বিষয়ে আদিষ্ট হইয়াছ তাহা প্রকাশ্যে প্রচার কর’’ (১৫ঃ ৯৪)। ‘‘তোমার ঘনিষ্ট আত্মীয়বর্গকে সতর্ক করিয়া দাও’’ (২৬ঃ ২১৪)। রাসূলুল্লাহ (স.) সাফা পাহাড়ে আরোহণ করে উচ্চকণ্ঠে কুরায়শ বংশের সকল গোত্রের নামোল্লেখ করে তাদেরকে জড়ো করেন এবং ইসলামের দা‘ওয়াত দেন। তারা তাঁর এ দা‘ওয়াতে সাড়া দিতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করে। তখন থেকেই কুরায়শগণ রাসূলুল্লাহ্ (স.) ও সাহাবীদের উপর নিপীড়ন শুরু করে।

কুরায়শগণ পবিত্র কা‘বার সেবক হিসেবে পৌরহিত্যের কল্যাণে সমগ্র আরবে সম্মানিত ছিল। মক্কা ও বহির্মক্কায় তারা নিরাপত্তা ও বিশেষ বাণিজ্য সুবিধা ভোগ করত। তাঁদের পৌত্তলিক ধর্ম বিশ্বাসে আঘাত করায় এবং ইসলাম গ্রহণ করলে তাদের চিরাচরিত সুযোগ সুবিধা ব্যাহত হবে আশঙ্কা করে কুরায়শগণ রাসূলুল্লাহ্ (স.)-এর বিরোধিতা শুরু করে। তাদের বিরোধিতার ধারা ছিল মুখরোচক কাহিনী ও গল্পের মাধ্যমে কোরান শ্রবণে মানুষকে বিরত রাখা (৩১ঃ ৬) এবং মুহাম্মদ (স.) এর নামে নানা কুৎসা রটনা এবং বল প্রয়োগ করে ইসলাম প্রচারণা থেকে মুসলমানদের বিরত রাখা। রাসূলুল্লাহ্ (স.) সাহাবীদেরকে ক্রমবর্ধমান উৎপীড়নের মুখে হাবশায় (বর্তমানে ইথিওপিয়া) হিজরতের পরামর্শ দেন। নুবুওয়তের পঞ্চম বছর রজব মাসে এগারো জন পুরুষ ও চারজন মহিলা হাবশায় হিজরত করেন। এরপর জা‘ফর ইব্ন আবূ তালিব (রা.) সহ তিরাশিজন সাহাবী ক্রমে হিজরত করতে থাকেন। আবিসিনিয়ার সম্রাট নাজ্জাশী মুহাজিরগণের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেন। কুরায়শী কাফিরগণ এ সংবাদ জানতে পেরে ‘আমর ইবনুল ‘আস ও ‘আবদুল্লাহ্ ইব্ন রবী‘আকে নাজ্জাশীর দরবারে পাঠিয়ে তাদের নিকট হস্তান্তর করার ব্যর্থ তৎপরতা চালায়।

এদিকে তেজস্বী বীর ‘উমরের (রা.) ইসলাম গ্রহণের ঘোষণায় কুরায়শরা আরও বিচলিত হয় এবং তারা তাদের পরিণাম সম্পর্কে  ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। মুশরিকগণ সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে, বনূ ‘আব্দিল মুত্তালিব ও বনূ হাশিম মুহাম্মদ (স.)-কে তাদের নিকট সমর্পণ করবে নতুবা তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা হবে। বনূ ‘আব্দিল মুত্তালিব মুশরিকদের দাবী না মানায় তারা এক অঙ্গীকারপত্র লিখেঃ ‘‘বনূ ‘আব্দিল মুত্তালিব ও হাশিমের সাথে সর্বপ্রকার সম্পর্কচ্ছেদ করা হলো। তাদের সাথে আলাপ-কুশল সামাজিক ও অর্থনৈতিক লেনদেন ও বিয়ে-শাদী বন্ধ থাকবে। কেউ তাদেরকে কোন সাহায্য করলে সে কঠোর দন্ডপ্রাপ্ত হবে।’’ এ অঙ্গীকারপত্র লিখে বায়তুল্লাহ্ শরীফে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। আবূ লাহাব ব্যতীত বনূ হাশিম ও বনূ ‘আব্দিল মুত্তালিব-এর মুসলিম কাফির নির্বিশেষে সকলেই শে‘ব-ই-আবূ তালিব অর্থাৎ পাহাড়বেষ্টিত আবূ তালিবের গিরিসংকটে অবরুদ্ধ হন। এখানে অবরুদ্ধ থাকা অবস্থায় অবর্ণনীয় দুরবস্থা দেখা দেয়। রসদপত্র ফুরিয়ে যায়। ক্ষুধার যাতনায় বৃক্ষের পাতাও খেতে হয়েছে। এ গিরিসংকটে তাঁরা অবরুদ্ধ জীবনযাপন করেন। দুই বছরের অধিক কাল অসহনীয় ক্লেশ ভোগের পর রাসূলুল্লাহ্ (স.) ও তাঁর সাথীদের উপর থেকে অবরোধ উঠিয়ে নেওয়া হয়।

অবরোধের অবসান ঘটলো বটে, কিন্তু নুবুওয়তের দশম বর্ষের শাওয়ালের মাঝামাঝি সময়ে আবূ তালিব মৃত্যুবরণ করেন এবং এর তিনদিন পর খাদীজা (রা.) ইনতিকাল করেন। এ দুই বিয়োগ বেদনায় রাসূলুল্লাহ্ (স.) মুহ্যমান হয়ে পড়েন। তাই রাসূলুল্লাহ্ (স.) তাঁদের ইনতিকালের বছরকে ‘আমুল হুয্ন বা শোক বর্ষ বলে অভিহিত করেন।

রাসূলুল্লাহ্ (স.)-এর প্রসিদ্ধ অলৌকিক ঘটনা মি‘রাজ ওই নুবুওয়তের দশম বর্ষে সংঘটিত হয়। রাসূলুল্লাহ্ (স.) মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আক্সা এবং তথা থেকে সপ্তাকাশ ভ্রমণ করেন। ২৭ রজবের রাতে রাসূলুল্লাহ্ (স.) হাতীমে কা‘বায় শোয়া অবস্থায় ছিলেন। জিব্রাঈল (‘আ.) তাঁকে বুরাকে আরোহণ করান এবং চোখের নিমিষে মসজিদে আকসায় পৌঁছান। তথায় পূর্ববর্তী সকল নবী (‘আ.)-কে মুহাম্মদ (স.)-এর সম্মানার্থে মু‘জিযাস্বরূপ সমবেত করেন। রাসূলুল্লাহ (স.) নামাযের জন্য নবী ও রসূলদের ইমামত করেন। অতঃপর তিনি মসজিদুল আকসা থেকে সপ্তাকাশ পরিভ্রমণ করেন। এরপর রাসূলুল্লাহ্ (স.) সিদরাতুল মুন্তাহার দিকে অগ্রসর হতে থাকেন। পথিমধ্যে হাউযে কাউসার অতিক্রম করে জান্নাতে প্রবেশ করেন। তথা থেকে তিনি বের হলে তাঁর সামনে জাহান্নাম পেশ করা হয়। এরপর রাসূলুল্লাহ্ (স.) একাকী অগ্রসর হতে থাকলেন, আর জিব্রাঈল (আ.) সম্মুখে অগ্রসর না হয়ে থেমে গেলেন। এ সময়ে রাসূলুল্লাহ্ (স.) আল্লাহ্ তা‘আলার চাক্ষুস দীদার লাভ করেন এবং তাঁর সাথে সরাসরি আলাপ করার সৌভাগ্য অর্জন করেন। এ সময়েই পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরয হয়। পরে তিনি তথা থেকে বায়তুল মুকাদ্দাসে ফিরে আসেন এবং বায়তুল মুকাদ্দাস থেকে বুরাকে আরোহণ করে মক্কায় পৌঁছেন। এই মি‘রাজ তাঁর মনোবল বাড়িয়ে দেয়।

রাসূলুল্লাহ্ (স.) সূরা ইস্রা’ (বনী-ইসরাঈল)-এর বিভিন্ন আয়াতে কয়েকটি প্রচ্ছন্ন পূর্বাভাস প্রাপ্ত হন। যথা- (ক) হিজরতের ইঙ্গিত: ‘‘বল, হে আমার প্রতিপালক! যেথায় আমার প্রবেশ শুভ হবে সেথায় আমার প্রবেশের ব্যবস্থা কর এবং যেথা (মক্কা) হতে বহির্গমন শুভ হবে তথা থেকে আমাকে বের কর’’ (১৭ঃ ৮০)। (খ) আশু বিজয়ের ইঙ্গিতঃ ‘‘বল, সত্য আগত, বাতিল অপসৃয়মান’’ (১৭ঃ ৮১)। (গ) মসজিদে আকসায় নবীদের জামা‘আতে ইমামতও ছিল মুহাম্মদ (স.)-এর শ্রেষ্ঠত্বের বাস্তব সাক্ষ্য। (ঘ) মদীনার য়াহূদী এবং মক্কার মুশরিকগণ মুহাম্মদ (স.)-এর নিকট পরাজিত হবে; এই পূর্বাভাসও ছিল এই সূরায় (১৭ঃ ৪-৮)। মি‘রাজ এবং উপরোক্ত পূর্বাভাসগুলি হতাশার ভাব কেটে উঠার পক্ষে মুহাম্মদ (স.)-কে সহায়তা করে। আবূ তালিবের মৃত্যুর পর রাসূলুল্লাহ্ (স.)-এর উপর মুশরিকদের অত্যাচার চরমরূপ ধারণ করলো। ইসলাম প্রচার তো দুরূহ ব্যাপার, মক্কায় অবস্থানও অসম্ভব হয়ে পড়ে।

হজ্জের মওসুমে ইসলামের দা‘ওয়াতের ফলে মদীনায় ইসলাম প্রচারিত এবং অবশেষে তথায় হিজরত সংঘটিত হয়। প্রথমে ‘আকাবা নামক উপত্যকায় মদীনার খায্রাজ গোত্রের ছয়জন হজ্জযাত্রী রাসূলুল্লাহ্ (স.)-এর হাতে বয়‘আত গ্রহণ করেন। এঁদেরই প্রচেষ্টায় মদীনায় ইসলাম দ্রুত প্রসার লাভ করে। এরপরের বছর হজ্জের সময়ে বারোজন মদীনাবাসী রাতের অন্ধকারে গোপনে ‘আকাবায় বয়‘আত গ্রহণ করেন। এটিই প্রথম বায়‘আতুল ‘আকাবা নামে খ্যাত। পরবর্তী বছর হজ্জের সময়ে দু’জন মহিলাসহ তিয়াত্তর জন মদীনাবাসী রাসূলুল্লাহ্ (স.)-এর সাথে দ্বিতীয় বায়‘আতুল ‘আকাবা একই স্থানে গভীর রাতে সংগোপনে সমাপ্ত হয়। তাঁরা বীরত্বব্যঞ্জকভাবে বললেন, তাঁরা আরবের সকল মুশরিক গোত্রের সাথে যুদ্ধের ঝুঁকি সামলাতেও প্রস্ত্তত রয়েছেন।

মুহাম্মদ (স.) মদীনায় মুসলমানদেরকে হিজরত করার নির্দেশ দেন। মক্কাবাসীদের বিভিন্ন বাধা বিপত্তির মুখে মুসলমানরা হিজরত করতে থাকেন। অনেকে ধনসম্পদ ছেড়ে, পরিবার পরিজন ফেলে রিক্ত হস্তে হিজরত করেন। মদীনাবাসী আনসারগণ মক্কার মুহাজিরদেরকে নিজ নিজ গৃহে স্থান দিয়ে তাঁদের সাথে গভীর ভ্রাতৃত্ববন্ধনে আবদ্ধ হন।

মুহাম্মদ (স.) নিজেও মদীনায় হিজরত করার সংকল্প করেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে কুরায়শ নেতৃবৃন্দ যুগপৎ আঘাতে মুহাম্মদ (স.)-কে হত্যা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। অপরদিকে মুহাম্মদ (স.) আল্লাহ্র তরফ থেকে হিজরতের হুকুম লাভ করে আবূবকর (রা.)সহ মদীনাভিমুখে বেরিয়ে পড়েন। হিজরতের পথে তাঁরা উভয়ে ছওর পাহাড়ের গুহায় আত্মগোপন করেন। সেখানে তিন দিন অবস্থানের পর তাঁরা উভয়ে মদীনাভিমুখে রওয়ানা দেন। অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে ৮ রবী‘উল আউয়াল নুবুওয়তের ত্রয়োদশ বর্ষে মদীনা থেকে তিন মাইল দূরে তাঁরা কুবা’ উপশহরে পৌঁছেন এবং সেখানে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। ইসলামের ইতিহাসে এটিই প্রথম মসজিদ।

কুবা’ থেকে মদীনায় যাত্রার পথে বনূ সালিম গোত্রের মহল্লায় মুহাম্মদ (স.) সর্বপ্রথম সালাতুল জুমু‘আ আদায় করেন এবং খুত্বা প্রদান করেন। যাত্রাপথে বনূ নাজ্জারসহ সকল গোত্রের আনসার দলে দলে আগমন করে তাঁকে সম্বর্ধনা জানান। মসজিদে নববী নির্মিত হবার পর এর সংলগ্ন দেয়ালের পাশেই নির্মিত হয় মুহাম্মদ (স.)-এর আবাস এবং উম্মুহাতুল মু’মিনদের হুজরা (কক্ষসমূহ)। মসজিদের একপাশে ‘সুফ্ফা’ নামে একটি চত্বর তৈরি করা হয় যা নিঃস্ব মুহাজিরদের আশ্রয়স্থল ছিল। এই সুফ্ফাই ছিল সর্বপ্রথম ইসলামের শিক্ষালয়।

মদীনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জাতিবর্ণ নির্বিশেষে সকলকে দেশের কাজে নিয়োগের উদ্দেশ্যে মুহাম্মদ (স.) মুসলিম, য়াহূদী এবং মুশরিকদের সমন্বয়ে মদীনাকে একটি রাষ্ট্রের রূপ দিতে মনোনিবেশ করেন। মুসলিম, য়াহূদী ও মুশরিকদের সমন্বয়ে একটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলনে সর্বসম্মতিক্রমে তিনি একটি সনদ লিপিবদ্ধ করেন। এই সনদে মদীনার নিরাপত্তার বিভিন্ন ব্যবস্থাসহ য়াহূদী, মুশরিক ও মুসলমানদের সম্পর্ক, অধিকার, দায়িত্ব, বিচার-ব্যবস্থা সম্পর্কিত শর্তাবলী লিপিবদ্ধ হয়। কতিপয় পৌত্তলিক সম্প্রদায়ের নামোল্লেখসহ তাদের পূর্ণ স্বাধীনতা এই সনদে স্বীকৃত হয়। মুহাম্মদ (স.) এই সমাজ ব্যবস্থার প্রধান নির্বাচিত হন। তিনি ওদ্দাম, যুল‘আশীরা প্রভৃতি গোত্রের এলাকায় গমন করে এই সনদে স্থানীয় নেতৃবৃন্দের স্বাক্ষর ও সম্মতি গ্রহণ করেন। এভাবে তিনি মৈত্রীচুক্তি দ্বারা মদীনার অমুসলিমদিগকে ধর্মীয় স্বাধীনতা দান করে মুসলিমদের সাথে এক জাতি গঠনের ভিত্তিস্থাপন করেন। এ দ্বারা আপদে-বিপদে সকলে একযোগে কাজ করে মদীনা নগরীকে শত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। মদীনা একটি ইসলামী রাষ্ট্রে পরিণত হয়।

হিজরী দ্বিতীয় সনের রমাযান মাসে মক্কার এক হাজার কুরায়শ যোদ্ধা অস্ত্রসজ্জিত হয়ে মদীনা আক্রমণ করতে উদ্যত হয়। রাসূলুল্লাহ্ (স.) ৩১৩ জন সঙ্গীসহ আক্রমণ প্রতিরোধ করতে অগ্রসর হন। তাঁদের অস্ত্রসজ্জা ও রসদ খুবই অপ্রতুল ছিল। ১৭ রামাযান তিনি বদর প্রান্তরের নিকটে আগমন করে অগ্রদূতের সংবাদে এখানে ছাউনী স্থাপন করেন। বদর প্রান্তরে ভীষণ যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে কুরায়শগণ শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। তেরো জন মুসলিম শাহাদাতবরণ করেন। মুশরিকদের পক্ষে সত্তর জন নিহত ও সত্তর জন বন্দী হয়। বদর যুদ্ধ থেকেই শুরু হয় ইসলামের মহাজয় যাত্রা।

দ্বিতীয় হিজরী সনে রমযানের রোজা ফরয হয় এবং সাদাকাতুল ফিত্‌র প্রদানের বিধান প্রবর্তিত হয়। বদর যুদ্ধ থেকে প্রত্যাবর্তনের পর রাসূলুল্লাহ্ (স.) সর্বপ্রথম ‘ঈদুল ফিত্রের নামায আদায় করেন। এ বছরই ‘ঈদুল আযহার নামায ও কুরবানী ওয়াজিব এবং যাকাত ফরয হয়।

হিজরী তৃতীয় সনে আবূ সুফ্ইয়ান কুরায়শদের প্রধান সর্দার নির্বাচিত হয়। তার নেতৃত্বে তিন হাজার সৈনিকের এক বিশাল বাহিনী মদীনাভিমুখে যাত্রা করে। মুশরিক বাহিনীর পুরোভাগে ছিল দেবতা হুবলের প্রতিমা এবং এরপর চৌদ্দজন মহিলা। এই মহিলাদের প্রধান ভূমিকা ছিল গান গেয়ে ও কবিতা আবৃত্তি করে রণোম্মাদনা সৃষ্টি করা। রাসূলুল্লাহ্ (স.) এক হাজার সৈন্যসহ প্রতিরোধব্যুহ রচনা করেন।

যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছে রাসূলুল্লাহ্ (স.) সৈন্যদের সারিবদ্ধ করে স্থান নির্ধারণ করে দেন। উহুদ পাহাড়ের পশ্চাতে গিরিপথ দিয়ে শত্রুদের আক্রমণের আশঙ্কা থাকায় ‘আব্দুল্লাহ্ ইব্ন যুবায়র (রা.)-এর নেতৃত্বে তিনি পঞ্চাশজন তীরন্দাজকে নিয়োজিত করেন। রাসূলুল্লাহ্ (স.) কঠোর নির্দেশ দেন যে, কোনো অবস্থাতেই তাঁরা যেন গিরিপথ ত্যাগ না করেন। মুসলিম বাহিনীর প্রতিরোধের মুখে শত্রুসৈন্য ছত্রভঙ্গ হয়ে পালাতে থাকে। জয় হয়েছে ভেবে গিরিপথে পাহারারত বেশ কিছুসংখ্যক তীরন্দাজ তাঁদের নেতা ‘আব্দুল্লাহ্র নির্দেশের প্রতি গুরুত্ব না দিয়ে স্থান ত্যাগ করে জয়োল্লাস শুরু করেন। শত্রুরা সুযোগ বুঝে গিরিপথ দিয়ে পশ্চাৎদিক হতে আক্রমণ চালায়। শত্রুর আক্রমণে অকস্মাৎ মুসলিম বাহিনী দিশেহারা হয়ে পড়েন। পতাকাবাহী মুস্‘আব ইব্ন ‘উমায়র (রা.) শহীদ হন। তবে অচিরেই মুহম্মদ (স.)-এর বাহিনী ঘুরে দাঁড়ায়।

প্রচন্ড আক্রমনের মুখে শত্রুবাহিনী পলায়ন করে। এ যুদ্ধে মুসলিমদের সত্তর জন শাহাদতবরণ করেন। উহুদে চরম যুদ্ধের সময়ে মুহাম্মদ (স.) দু‘আ করেন, ‘‘হে আল্লাহ্ আমার কওমকে হিদায়ত দান করুন, তারা অজ্ঞ।’’ ‘আইশা (রা.), ফাতিমা (রা.) প্রমুখ মুসলিম মহিলা এ যুদ্ধে আহতদের সেবা করেন। অসম সাহসে উম্মু ‘আমারা রাসূলুল্লাহ্ (স.)-এর উপর শত্রুর আক্রমণ প্রতিরোধের জন্য সরাসরি তরবারি হস্তে যুদ্ধ করে অমর হয়ে আছেন।

হিজরী চতুর্থ সনে শত্রুদের সঙ্গে ছয়টি সংঘর্ষ সংঘটিত হয়। এ বছরই মদ্যপান হারাম হয়। হিজরী পঞ্চম সনে শত্রুর বিরুদ্ধে চারটি সংঘর্ষ সংঘটিত হয়। এগুলির মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খন্দকের যুদ্ধ যা পরিখার যুদ্ধ নামেও ইতিহাসে পরিচিত, কেননা মুশরিক আক্রমণকে প্রতিহত করার জন্য মদীনার উম্মুক্ত পূর্বদিকে পরিখা খনন করা হয়েছিল। পরিখা অতিক্রম করতে না পেরে তারা তীর ও পাথর নিক্ষেপ করতে থাকে। কিন্তু মুসলমানদের প্রতিরোধের মুখে কোনো সুবিধাজনক অবস্থা সৃষ্টি করতে না পেরে কাফেররা মদীনা অবরোধ উঠিয়ে নিয়ে মক্কায় প্রত্যাবর্তন করে। এ পঞ্চম হিজরী সনেই মহিলাদের পর্দা, শালীন আচরণ, যিনার শাস্তি, যিনার অপবাদ করে প্রমাণ দিতে অক্ষম হলে অপরাধকারীর শাস্তির বিধান, লি‘আনের হুকুম এবং ‘যিহার’ স্ত্রী বর্জন প্রথার সংস্কার হয়।

ষষ্ঠ হিজরীর যু’ল-কা‘দাঃ মাসে হযরত মুহাম্মদ (স.) পনের শত সাহাবীসহ ‘উমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে মককা মুকাররামা অভিমুখে রওয়ানা হন। পথিমধ্যে মককার অনতিদূরে হুদায়বিয়া নামক স্থানে কুরায়শরা তাঁদের গতিরোধ করে। হযরত মুহাম্মদ (স.)-এর সঙ্গে কুরায়শদের এক শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা ইতিহাসে হুদায়বিয়ার সন্ধি নামে খ্যাত। এই সন্ধি অনুযায়ী রাসূলুল্লাহ্ (স.) ওই বছর ‘উমরা পালন না করে সাহাবীগণসহ মদীনায় ফিরে যান। পরের বছর কাযা উমরা পালন করেন। উভয়পক্ষ নিরাপত্তা লাভ করে। বাহ্যত এই সন্ধিচুক্তি মুসলিমদের অনুকূলে না হলেও প্রকৃতপক্ষে এটিই ছিল ইসলামের বিজয় সূচনা। এটিই শত্রু কর্তৃক ইসলামী শক্তির প্রথম স্বীকৃতি। আল-কুরআনে হুদায়বিয়ার সন্ধিকে প্রকাশ্য ও সুস্পষ্ট অর্থাৎ যথার্থ বিজয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে (৪৮ঃ ১)।  নিরাপত্তা স্থাপনের ফলে ‘আরবের বিভিন্ন সম্প্রদায় অবাধে মুসলিমদের সঙ্গে মেলামেশা করার সুযোগ লাভ করে ইসলাম গ্রহণ করতে থাকে। তদুপরি কয়েকটি শক্তিশালী পৌত্তলিক গোত্র রাসূলুল্লাহ্ (স.)-এর সাথে মৈত্রীচুক্তি করে মুসলিম জাতির শক্তি বৃদ্ধি করে। হুদায়বিয়া চুক্তির ফলে যুদ্ধ বিরতির সুযোগে রাসূলুল্লাহ্ (স.) বিদেশী রাজন্যবর্গের নিকট ইসলাম গ্রহণের আহবান জানিয়ে দূত প্রেরণ করেন।

সপ্তম হিজরী সনে ‘খায়বর’ যুদ্ধ সংঘটিত হয় য়াহূদীদের বিরুদ্ধে। ইতিপূর্বে বিশ্বাসঘাতকতার জন্য রসূলুল্লাহ (স.) মদীনা থেকে য়াহূদীদের উৎখাত করেন। উৎখাতে য়াহূদীরা খায়বরে গিয়ে তথাকার অন্যান্য য়াহূদীদের ইসলামের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ করতে থাকে।

পনের শত সাহাবীকে সাথে নিয়ে রাসূলুল্লাহ্ (স.) খায়বর আক্রমণ করেন এবং খায়বর দখল করেন। এ যুদ্ধে তিরানববই জন য়াহূদী নিহত হয় এবং পনেরজন সাহাবী শাহাদতবরণ করেন। খায়বরের সমুদয় স্থাবর সম্পত্তি তখন থেকে মদীনা ইসলামী রাষ্ট্রের মালিকানাধীন হয়ে যায়।

হিজরী অষ্টম সনে চারটি প্রসিদ্ধ সংঘর্ষ সংঘটিত হয়; যথা মূতা, মক্কা বিজয়, হুনায়ন এবং তাইফ। সিরিয়ার বালকা’ শহরের পার্শ্ববর্তী একটি স্থানের নাম মূতা। মুসলমান ও রোমীয়দের মাঝে এখানেই জিহাদ হয়। রোম সাম্রাজ্যের গাস্সানীর খ্রিস্টান শাসনকর্তা শুরাহ্বীল রাসূলুল্লাহ্ (স.)-এর দূত হারিছ ইব্ন ‘উমায়র (রা.)-কে শহীদ করেছিল। ‘দূত অবধ্য’- এই আন্তর্জাতিক আইনের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করার দায়িত্ব রাসূলুল্লাহ্ (স.) অনুভব করেন। রাসূলুল্লাহ্ (স.) যায়দ ইব্ন হারিছা (রা.)-এর নেতৃত্বে তিন হাজার সৈন্যের এক অভিযান মূতা অভিমুখে প্রেরণ করেন। কয়েকদিন যুদ্ধ চলার পর রোমকরা পলায়ন করে।

হুদায়বিয়ার সন্ধির পর শান্তির আবহাওয়ার ভিতর দিয়ে পূর্ণ দু’বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর অষ্টম হিজরীতে কুরায়শী কাফিররা চুক্তিভঙ্গ করে। কুরায়শ ও তার মিত্রগোত্র মুসলিমদের এক মিত্রগোত্রকে আক্রমণ করে বহু লোক নিহত করে।

সন্ধিভঙ্গ হওয়ায় রাসূলুল্লাহ্ (স.) দশ হাজার সৈন্যসহ মক্কা বিজয়ে অগ্রসর হন। শত্রু দলপতি আবূ সুফ্ইয়ান তাঁর বশ্যতা স্বীকার করে ইসলাম গ্রহণ করেন। রাসূলুল্লাহ্ (স.) বিনাযুদ্ধে বিজয়ীবেশে মক্কায় প্রবেশ করেন এবং কা‘বা শরীফে গমনপূর্বক তওয়াফ করেন। ‘‘সত্যের আবির্ভাব হয়েছে, অসত্য অপসৃত হয়েছে, অসত্যের তিরোভাব অবধারিত’’ (১৭ঃ ৮১) - এই আয়াত উচ্চারণ করে রাসূলুল্লাহ্ (স.) কা‘বা প্রাঙ্গণে প্রতিষ্ঠিত ৩৬০টি প্রতিমা একে একে তাঁর লাঠির স্পর্শে ভূপাতিত করেন। তাঁর আদেশে ‘উমর (রা.) কা‘বা থেকে প্রতিমাগুলি অপসারণ করেন। দেয়ালে অঙ্কিত ইব্রাহীম (‘আ.), ইসমা‘ঈল (‘আ.) মারইয়াম (‘আ.) এবং ‘ঈসা (‘আ.)-এর ছবি মুছে দেওয়া হয়। বিজয়ীবীর মুহাম্মদ (স.) সকল নির্যাতন, উৎপীড়ন বিস্মৃত হয়ে ক্ষমা ও করুণার মাহাত্ম্য দিয়ে মক্কাবাসীদের হূদয় জয় করেন। ঘোর শত্রুদল পরম বন্ধুতে পরিণত হয়। মক্কার নর-নারী দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করতে থাকে।

মক্কা বিজয়ের পর আরবের অধিকাংশ মানুষ ইসলামের ছায়াতলে আসে। তবে হিজাযের দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলের অধিবাসী হাওয়াযিন ও ছকীফ গোত্রদ্বয় মুসলমানদেরকে আক্রমণ করার উদ্দেশ্যে মক্কাভিমুখে অগ্রসর হয়। এ সংবাদ পেয়ে রাসূলুল্লাহ্ (স.) বারো হাজার সৈন্যের একটি দলকে কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য সমবেত করেন। তাঁদের মধ্যে ছিল দশ হাজার মুহাজির ও আনসার আর দু’হাজার নও-মসুলিম যাঁরা মক্কা বিজয়ের সময়ে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। অষ্টম হিজরীর ৬ শাওয়াল মুসলিম সেনাদল হুনায়ন পৌঁছলে পাহাড়ে আত্মগোপণকারী শত্রুরা অতর্কিত আক্রমণ চালায়। যেহেতু মুসলিম বাহিনী অপ্রস্ত্তত ও অসতর্ক ছিলেন তাই তাঁদের অগ্রবর্তী বাহিনী পশ্চাদপসরণ করতে বাধ্য হয়। তাঁদের দুরবস্থা দেখে পশ্চাদগামী দলও পিছনের দিকে ধাবিত হয়। মুসলিম সেনাবাহিনী পশ্চাদ্ধাবন করায় রাসূলুল্লাহ্ (স.)-এর নির্দেশে ‘আববাস (রা.)-এর বীরত্বব্যঞ্জক আহবানে তাঁরা শত্রুর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। উভয়পক্ষে তুমুল যুদ্ধ হয়। অবশেষে শত্রুদল পরাজিত ও ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পালিয়ে যায়।

পরে রাসূলুল্লাহ্ (স.) বনূ সাকীফ ও বনূ হাওয়াযিনের কেন্দ্রস্থল তায়িফে অভিযান চালান। তাদেরকে আঠারো দিন অবরোধ করে রাখার পর তারা আত্মসমর্পণ করলে তিনি অবরোধ তুলে নেন। হুনায়ন ও তায়িফ অভিযান শেষে রাসূলুল্লাহ্ (স.) জি‘ইর্রানা থেকে ‘উমরার নিয়্যত করে ইহরাম বাঁধেন। পরে মক্কায় গমন করে ‘উমরা আদায় করেন এবং অষ্টম হিজরী সনের ৬ যুলকা‘দাহ তারিখে মদীনা ফিরে আসেন। এ হিজরী সনেই বিভিন্ন প্রতিনিধিদল আগমন করে এবং দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করে।

রোমক সম্রাট হিরাক্লিয়াস সদ্য উদ্ভূত মুসলিম শক্তিকে অঙ্কুরে বিনষ্ট করার উদ্দেশ্যে তাঁর অধীনস্থ উত্তর আরবীয় খ্রিস্টান গাস্সান, লাখ্ম, জুযাম ইত্যাদি গোত্রকে সমরাভিযানের নির্দেশ দিয়ে চল্লিশ হাজার সৈন্য প্রেরণ করেন। এ সম্মিলিত বাহিনীর অগ্রবর্তী দল ‘বালকা’ পর্যন্ত পৌঁছায়। মুসলিম সেনাবাহিনী সাধ্যমত অর্থ, বস্ত্র, রসদ যোগানের প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হন। রাসূলুল্লাহ্ (স.) ত্রিশ হাজার মুজাহিদবাহিনীসহ তাবূক অভিমুখে যাত্রা করেন। মুসলিম প্রস্ত্ততির মুখে রোমকরা পলায়ন করে। তাবূক অভিযান ছিল মুহাম্মদ (স.)-এর জীবনের শেষ অভিযান।

দশম হিজরীতে কোনো যুদ্ধ অনুষ্ঠিত হয়নি। এ বছরই হজ্জাতুল বিদা‘ পালিত হয়। মক্কার জীবনে রাসূলুল্লাহ্ (স.) স্বগোত্রীয় পৌত্তলিকতা এবং অনাচার বর্জন করে হজ্জ পালন করতেন। বিস্তারিত বিধানাবলী নাযিল হওয়ার পর তিনি হজ্জ সম্বন্ধে সম্যক জ্ঞান লাভ করেন। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ হজ্জ পালনের সুযোগ আসে এই প্রথম এবং এটাই ছিল তাঁর একমাত্র হজ্জ। লক্ষাধিক সাহাবী হজ্জের উদ্দেশ্যে মক্কায় সমবেত হন। রাসূলুল্লাহ্ (স.) কর্তৃক পরিচালিত হজ্জের ইব্রাহীমী অনুষ্ঠানগুলি শিরক বিবর্জিত অবিমিশ্ররূপে চিরকালের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়। এতদ্ব্যতীত মক্কা, ‘আরাফা ও মিনাতে তিনি যে কয়টি খুতবা প্রদান করেন তা চিরকাল রাসূলুল্লাহ্ (স.)-এর নুবুওয়তের বিরাট সাফল্যের সাক্ষ্য বহন করে। খুতবাগুলিতে রাসূলুল্লাহ্ (স.)-এর মুসলিম সমাজ ও রাষ্ট্রচিন্তা পরিপূর্ণ রূপ লাভ করে।

আরাফা প্রান্তরে প্রদত্ত ভাষণ শেষে ওহী নাযিল হয়: ‘‘আজ আমি তোমাদের জন্য পবিত্র দীন ইসলামকে পূর্ণ করে দিলাম। আর তোমাদের প্রতি আমার ‘নেয়ামত পরিপূর্ণ করে দিলাম। আর ধর্মরূপে পবিত্র ইসলামকে তোমাদের মনোনীত করলাম’’ (৫ঃ ৩)।

হজ্জ সমাপনের পর রাসূলুল্লাহ্ (স.) দশদিন মক্কায় অবস্থান করে মদীনায় প্রত্যাবর্তন করেন। একাদশ হিজরীর সফর মাসের শেষ সপ্তাহে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। অসুস্থ অবস্থায় ১১ দিন ইমামতের দায়িত্ব পালন করার পর তিনি আবূবকর (রা.)-কে ইমামতের নির্দেশ দেন। একদিন যুহরের নামাযের সময় সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ্ (স.)-এর প্রতীক্ষায় ছিলেন। তিনি অযু করলেন, কিন্তু দাঁড়াবার সময়ে সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েন। জ্ঞান ফিরে পেলে তিনি আবার অযু করেন কিন্তু পুনরায় বেহুশ হয়ে পড়েন। তাঁর তৃতীয়বার সংজ্ঞালোপের পর আবূবকর (রা.) নামায শুরু করে দেন। এদিকে তিনি ‘আলী (রা.) এবং ‘আববাস (রা.)-এর কাঁধে ভর দিয়ে মসজিদে প্রবেশ করেন। আবূবকর (রা.)-এর পাশে তাঁকে বসিয়ে দেওয়া হয়। আবূবকর (রা.) ইমামের স্থান ত্যাগ করতে উদ্যত হলে তিনি ইঙ্গিতে তাঁকে বারণ করেন এবং এই অবস্থায় তিনি নামায শেষ করেন। নামায শেষে রাসূলুল্লাহ্ (স.) সংক্ষিপ্ত ভাষণ দেন। এর কয়েকদিন পর ১২ রবী‘উল আউয়াল সোমবার (মতান্তরে ১ অথবা ২ রবী‘উল আউয়াল) ৬৩ বৎসর বয়সে হযরত মুহাম্মদ (স.) ইন্তিকাল করেন। ইন্তিকালের সময় উচ্চকণ্ঠে তিনি বলে ওঠেন, ‘‘সা’লাত, -সা’লাত, সাবধান! দাসদাসীদের প্রতি সাবধান। পরে শেষ নিঃশ্বাসের সময় তিনি উচ্চারণ করেন, ‘‘হে আল্লাহ্! শ্রেষ্ঠতম বন্ধু।’’

রাসূলুল্লাহ্ (স.)-এর চরিত্র ছিল সব ধরনের মহৎ গুণের মধুর সমন্বয়। নিরক্ষর হয়েও তিনি মহাবিজ্ঞ, ইহলৌকিক ও পারলৌকিক সকল জ্ঞানের অফুরন্ত উৎস, জগতের মহাশিক্ষকদের সেরা। তিনি জ্ঞান-বিজ্ঞান শিক্ষার ওপর সবিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। অসত্যের বিরুদ্ধে আপোসহীন সংগ্রাম ও সত্যপ্রচারে একাকী হয়েও চরম বিপদে তিনি ছিলেন অবিচল। এক বিস্তীর্ণ রাজ্যের অধিপতি হয়েও তিনি তিনি ছিলেন অনাড়ম্বর। বিশ্বস্ততা ও কর্তব্যনিষ্ঠায় অটল, সংসারী হয়েও মহাত্যাগী। তিনি ছিলেন প্রেমময় স্বামী, স্নেহশীল পিতা, অকৃত্রিম বন্ধু, ঘোর শত্রুর প্রতি ক্ষমাশীল। তাঁর অটল আত্মবিশ্বাস দৃঢ় সঙ্কল্প ও দূরদর্শিতার নজির জগতে বিরল। ‘‘ধর্মে বল প্রয়োগ নাই’’, ‘‘বিজ্ঞতা ও উত্তম উপদেশ দ্বারা তোমাদের প্রভুর নিকট আহবান কর’’, কুরআনের এমন মহান উদার বাণী ছিল তাঁর প্রচারের মূলসূত্র য়াতীম, আর্ত ও দরিদ্রের সেবা এবং আত্মীয়, প্রতিবেশী ও নিপীড়িতের সাহায্য ছিল তাঁর জীবনের ব্রত। তিনি ছিলেন একাধারে সমাজসেবক, সংস্কারক, ন্যায়বিচারক, ধর্মপ্রবর্তক ও সাম্রাজ্য স্থাপক। আরবের শতধা বিভক্ত, যুদ্ধরত বর্বর গোত্রগুলিকে সংঘবদ্ধ করে এক জাতি, এক রাষ্ট্র ও সর্বকালের উপযোগী এক পবিত্র অলঙ্ঘনীয় বিধান প্রতিষ্ঠা করে তিনি মানব সমাজকে নব জীবন দান করেন।

শুধু মুসলমানদের দৃষ্টিতেই নয়, মাইকেল হার্ট, আলফ্রেড দ্য লামার্টিন, জন উইলিয়ম ড্রেপার, জর্জ বার্ণার্ড শ’ প্রমুখ অসংখ্য অমুসলিম মনীষী কর্তৃক হযরত মুহাম্মদ (স.) সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব ও পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা সফলকাম ব্যক্তিত্ব হিসেবে আখ্যায়িত হয়েছেন।

বিশ্বমনীষার শীর্ষতম শিখরে ইসলামের নবী মুহাম্মদ (স.)-এর অবস্থানের স্বীকৃতি প্রদানপূর্বক মাইকেল হার্ট তাঁর ‘‘দি হানড্রেড’’ গ্রন্থে দ্বিধাহীনচিত্তে উল্লেখ করেন, ‘‘পৃথিবীর ইতিহাসে প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গের তালিকায় শীর্ষদেশে মুহাম্মদ (স.)-কে স্থাপনে আমার সিদ্ধান্ত বহু পাঠককে বিস্মিত করতে পারে এবং অনেকের নিকটই তা প্রশ্নাধীন হতে পারে। কিন্তু ইতিহাসে তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি ধর্মীয় ও ধর্মনিরপেক্ষ উভয় পর্যায়ে চরমভাবে সফলকাম ছিলেন। ধর্ম ও ধর্মনিরপেক্ষতার এই অভূতপূর্ব ও নজিরবিহীন সংমিশ্রণই তাঁকে ইতিহাসের সর্বাপেক্ষা প্রভাবশালী ব্যক্তি রূপে পরিচিহ্নিত করে।’’ বিশ্ব মনীষার শ্রীবৃদ্ধি ও সৌকর্য সাধনে রাসূলুল্লাহ্ (স.)-এর অবদান অনস্বীকার্য। এ বিষয়ে মনীষী আলফ্রেড দ্য ল্যামার্টিন-এর অমর উক্তি প্রণিধানযোগ্য। ‘‘দার্শনিক, বাগ্মী, রসূল, আইন প্রণেতা, যোদ্ধা, মতবাদ বিজয়ী, ধর্ম মতের এবং প্রতিমাহীন উপাসনা পদ্ধতির পুনঃসংস্থাপক, উদ্ধারকারী, নিরাকারের ইবাদত আনয়নকারী মুহাম্মদ (স.) বিশটি পার্থিব এবং একটি আধ্যাত্মিক সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাকারী।’’ মানুষের মহত্ত পরিমাপের সকল মানদন্ড জড়ো করে আমাদের নিকট জিজ্ঞাসা- তাঁর চেয়ে মহত্তর কোনো মানুষ আছে কি?’’ ইউরোপীয় মনীষার উত্তরণেও মুহাম্মদ (স.)-এর আদর্শের প্রভাব সর্বজনস্বীকৃত। জন উইলিয়ম ড্রেপার নিঃসঙ্কোচে স্বীকার করেছেন যে, ‘‘রেনেসাঁর জন্ম হয়েছে ইসলামের দরুণ’’। মনীষী বার্নার্ড শ’ বলেছেন, ‘‘আমি ভবিষ্যতবাণী করছি যে, আগামীতে মুহাম্মদ (স.)-এর ধর্ম ইউরোপের নিকট গ্রহণীয় হবে।’’  [এ.এইচ.এম. মুজতবা হোছাইন ও সৈয়দ আশরাফ আলী]