যন্ত্রসঙ্গীত


যন্ত্রসঙ্গীত  বাদ্যযন্ত্রের মাধ্যমে সৃষ্ট ও পরিবেশিত  সঙ্গীত। এতে গানের সুর থাকে কথা থাকে না। তিন প্রকার সঙ্গীতের (কণ্ঠসঙ্গীত, যন্ত্রসঙ্গীত ও নৃত্যসঙ্গীত) মধ্যে যন্ত্রসঙ্গীতের ব্যবহার বহু ব্যাপক। কণ্ঠসঙ্গীত, নাটক, সিনেমা,  যাত্রা ইত্যাদিতে যন্ত্রসঙ্গীতের ব্যবহার খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

পরিবেশনার দিক থেকে যন্ত্রসঙ্গীত তিন প্রকার এককবাদন, যুগলবন্দী ও সমবেতবাদন বা বৃন্দবাদন। কণ্ঠসঙ্গীতের সঙ্গে যন্ত্রবাদনের বিষয়টিকে সহবাদন বা সহযোগিবাদন বলা হয়। যেমন কণ্ঠসঙ্গীতের একক রাগসঙ্গীত পরিবেশনায় তানপুরা, তবলা,  হারমোনিয়াম ইত্যাদি সহযোগী যন্ত্র হিসেবে ব্যবহূত হয়। আবার যন্ত্রসঙ্গীতের এককবাদনেও সহযোগিবাদন আবশ্যক হতে পারে। যেমন  সেতার বা সরোদের এককবাদনে  তবলা, তানপুরা সহযোগী যন্ত্র হিসেবে ব্যবহূত হয়। আর সমবেতবাদনে তো অনেকগুলি যন্ত্রের প্রয়োজন অত্যাবশ্যকীয়।

এককবাদনে প্রস্তাবিত যন্ত্রটি মুখ্য ভূমিকা পালন করে, তবে সকল যন্ত্রের এককবাদন হয় না। যেসকল যন্ত্রে সঙ্গীতের সুর ও তালের মৌলিক বিষয়কে শিল্পসম্মতভাবে উপস্থাপন করা যায়, কেবল সেগুলিরই এককবাদন হতে পারে। সঙ্গীতের সুরের বিষয়টি শিল্পসম্মত হয় ১২টি স্বরকে (সাতটি শুদ্ধস্বর ও পাঁচটি প্রতিস্বর) আশ্রয় করে; আর তালের বিষয়টি হচ্ছে পাখোয়াজ/তবলার ১০টি বর্ণকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন তালের পেশকার, উপজ, কায়দা, পাল্টা, রেলা, তেহাই ইত্যাদির নৈপুণ্য প্রদর্শন।

বীণা, সেতার, সানাই,  এসরাজ, সরোদ,  বাঁশি, বেহালা, সুরবাহার, সারেঙ্গি ইত্যাদির এককবাদন হতে পারে। তবে এসকল যন্ত্রের এককবাদনে সহযোগী হিসেবে তানপুরা, তবলা, পাখোয়াজ ইত্যাদি যন্ত্র ব্যবহূত হয়। আর তবলা/পাখোয়াজের এককবাদনে নাগমা (নির্দিষ্ট মাত্রাবিশিষ্ট বন্দিশ বা কম্পোজিশন) বাজানোর জন্য সারেঙ্গি, এসরাজ, হারমোনিয়াম, বেহালা, ইত্যাদি সহযোগী যন্ত্র ব্যবহার করা হয়। এককবাদনে তালযন্ত্রের ভূমিকা গৌণ হলেও কম্পোজিশন বা বন্দিশ অংশে তা আবশ্যক। যন্ত্রে রাগসঙ্গীতের আলাপ অংশটি শিল্পী কারো সহযোগিতা ছাড়াও বাজাতে পারেন।

যেসকল যন্ত্রের এককবাদন হয় তার সবগুলিই যুগলবন্দীতে ব্যবহূত হতে পারে। যুগলবন্দীতে প্রস্তাবিত একই ধরনের বা দুটি ভিন্ন ধরণের যন্ত্রের প্রধান ভূমিকা থাকে। যেমন দুজন সেতারবাদক, বা একজন সেতার ও একজন সরোদ বাদক, বা একজন বেহালা ও একজন বংশীবাদকের যুগলবন্দী হতে পারে। তবে এসকল ক্ষেত্রে সহযোগী  বাদ্যযন্ত্র হিসেবে তালযন্ত্রের ভূমিকা গৌণ হলেও তা অত্যাবশ্যক।

রাগ সঙ্গীতে ১২টি স্বরের (সা-রে-গা-মা-পা-ধা-নি-ঋ-জ্ঞ-দ-ণ-হ্ম) সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ব্যবহার করা হয়। এগুলির মধ্যে আবার ২২টি শ্রুতির ব্যবহার রয়েছে। যেসকল যন্ত্র এককবাদনের উপযোগী সেগুলিতে এই শ্রুতির অনুভূতি সুন্দরভাবে প্রকাশ করা যায়। বীণার তারে ২২টি শ্রুতির অবতারণা করেছেন মহর্ষি ভরত। তিনি বীণায় ২২টি তার সংযোজন করে তারের কম্পন অনুসারে শ্রুতিসমূহের স্থান নির্ণয় ও নামকরণ করেছেন। শ্রুতিগুলি সাতটি শুদ্ধ স্বরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, যেমন: সা তীব্রা, কুমুদ্বতী, মন্দা, ছন্দোবতী; রে দয়াবতী, রঞ্জনী, রক্তিকা; গা রৌদ্রী, ক্রোধী; মা বজ্রিকা, প্রসারিণী, প্রীতি, মার্জনী; পা ক্ষিতি, রক্তা, সন্দীপনী, আলাপিনী; ধা মদন্তী, রোহিণী, রম্যা এবং নি উগ্রা, ক্ষোভিণী। এসকল শ্রুতির ব্যবহার রাগের পরিবেশনায় সূক্ষমভাবে অনুসৃত হয়ে থাকে। একাধিক যন্ত্রে সমবেতভাবে কোনো শ্রুতির সমন্বয় করা অত্যন্ত কঠিন এবং যন্ত্রসঙ্গীতের সমবেতবাদনে শ্রুতিমাধুর্য পরিস্ফুট করাও সহজ নয়। তাই রাগসঙ্গীতের ক্ষেত্রে সমবেত যন্ত্রসঙ্গীত তেমন প্রসার লাভ করেনি।

সমবেত বা বৃন্দবাদনে যখন অনেকগুলি যন্ত্র একসঙ্গে বাজে বা আংশিকভাবে কোনো সুরের অনুসরণ করে তখন যন্ত্রের একক বাদনের মতো উৎকর্ষ প্রকাশ পায় না। রাগসঙ্গীত সপ্তকের শ্রুতি বিভাজনের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় যন্ত্রসঙ্গীতের সমবেতবাদন সামগ্রিকভাবে উৎসাহিত হয়নি। যেসকল যন্ত্র একক বাদনের জন্য প্রসিদ্ধ সেগুলি সমবেতবাদনে প্রধান ভূমিকা রাখতে পারে। বৃন্দবাদনে এককবাদন বা যুগলবন্দীতে ব্যবহূত যন্ত্র ব্যতীত প্রায় অধিকাংশ যন্ত্রই সহযোগী যন্ত্র হিসেবে ব্যবহূত হয়। কণ্ঠসঙ্গীতের সঙ্গে বহুসংখ্যক যন্ত্রের ব্যবহারকে বৃন্দবাদন বলা যায় না। এক্ষেত্রে যন্ত্রগুলি সহযোগী যন্ত্রের ভূমিকা পালন করে। বরং যন্ত্রগুলি যখন স্বকীয়তা নিয়ে এক সঙ্গে বাজে তখনই তাকে বলে সমবেতবাদন। যেমন  দোতারা, বাঁশি, বেহালা, তবলা, সারিন্দা, ঢোল, খোল, কাঁসি, করতাল ইত্যাদি যন্ত্রসহযোগে একটি বৃন্দবাদন হতে পারে। তবে বৃন্দবাদনে কোনো নির্দিষ্ট composition বা গানের সুরকে যন্ত্রের মাধ্যমে প্রধান ভূমিকা পালন করতে হবে। একই ধরণের একাধিক যন্ত্রেও সমবেতবাদন হতে পারে, যেমন অনেকগুলি দোতারা বা সেতার বা সরোদ ইত্যাদির বাদন।

যন্ত্রসঙ্গীতের এককবাদন, যুগলবন্দী এবং সমবেতবাদন সকল ক্ষেত্রেই তালবাদ্যযন্ত্রের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। একটিমাত্র তবলা (তবলা-বাঁয়া), পাখোয়াজ, ঢোল, খোল, নাল বা ড্রাম শতশত বাদ্যযন্ত্রের সমবেতবাদনে যন্ত্রের সুর ও ছন্দের গতিপ্রকৃতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। তালযন্ত্রের ব্যবহার ছাড়া কোনো composition পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না। কেবল তালযন্ত্র সহযোগেও বৃন্দবাদন হতে পারে, যেমন: তবলা, পাখোয়াজ, ঢোল, খোল, মৃদঙ্গ, ড্রাম, কঙ্গ, বঙ্গ ইত্যাদির বৃন্দবাদন। এক্ষেত্রে যন্ত্রগুলি কোনো নির্দিষ্ট স্বরে tune করা হলে বাদনটি চিত্তাকর্ষক হয়।

বাংলাদেশে যন্ত্রসঙ্গীতচর্চার গৌরবময় ইতিহাস আছে। বিশ্ববরেণ্য অনেক যন্ত্রশিল্পীর জন্ম এই বাংলাদেশেই, বা তাঁদের পূর্ব পুরুষ এই বাংলাদেশেরই অধিবাসী ছিলেন। এছাড়া বিভাগপূর্ব বাংলাদেশের ঢাকা, রাজশাহী (নাটোর), ময়মনসিংহ, সিলেট, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা (ব্রাহ্মণবাড়ীয়া) ইত্যাদি অঞ্চলে ভারতের অন্যান্য প্রদেশ থেকে সঙ্গীতগুণীরা আসতেন। তাঁরা বিভিন্ন রাজা ও জমিদারের পৃষ্ঠপোষকতায় এসব অঞ্চলে স্থায়িভাবে বসবাস করতেন এবং সঙ্গীতচর্চা করতেন। ১৮৮৬ সালে চন্দ্রনাথ রায় ঢাকায় একটি সঙ্গীত বিদ্যালয় (জগন্নাথ কলেজে) স্থাপন করেছিলেন, যেখানে হারমোনিয়াম, কণ্ঠসঙ্গীত, তবলা ও সেতার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ছিল। যাঁরা পাশ্চাত্য যন্ত্রসঙ্গীতের অনুকরণে বাংলা গানের সুর ও সমবেত যন্ত্রসঙ্গীত প্রচারের চেষ্টা করেছেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম পন্ডিত  উদয়শঙ্কর। তিনি বিদেশে অর্কেস্ট্রার মাধ্যমে নৃত্য ও যন্ত্রসঙ্গীতকে তুলে ধরে বিশ্বখ্যাত হয়েছেন। পন্ডিত রবিশঙ্করও অর্কেস্ট্রা মিউজিকে অসামান্য অবদান রেখেছেন। চট্টগ্রামের  সুরেন্দ্রলাল দাস (১৮৯১-১৯৪৩) বাঁশি এবং আরও অনেক যন্ত্র বাজাতে পারতেন। পাশ্চাত্য রীতি অনুসরণে তাঁর অর্কেস্ট্রাদল বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছিল। ওস্তাদ  আলাউদ্দিন খাঁ, দক্ষিণারঞ্জন সেন, তিমিরবরণ ভট্টাচার্য,  পান্নালাল ঘোষ (তবলা) সহ আরও অনেকে অর্কেস্ট্রা মিউজিকে অসামান্য অবদান রেখেছেন। বংশীবাদক  ধীর আলী মিয়া (১৯২০-১৯৮৪) এবং সেতার বাদক  মীর কাশেম খাঁ (১৯২৮-৮৪) অর্কেস্ট্রা মিউজিকের জন্য বাংলা সঙ্গীতের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন। বাংলাদেশ টেলিভিশন এবং বেতার কেন্দ্রসমূহে যন্ত্রসঙ্গীতের এককবাদন ও সমবেতবাদন বাজানো হয়। যেসব যন্ত্র একক বাদনে ব্যবহূত হয় সেগুলি সম্পর্কে নিম্নে আলোচনা করা হলো:

বীণা বীণার এককবাদন অনেকটা ধ্রুপদ অঙ্গের হয়ে থাকে। আলাপ ও জোড় অংশে তালযন্ত্রের সহযোগিতা ছাড়াই বীণা বাজানো হয়। গৎ অংশে তবলা বা পাখোয়াজ বা মৃদঙ্গ (দক্ষিণ ভারতীয়) বাজানো হয়। এছাড়া বীণা বিশুদ্ধ রাগসঙ্গীত পরিবেশনের জন্য বা সহযোগী যন্ত্র হিসেবেও ব্যবহূত হয়। সিলেটের অনাদিকুমার দস্তিদার (১৯০৩-৭৪) একজন দক্ষ বীণাবাদক ছিলেন। তিনি উদয়শঙ্করের নৃত্যদলে বীণা বাজাতেন।

সুরবাহার বীণার প্রকারভেদ। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ বিশ্বের অনেক দেশে এর পরিবেশনায় শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছেন। অন্নদাশঙ্কর এই পরম্পরায় বিশেষভাবে অবদান রাখেন। বাংলাদেশে ওস্তাদ  আয়েত আলী খাঁ ও তাঁর পুত্র মোবারক হোসেন খান সুরবাহারে বিশেষ পারদর্শী। সেতারের তুলনায় মোটা তার ব্যবহূত হওয়ায় সুরবাহারের সুর অনেক ভারী ও গম্ভীর শোনায়। এতে ঢিমে লয়ের এককবাদনে  ধ্রুপদ অঙ্গের সুর বাজানো হয়।

সরোদ রবাবের পরিমার্জিত রূপ। তানসেন ঘরানার রবাব ও রামপুর ঘরানার সুরসিঙ্গার ঢঙ্গে এটি বাজানো হয়। সরোদের বিশ্ববরেণ্য শিল্পী ছিলেন ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ। বর্তমানে শাহাদৎ হোসেন খাঁ, ইউসুফ খাঁ, আফজালুর রহমান প্রমুখ সরোদ বাজান।

সরোদে মূলত ধ্রুপদ অঙ্গের পরিবেশনা করা হয়, তবে আধুনিককালে এতে কণ্ঠসঙ্গীতের গায়কীর অনুকরণে  ঠুংরি, দাদরা, কাজরী, চৈতী, হোলী ইত্যাদি রাগপ্রধান অঙ্গের ধুন বাজানো বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এতে এককবাদনে রাগের আলাপ, জোড় ও গৎ বাজানো যথেষ্ট সাধনা সাপেক্ষ ব্যাপার। সাধারণ শ্রোতারা সরোদে দ্রুত অঙ্গের গৎ বা লঘুসঙ্গীতের ধুন বেশ পছন্দ করে। সরোদের এককবাদনের মনোরঞ্জক আরও একটি বিষয় হলো তবলার সঙ্গে এর সওয়াল-জবাব অংশ, যা সুরে, মাত্রায় ও বাণীতে অনেকটা তাৎক্ষণিকভাবে উপস্থাপন করা হয়। সরোদে-সরোদে, সরোদ-সেতারে বা সরোদ-বেহালায় এর যুগলবন্দীও বেশ উপভোগ্য। এখানেও দুজন বাদকের মাধ্যমে সওয়াল-জবাব পরিবেশিত হয়, যা খুবই উপভোগ্য। সরোদ বৃন্দবাদনেও বিশেষ ভূমিকা পালন করে।

সারেঙ্গি সারঙ্গদেবী বীণার আধুনিক রূপ। এটি অত্যন্ত শ্রুতিমনোহর এবং সহযোগী যন্ত্র হিসেবে অতুলনীয়। মানুষের কণ্ঠের অনুরূপ অনুভূতিপ্রবণ স্বর-প্রক্ষেপণ এ যন্ত্রের মতো অন্য কোনো যন্ত্রে এত সুন্দরভাবে ফুটে ওঠে না। তাই কণ্ঠসঙ্গীতের সঙ্গে সবচেয়ে উপযোগী যন্ত্র হিসেবে সারেঙ্গি সমাদৃত। ঠুংরি, দাদরা, কাজরী, চৈতী, হোলী ইত্যাদি শৈলীর শান্ত, করুণ ও শৃঙ্গার রসাত্মক প্রেমবিরহের অনুভূতি সারেঙ্গিতে অসাধারণভাবে ফুটে ওঠে। সারেঙ্গি এককবাদনের জন্যও বিশেষ উপযোগী। পন্ডিত বুন্দু খাঁ, আলী বক্স (দিল্লি), সাবিত আলি (গোয়ালিয়র), হুসেন বক্স (লক্ষ্ণৌ), গুলাম সাবির (দিল্লি), গোপাল মিশ্র, রামনারায়ণ, বৈজনাথ মিশ্র (বেনারস), গৌরীশঙ্কর মিশ্র, মেহেদি হোসেন খাঁ প্রমুখ সঙ্গীতজ্ঞ সারেঙ্গির এককবাদন বা সহযোগী বাদনের জন্য বিখ্যাত। বিভাগপূর্ব বাংলাদেশে সারেঙ্গিবাদকদের ঢাকায় বসবাসের কথা জানা যায়। ওস্তাদ সগীরউদ্দিন খাঁ বাংলাদেশেই ছিলেন এবং সম্প্রতি পরলোক গমন করেন। বর্তমানে দিলীপকুমার রায় বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনে সারেঙ্গি বাজান।

সেতার সেতারে কণ্ঠসঙ্গীতের বিলম্বিত ও মধ্যলয়/দ্রুতলয়ের খেয়ালের মতো এককবাদন বা দ্বৈত বাদনে মসিদখানি গৎ ও রজাখানি গৎ বাজানো হয়। পন্ডিত রবিশঙ্কর আধুনিক কালের সেতার শিল্পী হিসেবে বিশ্ববরেণ্য। সেতারের বৃন্দবাদন পাশ্চাত্যেও বিশেষ জনপ্রিয়। এর বিলম্বিত আলাপ মীড়প্রধান, যা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে খুবই শ্রুতিমধুর ও হূদয়গ্রাহী হয়। এতে জোড় ও ঝালা এক আনন্দঘন পরিবেশের সৃষ্টি করে। বিভাগপূর্ব এবং পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে সেতারবাদন অনেকটা ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে।

সেতারে ঢাকা ঘরানার স্রষ্টা হরিচরণ দাস। উনিশ শতকের প্রথম ভাগে তাঁর সঙ্গীত জীবনের বিকাশ ঘটে। তিনিই প্রথম বঙ্গে একক সেতারবাদন প্রচলন করেন। হরিচরণের বংশপরম্পরায় সেতারে ঢাকা ঘরানা গড়ে ওঠে। তাঁর প্রপৌত্র ভগবান দাস ছিলেন এই বংশের শ্রেষ্ঠ সেতারবাদক। এই দাসবংশের পাশাপাশি ঢাকায় সেতার বাদনে আরও অনেক উল্লেখযোগ্য শিল্পীর সৃষ্টি হয়। এছাড়া কুমিল্লার (ব্রাহ্মণবাড়ীয়া) ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে যাঁরা সেতারে খ্যাতি অর্জন করেন তাঁরা হলেন ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁ, ওস্তাদ  আবেদ হোসেন খান, ওস্তাদ বিলায়েত হোসেন খাঁ প্রমুখ। বিশ শতকের ২০-এর দশকে ঢাকা সেতারে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন ওস্তাদ ওয়ালিউল্লা খাঁ, বঙ্কিমকুমার পাল প্রমুখ। বিভাগপূর্ব বাংলাদেশে গৌরীপুরের ওস্তাদ  এনায়েত খাঁ ও তাঁর শিষ্যমন্ডলী সেতারবাদনে বিখ্যাত ছিলেন। বর্তমানে ওস্তাদ খুরশীদ খাঁ এবং ওস্তাদ মতিউল হকসহ আরও অনেকে সেতার বাজান।

এসরাজ সারিন্দা, সেতার ও সারেঙ্গির মিশ্রিতরূপ। এর অন্য নাম আশুরঞ্জনী। প্রধানত সহযোগী যন্ত্র হিসেবেই উচ্চাঙ্গ বা লঘুসঙ্গীতের সঙ্গে এসরাজ বাজানো হয়। তবে এর এককবাদনও বেশ মনোমুগ্ধকর। বিভাগপূর্ব বাংলাদেশে ময়মনসিংহের গৌরীপুর স্টেটের জমিদার  ব্রজেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী (১৮৭৪-১৯৫৭) এসরাজ বাদক হিসেবে সুনাম অর্জন করেছিলেন। নিজগৃহে সঙ্গীতজ্ঞদের আশ্রয় দিয়ে তাঁদের নিকট তিনি এসরাজ শিখেছিলেন। সেসব সঙ্গীতজ্ঞদের মধ্যে মুরারিমোহন গুপ্ত, আবদুল্লাহ্ খাঁ (সরোদ) আমির খাঁ (সরোদ), এমদাদ হোসেন খাঁ (সেতার, সুরবাহার), হনুমান দাস সিং এবং এনায়েত খাঁর (সরোদ) নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ওই সময়ে ঢাকায় শ্যাম বসাক ও প্রিয়লাল চৌধুরীও এসরাজে বিখ্যাত ছিলেন। নিকট অতীতে এবং বর্তমানে এসরাজ বাদক হিসেবে যাঁরা পরিচিতি লাভ করেছেন তাঁরা হলেন আবদুল বারী (সম্প্রতি মৃত্যুবরণ করেছেন), দিলীপকুমার রায়, নূর হোসেন প্রমুখ।

বেহালা এ যন্ত্রটি পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই প্রচলিত আছে। বাংলাদেশে এর এককবাদন, যুগলবন্দী ও সমবেতবাদন বেশ জনপ্রিয়। সহযোগী যন্ত্র হিসেবেও বেহালা রাগসঙ্গীত ও লঘুসঙ্গীতে বাজানো যায়।  বাউলকীর্তনপালাগান ইত্যাদি দলভিত্তিক গানে বেহালার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে। বেহালার এককবাদনে কণ্ঠসঙ্গীতের মতো বিলম্বিত ও মধ্যলয়/দ্রুতলয়ের বন্দিশ যথেষ্ট সমাদৃত। যন্ত্রসঙ্গীতে যদিও গানের বাণী ব্যবহূত হয় না, তথাপি বেহালার বন্দিশের নান্দনিকতাপূর্ণ পরিবেশনা কণ্ঠসঙ্গীতের তুলনায় কোনো অংশে কম নয়। দ্বৈত বাদনে এ যন্ত্রটি সেতার, সরোদ, সারেঙ্গি, সানাই ইত্যাদির মতোই আবেদন সৃষ্টি করতে পারে। রাগসঙ্গীত বা লঘুসঙ্গীতের সুরকে আশ্রয় করে বৃন্দবাদনে বেহালা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিভাগপূর্ব বাংলাদেশে বেহালা বাদক হিসেবে  আফতাব উদ্দিন খাঁ (১৮৬২-১৯৩৩), গঙ্গাধর নট্ট (ময়মনসিংহ) ও পরিতোষ শীল (ঢাকা) সুপরিচিত ছিলেন। বর্তমানে বেহালাবাদনে ওস্তাদ রঘুনাথ দাস (রাজশাহী), গিয়াসউদ্দিন, সুনীলকুমার দাস, স্বপন দত্ত প্রমুখ বিশেষভাবে পরিচিত।

সানাই  সানাইয়ের এককবাদন অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর। এতে করুণ রস ছাড়া অন্যান্য রসের আস্বাদনও সম্ভব। এককবাদন বা যুগলবন্দীতে তবলার সঙ্গে সানাইয়ের সওয়াল-জবাব বা মধ্য/দ্রুতলয়ের সঙ্গে বন্দিশের অভিব্যক্তি শ্রোতাকে অভিভূত করে। বাংলাদেশে বিয়ে, যাত্রাদলের দৃশ্যপরিবর্তন, সৈনিকদের কুচকাওয়াজ এবং আরও অনেক অনুষ্ঠানে সানাই, ক্লারিওনেট, ঢোল, ড্রাম, সিঙ্গা প্রভৃতি যন্ত্রের বৃন্দবাদন হয়ে থাকে।

বাঁশি  বাঁশির এককবাদন কণ্ঠসঙ্গীতের অনুরূপ বিলম্বিত ও মধ্যলয়/দ্রুতলয়ের খেয়ালের মতোই হয়ে থাকে। এর শেষদিকে ঠুংরি অঙ্গের বা লঘুসঙ্গীতের ধুন বাজানো হয়। লোকসঙ্গীতের সঙ্গে সহযোগী যন্ত্র হিসেবে বাঁশি প্রায়শই ব্যবহূত হয়। আর শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের এককবাদন বা যুগলবন্দীতে বাঁশির শিল্পনৈপুণ্য অতুলনীয়। শিল্পীর গভীর অনুরাগ শ্রোতার হূদয়ে সঞ্চারিত হয় বাঁশির সুরেই। বাংলাদেশে যাঁরা বাঁশি বাজান তাঁদের মধ্যে শুক্কুর আলী, বারি সিদ্দিকী, ক্যাপ্টেন আজিজুল ইসলাম, আবদুল হাকীম গাজী অন্যতম। এছাড়া বাংলাদেশ বেতারের আঞ্চলিক শাখাসমূহেও অনেকে এই যন্ত্রের নিজস্ব শিল্পী হিসেবে নিয়োজিত আছেন।

গীটার এটি পাশ্চাত্য দেশীয় যন্ত্র হলেও বাংলাদেশে বেশ জনপ্রিয়। দুই রকম গীটারের প্রচলন আছে স্প্যানিশ ও হাওয়াইয়ান। হাওয়াইয়ান গীটারের সংস্কার করে পন্ডিত বৃজভূষণ কাবরা ভারতীয় রাগসঙ্গীতে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। বাংলাদেশে হাওয়াই গীটার লঘুসঙ্গীতের সঙ্গে ও সমবেতবাদনে ব্যাপকভাবে ব্যবহূত হয়। চট্টগ্রামের শিল্পী দোলন কানুনগো পন্ডিত বৃজভূষণ কাবরার অনুকরণে গীটারে রাগসঙ্গীতচর্চায় বিশেষ পারদর্শিতা অর্জন করেছেন।

ম্যান্ডোলিন প্রধানত লঘুসঙ্গীতের ধুন বাজানো এবং কণ্ঠসঙ্গীতের সঙ্গে সহযোগী যন্ত্র হিসেবে সমাদৃত। তবে এটি বৃন্দবাদনে বৈচিত্র্য সৃষ্টি করে থাকে।

জলতরঙ্গ প্রধানত এককবাদনের যন্ত্র। বিভিন্ন আকারের ১০-১৮টি চীনা মাটির পাত্রে নির্দিষ্ট পরিমাণ জল রেখে সপ্তক রচনা করা হয়। পরে কাঠি দিয়ে বাজালে রাগের সুরটি মীড়রহিতভাবে ধ্বনিত হয়।

পাখোয়াজ এ যন্ত্রে এককবাদন, যুগলবন্দী এবং সমবেতবাদন বাজানো হয়। কণ্ঠসঙ্গীত বিশেষত ধ্রুপদ ও নৃত্যের ক্ষেত্রে এটি একটি অত্যাবশ্যকীয় সহযোগী যন্ত্র। এককবাদন ও যুগলবন্দীর লহড়াবাদনে এর উৎকর্ষ বা শৈল্পিক নৈপুণ্য সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ পায়। পাখোয়াজে বিভিন্ন ধরনের উপজ বা লয়কারী তেহাইসহ নৃত্যের তোড়া বা গণেশ বন্দনা বা অন্যান্য দেবদেবীর বন্দনাও বাজানো হয়। এক সময় কলকাতা এবং ঢাকায় পাখোয়াজের পৃথক পৃথক ঘরানা ছিল। বর্তমানে বাংলাদেশে পাখোয়াজ  ধ্রুপদসঙ্গীত ও নৃত্যের সঙ্গে বা ধ্রুপদ অঙ্গের গানের সঙ্গে সহযোগী যন্ত্র হিসেবে বেশি ব্যবহূত হয়।

তবলা   তালবাদ্যযন্ত্রের মধ্যে সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয়। এর এককবাদনকে বলা হয় ‘লহড়া’। লহড়াবাদনের সঙ্গে নাগমা বাজানোর জন্য একজন সহযোগী বাদক থাকে, যিনি সারেঙ্গি, হারমোনিয়াম, এসরাজ বা বাঁশি যেকোনো একটি যন্ত্র বাজিয়ে শিল্পীকে সহযোগিতা করেন। তবলায় পেশকার, কায়দা, টুকরা, রেলা, তেহাই ইত্যাদি সহযোগে গতিশীল ও চমৎকার উপস্থাপনার মাধ্যমে নাগমার প্রতিটি পর্যায়কে সাজানো হয়। বিলম্বিতলয়ে, মধ্যলয়ে এবং দ্রুতলয়ে তবলার বাদনভঙ্গি ও বিভিন্ন অঙ্গের ব্যবহার শিল্পী দক্ষতার সঙ্গে করে থাকেন। এককবাদনে আমাদের পরিপার্শ্বে সৃষ্ট শব্দবৈচিত্র্য তবলার মাধ্যমে প্রকাশ করা সম্ভব। যেমন গাড়ি-ঘোড়া চলার শব্দ, নাগমা বাদকের সঙ্গে সওয়াল-জবাব ইত্যাদি তবলায় বাজানো হয়। অতি সূক্ষ্ম মাইক্রোফোন টেকনিক অনুসরণ করে মরুভূমির শব্দকেও তবলায় বাজনো সম্ভব, যা ওস্তাদ জাকির হোসেন জনপ্রিয় করেছেন।

সুরযন্ত্র ও কণ্ঠসঙ্গীতের এককবাদন ও যুগলবন্দীতে তবলা অত্যাবশ্যকীয় যন্ত্র। সেতার, সরোদ, সারেঙ্গি বা কণ্ঠসঙ্গীতের যেকোনো বিষয়ে তবলাকে সহজেই সহযোগী যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা যায়। এককবাদন এবং যুগলবন্দীতে তবলার সঙ্গে মুখ্য ভূমিকায় অবতীর্ণ শিল্পীর সওয়াল-জবাব অত্যন্ত মনোরঞ্জক হয়। সমবেতবাদনে একটিমাত্র তবলা শত শত অন্যান্য যন্ত্রের ছন্দোময়তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। কণ্ঠসঙ্গীতের অনুকরণে তবলায় তালমালা বাজানো হয়। এতে রাগের স্বরকে তবলার সুরে মেলানোর জন্য রাগে ব্যবহূত স্বরের সংখ্যা অনুযায়ী তবলার সংখ্যা প্রয়োজন হয়। অনেকটা জলতরঙ্গের মতোই তবলাতরঙ্গে  রাগ পরিবেশন করা সম্ভব। অন্যযন্ত্র বা কণ্ঠের তুলনায় মীড়প্রধান স্বরের প্রকাশ এখানে দুর্বল হয়ে থাকে, তাই তালমালায় রাগের পরিবেশনা জনপ্রিয় না হলেও তা একটি স্বীকৃত শৈলী।  [কৃষ্ণপদ মন্ডল]