যাত্রা


যাত্রা   লোকনাট্যের একটি জনপ্রিয় শাখা। ঐতিহ্যমন্ডিত কোনো লোকবিষয়কে নাট্যরূপ দিয়ে তার যে অভিনয় প্রদর্শন করা হয় তাকেই বলা হয় যাত্রা। খোলা আসরে সোচ্চার কণ্ঠে অতিরিক্ত অঙ্গসঞ্চালনের মাধ্যমে অভিনয়, সঙ্গীত ও বাদ্য সহযোগে যাত্রা অনুষ্ঠিত হয়।

‘যাত্রা’ শব্দটির সাধারণ অর্থ গমন বা গমনার্থে পদক্ষেপ গ্রহণ। অতীতে কোনো স্থানে যাত্রা বা গমন উপলক্ষে যেসব উৎসব অনুষ্ঠিত হতো, কালক্রমে সেসব বোঝাতেই ‘যাত্রা’ শব্দটি ব্যবহূত হতে থাকে। ধারণা করা হয় যে, প্রাচীন ভারতে কোনো দেবতার উৎসব উপলক্ষে নৃত্যগীতপূর্ণ যে শোভাযাত্রা বের করা হতো তাকেও যাত্রা বলা হতো। রথযাত্রা এরূপ একটি উৎসব। যাত্রা হচ্ছে প্রাচীন লোকসাহিত্যের একটি ক্রমবিবর্তিত রূপ। প্রথমে শিবোৎসব, পরে কৃষ্ণোৎসব, তৎপর রোম্যান্টিক প্রণয়োপাখ্যান ইত্যাদির প্রচলন হয়; আর এভাবেই বাংলাদেশে যাত্রা সাহিত্যের উদ্ভব ও বিকাশ ঘটে। চৈতন্যদেবের পূর্বেও যে যাত্রার অভিনয় হতো তার প্রমাণ আছে চৈতন্যভাগবতে। বৈষ্ণবধর্ম প্রবর্তিত হলে কৃষ্ণযাত্রা দেশের সর্বত্র ব্যাপ্তি লাভ করে। অষ্টাদশ শতক থেকে যাত্রা বিশেষভাবে প্রসার লাভ করতে থাকে। এসময়ের যাত্রাজগতে শিশুরাম, পরমানন্দ অধিকারী, সুবল দাস প্রভৃতি প্রসিদ্ধ নাম।

যাত্রার দৃশ্য

উনিশ শতকে পৌরাণিক যাত্রার ব্যাপক প্রচার হয়। মতিলাল রায় ও নীলকণ্ঠ মুখোপাধ্যায়ের পৌরাণিক যাত্রার দল সে যুগে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করে। বিশ শতকের প্রথম ভাগে বাংলার শ্রেষ্ঠ যাত্রারচয়িতা ছিলেন মুকুন্দ দাস। তিনি যাত্রার ভেতর দিয়ে দেশাত্মবোধ, রাজনৈতিক মুক্তিসংগ্রাম ও সমাজ সংস্কারের কথা প্রচার করেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ভারতবিভাগ, দুর্ভিক্ষ, মহামারী ইত্যাদি কারণে যে সামাজিক বিপর্যয় দেখা দেয় তা থেকে উত্তরণের জন্য যাত্রাশিল্পে নবরূপ ও নবপ্রাণ সঞ্চারিত হয়। প্রাচীন যাত্রাগুলিতে ধর্ম, পদ্য সংলাপ ও সঙ্গীতের প্রাধান্য ছিল, কিন্তু আধুনিক যাত্রা অভিনয় ও সংলাপপ্রধান; উপরন্তু বর্তমানে তাতে আধুনিক সঙ্গীতের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। যাত্রায় সুসংবদ্ধ কাহিনীর সংযোগ ও সংলাপের গুরুত্ব বৃদ্ধি পাওয়ায় তা এখন একটি উন্নত মানের শিল্পমাধ্যমে পরিণত হয়েছে এবং গীত ও অভিনয়ে পারদর্শী লোকের সমন্বয়ে যাত্রার পৃথক পৃথক দল গড়ে উঠেছে। এসব দল পেশাদার ও ভ্রাম্যমাণ।

যাত্রাদল গঠনের জন্য একজন উদ্যোক্তা থাকেন, যাঁকে বলা হয় ‘মালিক’ বা ‘সরকার’। দলের সর্বময় কর্তা বা স্বত্বাধিকারীকে বলা হয় ‘অধিকারী’। একটি ভাল এবং বড় যাত্রাদল গড়ে তোলার জন্য মোটা অঙ্কের পুঁজির দরকার হয়। যাত্রাদলে শিল্পী, কলাকুশলী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীসহ ৫০/৬০ জন লোক থাকে। এদের মধ্যে পুরুষ শিল্পী, মহিলা শিল্পী, নৃত্যশিল্পী, যন্ত্রী, ড্রেসম্যান, প্রম্প্টার, ম্যানেজার, বাবুর্চি, চাকর ইত্যাদি থাকে। প্রধানত অভিনেতা-অভিনেত্রী এবং নৃত্যশিল্পীদের গুণগত মানের ওপরই যাত্রাদলের যশ-খ্যাতি নির্ভর করে।

কৃষিকর্মের কারণে সাধারণত শ্রাবণ থেকে আশ্বিন মাস পর্যন্ত যাত্রাদলের অভিনয় চলে; কোথাও কোথাও ফাল্গুন মাস পর্যন্ত এ ধারা অব্যাহত থাকে। আশ্বিন মাসে দুর্গাপূজা উপলক্ষে যাত্রার দল দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়ায়। মাঠ বা হাটবাজার সংলগ্ন খোলা জায়গায় টিন ও বাঁশ দিয়ে তৈরি প্যান্ডেলে যাত্রার আসর বসে। অভিনয়মঞ্চ থাকে প্যান্ডেলের ঠিক মাঝখানে চতুর্দিক খোলা অপেক্ষাকৃত উঁচু স্থানে। মঞ্চের উপরিভাগে ত্রিপল বা টিনের ছাউনি থাকে। মঞ্চের দুপাশে থাকে বাদ্যযন্ত্রীদের বসার স্থান। প্যান্ডেলের ভেতরে দর্শকদের বসার জন্য প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও স্পেশাল এই চার শ্রেণীর স্থান নির্ধারণ করা হয়। আসরে দর্শক পূর্ণ হলে কাঁসার ঘণ্টা বা হুইসেল বাজিয়ে অভিনেতা-অভিনেত্রীর মঞ্চে প্রবেশের ইঙ্গিত দেওয়া হয়। সাধারণত মহিলা শিল্পীদের উদ্বোধনী সঙ্গীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু হয়। পরে একক সঙ্গীত ও কয়েকটি নৃত্য পরিবেশনের পর যাত্রার কাহিনী শুরু করার জন্য প্রথম অঙ্কের ঘণ্টা বাজে। প্রথম অঙ্ক শেষ হলে পুনরায় সামান্য নৃত্য-গীত হওয়ার পর দ্বিতীয় অঙ্ক শুরু হয়। এভাবে পর্যায়ক্রমে যাত্রাভিনয় চলতে থাকে।

যাত্রা সচরাচর গভীর রাতে শুরু হয়ে ভোর রাত পর্যন্ত চলে। পূর্বে যাত্রায় বাদ্যযন্ত্র হিসেবে মন্দিরা, খোল, বাঁশি, করতাল, ঢোল ইত্যাদি ব্যবহূত হতো। বর্তমানে ব্যবহূত হয় হারমোনিয়াম, তবলা, ঢোলক, ড্রাম, কঙ্গো, বেহালা, কর্নেট, অর্গান, বাঁশি, ক্লারিওনেট প্রভৃতি আধুনিক বাদ্যযন্ত্র।

যাত্রা বাংলাদেশের লোকজ ও মৌলিক সংস্কৃতির একটি ঐতিহ্যবাহী অঙ্গ। সাধারণ মানুষের বিনোদন মাধ্যম হিসেবে যাত্রা অতীতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। বর্তমানে বিনোদনের অনেক আধুনিক মাধ্যমের প্রবর্তন এবং দর্শক-শ্রোতাদের রুচি পরিবর্তনের কারণে এর চাহিদা অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে। তবে বর্তমানে যাত্রার বিষয়গত ও গুণগত অনেক রূপান্তর ঘটেছে। এখন ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক বিষয়ের পাশাপাশি সামাজিক ও সমকালীন বিষয়ভিত্তিক এবং রাজনীতি ও সাহিত্যনির্ভর যাত্রাও অভিনীত হচ্ছে। আধুনিক যাত্রাশিল্পে অভিনয়, নৃত্য ও সঙ্গীতের সঙ্গে সঙ্গে বাচনভঙ্গি, পোশাক-পরিচ্ছদ, বাদ্যযন্ত্র, সাজসজ্জা, মঞ্চ, আলোকসজ্জা ও পরিবেশসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর প্রতিও দৃষ্টি দেওয়া হচ্ছে। তবে গ্রামাঞ্চলে এখনও আধো আলো-অন্ধকারের মধ্যে প্রশস্ত মাঠ বা খোলা ময়দানে শত শত দর্শক গভীর আগ্রহ সহকারে যাত্রাভিনয় উপভোগ করে। বাংলাদেশের বৃহত্তর যশোর, খুলনা, ফরিদপুর, বরিশাল, রাজশাহী, দিনাজপুর, ময়মনসিংহ, সিলেট প্রভৃতি অঞ্চলে যাত্রার ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে।  [শাহিদা খাতুন]