বাউল


বাউল লোকসম্প্রদায়ের একটি সাধন-ভজন গোষ্ঠী, যারা গ্রামে-গঞ্জে গান গেয়ে ভিক্ষা করে বেড়ায়। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এদের দেখা গেলেও সাধারণত কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, ফরিদপুর, যশোর এবং পাবনা অঞ্চলেই এদের বেশি দেখা যায়। বাউলরা দেহভিত্তিক গুপ্ত সাধনার অনুসারী। এই সাধনায় সহজিয়া ও সুফি সাধনার সম্মিলন ঘটেছে; তবে সুফি ভাবনার প্রভাবই বেশি। বাউলরা মসজিদ বা মন্দিরে যায় না। কোনো ধর্মগ্রন্থে তাদের বিশ্বাস নেই। মূর্তিপূজা, বর্ণবৈষম্য বা জাতিভেদে তারা বিশ্বাসী নয়। তারা মানবতাবাদী। তাদের বিশ্বাস জন্মগতভাবে কেউ বাউল নয়, গুরুর নিকট দীক্ষা নিয়েই বাউল হতে হয়। বাউল সাধনা মূলত নারী-পুরুষের যুগলসাধনা। তবে জ্ঞানমার্গীয় একক যোগসাধনাও আছে।

কুষ্টিয়ার লালন শাহর মাজারে একদল বাউল

বাউল সম্প্রদায়ের উদ্ভব সম্পর্কে সঠিক কোনো তথ্য জানা যায় না। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে ‘বাউল’ শব্দের প্রয়োগ লক্ষ করা যায়। পনের শতকের শাহ মোহাম্মদ সগীরের  ইউসুফ-জুলেখা, মালাধর বসুর  শ্রীকৃষ্ণবিজয়, ষোলো শতকের বাহরাম খানের   লায়লী-মজনু এবং কৃষ্ণদাস কবিরাজের  চৈতন্যচরিতামৃত  গ্রন্থে ‘বাউল’ শব্দের ব্যবহার আছে। এ থেকে অনুমান করা হয় যে, অন্ততঃপক্ষে খ্রিস্টীয় পঞ্চদশ শতক কিংবা তার পূর্ব থেকেই বাংলাদেশে বাউল সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব ছিল। সাম্প্রতিককালের এক গবেষণায় জানা যায় যে, পারস্যে অষ্টম-নবম শতকে সুফিসাধনা প্রবর্তনকালে ‘বা’আল’ নামে সুফি সাধনার একটি শাখা গড়ে ওঠে। তারা ছিল সঙ্গীতাশ্রয়ী এবং মৈথুনভিত্তিক গুপ্ত সাধনপন্থী। মরুভূমির বিভিন্ন অঞ্চলে তারা গান গেয়ে বেড়াত। অন্যান্য সুফিসাধকদের মতো তারাও এক সময় ভারতীয় উপমহাদেশে আগমন করে এবং ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। এভাবেই বাংলায় বাউল সম্প্রদায়ের আগমন ঘটে।

বাউলদের আচার-আচরণ অদ্ভুত এবং বিচিত্র হওয়ায় কেউ কেউ তাদের ‘পাগল’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। এ কারণে সংস্কৃত ‘বাতুল’ (পাগল, কান্ডজ্ঞানহীন) ও ‘ব্যাকুল’ (বিহবল, উদ্ভ্রান্ত) শব্দদ্বয়কে ‘বাউল’ শব্দের উৎপত্তিমূল বলে মনে করা হয়। কেউ কেউ পারসি ‘বা‘আল’ বা আরবি ‘আউলিয়া’ (বন্ধু, ভক্ত) শব্দ থেকে ‘বাউল’ শব্দের উৎপত্তি বলে মনে করেন। বা‘আলরা তাদের প্রেমাস্পদের উদ্দেশে মরুভূমিতে ‘পাগল’ বা ‘ক্ষ্যাপা’র মতো গান গেয়ে বেড়ায়। তারা সংসারত্যাগী এবং সকল বাধা-বন্ধনহীন। বাউলরাও অনেকটা পাগল বা ক্ষ্যাপার মতো।তবে তারা যে অর্থে ‘পাগল’ বা ‘ক্ষ্যাপা’ তা কেবল সুফি ‘দিওয়ানা’ শব্দের সঙ্গেই তুলনীয়।

সুফি সাধনায় যিনি সাধকের পরমারাধ্য বা পরমার্থ, তিনিই বাউলের মনের মানুষ এবং বাউলদের মতে তাঁর অবস্থান মানবদেহে। বাউলরা তাঁকে সাঁই (স্বামী), মুর্শিদ (পথনির্দেশক), গুরু (বিধানদাতা) ইত্যাদি নামে অভিহিত করে এবং তাঁরই সান্নিধ্যলাভে পাগল হয়।

প্রকারভেদ বাউলদের মধ্যে দুটি শ্রেণি আছে গৃহত্যাগী বাউল ও গৃহী বা সংসারী বাউল। যারা গুরুর নিকট ভেক খিলাফৎ-এর মাধ্যমে দীক্ষা গ্রহণ করে তাদের ত্যাগী বা ভেকধারী বাউল বলা হয়। এই শ্রেণির বাউলরা সংসার ও সমাজত্যাগী। ভিক্ষাই তাদের একমাত্র পেশা। তারা আখড়ায় আখড়ায় ঘুরে বেড়ায় এবং সেখানে সাময়িকভাবে অবস্থান করে। পুরুষরা সাদা লুঙ্গি এবং সাদা আলখাল্লা এবং মহিলারা সাদা শাড়ি পরিধান করে। তাদের কাঁধে থাকে ভিক্ষার ঝুলি। তারা সন্তান ধারণ বা প্রতিপালন করতে পারে না। এ ধরনের জীবনকে বলা হয় ‘জ্যান্তে মরা’ বা জীবন্মৃত। মহিলাদেরকে বলা হয় সেবাদাসী। পুরুষ বাউল এক বা একাধিক সেবাদাসী রাখতে পারে। এই সেবাদাসীরা বাউলদের সাধনসঙ্গিনী। ১৯৭৬ সাল অবধি বৃহত্তর কুষ্টিয়া জেলায় ২৫২ জন ভেকধারী বাউল ছিল। ১৯৮২-৮৩ সালে এই সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে ৯০৫ জনে দাঁড়ায়। বর্তমানে সমগ্র দেশে ভেকধারী বাউলের সংখ্যা প্রায় পাঁচ হাজার।

গৃহী বা সংসারী বাউলরা স্ত্রী-পুত্র-পরিজনসহ লোকালয়ে একটি স্বতন্ত্র পাড়ায় বাস করে। সমাজের অন্যদের সঙ্গে তাদের ওঠা-বসা, বিবাহ ইত্যাদি নিষিদ্ধ। ভেকধারী বাউলদের মতো তাদের কঠোর সাধনা করতে হয় না; ‘কলমা’ বা ‘বীজমন্ত্র’ পাঠ এবং নির্দিষ্ট কিছু সাধন-ভজন প্রক্রিয়া অনুসরণ করলেই হয়। ভেকধারী বাউলরা গৃহী বাউলদের দীক্ষা দিয়ে থাকে। উভয়ের সম্পর্ক অনেকটা পীর-মুরিদের মতো। দীক্ষা নেওয়ার পর সন্তানধারণ নিষিদ্ধ, তবে গুরুর অনুমতিক্রমে কেউ কেউ সন্তান ধারণ করতে পারে। বর্তমানে কৃষিজীবী, তন্তুবায় এবং ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মধ্যে বাউল হওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব ব্যক্তির মধ্যে অনেকে কলকারখানার শ্রমিক ও দৈনন্দিন মজুর পর্যায়ভুক্ত। বাউলমতে দীক্ষিত হওয়ার পূর্বে বিবাহ হয়ে থাকলে নতুন করে কোনো অনুষ্ঠান করতে হয় না। ত্যাগী বাউলদের সেবাদাসী ‘কণ্ঠিবদল’ করে একজনকে ছেড়ে অন্য জনের সঙ্গে চলে যেতে পারে। বর্তমানে গৃহী বাউলদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

গুরুধারা বাউলদের ‘ঘর’ বা ‘গুরুধারা’ আছে। এক একজন প্রধান বাউলগুরুর নামানুসারে এই ‘ঘর’ নির্দিষ্ট হয়। যেমন লালন শাহী, পাঞ্জু শাহী, দেলবার শাহী, পাঁচু শাহী ইত্যাদি। বাউলদের একটি বিশেষ সম্প্রদায় হলো  কর্তাভজা। এরা বৈষ্ণবপন্থী এবং ‘সতীমায়ের ঘর’ বলে পরিচিত। সতী মা কর্তাভজা সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান গুরু। বাউলদের এসব ঘর বা গুরুধারার মধ্যে সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্য উভয়ই আছে। বৈসাদৃশ্য তাদের সাধন-ভজন এবং সঙ্গীতের ক্ষেত্রেও লক্ষ করা যায়। লালন শাহ্র মধ্যে সুফি সাধনপ্রক্রিয়াসহ তন্ত্রযোগ এবং সহজিয়া সাধনতত্ত্ব এবং পাঞ্জু শাহ্র মধ্যে সুফিভাবনা ও দর্শন অধিক গুরুত্ব পেয়েছে।

আখড়া বাউল-ফকিরদের সাময়িক আবাসস্থলের নাম  আখড়া। এসব আখড়া পল্লিগ্রামের লোকালয় থেকে একটু দূরে অবস্থিত। সাধারণত সংসারত্যাগী এবং ভেকধারী বাউল-ফকিররাই এখানে অবস্থান করে। গুরুগৃহ এবং তার সমাধিকে কেন্দ্র করেও আখড়া গড়ে ওঠে। লালন শাহ্র সমকালে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষ করে ঢাকার বিক্রমপুর, নরসিংদী, মানিকগঞ্জ, শ্রীহট্ট (সিলেট), ত্রিপুরা (কুমিল্লা), রংপুর, নিলফামারী, পাবনা, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, যশোর, মাগুরা, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর এবং কুষ্টিয়াতে বাউল-ফকিরদের আখড়া ছিল। ঝিনাইদহ অঞ্চলে হরিণাকুন্ড থানার কুলবেড়ে হরিশপুর গ্রামে পাঞ্জু শাহ্র বসতবাড়ি ও সমাধিকে কেন্দ্র করে আখড়া গড়ে উঠেছে। লালন ফকিরের আখড়া কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়া গ্রামে। আখড়ায় ভক্তরা জড় হয়ে গান গেয়ে ধর্মকর্ম পালন করে। ছেঁউড়িয়ায় প্রতি বছর দোল পূর্ণিমায় তিনদিন ব্যাপী ‘মচ্ছব’ (মহোৎসব) ও ‘সাধুসেবা’ অনুষ্ঠিত হয়।

বাউলবিরোধী আন্দোলন  বাউল সম্প্রদায় অতীতকাল থেকেই এক শ্রেণির মানুষের কাছে যেমন সমাদৃত হয়েছে, তেমনি অন্য এক শ্রেণির গোঁড়া সম্প্রদায়ের নিকট ধিকৃত ও নিন্দিতও হয়েছে। লালন নিজেও এর শিকার হয়েছেন। হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্বপ্রদায়ই বাউলদের প্রতি কমবেশি বিদ্বেষভাবাপন্ন ছিল। এর কারণ বাউলরা সকল প্রকার শাস্ত্রাচার ও জাতিভেদপ্রথাকে অস্বীকার করে এবং দেহবাদী অধ্যাত্মসাধনায় নিয়োজিত থাকে। তাদের এই সাধনায় নারীকে তারা সঙ্গিনী হিসেবে গ্রহণ করে। তাদের সাধনা প্রেমনির্ভর অধ্যাত্মবাদী হলেও তা মিথুনাত্মক যৌনাচারমূলক হওয়ায় সুশীল সমাজ কর্তৃক নিন্দিত। ১৯৪২ সালে কুষ্টিয়া অঞ্চলে মওলানা আফসারউদ্দিনের নেতৃত্বে ‘বাউল খেদা’ নামে একটি আন্দোলনও হয়।

বাউল গান বাউল সম্প্রদায়ের সাধনসঙ্গীত। এটি লোকসঙ্গীতের অন্তর্গত। এ গানের উদ্ভব সম্পর্কে সঠিক কোনো তথ্য জানা যায় না। অনুমান করা হয় যে, খ্রিস্টীয় পঞ্চদশ শতক কিংবা তার আগে থেকেই বাংলায় এ গানের প্রচলন ছিল। বাউল গানের প্রবক্তাদের মধ্যে  লালন শাহ্পাঞ্জু শাহ্, সিরাজ শাহ্ এবং  দুদ্দু শাহ্ প্রধান। এঁদের ও অন্যান্য বাউল সাধকের রচিত গান গ্রামাঞ্চলে ‘ভাবগান’ বা ‘ভাবসঙ্গীত’ নামে পরিচিত। কেউ কেউ এসব গানকে ‘শব্দগান’ ও ‘ধুয়া’ গান নামেও অভিহিত করেন।

বাউল গান সাধারণত দুপ্রকার দৈন্য ও প্রবর্ত। এ থেকে সৃষ্টি হয়েছে রাগ দৈন্য ও রাগ প্রবর্ত। এই ‘রাগ’ অবশ্য শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের রাগ নয়, ভজন-সাধনের রাগ। বৈষ্ণব রসশাস্ত্রের মতো বাউল গানে ‘রাগ’ শব্দটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে ‘রাগ’ অর্থে অভিমান এবং প্রেমের নিবিড়তা বোঝায়। কাঙ্ক্ষিতজনের প্রতি নিবেদিত প্রেমের প্রগাঢ় অবস্থার নামই রাগ। রাগ দৈন্যে এমন ভাবই লক্ষণীয়। বাউলরা তাদের সাধনপন্থাকে রাগের কারণ বলে অভিহিত করে (আমার হয় না রে সে মনের মত মন/ আগে জানব কি সে রাগের কারণ)।

বাউল গান সাধারণত দুটি ধারায় পরিবেশিত হয় আখড়া আশ্রিত সাধনসঙ্গীত এবং আখড়াবহির্ভূত অনুষ্ঠানভিত্তিক। আখড়া আশ্রিত গানের ঢং ও সুর শান্ত এবং মৃদু তালের। অনেকটা হাম্দ,  গজল কিংবা নাত সদৃশ্য। লালন শাহ্র আখড়ায় বসে ফকিররা এ শ্রেণির গান করে থাকে। অপর ধারার চর্চা হয় আখড়ার বাইরে অনুষ্ঠানাদিতে, জনসমক্ষে। এ গান চড়া সুরে গীত হয়। সঙ্গে  একতারাডুগডুগি, খমক, ঢোলক,  সারিন্দাদোতারা ইত্যাদি  বাদ্যযন্ত্র বাজানো হয়। তাল দাদরা, কাহারবা, কখনও ঝুমুর, একতালা কিংবা ঝাঁপতাল। শিল্পীরা নেচে নেচে গান করে। কখনও গ্রাম এলাকায় রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটলে বাউল গানের মাধ্যমে তা নিরাময়ের জন্য প্রার্থনা করা হয়। বাউলরা কখনও একক আবার কখনও দলবদ্ধভাবে সঙ্গীত পরিবেশন করে। এ গানের একজন মুল প্রবক্তা থাকে। তার সঙ্গে অন্যরা ধুয়া বা ‘পাছ দোয়ার’ ধরে।

বাউল গানে কেউ কেউ শাস্ত্রীয় রাগসঙ্গীতের প্রভাবের কথা বলেছেন। কিন্তু এ গান মূলত ধর্মীয় লোকসঙ্গীতের পর্যায়ভুক্ত। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের উন্মেষ ও বিকাশ লোকসঙ্গীতের অনেক পরে। আধুনিক শিল্পীদের কণ্ঠে কখনও কখনও রাগের ব্যবহার হলেও তা সর্বক্ষেত্রে অপরিহার্য নয়।

বাউল গানে সাধারণত দুধরনের সুর লক্ষ করা যায় প্রথম কলি অর্থাৎ অস্থায়ীতে এক সুর এবং অন্য সব কলিতে কিছুটা ভিন্ন সুর। সবশেষে দ্রুতগতিতে দ্বিতীয় কলির অংশবিশেষ পুনরায় গীত হয়। এ গানে অস্থায়ী এবং অন্তরাই প্রধান। অস্থায়ীকে কখনও ধুয়া, মুখ বা মহড়া বলা হয়। দ্রুত লয়ের এ গানে প্রতি অন্তরার পর অস্থায়ী গাইতে হয়। কোনো কোনো গানে সঞ্চারী থাকে; আবার কোনো কোনো গানে নাচেরও প্রচলন রয়েছে, যার উৎস গ্রামীণ পাঁচালি গান বলে মনে করা হয়। তবে আখড়া আশ্রিত বাউল গানে নাচের প্রচলন নেই।

কিছু কিছু বাউল গান কীর্তন আশ্রিত। বৈষ্ণবধর্মের প্রভাবে এমনটি হয়েছে। তবে বাউল গানে সুফিভাবনাই প্রবল। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে,  পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের বাউল গানে সুরের পার্থক্য রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে সহজিয়া বৈষ্ণব সুরের আধিক্য, আর বাংলাদেশে সুফি গজলের প্রভাব, যার একটি দেশজরূপ ভাবগান ও শব্দগান। বাউল গানের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো এতে একটা উদাসী ভাব লক্ষ করা যায়; এর সুরে যেন মিশে থাকে না-পাওয়ার এক বেদনা।

বাউল গানের একটি বড় সম্পদ তার গায়কী বা গায়নশৈলী। উল্লেখ্য যে, বাউল গান একটি বিশেষ অঞ্চলে রচিত হলেও সঙ্গীতশিল্পীদের কারণে এর ওপর বিভিন্ন অঞ্চলের প্রভাব পড়ে। ফলে সুর ও গায়কিতে আসে পরিবর্তন। কখনও কখনও শব্দেও পরিবর্তন ঘটে। লক্ষ করা গেছে, কুষ্টিয়া অঞ্চলের বাউল গান যখন সিলেট, চট্টগ্রাম, ঢাকা, ফরিদপুর, রাজশাহী বা দিনাজপুরে গীত হয়, তখন বাণীর উচ্চারণে, সুরের প্রক্ষেপণে এবং গায়কিতে পরিবর্তন আসে। কিন্তু তারমধ্যেও মূল সুর ও বাণীর মধ্যে কমবেশি ঐক্য বজায় থাকে।

অতীতে বাউল বা লালনের গানে নির্দিষ্ট কোনো সুর ছিল না। পরবর্তীকালে লালনশিষ্য মনিরুদ্দিন ফকির এবং তাঁর শিষ্য খোদা বক্স এই গানের একটি ‘ছক‘ বাঁধার প্রচেষ্টা নেন। খোদা বক্সের শিষ্য অমূল্য শাহ্ ছিলেন একজন বিশিষ্ট সঙ্গীতজ্ঞ। তিনি বাউল তথা লালনগীতির একটি সঙ্গীতকাঠামো নির্মাণ করেন। তাঁর শিষ্য বেহাল শাহ্, শুকচাঁদ, দাসী ফকিরানী, চাঁদার গহর, নিমাই শাহ্, মহেন্দ্র, কানাই ক্ষ্যাপা, মতি ফকিরানী প্রমুখ এ গানের শ্রীবৃদ্ধি ঘটান। পরবর্তী সময়ে মহিম শাহ্, খোদাবক্স শাহ্, ঝড়ু শাহ্, করিম, বেল্লা, ফকিরচাঁদ, জোমেলা, খোরশেদ ফকির, লাইলি, ইয়াছিন শাহ্ প্রমুখ এর আরও উৎকর্ষ সাধন করেন।  বেতার ও  টেলিভিশন শিল্পী মকছেদ আলী খান বাউল গান ও লালনগীতির আধুনিকীকরণ করেন এবং তাঁর শিষ্য ফরিদা পারভীন বর্তমানে লালনগীতির সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় শিল্পী। তিনি বাউল গান ও লালন গীতিতে নতুন মাত্রা ও সুর সংযোজন করেন।

বাউল গানের একাধিক  ঘরানা আছে। অবশ্য এ ঘরানা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের রীতি অনুযায়ী নয়। এ ঘরানা সাধন-ভজন সংক্রান্ত। বাউল গানের ঘরানার সংখ্যা পাঁচ লালন শাহী, পাঞ্জু শাহী, দেলবার শাহী, উজল শাহী এবং পাঁচু শাহী। লালন শাহ্, পাঞ্জু শাহ্ প্রমুখ পঞ্চ বাউলকে কেন্দ্র করে এই পাঁচটি ঘরানা গড়ে উঠেছে।

বাউল গানে নানা তত্ত্বকথা আছে যেমন দেহতত্ত্ব, গুরু বা মুর্শিদতত্ত্ব অথবা নবীতত্ত্ব, লীলা অথবা মনের মানুষ তত্ত্ব ইত্যাদি। প্রতি গানে দুটি পদ থাকে দেহতত্ত্ব এবং ভজনতত্ত্ব। বাউলরা নিজেদের ভাষায় এ দুটিকে উপর পদ এবং নিচের পদ বলে উল্লেখ করে। বাউল গানের সুরে কখনও কখনও  ভাটিয়ালি সুরের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। এর কারণ মাঝিমাল্লারাও অনেক সময় নৌকা বাইতে বাইতে ধীর লয়ে এ গান গেয়ে থাকে। বাউল গানের বিশেষত্ব এই যে, এ গান কেবল বাউল সাধকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বাউলের সাধন-ভজন জানে না এমন সাধারণ মানুষও অধ্যাত্মরসের কারণে এ গান নিজের করে নিয়েছে।  [আনোয়ারুল করীম]