গজল


গজল  এক প্রকার লঘু রাগসঙ্গীত। এর উদ্ভব পারস্য দেশে। ভারতীয় সঙ্গীতে পারস্য সঙ্গীতের প্রভাব সংক্রমিত হলে গজল গানের ধারা ভারতে অনুপ্রবেশ করে। ভারতীয় সঙ্গীতের যে দুটি ধারা হিন্দুস্তানি (উত্তর ভারতীয়) ও কর্ণাটকি (দক্ষিণ ভারতীয়), গজল তার প্রথম ধারার অন্তর্গত। দিল্লি ও লক্ষ্ণৌ গজল চর্চার দুটি প্রধান কেন্দ্র।

‘গজল’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ প্রেমিক-প্রেমিকার কথোপকথন। তাই গজল গানকে প্রণয়সঙ্গীতও বলা হয়। গজল মূলত এক প্রকার ক্ষুদ্রগীত। এ গানে নর-নারীর বিচিত্র মনোভাব (যেমন, পূর্বরাগ, অনুরাগ, মনস্তাপ, বিরাগ, বিচ্ছেদ, আকাঙ্ক্ষা, আসক্তি, বিরহ, মিলন ইত্যাদি) প্রকাশ পায়। এর পাশাপাশি আল্লাহর প্রতি প্রেম, ভক্তি ও ভালোবাসাও প্রকাশ পায়।

পারস্যের শ্রেষ্ঠ সাধক কবিরা যে গজল রচনা করেন তাতে গভীর দার্শনিক তত্ত্ব প্রকাশ পেয়েছে। ভারতে গজল গানের প্রবর্তন হলে ফারসি, উর্দু ও অন্যান্য ভাষায় প্রচুর গজল রচিত হয় এবং তাতে রাগসঙ্গীতের মাধুর্য যুক্ত হওয়ায় গজল গান নতুন মাত্রা পায়।

গজল গানে মনকে আপ্লুত করার একটা বিশেষ গুণ আছে। তাই গজল বেশ জনপ্রিয় গান। গজল রচনার ক্ষেত্রে মীর্জা গালিব, জওক, মীল, আরজু, সম্রাট জাহাঙ্গীর, সম্রাজ্ঞী নূরজাহান, নবাব ওয়াজেদ আলী খান, চলচ্চিত্রাভিনেত্রী মীনা কুমারীর অজস্র সুন্দর সুন্দর গজল রচনার সন্ধান পাওয়া যায়।

গজল গানে সুরের চেয়ে কথার প্রাধান্য বেশি। এ গান শৃঙ্গাররসাত্মক এবং এর প্রধান উপজীব্য মানবপ্রেম হলেও যে কোনো ধরনের রচনাই এর বিষয়বস্ত্ত হতে পারে। উচ্চ ভাবপূর্ণ ও গাম্ভীর্যপূর্ণ রচনাও কোনো কোনো গজলে দেখা যায়। গজলে অনেকগুলি চরণ বা কলি থাকে। ‘স্থায়ী’ ছাড়া অন্য সমস্ত কলিকেই বলা হয় ‘অন্তরা’ এবং সেগুলি একই সুরে গাওয়া হয়। মাঝে মাঝে কোনো কোনো স্তবক  ছন্দ ভেঙ্গে ধীর লয়ে আবৃত্তি করা হয়। গজল গানের প্রকৃতি বা স্বভাব কোমল।  টপ্পা এবং ঠুমরির মতো গজল গানে মধুর ও মৃদু স্বভাবের  রাগ ব্যবহূত হয়। সাধারণত কাফি, ঝিঝিঁট, খাম্বাজ, ভৈরবী, পিলু, বারোয়া প্রভৃতি রাগ এবং পশ্তু ও দীপচন্দী তালে গজল গাওয়া হয়।

বাংলা ভাষায় গজল রচনার পথিকৃৎ  অতুলপ্রসাদ সেন। উত্তর ভারতের লক্ষ্ণৌ শহরে থাকার কারণে তিনি এ ধারার সঙ্গে পরিচিত হন এবং বাংলা গজলের বুনিয়াদ রচনা করেন। তাঁর পরে নজরুল ইসলামের হাতে বাংলা গজল বিশিষ্ট রূপ লাভ করে এবং তাঁর রচনার মধ্য দিয়েই গজল গান জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। নজরুলের পরে মনিরউদ্দিন ইউসুফ বেশ কিছু বাংলা গজল রচনা করলেও এ নিয়ে আর উল্লেখযোগ্য চর্চা হয়নি। [মোবারক হোসেন খান]