কীর্তন


কীর্তন  বাংলা সঙ্গীতের অন্যতম আদি ধারা। সাধারণ লোকের পক্ষে অতি সহজে ঈশ্বর সাধনার একটি উপায় হিসেবে এর উদ্ভব। গানের মাধ্যমে ধর্মচর্চার এ ধারা প্রাচীনকাল থেকেই এদেশে চলে আসছে। সে ধারাবাহিকতায় বাংলার বৈষ্ণবধর্মজাত সঙ্গীতধারার বিকশিত রূপই কীর্তন। এতে সাধারণত ঈশ্বরের গুণ ও লীলা বর্ণিত হয়।

কীর্তন গান পরিবেশনা

কীর্তন দুপ্রকার নামকীর্তন বা নামসংকীর্তন এবং লীলাকীর্তন বা রসকীর্তন। হরি বা বিষ্ণুকে সম্বোধন করে ‘হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে/ হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে\’ এ ষোল পদবিশিষ্ট কীর্তনই নামকীর্তন। অবশ্য নামকীর্তনের এ বোল ছাড়া আরও বোল আছে। সেগুলিও নামকীর্তন হিসেবেই প্রচলিত। আর রাধাকৃষ্ণ এবং গোপী-শ্রীকৃষ্ণের কাহিনী অবলম্বনে যে  পালাগান তা লীলাকীর্তন। পরবর্তীকালে গৌরাঙ্গ বা শ্রীচৈতন্যের কাহিনী অবলম্বনেও লীলাকীর্তনের প্রচলন হয়। কয়েকটি প্রধান লীলাকীর্তন হলো গোষ্ঠ, মান, মাথুর, নৌকাবিলাস, নিমাই সন্ন্যাস ইত্যাদি। এগুলি পদাবলি কীর্তন নামেও পরিচিত।

জয়দেবের গীতগোবিন্দম্ কীর্তন গানের আদি উৎস। এতে বিভিন্ন রাগ ও তালের উল্লেখ আছে। এর পদগুলি যে সাঙ্গীতিক কাঠামোতে রচিত, পরবর্তীকালের কীর্তনের ধারায় তারই প্রভাব পড়েছে। বড়ু চন্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন থেকেই কীর্তন নামের এ সঙ্গীতধারার বিকাশ ঘটে। এ সময়ের কাছাকাছি মিথিলার কবি বিদ্যাপতিও ব্রজবুলিতে কীর্তনাঙ্গের বৈষ্ণবপদ রচনা করেন। পনেরো শতকে চৈতন্যদেবের আবির্ভাবে কীর্তন গানে অসামান্য বেগ সঞ্চারিত হয়। তিনি ছিলেন নামকীর্তনের প্রচারক। চৈতন্যদেব বুঝতে পেরেছিলেন যে, নারী-পুরুষ ও বয়স নির্বিশেষে সঙ্গীতের আবেদন সর্বাধিক এবং কোনো কঠিন বিষয়ের প্রতি অশিক্ষিত কিংবা স্বল্পশিক্ষিত জনগণকে আকৃষ্ট করার সহজতম উপায় হচ্ছে সঙ্গীত। তাই ঈশ্বর-সাধনার সহজতম পন্থা হিসেবে তিনি বেছে নেন কীর্তনকে। তিনি সকলকে জানান আর কোনো শাস্ত্র নয়, কেবল ‘হরে কৃষ্ণ...’ ইত্যাদি ষোল পদবিশিষ্ট কীর্তন করলেই ঈশ্বরকে পাওয়া যাবে। ঈশ্বর-সাধনার এ সহজ পথের সন্ধান পেয়ে সাধারণ লোকেরা তাঁকে অনুসরণ করে কীর্তন গাইতে শুরু করে। ফলে কীর্তন একটি সামাজিক আন্দোলনে পরিণত হয়। এভাবেই চৈতন্যদেব কীর্তনের মাধ্যমে তাঁর আদর্শ, অধ্যাত্মচিন্তা এবং তাঁর সাম্যের ধর্ম সারা বাংলায় প্রচার করেন। তিনিই নামকীর্তনের পরিপূর্ণ সাঙ্গীতিক রূপ দান করেন এবং এ গানকে অধ্যাত্মমার্গে উন্নীত করে বাঙালির কাছে জনপ্রিয় করে তোলেন।

চৈতন্যোত্তর যুগে লীলাকীর্তন পাঁচটি ধারায় বিকশিত হয়: গড়ানহাটি, মনোহরশাহী, রেনেটি, মন্দারিণী ও ঝাড়খন্ডী। ধারাগুলি ঘরানা নামেও পরিচিত। উৎপত্তিস্থানের নামানুসারে এসব ধারার নামকরণ করা হয়। ষোল শতকে রাজশাহী জেলার অন্তর্গত গড়ানহাটি পরগনার পদকর্তা নরোত্তম দাস কর্তৃক গড়ানহাটি ধারা প্রবর্তিত হয়। তিনি প্রথমে গৌরচন্দ্রিকা গেয়ে পরে কীর্তন গাওয়ার রীতি প্রবর্তন করেন। নরোত্তম দাস  ধ্রুপদ সঙ্গীতে ব্যুৎপন্ন ছিলেন বলে তাঁর প্রবর্তিত গড়ানহাটি ধারাটি ছিল ধ্রুপদাঙ্গের কীর্তন। বীরভূমের মনোহরশাহী ধারার প্রবর্তক জ্ঞানদাস মনোহর। এতে খেয়াল গানের প্রভাব আছে। বর্ধমানের রেনেটি ধারার প্রবর্তক বিপ্রদাস ঘোষ। এতে টপ্পাঙ্গের প্রভাব আছে। মন্দারণ সরকার নামক জনৈক কীর্তনীয়া প্রবর্তিত ধারার নাম হয় মন্দারিণী এবং ঝাড়খন্ড অঞ্চলে উদ্ভূত ধারার নাম ঝাড়খন্ডী কীর্তন। মন্দারিণী ধারায় ঠুংরির প্রভাব লক্ষণীয়।

পরবর্তীকালে কলকাতায় টপ্পার প্রভাবে কীর্তনের এক নতুন ধারার সৃষ্টি হয়, যা ঢপকীর্তন নামে পরিচিত। নরোত্তম দাস কর্তৃক উদ্ভাবিত কীর্তনের এ ধারায় প্রথমে অনিবন্ধ গীতে আলাপ তথা স্বরালাপের মধ্য দিয়ে গানের শুরু হয়। আলাপের পর ধ্রুপদের গঠনভঙ্গি অনুযায়ী মূল গান অর্থাৎ নিবন্ধ গান গাওয়া হয়। নিবন্ধ গানের চারটি ধাতু উদ্গ্রাহ, মেলাপক, ধ্রুব ও আভোগ-এর গঠনরীতি অনুযায়ী পদাবলি কীর্তনের রূপ নির্মিত হয়েছে। বৈষ্ণব পন্ডিতদের মতে কীর্তনে ৬৪ প্রকার রসের উল্লেখ আছে। সাধারণত দাঁড়িয়ে অথবা নৃত্যসহযোগে কীর্তন পরিবেশিত হয়, তবে বৈঠকি স্বভাবে কীর্তন পরিবেশনেরও উল্লেখ পাওয়া যায়। কীর্তনের গঠন-প্রকৃতিতে রয়েছে কথা, আখর, দোহা, ছুট ও তুক্। এতে আখরের প্রয়োগ খুবই মধুর ও আকর্ষণীয়। কীর্তনের একটি পদ গাওয়ার পর আখর দ্বারা সঙ্গীতের মূল কথাটি ভাব ও রসে ভরিয়ে তোলা হয়। কীর্তন উচ্চাঙ্গসঙ্গীত ধারার গান। এর সুর ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের বিশেষ করে হিন্দুস্থানি সুরের প্রভাব থেকে মুক্ত এবং উদার ভক্তিভাবরসেপূর্ণ।

কীর্তন রাগসঙ্গীত ধারার গান হলেও এতে রাগের ব্যবহার অনেকটা শিথিল, কারণ কীর্তন তার মূল ভাব, রূপ ও রসের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে হিন্দুস্থানি রাগ-রাগিণীর কঠিন বিধি-নিষেধ থেকে সব সময় ভিন্ন পথে অগ্রসর হয়েছে। তবে কীর্তন গানের একটি বিষয় লক্ষণীয় হলো যে, তা সাধারণত সম্পূর্ণ জাতিতে অর্থাৎ সাত স্বরে গীত হয়ে থাকে। ষাড়ব এবং ঔড়ব জাতির গান তুলনামূলকভাবে কম। কীর্তনে তোড়ী, কামোদ, শ্রীরাগ, পাহাড়ী, পটমঞ্জরী প্রভৃতি রাগ-রাগিণীর ব্যবহার ছাড়াও প্রাচীন রাগ-রাগিণীর পরিচয়ও পাওয়া যায়।

কীর্তন গানে ভারতীয় প্রাচীন তালের বৈচিত্র্য লক্ষণীয়। দ্রুত, মধ্য ও বিলম্বিত এ তিন লয়েই তাল বাজানো হয়। এর তাল বিভিন্ন ক্রিয়ার মাধ্যমে প্রদর্শিত হয়, যেমন তাল, ফাঁক, কাল, কোশী বা কুশী ও অর্ধতালী। কীর্তনে বিভিন্ন প্রকার তাল ব্যবহূত হয়, যেমন ছোট লোফা, বড় লোফা, রূপক, যতি, তেওট, দোঠুকী, মধ্যম দশকোশী, বড় দশকোশী, দাশপেড়ে, শশীশেখর, বীর বিক্রম ইত্যাদি। বাদ্যযন্ত্র হিসেবে এ গানে আনদ্ধ ও ঘন বিশেষত শ্রীখোল এবং করতালের ব্যবহারই সমধিক।

ইংরেজ কর্তৃক কলকাতা শহরের পত্তনের পূর্ব পর্যন্ত কীর্তন গ্রামবাংলার সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে ছিল। অর্থনৈতিক কারণে গ্রামছাড়া মানুষ যখন কলকাতায় ভিড় জমাতে থাকে তখন তাদের সঙ্গে কীর্তন, পাঁচালি ইত্যাদি সঙ্গীতধারা কলকাতার নগরসমাজে প্রবেশ করে। ওই সময় কলকাতায় ঢপকীর্তন বেশ জনপ্রিয় ছিল। তবে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত প্রায় সমগ্র বাংলাদেশেই হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে কীর্তনের শ্রোতৃজগৎ ছিল বিস্তৃত। পাকিস্তান আমলেও এদেশে গ্রামে গ্রামে কীর্তন গানের ব্যাপক প্রচলন ছিল। বর্তমানে এর প্রচলন সংকীর্ণ হলেও শ্রোতা আছে। আধুনিক বাংলা গানে অনেক সময় কীর্তনের মৌলিক সুর ও ভাব সংযোজনের প্রবণতাও দেখা যায়।  [খান মোঃ সাঈদ]