কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়


কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়  ভারতের আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলির মধ্যে প্রাচীনতম। ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড ক্যানিং এর (১৮৫৬-১৮৬২) শাসনামলে ১৮৫৭ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। যে বিশ্ববিদ্যালয় আইন (১৮৫৭ সালের ২ নং আইন) বলে এটি প্রতিষ্ঠিত তার মুখবন্ধে বলা হয়, মহারানীর সকল শ্রেণি ও ধর্মের প্রজাদের নিয়মিত ও উদার শিক্ষাগ্রহণে উদ্বুদ্ধ করা এবং একই সঙ্গে সাহিত্য, বিজ্ঞান ও শিল্পকলার বিভিন্ন শাখায় পরীক্ষার মাধ্যমে সকল ব্যক্তির দক্ষতা নিরূপণ করাই হবে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল উদ্দেশ্য। এ সকল লোককে তাদের সাফল্যের প্রমাণস্বরূপ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি প্রদান করা হবে।

আশুতোষ ভবন, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অধিভুক্তি এবং ছাত্রছাত্রীদের পরীক্ষা গ্রহণের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলরের পদটি ছিল অবৈতনিক। তিনি সিনেট ও সিন্ডিকেটের সম্মতি ও সুপারিশক্রমে মনোনীত হতেন এবং এদের অনুমোদন ও পরামর্শ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। স্যার জেমস উইলিয়াম কোলভিল (২৪ জানুয়ারি ১৮৫৭ থেকে ২৪ জানুয়ারি ১৮৫৯) থেকে শুরু করে প্রথম দিকের সকল উপাচার্যই ছিলেন ইউরোপীয়। এ পদে মনোনীত প্রথম ভারতীয় ছিলেন স্যার গুরুদাস ব্যানার্জী। তিনি ১৮৯০ সালের ১ জানুয়ারি এ পদের জন্য মনোনীত হন এবং ১৮৯২ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত উক্ত দায়িত্বে বহাল ছিলেন।

১৮৮২ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পঁচিশ বছর পূর্তিকালেই তার এখতিয়ার কলকাতা ও নিম্ন প্রদেশগুলির বাইরে ছড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং তা পশ্চিমে পাটনা, বারানসী, এলাহাবাদ, লক্ষ্মৌ, কানপুর, বেরেলী, জয়পুর, ইন্দোর, আজমীর, আগ্রা, দিল্লি, পাতিয়ালা, লাহোর, সিমলা ও অমৃতসর, পূর্বে ঢাকা, গৌহাটি ও রেঙ্গুন, দক্ষিণে কটক, সওগর ও নাগপুর এবং এর বাইরে সিংহলের কান্ডি ও কলম্বো পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়। যখন বোম্বে ও মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয় দাক্ষিণাত্য ও সুদূর দক্ষিণের অধিকাংশ অঞ্চলের দায়িত্বভার গ্রহণ করে, তখন বার্মা (মায়ানমার) এবং সিংহলও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে নিজেদেরকে এক করে ফেলার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল।

ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ১৯০৪ প্রণয়নের পর বিশ্ববিদ্যালয়টির ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা হয়। ১৯০১ সালে সিমলায় লর্ড  কার্জন আহূত শিক্ষা সম্মেলনের প্রস্তাবনা এবং ১৯০২ সালে লর্ড কার্জন কর্তৃক গঠিত বিশ্ববিদ্যালয় কমিশনের সুপারিশের ফলে প্রণীত এ আইনের দ্বারা বিশ্ববিদ্যালয়কে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাদান এবং অধ্যয়ন ও গবেষণার উন্নয়নে কাজ করার ক্ষমতা প্রদান করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের এবং তাদের এলাকাগত এখতিয়ারের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ সুদৃঢ় করা এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলির বিশেষত তৎকালে দূরবর্তী বার্মা ও সিংহলের বিস্তৃত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে লর্ড কার্জন খুবই সচেতন ছিলেন। এ আইনের দ্বারা সিনেট সদস্যদের সংখ্যা সীমিত করা হয়, যাদের অধিকাংশ ছিলেন সরকার কর্তৃক মনোনীত এবং নতুন কলেজের নিবন্ধন দানের ক্ষেত্রে কঠোর শর্ত আরোপিত হয়। এ আইনে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলিতে নিয়মানুগ পরিদর্শনের ব্যবস্থা করা, প্রভাষক ও অধ্যাপকদের নিয়োগ দান এবং বিজ্ঞানাগার ও জাদুঘরে প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহ করে ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষাদানের ব্যবস্থা গ্রহণের এখতিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে দেওয়া হয়।

আশুতোষ মুখার্জী চার মেয়াদকাল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন। তাঁর সময়ে কলেজগুলির উন্নয়ন, স্কুলসমূহের সংস্কার, গোটা শিক্ষা ব্যবস্থার পুনর্গঠন এবং বিশেষভাবে বিশ্ববিদ্যালয়কে বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকান্ডের কেন্দ্রে পরিণত করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এসময় স্নাতকোত্তর পর্যায়ের বিভিন্ন বিষয়ে চালু বিভাগগুলির যে লক্ষণীয় সম্প্রসারণ ঘটে তা ১৯১৯ সালে মাইকেল স্যাডলারের সভাপতিত্বে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কমিশন এর রিপোর্ট থেকে স্পষ্ট অনুধাবন করা যায়। আশুতোষ মুখার্জীর প্রচেষ্টার সাফল্য শুধু মানবিক বিভাগের বিভিন্ন শাখার স্নাতকোত্তর শিক্ষার সম্প্রসারণেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং পূর্ববর্তী বছরগুলিতে একান্তভাবে কাঙ্ক্ষিত ব্যবহারিক ও প্রযুক্তি বিজ্ঞানের সম্প্রসারণেও সাফল্য এসেছিল। দ্বারভাঙ্গার মহারাজা স্যার স্যার তারকনাথ পালিত ও স্যার রাসবিহারী ঘোষ এর মোটা অংকের অনুদান আশুতোষ মুখার্জীকে বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার ও বিজ্ঞান কলেজের বিশাল ভবন নির্মাণ এবং সেখানে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামের ব্যবস্থা ও গবেষণাগার প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করে। আশুতোষ মুখার্জী উন্নয়নের যে ধারার সূচনা করেন পঁয়ত্রিশ জন উপাচার্যের সুযোগ্য নেতৃত্বে ১৯১৯ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত সে ধারা অব্যাহত থাকে। এঁদের মধ্যে সুপরিচিত ছিলেন ড.  নীলরতন সরকার, স্যার উইলিয়ম ইউয়ার্ট গ্রিভস, স্যার যদুনাথ সরকার, ড. হাসান সোহরাওয়ার্দী, ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী,  মুহম্মদ আজিজুল হক, ড. বিধানচন্দ্র রায়, ড. রাধাবিনোদ পাল ও ড. প্রমথনাথ ব্যানার্জী।

উচ্চশিক্ষা ও জ্ঞানবিস্তারের প্রখ্যাত কেন্দ্র হিসেবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বেশসংখ্যক পৃষ্ঠপোষকদের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা লাভ করে। প্রসন্ন কুমার ঠাকুর, প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ, দ্বারভাঙ্গার মহারাজা রামেশ্বর সিং, তারকনাথ পালিত, রাসবিহারী ঘোষ, জয়কিষাণ মুখার্জী, জ্ঞানেন্দ্রচন্দ্র ঘোষ, মহারাজা মনিন্দ্রচন্দ্র নন্দী ও নীলরতন সরকারের ন্যায় বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের আহবানে সাড়া দিয়ে সাহায্যের হাত সম্প্রসারিত করেন। উন্নয়নশীল সমাজের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণের নিমিত্তে বিশ্ববিদ্যালয়টি স্নাতকপূর্ব ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে বিভিন্ন পছন্দের নৈর্বাচনিক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করতে সমর্থ হয়। বিভিন্ন পর্যায়ের পরীক্ষার ক্রমবর্ধমান সংখ্যা থেকেই অনুষদ ও পাঠক্রমের বিস্তৃতি অনুধাবন করা যায়। ১৯৩৩ সালে পরীক্ষার সংখ্যা ছিল ত্রিশ; ১৯৪৩ সালে এর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় সাইত্রিশ এবং এক দশক পর অর্থাৎ ১৯৫৩ সালে এ সংখ্যা চৌষট্টিতে পৌঁছে। পাঠক্রমের বৈচিত্র্যের সাথে সাথে সেখানে প্রাতিষ্ঠানিক সাধারণ কোর্স থেকে পেশাগত শিক্ষায় কোর্স বদলের সুযোগও প্রত্যক্ষ করা যায়। মেডিক্যাল ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজগুলিতে ছাত্রসংখ্যা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেতে থাকে। ১৯৩৬ সালের মধ্যে সমরবিদ্যা বিষয়ে পরীক্ষা গ্রহণ ও সনদপত্র প্রদান ব্যবস্থার প্রচলন করা হয় এবং ১৯৪৫ সালে গ্রন্থাগার বিজ্ঞানে ডিপ্লোমা কোর্স চালু করা হয়। ওই বছরই ফলিত রসায়ন বিভাগের অধীনে সাবান-প্রযুক্তি বিষয়ে ডিপ্লোমা কোর্স চালু হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাতিষ্ঠানিক ও পেশাগত বিষয়ে স্নাতকোত্তর শিক্ষাদানের পরিধি সম্প্রসারণ করা হয়। ১৯৩৩ সালে আরবি, ফারসি, হিন্দি, উর্দু ছিল এম.এ. পরীক্ষার জন্য প্রধান বিষয়। ১৯৩৯ সালে ভারতীয় মাতৃভাষা ব্যাপক সংস্কার করে আধুনিক ভারতীয় ভাষায় রূপ দেওয়া হয় এবং তা এম.এ পরীক্ষার বিষয়রূপে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পরের বছর ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়টি পাঠসূচির অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং এর সুবাদে বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামি শিক্ষা বিষয়ে উচ্চতর শিক্ষাদানের জন্য একটি পৃথক বিভাগ খোলার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়। একই বছর এম.এ ও এম.এস-সি পরীক্ষায় পরিসংখ্যান ও ভূগোল বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ১৯৪৬ সালে পৃথক বিষয় হিসেবে বাণিজ্য অন্তর্ভুক্ত হয় এবং ১৯৪৭ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞান স্বতন্ত্র মর্যাদা লাভ করে। স্নাতকোত্তর পর্যায়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা ১৯৩৬ সালেই অনুভূত হয়। ফলে ১৯৫৩ সালে মাস্টার অব ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ১৯৪৭ সালে পাবলিক হেলথ বিষয়ে ডিগ্রি কোর্স চালু করা হয়। ইতোমধ্যে ১৯৩৯ সালে প্রতিষ্ঠিত ব্যারাকপুরের কৃষি ইনস্টিটিউট ১৯৪৮ সালে পুনরায় চালু করা হয় এবং ওই বছরই কৃষির খয়রা অধ্যাপক পদ সৃষ্টি হয়। অনুরূপভাবে ১৯৪৬ সালে ইনস্টিটিউট অব জুট টেকনোলজির প্রতিষ্ঠা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রমে এক নতুন মাত্রা যোগ করে।

১৯৩৪ সালে প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ে স্নাতকোত্তর শিক্ষার সাথে সংশ্লিষ্ট একটি আর্ট গ্যালারি ও জাদুঘর প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৩৭ সালে শিল্পকলা ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের এক প্রদর্শনীর মাধ্যমে আশুতোষ মিউজিয়াম অব ইন্ডিয়ান আর্ট-এর উদ্বোধনের পর এ আর্ট গ্যালারি ও জাদুঘর পূর্ণতা লাভ করে। প্রদর্শিত শত শত নিদর্শনের মধ্যে ছিল চিত্রকলা, ভাস্কর্য, ব্রোঞ্জমূর্তি, পোড়ামাটির ফলকমুদ্রা, সচিত্র পান্ডুলিপি, ব্যানার, গোটানো আকারে কাগজে লিখিত পুথি ইত্যাদি। নেপাল, তিববত, বাংলাদেশ (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) এবং পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, বিহার, উড়িষ্যা ও ভারতের অন্যান্য অংশ থেকে এগুলি সংগ্রহ করা হয়েছিল। ১৯৪৫ ও ১৯৫০ সালে যথাক্রমে ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার ফিজিক্স এবং রেডিও ফিজিক্স অ্যান্ড ইলেকট্রোনিক্স বিভাগ চালু করা হয়। এগুলি ছিল বিজ্ঞান শিক্ষার ক্ষেত্রে দুটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের প্রাক্কালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্ষপঞ্জিতে ২১৬ টি অধিভুক্ত কলেজের তালিকা প্রকাশিত হয়। এদের মধ্যে সাতাশটি কলেজ ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে, বর্তমান বাংলাদেশে। এগুলি হলো: আনন্দ মোহন কলেজ, ময়মনসিংহ (১৯১৪ সালে নিবন্ধিত), আজিজুল হক কলেজ, বগুড়া (১৯৪১), ব্রজমোহন কলেজ, বরিশাল (১৮৯৮), ব্রজলাল হিন্দু একাডেমী, দৌলতপুর, খুলনা (১৯১৪), কারমাইকেল কলেজ, রংপুর (১৯১৭), চৌমুহনী কলেজ, নোয়াখালী (১৯৪৫), চট্টগ্রাম কলেজ (১৯১০), দেবেন্দ্র কলেজ, মানিকগঞ্জ (১৯৪২), এডওয়ার্ড কলেজ, পাবনা (১৯৪০), ফজলুল হক কলেজ, চাখার (১৯৪১), হরগংগা কলেজ, মুন্সিগঞ্জ (১৯৪২), জামালপুর কলেজ, জামালপুর (১৯৪৬), মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর (১৯৪২), গুরুদয়াল কলেজ, কিশোরগঞ্জ (১৯৪৫), কুমুদিনী কলেজ, টাংগাইল (১৯৪৪), মনমোহিনী ইনষ্টিটিউট অব সাইন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, হেমায়েতপুর, পাবনা (১৯৪৬), প্রফুল্লচন্দ্র কলেজ, বাগেরহাট (১৯২৩), রাজেন্দ্র কলেজ, ফরিদপুর (১৯২০), রাজেন্দ্র কুমার গার্লস কলেজ, খুলনা (১৯৪৪), রাজশাহী কলেজ, রাজশাহী (১৮৭৮), সাদত কলেজ, করটিয়া, টাংগাইল (১৯৩৯), সাতক্ষীরা কলেজ, সাতক্ষীরা (১৯৪৬), সিরাজগঞ্জ কলেজ, সিরাজগঞ্জ (১৯৪০), শেঠ তোলারাম গার্লস কলেজ, নারায়ণগঞ্জ (১৯৪৫), স্যার আশুতোষ কলেজ, চট্টগ্রাম (১৯৪১), শ্রীকৃষ্ণ কলেজ, ফরিদপুর (১৯৪২) ও ভিক্টোরিয়া কলেজ, নড়াইল (১৮৯০)।

স্যার আশুতোষ মুখার্জীর উদ্যম ও অনুপ্রেরণায় স্নাতকোত্তর বিভাগসমূহ চালু হওয়ার পর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কলা ও বিজ্ঞানের সক্রিয় গবেষণা কেন্দ্রে পরিণত হয় এবং সমগ্র বিশ্বে স্বীকৃতি লাভ করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন নোবেল বিজয়ী সি.ভি. রমন ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রখ্যাত বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসু, প্রফুল্লচন্দ্র রায়, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, মেঘনাদ সাহা, জ্ঞানেন্দ্রনাথ মুখার্জী, জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ ও বি.সি. গুহ। সর্বপল্লি রাধাকৃষ্ণন, সুরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত, ব্রজেন্দ্রনাথ শীল ও কৃষ্ণচন্দ্র ভট্টাচার্যের ন্যায় স্বনামধন্য দার্শনিকগণ এবং ডি.আর. ভান্ডারকর,  হেমচন্দ্র রায়চৌধুরী, সুরেন্দ্রনাথ সেন, ইন্দুভূষণ ব্যানার্জি, নরেন্দ্রকৃষ্ণ সিংহ, রমেশচন্দ্র মজুমদার ও মুহম্মদ যুবায়ের সিদ্দিকী প্রমুখ ইতিহাসবেত্তাদের সুখ্যাতি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যকে গৌরবান্বিত করেছিল। চারুকলায় অবনীন্দ্রনাথঠাকুর, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, অর্ধেন্দ্র কুমার গাঙ্গুলী ও নীহাররঞ্জন রায় এর গৌরব বৃদ্ধি করেন। ভাষাবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে অনন্যসাধারণ পান্ডিত্যের জন্য সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় খ্যাতিলাভ করেন।

১৯৪৭ সাল পর্যন্ত শিক্ষা পদ্ধতি নিয়ে বহুবিধ পরীক্ষানিরীক্ষা চলে এবং এসব কার্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত ছিল ওয়ার্দা স্কিম, ন্যাশনাল কাউন্সিল অব এডুকেশন, বিশ্বভারতী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। এক্ষেত্রে অপরাপর কার্যক্রম ছাড়াও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় অবিভক্ত বাংলায় শিক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছিল।

১৯৫১ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার, ১৯০৪ সালের ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয় আইন (Indian Universities Act) এর পরিবর্তে ‘কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় আইন’ (Calcutta University Act) পাশ করে। যা অধিভুক্ত কলেজগুলোর আন্তঃসমন্বয় সাধনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক কাঠামোকে সুদৃঢ় করার দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর দেয়া হয়। একই বছর পশ্চিমবঙ্গীয় মাধ্যমিক শিক্ষা আইন (West Bengal Secondary Education Act) পাশের ফলে স্কুল সমাপনী পরীক্ষার দায়িত্বও বিশ্ববিদ্যালয়কে দেয়া হয়।

বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর পর্যায়ের পড়াশোনার বিষয়বস্ত্তকে নতুন মাত্রায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। নতুন নতুন বৈজ্ঞানিক গবেষণার ক্ষেত্র যেমন, নিউক্লিয়ার ফিজিক্স, রেডিও ফিজিক্স এন্ড ইলেক্ট্রনিক্স, বায়োফিজিক্স, মোলিকিউলার বায়োলজি এন্ড জেনেটিক্স, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড বায়োটেকনোলজি, প্ল্যান্ট সায়েন্স এন্ড সেল বায়োলজি, মাইক্রোবায়োলজি, এ্যাটমোসফিয়ারিক সায়ন্স, ইনভায়রনমেন্টাল সায়ন্স, ইনফরমেশন টেকনোলজি এন্ড কম্পিউটার এপ্লিকেশন প্রভৃতি বিষয়সমূহ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এই বিষয়বস্ত্তসমূহ মৌলিক বিজ্ঞান না হলেও এর সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা করে। সামাজিক বিজ্ঞান, ভাষা এবং সাহিত্যের ক্ষেত্রে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্জন সকল সময়ই প্রশংসনীয়। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাব্যবস্থায় প্রচলিত বিষয়সমূহ যেমন অর্থনীতি, ইতিহাস, দর্শন, ভাষাতত্ত্ব এবং আধুনিক ভারতীয় ভাষার তুলনামূলক বিশ্লেষণের ফলে প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস ও সংস্কৃতি (১৯৩২), রাস্ট্র বিজ্ঞান (১৯৪৮) কিংবা সমাজবিজ্ঞানের মতো একাধিক নতুন বিভাগ চালু করা হয়।

পরবর্তী সময়ে গান্ধী অথবা নেহেরুর নামে ‘সেন্টার ফর সোস্যাল সায়ন্স এন্ড হিউম্যানিটিজ্’ (Centre for Social Sciences and Humanities) স্থাপিত হয় যা ডিএসএ (DSA)এর সহায়তায় সম্প্রসারিত হয়ে একাধিক বিভাগে পরিণত হয়।

২০০১ সালে National Assessment and Accreditation Council (NAAC) কর্তৃক কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ‘Five Star Status’ খেতাবপ্রাপ্ত হয়। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্ভাবনাময় উৎকর্ষতার স্বীকৃতিস্বরূপ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (The University Grants Commission) কর্তৃকও ‘University with Potential for Excellence Status’ নামক খেতাব প্রদান করে।

২০০৫ সালের ১০ নভেম্বর, টাইমস্ হাইয়ার এডুকেশন সাপ্লিমেন্ট (The Times Higher Education Supplement) পৃথিবীর বিখ্যাত কলা ও মানবিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি তালিকা প্রকাশ করে। সেখানে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ই ছিল একমাত্র ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয় যার নাম তালিকার প্রথম ৫০ টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ছিল।

২০০৬ সালের ১৭ জানুয়ারী, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ পরবর্তী গোল্ডেন জুবিলি উদ্যাপন (Post Centenary Golden Jubilee Celebration) করে যার উদ্বোধন করেন ভারতের রাষ্ট্রপতি।  [রচনা চক্রবর্তী]

গ্রন্থপঞ্জি  Pramatha Nath Banerjee, (et al), Hundred Years of the University of Calcutta, Calcutta, 1957; PK Bose, Calcutta University: Some Problems and Their Remedies, University of Calcutta, Calcutta, 1973; Rachana Chakraborty, Higher Education in Bengal, (1919-1947): A Study of its Administration and Management, Calcutta, 1996.