সরকার, নীলরতন


সরকার, নীলরতন (১৮৬১-১৯৪৩)  একজন চিকিৎসাসেবী, জনহিতৈষী, শিক্ষাবিদ এবং শিল্পোদ্যোক্তা। নীলরতনের পিতা নন্দলাল সরকার ছিলেন যশোরের এক দরিদ্র কায়স্থ পরিবারের সন্তান; তিনি পরবর্তীসময়ে খুলনার জয়নগরে বসতি স্থাপন করেন। নীলরতন সরকার ১৮৬১ সালের ১ অক্টোবর চবিবশ পরগনা জেলার নেত্র এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৮৭৬ সালে স্থানীয় স্কুল থেকে এন্ট্রান্স পাস করার পর নীলরতন সরকার ১৮৭৯ অথবা ১৮৮০ সালে ক্যাম্পবেল মেডিকেল স্কুল থেকে চিকিৎসা শাস্ত্রে দেশীয় ডিপ্লোমা লাভ করেন। তিনি ১৮৮৫ সালে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন এবং কিছুদিন একটি স্কুলে শিক্ষকতা করেন। তিনি  কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৮৮৮, ১৮৮৯ এবং ১৮৯০ সালে যথাক্রমে এমবি, এমএ এবং এমডি ডিগ্রি লাভ করেন।

১৮৮৮ সালে নীলরতন পূর্ববাংলার ব্রাহ্ম মিশনারি গিরিশচন্দ্র মজুমদারের কন্যা নির্জলাকে বিয়ে করেন এবং ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করেন। একজন স্বাধীন বেসরকারি চিকিৎসক হিসেবে নীলরতন সরকার তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন এবং অচিরেই একজন সফল চিকিৎসক হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। তাঁর চিকিৎসা সম্মানী দুই রুপী থেকে ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়ে চৌষট্টি রুপী পর্যন্ত দাঁড়ায়। তিনি দরিদ্র রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা প্রদান এবং উদার হস্তে খাদ্য ও ঔষধের ব্যবস্থা করার মাধ্যমে সমাজের প্রতি তাঁর গভীর দায়িত্বশীলতা প্রদর্শন করেন। পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত ভারতের স্থানীয় চিকিৎসকদের সংগঠন কলকাতা মেডিকেল ক্লাব-এর তিনি ছিলেন একজন মুখ্য সংগঠক এবং সতেরো বছর যাবৎ তিনি এই সংস্থার সভাপতির পদ অলংকৃত করেন। ইন্ডিয়ান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন গঠনের ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন এবং দীর্ঘ সময় যাবৎ এ সংস্থার পত্রিকার এডিটর-ইন-চীফ বা প্রধান সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।

১৮৯৫ সালে তিনি একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ স্থাপন করেন যা পরবর্তীকালে ১৯০৪ সালে ‘Calcutta Medical School and College of Physicians and Surgeons of Bengal’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। প্রতিষ্ঠানটির স্কুল শাখায় দেশীয় ভাষার মাধ্যমে চার বছর মেয়াদি প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো, আর অপর শাখায় ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে পাঁচ বছর মেয়াদি শিক্ষা দেয়া হতো। প্রতিষ্ঠানটির কলেজ শাখা পরে ১৯১৬ সালে পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল কলেজের মর্যাদা লাভ করে এবং এর নাম দেওয়া হয় কারমাইকেল মেডিকেল কলেজ। পরবর্তীকালে ১৯১৭ সালে এটি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। মেডিকেল স্কুলটির কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ১৯১৮ সালে ‘মেডিক্যাল এডুকেশন সোসাইটি’ গঠন করা হয়। নীলরতন সরকার ১৯২২ সালে এর প্রথম সভাপতি নির্বাচিত হন এবং একটানা ১৯৪১ সাল পর্যন্ত এ পদে অধিষ্ঠিত থাকেন। বাংলায় বিভাগবিরোধী আন্দোলনের সময় প্রতিষ্ঠিত ‘ন্যাশনাল কাউন্সিল অব এডুকেশন’ এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্গত সায়েন্স কলেজ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন একজন উৎসাহী সংগঠক। তিনি  ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কালটিভেশন অব সায়েন্স-এর সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন।

নীলরতন সরকার রাজনীতিতেও যথেষ্ট সক্রিয় ছিলেন। তিনি ১৮৯০ সাল থেকে ১৯১৯ সাল পর্যন্ত  ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সদস্য ছিলেন। শিক্ষা ক্ষেত্রে উৎসাহের কারণে তিনি বিভিন্নভাবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ১৯১৯ সাল থেকে ১৯২১ সাল পর্যন্ত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, ১৯২৪ সাল থেকে ১৯২৭ সাল পর্যন্ত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘Council of Post-Graduate Teaching in Arts’-এর সভাপতি এবং ১৯২৪ সাল থেকে ১৯৪৩ সাল পর্যন্ত একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘Council of Post-Graduate teaching in Science’-এর সভাপতির পদ অলংকৃত করেন। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় নীলরতন সরকারকে যথাক্রমে ডিসিএল ও এলএলডি ডিগ্রি প্রদান করে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৪০ সালে নীলরতন সরকারকে ডিএসসি ডিগ্রি প্রদান করে।

দেশের সার্বিক উন্নয়নে নিজের আগ্রহের কারণে নীলরতন সরকার বিভিন্ন শিল্প প্রকল্প, যেমন রাঙ্গামাটি টি কোম্পানি, ন্যাশনাল সোপ ফ্যাক্টরি এবং ন্যাশনাল ট্যানারি কোম্পানি প্রতিষ্ঠায় অর্থায়ন করেন। বুট ও ইক্যুপমেন্ট ফ্যাক্টরির একজন পরিচালক হিসেবে তিনি কিছুদিন দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৪৩ সালের ১৮ মে তাঁর মৃত্যু হয়।  [সুজাতা মুখার্জী]