পোড়ামাটির ভাস্কর্য ও ম্যুরাল


পোড়ামাটির ভাস্কর্য ও ম্যুরাল  পাথরের অভাবহেতু বাংলায় ব্যাপকভাবে নির্মিত হয়েছে এবং এই শিল্পকর্ম পলিবিধৌত বাংলায় বিশেষ উৎকর্ষ লাভ করে।

পোড়ামাটির ফলক, মহাস্থান

পশ্চিমবাংলার পাল্পু রাজার ঢিবি ও প্রাক মৌর্যযুগের প্রত্নস্থল হরিনারায়ণপুরে কিছু প্রত্ননিদর্শন পাওয়া গেলেও পোড়ামাটির ভাস্কর্যের যথার্থ ইতিহাস মৌর্যযুগ থেকেই শুরু। মনে করা হয়, মৌর্য-পূর্ববর্তী যুগে মাতৃকা মূর্তিরই প্রাধান্য ছিল। মৌর্যযুগের ভাস্কর্যের উপস্থাপনা ও নান্দনিক মান দেখে সহজেই অনুমান করা যায় যে, এর একটি ধারাবাহিক ঐতিহ্য ছিল। তমলুক এবং চন্দ্রকেতুগড়ে প্রাপ্ত খ্রিস্টপূর্ব তিন শতকের ভাস্কর্যের মুখভঙ্গি, কেশবিন্যাস, মস্তকাভরণ, পোশাক ও অলঙ্কার ছিল মার্জিত রুচি এবং সৌন্দর্যবোধের পরিচায়ক। সমসাময়িক পাথরের ভাস্কর্যের সঙ্গে শৈলীর দিক থেকে এর যথেষ্ট সম্পর্ক রয়েছে। উল্লেখ্য, এ সময়কার ভাস্কর্যগুলির মুখাবয়ব ছাঁচে তৈরি করে হাতে গড়া দেহের সঙ্গে যুক্ত করা হতো।

শুঙ্গ ও কুষাণ যুগে, খ্রিস্টপূর্ব দুই শতক থেকে তিন শতক পর্যন্ত, সমগ্র গঙ্গা-যমুনা উপত্যকা ও মধ্যভারত জুড়ে পোড়ামাটির এক ধরনের শিল্পশৈলী প্রচলিত ছিল। বাংলাদেশের মহা’র্ান এবং পশ্চিমবঙ্গের তমলুক, চক্টদন্ডএকতুগড়, পোখরনা প্রভৃতি স্থানে এ ধারার সম্পূর্ণ ছাঁচে তৈরি ফলকচিত্র পাওয়া গিয়েছে। এগুলির অধিকাংশই ছিল যৌবন সমৃদ্ধ নরনারীর মূর্তি। মূর্তিগুলির সর্বাঙ্গে বিচিত্র আকৃতির ও নকশার অলঙ্কার এবং নানা ভঙ্গির কেশবিন্যাস রয়েছে। সুতা দিয়ে দেয়ালে ঝোলানো শুঙ্গ যুগের ফলকচিত্রও পাওয়া গিয়েছে। এগুলি দেয়ালের একঘেয়ে সরলতা দূর করার লক্ষ্যে স্থাপত্য অলঙ্করণের প্রাথমিক প্রয়াস বলা যেতে পারে। কুষাণ যুগে এই ভাস্কর্যগুলি ছিল অনেক বেশি সাবলীল, পরিশীলিত এবং জাগতিক। এগুলি উঁচু রিলিফ ও মসৃণ এবং কৃৎকৌশলের দিক থেকে উন্নত ছিল। সামনে পেছনে দুটি ছাঁচ ব্যবহার করে দেহাবয়বকে ত্রিমাত্রিক করা হয়েছে; বাণগড় এ প্রাপ্ত এই ধারার নিদর্শনগুলি উল্লেখযোগ্য। মহাস্থানগড়ে খননের ফলে শুঙ্গযুগের কিছুসংখ্যক ফলকচিত্র আবিষ্কৃত হয়েছে।

গুপ্তযুগে উত্তর ভারতের ভাস্কর্যকলার নান্দনিকতার সঙ্গে চিন্তার এবং বাহ্যিক আকারের সঙ্গে ভিতরের সৌন্দর্যের যে মিশ্রণ ঘটেছিল, তা বাংলায় পোড়ামাটির ভাস্কর্যে লক্ষ্য করা যায়। এ যুগে বাংলায় প্রাপ্ত পাথরের ভাস্কর্যের চেয়ে পোড়ামাটির ভাস্কর্যই অধিক মানসম্পন্ন। এগুলিতে পূর্ববর্তী যুগের ভাস্কর্যের অলঙ্কার এবং বেশভূষার আতিশয্য দূর হয়। মহাস্থানগড়ে প্রাপ্ত বোধিসত্ত্বের অর্ধনিমিলিত চোখ এবং পেলব ধ্যানী মুখাবয়ব এর একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। একই স্থানে প্রাপ্ত দক্ষ শিল্পির হাতে গড়া মুকুটপরিহিত মসৃণ মুখ এবং যুগলমূর্তিসম্বলিত চিত্রফলকগুলিতে গুপ্তযুগের ভাস্কর্যের ধ্রুপদী রূপ লক্ষ্য করা যায়। খ্রিস্টীয় পাঁচ শতকে উত্তর ভারতের ভিটারগাঁও-এ ইটের|

তৈরি মন্দিরের অলঙ্করণে প্রথম যে পোড়ামাটির তৈরি দেবদেবী ও পৌরাণিক কাহিনী এবং অলঙ্কৃত ফলক ব্যবহূত হয়েছে, তারই ব্যাপক প্রয়োগ মহাস্থান,  ভাসুবিহারপাহাড়পুর ও  ময়নামতীতে দেখা যায়।

বাংলায় পাথরের অভাবে এবং পরিবহণ-অসুবিধার কারণে স্থাপত্যে ইটের ব্যবহারই জনপ্রিয় হয় এবং সেইসঙ্গে পোড়ামাটির ফলক দিয়ে বহিরঙ্গ অলঙ্করণের ঐতিহ্য গড়ে ওঠে। আট ও নয় শতকে তৈরি পাহাড়পুরের বিশাল সৈামপুর মহাবিহার মন্দিরের ভিতে, দেওয়ালে ও উপরে সুপরিসর প্রদক্ষিণ পথের ধারে এখনও প্রায় দুই হাজার পোড়ামাটির ফলক আছে এবং প্রায় আট শত-এর বেশি ইতস্তত বিক্ষিপ্ত অবস্থায় সংগৃহীত হয়েছে। মন্দিরগাত্রের পোড়ামাটির ফলকচিত্রগুলিতে নিত্যনৈমিত্তিক জীবন ও অভিজ্ঞতাকে উৎকীর্ণ করা হয়েছে। প্রকৃতি, মানুষ, জীবজন্তু, উপজাতি, কিন্নর-কিন্নরী, গন্ধর্ব, কঙ্কালসার পথিক সন্ন্যাসী প্রভৃতি এগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য। ময়নামতী শালবন বিহার এর ক্রুশাকার প্রধান মন্দিরটির ভিত্তিভূমি পাহাড়পুর মন্দিরের মতো একসারি পোড়ামাটির ফলকচিত্র দিয়ে সুশোভিত ছিল। এগুলি সেযুগের বাংলার লোকায়ত শিল্পের এক অপূর্ব নিদর্শন। ভাসুবিহারে প্রাপ্ত পরবর্তী যুগের ৩৪টি ফলকচিত্র পাহাড়পুর-ময়নামতীর চেয়ে নান্দনিক গুণাগুণ এবং দক্ষতায় অনেক বেশি পরিশীলিত এবং উন্নত শৈলীর পরিচায়ক। এসবের মধ্যে অর্ধেক মানুষ, অর্ধেক মাছ বা ফুল, হাঁসের মুখে মুক্তার মালা এবং হাতি ও তীরন্দাজ উল্লেখযোগ্য।

১৩০০ থেকে ১৫০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইসলামি স্থাপত্যশৈলী ও কৃৎকৌশল এ অঞ্চলের জলবায়ু, ঐতিহ্য এবং অভিজ্ঞতার সঙ্গে সংমিশ্রিত হয়ে বাংলার নিজস্ব স্থাপত্যরীতির জন্ম দেয়। স্থানীয় শিল্পিদের হাতে ইসলামিক ক্যালিগ্রাফি, জ্যামিতিক নকশার সঙ্গে এতদঞ্চলের হিন্দুসংস্কৃতির পদ্মফুল, শিকল সমেত ঘণ্টা, প্যাঁচানো ফুল, লতা-পাতা মিশে এক অনবদ্য স্থাপত্য অলঙ্করণের ঐতিহ্য গড়ে ওঠে। জাফর খান গাজীর মসজিদ, ছোট পান্ডুয়া মসজিদ, আদিনা মসজিদ, কৈলাখী সমাধি, তাঁতিপাড়া মসজিদ, বাঘা মসজিদ, আতিয়া মসজিদ প্রভৃতি এই ধারার অন্যতম নিদর্শন।

খ্রিস্টীয় পনেরো শতকে বাংলায় শণ্ঠী Šচতনঞ্ঝএর প্রভাবে বৈষ্ণবধর্মের জনপ্রিয়তার মধ্য দিয়ে হিন্দুসংস্কৃতির পুনর্জাগরণ ঘটে। হিন্দুসমাজের জাতিভেদ প্রথা ভেঙে কৃষ্ণভক্তি ও প্রেম এবং সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে আধ্যাত্ম চর্চায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। এ নবজাগরণের মধ্যে দিয়েই খ্রিস্টীয় ষোলো শতকের শেষ ভাগ থেকে উনিশ শতকের মধ্যে বেশির ভাগ পোড়ামাটির মন্দির নির্মিত হয়। স্থাপত্য অলঙ্করণের (ম্যুরাল) ইতিহাসে পোড়ামাটির ফলকচিত্রের এমন ব্যাপক এবং বিচিত্র ব্যবহার শিল্পকলার ইতিহাসে দেখা যায় না। খ্রিস্টীয় সতেরো শতকের বিষ্ণুপুরের মন্দিরগুলি এবং আঠারো শতকের কান্তজীর মন্দির এর শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। এছাড়াও পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া, হুগলি, মেদিনীপুর, নদীয়া, বীরভূম ও মুর্শিদাবাদের বরানগরের পাশাপাশি বাংলাদেশের পাবনা, যশোর, ফরিদপুর, রাজশাহী, বরিশাল প্রভৃতি অঞ্চলের বহু মন্দিরগাত্রে উল্লেখযোগ্য পোড়ামাটির ম্যুরালের নিদর্শন পাওয়া যায়।

বাংলার মন্দিরের স্থাপত্যশৈলী শিল্পিকে দিয়েছে বিশাল দেয়াল, খিলান, মোটা মোটা স্তম্ভ, বেদিমূল, কার্নিস যার অবয়বে উৎকীর্ণ অজস্র পৌরাণিক কাহিনী রামায়ণ, মহাভারত, কৃষ্ণলীলা এবং সমসাময়িক সমাজজীবন, নর-নারী, পশু-পাখি, জীব-জন্তু, শিকার-চিত্র, লতাপাতার নকশা ইত্যাদি একান্ত বাঙালি আঙ্গিকে রূপায়িত হয়েছে। এ ছাড়াও ইউরোপীয়দের জীবনযাত্রার পাশাপাশি জমিদার শ্রেণীর ভোগবিলাসের চিত্র দেখা যায়।

মহাস্থান-ভাসুবিহার, পাহাড়পুর, ময়নামতীর সঙ্গে সতেরো, আঠারো এবং উনিশ শতকের মন্দিরফলকের তুলনা করলে দেখা যায়, পূর্ববর্তীগুলি আকারে বড় ও রিলিফ বেশি এবং মডেলিং পদ্ধতিতে করা। পরবর্তী যুগে মাটির ব্লক তৈরি করে প্রয়োজনমতো কিছুটা শুকিয়ে বাঁশ বা লোহার নরুন দিয়ে কেটে কেটে তৈরি করা হয়েছে। অবশ্য নকশার প্রয়োজনে করা ফলকগুলি ছাঁচে তৈরি। মাধ্যমগত কারণে ফলক-আকারের সীমাবদ্ধতায় এর নান্দনিক ব্যবহার মন্দিরকে একই সঙ্গে করেছে জ্যামিতিক নকশাধর্মী এবং অলঙ্কারধর্মী। এ সকল মন্দির জমিদার এবং ধনিক শ্রেণির পৃষ্ঠপোষকতায় গ্রামবাংলার বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছিল। ব্রিটিশদের আগমনের পর ইউরোপীয় স্থাপত্যকৌশল (সিমেন্ট বালির ব্যবহার) এবং কলকাতাকেন্দ্রিক সংস্কৃতি এ ঐতিহ্যের সমাপ্তি ঘটায়।

ভারতীয় পরম্পরাগত শিল্পচর্চার ছন্দপতনের পর ব্রিটিশ শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় আর্ট কলেজ এবং নগর সভ্যতাকে কেন্দ্র করে আধুনিক শিল্পচর্চা শুরু হয়। ১৯৪৮ সালে ঢাকা আর্ট কলেজের জন্ম হলেও ভাস্কর্য আলাদা বিভাগ হিসেবে যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশের জন্মের পরে। ঐতিহ্যের সন্ধানে পোড়ামাটি শিল্পকর্মের নতুন যাত্রা এবং আধুনিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু হয় স্বাধীন বাংলাদেশে।

আবহমান বাংলা ও মুক্তিযুদ্ধকে উপজীব্য করে ম্যুরাল নির্মাণের একটা প্রবণতা দেখা যায় স্বাধীনতা উত্তরকালে। এর সঙ্গে কিছু অন্যান্য বিষয়ও সম্পৃক্ত হয়েছে। উল্লেখযোগ্য স্থানগুলি হলো বাংলাদেশ টেলিভিশন ভবন, সেনাসদর ভবন, ইত্তেফাক ভবন, আরব বাংলাদেশ ব্যাংক, বিসিআইসি ভবন, গ্রামীণ ব্যাংক, সফুরা টাওয়ার, মিলিটারি অ্যাকাডেমি, বাংলা কৈাএডমী, ইয়াং-ওয়াং কর্পোরেশন (ইপিজেড ঢাকা ও চট্টগ্রাম), সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের স্বাধীনতা কমপ্লেক্স, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর (ঢাকা), মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতিসৌধ (রংপুর), মার্কিন দুতাবাস ও ব্রিটিশ দুতাবাস। তবে এর সবগুলিই পোড়ামাটির অলঙ্করণ নয়। সিরামিক ও মোজাইকেও ম্যুরাল সৃষ্টি করা হয়েছে।  [অলক রায়]