একলাখী সমাধিসৌধ


একলাখী সমাধিসৌধ  বাংলায় অদ্যাবধি বিদ্যমান এ ধরনের স্থাপত্য কীর্তিগুলির আদি নিদর্শন। এটি লোক পরম্পরায় রাজা গণেশের ছেলে জালালউদ্দীন মুহম্মদ শাহ এর সমাধিসৌধ রূপে পরিচিত। সৌধটি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জেলার হযরত পান্ডুয়ায় অবস্থিত। এ সমাধিসৌধ নির্মাণের অনুপ্রেরণা এসেছে বিহার শরীফে অবস্থিত ইবরাহিম বাইয়ুর সমাধির (১৩৫৩ খ্রি.) মাধ্যমে এবং দিল্লির কুওয়াতুল ইসলাম মসজিদের পেছনে অবস্থিত সুলতান ইলতুৎমিশের সমাধি (১২৩৬ খ্রি.) থেকে। ইসলামের প্রাথমিক যুগে সমাধিসৌধ নির্মাণ তেমন জনপ্রিয় ছিল না। তুর্কিদের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে এর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়। এ জাতীয় বর্গাকার ইমারতের সর্বপ্রথম নিদর্শন বোখারায় সামানী বংশীয় ইসমাইলের সমাধি। সম্ভবত এর মূল নমুনা ছিল ‘চাহারতক’ নামে পরিচিত ইরানের চার গম্বুজবিশিষ্ট সাসানীয় অগ্নি মন্দির। জনশ্রুতি আছে যে, এর নির্মাণকার্যে এক লাখ টংকা ব্যয় হয়েছিল; তাই এর নামকরণ হয়েছে একলাখী। এর নির্মাণকাল অজ্ঞাত; তবে সাধারণত জালালউদ্দীনের মৃত্যুর বছরকেই (১৪৩৩ খ্রি) এর নির্মাণের কাল বলে ধরে নেওয়া হয়।

একলাখী সমাধিসৌধ

সুবৃহৎ আদিনা মসজিদ এর দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে অবস্থিত এ ইমারতটি ইটের তৈরি এবং সুফি  নূর কুতুব আলম এর সম্মানার্থে তৈরি কুতুবশাহী মসজিদ এর কিছুদূর উত্তর-পূর্বে এর অবস্থান। এর আকার ২৪ মি × ২২.৭ মি; চূড়াবিশিষ্ট গোলার্ধ আকৃতির গম্বুজের অভ্যন্তরীণ ব্যাস ১৪.৮ মিটার। গম্বুজটি চার কোণের স্কুইঞ্চের উপর স্থাপিত। ইমারতটির চার কোণে চারটি অষ্টভুজ বুরুজ দ্বারা বহির্ভাগকে মজবুত করা হয়েছে। প্রতি দিকের দেয়ালের মাঝখানে একটি করে মোট চারটি প্রবেশদ্বার রয়েছে। প্রবেশদ্বারের চৌকাঠের বাজুর উপরিভাগে রয়েছে সরদলসহ সূচ্যগ্র খিলান। এটি হিন্দু মন্দিরের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য যা তুগলক স্থাপত্যের মাধ্যমে প্রচলিত হয়েছে। দরজার বাজু ও সরদলগুলিতে রয়েছে খোদাই করা দেবমূর্তি। দক্ষিণের প্রবেশপথের সরদলে রয়েছে বিষ্ণু মূর্তি এবং দরজার বাজুগুলিতে দ্বারপালের মূর্তি।

এর থেকেই প্রমাণিত হয় যে, এগুলি হিন্দু মন্দির ইমারত থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। ইমারতটির অভ্যন্তরে তিনটি প্রস্তর শবাধারের ধ্বংসাবশেষ রয়েছে। পশ্চিম দিকেরটি সুলতানের, মধ্যবর্তীটি তাঁর স্ত্রীর এবং পূর্ব দিকেরটি তাঁর পুত্র সুলতান আহমদ শাহের কবর বলে মনে করা হয়। ভেতরের প্রশস্ত প্রকোষ্ঠের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো কোণগুলিতে নির্মিত চারটি কুঠুরি। এগুলি কুরআন তেলাওয়াতকারীদের জন্য সংরক্ষিত কক্ষ বলে মনে করা হয়।

ইমারতটির অলংকরণের মধ্যে রয়েছে কোণের বুরুজগুলিতে দড়ির ছাঁচ নক্শা বলয়, বাইরের সবদিকে বিভাজনকারী ছাঁচ নকশা, প্যানেলের নিচে  পোড়ামাটির ফলকের পাশে কার্নিশে বর্তমানে ভগ্ন তিন স্তর বিশিষ্ট ছাঁচ নক্শা, যা আদিনা মসজিদ হতে অনুকরণ করা হয়েছে। গম্বুজের অভ্যন্তরভাগ এক সময় পলস্তারা দ্বারা অলংকৃত ছিল এবং এগুলির সবই এখন বিধ্বস্ত। গম্বুজটি সুলতানি আমলের বাংলার অন্যান্য গম্বুজের মতোই শীর্ষদন্ডহীন; তবে বৌদ্ধ রীতিতে হরমিকা আকারে গোলাকার বেষ্টনী দ্বারা আচ্ছাদিত ছিল বলে মনে হয় যা স্পষ্টত একটি বৌদ্ধ বৈশিষ্ট্য। গোলার্ধ আকৃতির গম্বুজটি বস্ত্তত সাঁচী (খ্রি.পূ. প্রথম শতক) ও পাঞ্জাবের মানিক্যলা (খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতক) মহা সূতপের গম্বুজগুলির আকৃতির সঙ্গে এতোটাই সাদৃশ্যপূর্ণ যে, এসব গম্বুজের ধারণা যে ঐসব  স্তূপ থেকে গৃহীত তা সহজেই অনুমান করা যায়।

বাংলার স্থাপত্যশিল্পে এ ভবনটির প্রধান অবদান হচ্ছে বাংলার কুঁড়েঘরের ঢালু চালার অনুকরণে মধ্যভাগ হতে কার্নিশকে নিচের দিকে বাঁকিয়ে বঙ্গীয়করণ করা। একবার চালু হওয়ার পর এ রীতি বাংলায় সুলতানি আমলের স্থাপত্যশিল্পের শুধু এক গম্বুজবিশিষ্ট ইমারতেই নয়, বহু-গম্বুজবিশিষ্ট বৃহৎ আকারের মসজিদগুলিতেও ব্যবহূত হয়েছে। শুধু সুলতানি আমলের ভবন নির্মাণে নয়, মুগল স্থাপত্যশিল্পেও এটি বাংলার এক-গম্বুজবিশিষ্ট ভবনের নজির প্রতিষ্ঠা করেছে। স্থাপত্যশিল্পের বঙ্গীয় রীতি গঠনে এর গুরুত্বপূর্ণ অবদান পনেরো শতকের শেষার্ধে এবং ষোল শতকের প্রথম দিকে সবচেয়ে বেশি দৃষ্টিগোচর হয়। [এ.বি.এম. হোসাইন]