বঙ্গীয় শিল্পকলা


বঙ্গীয় শিল্পকলা (উপনিবেশিক আমল, ১৭৫৭-১৯৪৭)  ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসনের প্রায় দুশো বছরে বাংলার শিল্পকলা বিচিত্র ধারায় বিকাশ লাভ করে। এই বিকাশে ইংরেজ শাসকশ্রেণির মনোভাব ও রুচির ব্যাপক প্রভাব প্রতিফলিত হয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও শিল্পের বিভিন্ন ধারা ও শৈলীকে চিহ্নিত করা যায়। সেগুলি নিম্নরূপ:

বিদেশী শিল্পি  ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠার পর রাতারাতি ধনী হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় ইংল্যান্ড ও ইউরোপের অন্যান্য দেশ থেকে বহু শিল্পি ভারতে আসে। কমপক্ষে এমন ৬০ জন শিল্পির সুনির্দিষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায়। তাঁরা প্রধানত তিনটি প্রয়োগরীতিতে কাজ করতেন। সেগুলি হলো: (১) ক্যানভাসে তেলরং; (২) গজদন্তের উপর ক্ষুদ্র চিত্রকলা (miniature paintings); (৩) কাগজে জলরং ও তা থেকে এনগ্রে©র্ভং (engraving) পদ্ধতিতে মুদ্রণ। তেলরং-এর চিত্রশিল্পিদের বিশিষ্ট শিল্পীরা হলেন টিলি কেট্ল, জন জোফ্যানি, আর্থার ডেভিস, টমাস হিকি, ফ্রান্সিসকো রোনালদি, রবার্ট হোম, উইলিয়ম বিচি, মার্শাল ক্ল্যাকসান ও ভেরেশ্যাগিন। ওজিস হামফ্রে, জর্জ চিনারি ও স্যার চার্লস ডয়লী ছিলেন গজদন্তের উপর ক্ষুদ্র চিত্রকলাকার বিশিষ্ট শিল্পি। উল্লেখযোগ্য এনগ্রেভার ও মুদ্রক ছিলেন উইলিয়ম হোজেস, ব্যাল্ট সলভিন্স, জেমস মোফাট, কলসওয়ার্দি গ্র্যান্ট, উইলিয়ম সিম্পসন এবং চাচা ও ভ্রাতুষ্পুত্র টমাস ও উইলিয়ম ড্যানিয়েল। এছাড়া আরও বেশ কয়েকজন চিত্রশিল্পি ছিলেন। তাঁরা অবসর কাটানোর জন্য, সখ ও কৌতূহলবশত ছবি অাঁকতেন। তাঁদের মধ্যে বিশিষ্ট শিল্পিরা হলেন জেমস বি ফ্রেজার, উইলিয়ম প্রিন্সেপ, এমিলি ইডেন, ম্যাডাম বেলসন, জি.এফ অ্যাটকিনসন প্রমুখ। জন জোফ্যানিসহ আরও কয়েকজন শিল্পি ছাড়া বেশিরভাগ শিল্পিই ছিলেন মধ্যম মেধা ও খ্যাতির অধিকারী। যদিও তাঁদের চিত্রকলার নন্দনতাত্ত্বিক তাৎপর্য খুব বেশি নয়, তবুও তাঁরা আঠারো ও উনিশ শতকে বাংলার জীবন ও প্রকৃতিকে চিত্রকলায় ধরে রাখার ব্যাপারে বড় রকমের অবদান রেখেছেন। তাঁদের ঐ কাজগুলি অত্যন্ত সজীব, প্রাণবন্ত ও স্বাভাবিক। ফলে এর মাঝে চিত্রগুলির এক সুগভীর ঐতিহাসিক তাৎপর্য রয়েছে।

কোম্পানি শিল্পকলা, ঢাকা, উনিশ শতক

কোম্পানি শিল্পকলা  আঠারো শতকের গোড়ার দিকে মুগল সাম্রাজ্যের অবসানের পর মুগল রাজদরবারের শিল্পিরা অযোধ্যা, পাটনা ও মুর্শিদাবাদের মতো প্রাদেশিক রাজ্যগুলিতে আশ্রয় নিতে শুরু করেন। এসব রাজ্যের শাসনকর্তাদের আশ্রয়ে ও পৃষ্ঠপোষকতায় তাঁরা তাঁদের সনাতন ঐতিহ্য অনুযায়ী চিত্রকর্মে নিয়োজিত থাকেন। তাঁদের এই চিত্রকর্মের ফসলগুলিকে সাধারণত ‘প্রাদেশিক মুগল শিল্পকর্ম’ বলা হয়ে থাকে। মুর্শিদাবাদের পতন ও উপনিবেশিক শাসকদের শাসনকেন্দ্র হিসেবে কলকাতার অভ্যুদয়ের পর মুর্শিদাবাদ, এমনকি অযোধ্যা ও পাটনা থেকে শিল্পিরা জীবিকার সন্ধানে কলকাতায় এসে সমবেত হন। গোড়ার দিকে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ তাঁদের প্রশাসনিক প্রয়োজনে স্থাপত্য, উদ্ভিদতত্ত্ব ও প্রাণিতত্ত্ব সম্পর্কিত চিত্র, নকশা ও ডিজাইনের জন্য ইংরেজ শিল্পিদের নিয়োগ করতেন। কিন্তু ইংরেজ শিল্পিদের অত্যধিক বেতন দিতে হতো। তাই ব্যয়বাহুল্য কমানোর জন্য ক্রমান্বয়ে স্থানীয় শিল্পিদের প্রশিক্ষণ দিয়ে তাঁদেরই নিয়োগ করা হয়। প্রদেশের শিল্পিরা অচিরেই এ নতুন কৌশল ও পদ্ধতি আয়ত্ত করার পর তার সাথে তাঁদের ঐতিহ্যিক জ্ঞান আত্মস্থ করে এক নতুন মেজাজের শিল্পকলা ও শিল্পরীতি গড়ে তোলেন, যাকে ‘কোম্পানি শিল্পকলা’ বলে আখ্যায়িত করা হয়। এক্ষেত্রে পীরবক্স, শেখ জয়নুদ্দীন ও আরও হাতেগোনা কয়েকজন অত্যন্ত চমৎকার পারদর্শিতার পরিচয় দেন। চিত্রকলার এই শৈলীর সর্বসেরা শিল্পি ছিলেন শেখ মুহম্মদ আমীর। তিনি ১৮৪০ থেকে ৫০ এই দশকটিতে সক্রিয় ছিলেন। তাঁর অাঁকা জীবজন্তুর চিত্রকলা যেকোন সর্বোত্তম ইউরোপীয় নমুনার সমতুল্য।

কালীঘাট চিত্রকলা  কলকাতার কালীঘাট মন্দিরের আশপাশ এলাকায় আঠারো শতকের শেষভাগ ও গোটা উনিশ শতকে চিত্রকলার ক্ষেত্রে আরেকটি স্থানীয় ধারা প্রচলিত ছিল। এই শিল্পরীতিটি এখন কালীঘাট চিত্রকলা বা  কালীঘাট পটচিত্র নামে পরিচিতি লাভ করেছে। উপনিবেশিক শাসনের ফলে গ্রামবাংলার জনজীবনের ভারসাম্য বিনষ্ট হয়। গাঁয়ের পটুয়ারা তাদের জীবিকার উপায় হারাতে থাকে। এর ফলে কলকাতার কাছাকাছি অঞ্চলগুলি থেকে প্রধানত ২৪ পরগণা, হাওড়া ও মেদিনীপুর জেলার অঞ্চলগুলি থেকে পটুয়ারা কালীঘাট মন্দিরের আশেপাশে এসে ভীড় জমাতে থাকে এবং সস্তা কাগজে ও স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত জলরং-এ দেবদেবীর ছবি এঁকে সেগুলি ভক্ত ও তীর্থযাত্রীদের কাছে বিক্রি করতে থাকে। সস্তা দামের এই পটচিত্রগুলি দারুণ জনপ্রিয়তা লাভ করে। গোড়ার দিকে পটুয়ারা সনাতন ধর্মীয় বিষয়বস্ত্ত অবলম্বনেই ছবি অাঁকত। তবে শহর-নগর জীবনের সংস্পর্শে আসার পর তারা সমসাময়িক ও লোকায়ত বিষয়বস্ত্ত অবলম্বনেও পটের ছবি অাঁকা শুরু করে। এভাবে ইংরেজ সাহেবদের জীবনের নানা বিষয় এবং কলকাতার বাবুদের জীবনকে নিয়ে তাঁদের অাঁকা পটচিত্রগুলি আরও বেশি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। পটুয়ারা তাঁদের চিত্রকর্মে অসাধারণ রসবোধের পরিচয় দিয়ে নগরজীবনের নানা অসঙ্গতি তুলে ধরে। সুনির্দিষ্টভাবেই বলা যায়, লোকপর্যায়ে পুতুল নাচ ও ক্ষুদ্রাকার নানা মূর্তি (statuettes) থেকেই কালীঘাট পটচিত্র এর অনুপ্রেরণা এসেছিল। পটুয়াদের সাবলীল তরঙ্গায়িত ধারায় বেরিয়ে আসা তুলির অাঁচড়ের সৌন্দর্য, বিশেষ করে একটা সুসঙ্গতি ও মাধুর্য আনার কৌশল, বিস্ময়কর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা, সারল্য ও মাত্রাজ্ঞান কালীঘাট পটচিত্রের জন্য বড় রকমের সুখ্যাতি নিয়ে আসে।

পাশ্চাত্য ধারার চিত্রকলার শৈলী  ১৮৩৯ সালে কলকাতায় ‘মেকানিক্যাল ইনস্টিটিউট’ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ভারতে চারু ও কারুকলা শিক্ষার যাত্রা শুরু হয়, যদিও যথার্থ অর্থে এ শিক্ষার শুরু হয়েছে ১৮৬৪ সালে ‘ক্যালকাটা স্কুল অব ইন্ডাস্ট্রিয়াল আর্টের’ প্রতিষ্ঠার সাথে সাথে। এই প্রতিষ্ঠানটি পরবর্তীকালে ‘গভর্নমেন্ট স্কুল অব আর্ট’-এ পরিণত হয়। ইউরোপীয় শিল্পকলার প্রয়োগপদ্ধতি ও কৌশলে দক্ষ এক বড় আকারের ভারতীয় শিল্পিগোষ্ঠী ভারতে নব প্রজন্মের শিল্পিদের জন্য পথিকৃতের ভূমিকা পালন করে। এক্ষেত্রে গোড়ার দিকে যুগের সর্বাপেক্ষা বিশিষ্ট শিল্পীদের দুজন হলেন অন্নদাপ্রসাদ বাগচীশ্যামাচরণ শ্রীমানী। উনিশ শতকের আরেকজন চিত্রকর হলেন বামাচরণ ব্যানার্জী। তিনি তেলরং মাধ্যম ব্যবহার করে ভারতীয় অতিকথার উপাখ্যানে বর্ণিত দৃশ্যগুলি অঙ্কন করেন এবং সেগুলি জার্মানি থেকে মুদ্রণের ব্যবস্থা করেন। এর কিছুকাল পরে শিল্পি হিসেবে অধিকতর খ্যাত কেরালার রবি বর্মা, রোহিণীকান্ত নাগ ও শশীকুমার হেশ ছিলেন প্রথম তিন ভারতীয়, যাঁরা শিল্পকলায় উচ্চতর শিক্ষার জন্য ইতালি যান। ইংল্যান্ড ও জার্মানিতে হেশ একজন বিশিষ্ট চিত্রশিল্পি হিসেবে খ্যাতি ও প্রতিষ্ঠা অর্জন করেন। ওই শতকের শেষ নাগাদ শিল্পকলার ক্ষেত্রে পুনর্জাগরণবাদী শৈলীর অভ্যুদয় ও তার ব্যাপক জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও পাশ্চাত্যের প্রকৃতিবাদী ( naturalist) শিল্পশৈলী চিত্রকলার ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান ধারা হিসেবে অস্তিত্ব রক্ষায় সমর্থ হয়। বহু বিখ্যাত শিল্পি বিশ শতকের প্রথমার্ধে অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে তাঁদের শিল্পসাধনায় নিয়োজিত থাকেন। তাঁদের মধ্যে বিশিষ্ট শিল্পিরা হলেন যামিনীপ্রসাদ গাঙ্গুলী, প্রহ্লাদ কর্মকার ও দেবীপ্রসাদ রায়চৌধুরী

অবনীন্দ্রনাথ ও বাংলার শিল্পকলারীতি ভারত-শিল্পের অনুরাগী ও প্রচারক  ই.বি হ্যাভেল ১৮৯৬ সালে ক্যালকাটা আর্ট স্কুল-এর অধ্যক্ষ পদে নিযুক্ত হন। ১৯০৫ সালে হ্যাভেল তাঁর স্কুলের উপাধ্যক্ষ পদে যোগ দেওয়ার জন্য অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে সম্মত করান। এরপর তাঁরা দুজনে মিলে তাঁদের ঐ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিল্পকলার ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় প্রয়োগরীতির প্রবর্তন করেন। নন্দলাল বসু, সুরেন্দ্রনাথ কর, অসিতকুমার হালদার, কে ভেঙ্কটাপ্পা, সমরেন্দ্রনাথ গুপ্ত, ক্ষিতীন্দ্রনাথ মজুমদার, শৈলেন্দ্রনাথ দে প্রমুখ অবনীন্দ্রনাথের শিষ্য হিসেবে তাঁর সাথে যোগ দেন এবং এক নতুন শৈলীর পুনর্জাগরণবাদী চিত্রকলারীতি প্রবর্তনে তাঁকে সহায়তা করেন। ঐ সময়ে চলছিল জাতীয়তাবাদী চেতনার জোয়ার। ফলে তাঁদের প্রবর্তিত এই শিল্পরীতি বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং গোটা ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়ে। বাস্তবিকপক্ষে বাংলার এই চিত্রকলা-রীতিই ছিল আধুনিক ভারতের প্রথম স্বীকৃত শিল্পশৈলী।

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, 'ভারত মাতা', জলরং, ১৯০৫

হ্যাভেল ও অবনীন্দ্রনাথ ভারতীয় শিল্পকলার সনাতন শিল্পশৈলীর পুনরুজ্জীবনের ব্যাপারে সবিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন। বস্ত্তত অবনীন্দ্রনাথ যে পুনর্জাগরণবাদী শিল্পকলার প্রবর্তন করেছিলেন তা প্রকৃতপক্ষে ছিল অজন্তা, মুগল, ইউরোপীয় প্রকৃতিবাদী ও জাপানি ওয়াশ প্রয়োগ-কৌশলের সমন্বয় বিশেষ। এই নতুন শিল্পকর্ম কার্যত সবটাই করা হতো জলরং-এ। আর এতে ভারতের ধর্মীয় ইতিকথামূলক, ঐতিহাসিক ও সাহিত্যসম্পর্কিত বিষয়বস্ত্ত তুলে ধরা হতো। ভারতের জাতীয়তাবাদীদেরও অনুমোদনও ছিল এতে। অবনীন্দ্রনাথ ধর্মীয় ও অতিকথামূলক বিষয়বস্ত্তর চেয়ে ইতিহাস ও সাহিত্যের বিষয়বস্ত্তর অধিকতর পক্ষপাতী ছিলেন। সূক্ষ্ম, পরিশীলিত রুচিবোধ, মাত্রাজ্ঞান ও পর্যবেক্ষণ শক্তির সাহায্যে তিনি তাঁর চিত্রকলায় একটা মোহনীয়তা ও সৌন্দর্যের উৎকর্ষ আরোপ করতে পারতেন। তবে এক বা দুজন ছাড়া তাঁর অনুসারীরা তেমন প্রতিভার অধিকারী ছিলেন না। ফলে তাঁদের হাতে বাংলার শিল্পরীতি একটা বদ্ধ অবস্থায় এসে দাঁড়ায় এবং তা এক ধরনের ভাবালু ও ঘরসাজানো শিল্পকলায় পর্যবসিত হয়।

সৃষ্টিধর্মী ব্যক্তিশিল্পি  বিশ শতকের গোড়ার দশকগুলিতে যদিও শিল্পকলার ক্ষেত্রে বেঙ্গল স্কুল জনপ্রিয় শিল্পপ্রবণতার হিসেবে অস্তিত্বশীল ছিল এবং প্রকৃতিবাদী শিল্পরীতি ব্যাপক পরিসরে গ্রহণযোগ্যও ছিল, তবুও কোন কোন শিল্পি ব্যক্তি-পর্যায়ে তাঁদের সৃষ্টির প্রতিভাকে কাজে লাগিয়ে চলতি ধারা-প্রবণতা কাটিয়ে শিল্পকলার ক্ষেত্রে স্বাতস্ত্র্য ও ব্যক্তিত্ব অর্জনে প্রয়াসী হন। এঁদের মধ্যে অধিকতর পরিচিতগণ ছিলেন: গগণেন্দ্রনাথ ঠাকুর, যামিনী রায় ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। গগণেন্দ্রনাথ ছিলেন অবনীন্দ্রনাথের জ্যেষ্ঠ ভাই। তিনি ছিলেন সত্যিকার অর্থে ভারতের প্রথম ব্যঙ্গচিত্র শিল্পি। তিনি কার্টুনচিত্রের মাধ্যমে রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার নানা বিষয়ে মন্তব্য প্রকাশ করতেন। এছাড়াও চিত্রকলার ক্ষেত্রে তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি প্রথমবারের মতো অঙ্কিত চিত্রকে রেখা, আকৃতি, রং ও আলোর একটা সমাবেশমূলক আয়োজন হিসেবে দেখেছিলেন। তিনি স্থাপত্য ও অভ্যন্তর সজ্জার ওপর চিত্রকর্ম সম্পাদন করেন এবং এ কাজে তিনি কিছুটা জ্যামিতিক কিউবিস্ট (cubist) পদ্ধতিতে আলো ও ছায়ার সংঘাতময় বিন্যাস প্রদর্শন করেন। তিনি অতিকথা ও আধ্যাত্মিক ভাবনাগুলিকে আকৃতি ও রং-এ প্রকাশ করেছেন, যা অনেক ক্ষেত্রে প্রায় অধরা (abstract) শিল্প পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে।

যামিনী প্রকাশ গাঙ্গুলী, 'ইভিনিং', তেলরং, ১৯১০

ওই সময়ে লোকশিল্পকলার সম্ভাবনা ও গুণগত উৎকর্ষ সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষিত না হলেও যামিনী রায়ের আগে কেউই লোকশিল্পকলার উপাদানকে শিল্পকলার প্রধান ধারায় প্রয়োগের কথা ভাবেন নি। এমনি করে ১৯২১ সালে প্রকৃতিবাদী চিত্রাঙ্কনশৈলী বিসর্জন দিয়ে এবং বাংলার লোকশিল্পকলা থেকে অনুপ্রেরণা গ্রহণ করে যামিনী রায় আধুনিক ভারতীয় চিত্রকলায় যে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উদ্ঘাটন করেন, এর আগে আর কেউ তা করেন নি। তিনি ত্রিমাত্রিক (tri-dimensional) সঙ্গতি প্রয়োগ, প্রেক্ষাপট, আলো ও ছায়া, যা পাশ্চাত্য প্রকৃতিবাদী শিল্পকলার উপাদান, সেসব ছেড়ে ঢালাও রঙের দ্বিমাত্রিক ফর্ম্যাট ও লোক-ঐতিহ্যের সাবলীল তরঙ্গায়িত রূপরেখার পদ্ধতি বেছে নেন। লোক-ভাবধারার মধ্য থেকে তিনি এক অধিকতর সূক্ষ্ম, সুপরিশীলিত ও সুসমঞ্জস চিত্রকলার জন্ম দেন, যার মাঝে অভিব্যক্ত হয় এক নতুন ধরনের সরল সৌন্দর্য। যুগপৎ এক ধরনের ভারতীয়ত্বও তাতে বজায় থাকে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯২০-এর দশকে চিত্রাঙ্কনে বিক্ষিপ্তভাবে প্রয়াসী হওয়ার চেষ্টা শুরু করলেও পরের দশকেই দেখা যায় তিনি ভারতের একজন প্রধান চিত্রশিল্পি হিসেবে আবির্ভূত হন। তাঁর চিত্রকলা সম্পর্কে বলা যায়, এগুলি একজন বিশেষ ব্যক্তির কাজ যার কল্পনাশক্তি অসাধারণ রকমের উন্নত। তাঁর চিত্রকলাগুলি, এমনও হতে পারে, পাশ্চাত্যের সমসাময়িক শিল্পরীতি সম্পর্কে তাঁর সুগভীর জ্ঞানের সাথেও সম্পর্কিত। তাঁর চিত্রকর্মগুলি একটা আদিম শক্তি ও সূক্ষ্ম শক্তির প্রবল সম্ভাবনার অনুভূতির জন্ম দেয়।

মুদ্রণ শিল্পকলা  যে বিভিন্ন পদ্ধতিতে ও কৌশলে শিল্পকর্মগুলি ছাপা হয় সেগুলি উপনিবেশিক আমলে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। টমাস ড্যানিয়েল ও তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র উইলিয়ম ড্যানিয়েল ভারতে টুয়েলভ ভিউজ অব ক্যালকাটা (১৭৮৬-৮৮) বর্ধিত আকারে প্রকাশ করেন। প্রথম বাঙালি এনগ্রেভার ছিলেন রামচন্দ্র রায়। ১৮১৬ সালে কলকাতায় মুদ্রিত তাঁর অন্নদামঙ্গল ছিল প্রথম মুদ্রিত বাংলা বই যাতে এনগ্রেভ করা ছবি, নকশা ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়। গোড়ার দিকে ছাপাখানাগুলির মালিকানা ছিল ইংরেজদের। উনিশ শতকের শেষের দিকে বাঙালিরাও তাদের নিজেদের ছাপাখানার মালিক হয় এবং কাঠ ও ধাতব পাতে এনগ্রেভ করা আখ্যানমূলক ছবিসহকারে বই ছাপিয়ে তারা বের করতে শুরু করে। আর এ ধরনের প্রকাশনাগুলি বটতলার বই হিসেবে পরিচিত হয়। কথিত এই বটতলার বইগুলি ছিল এক ধরনের সস্তা পুস্তিকা বিশেষ। এতে ছিল ধর্মীয় ও অতিকথামূলক আখ্যান ও ঘটনার সচিত্র পরিবেশনা, ছিল জনপ্রিয় গল্পকাহিনী ও শিশুতোষ রচনা। জনসাধারণের মাঝে এ ধরনের প্রকাশনার বিপুল প্রভাব ছিল। বই-এর এনগ্রেভিং-এর জন্য প্রথমদিকে শিল্পিদের আবির্ভাব ঘটে ছুতোর মিস্ত্রি ও ধাতুর কারিগরদের মাঝ থেকে। আর তাদের ঐ সময়কার কাজে কালীঘাট পটচিত্র থেকে অনুপ্রেরণা গ্রহণের আভাস পাওয়া যায়।

মুদ্রণের আরও একটি প্রয়োগ কৌশল বা পদ্ধতি জনপ্রিয়তা লাভ করে। এই পদ্ধতির নাম লিথোগ্রাফি। বিভিন্ন শিল্পকলা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রদত্ত শিক্ষার সুবাদে এই মুদ্রণ পদ্ধতি প্রবর্তন সম্ভব হয়। অন্নদাপ্রসাদ বাগচী ও তার সহযোগীরা ১৮৭৬ সালে ‘ক্যালকাটা আর্ট স্টুডিও’ প্রতিষ্ঠা করেন এবং সেখান থেকে তাঁরা ধর্ম ও অতিকথা সম্পর্কিত নানা দৃশ্যের লিথো পদ্ধতিতে মুদ্রিত ছবি বের করে বিক্রি করতে থাকেন। এছাড়া প্রতিকৃতি ও বর্ণমালাও এভাবে ছেপে বের করা হয়। এসবের বেশিরভাগ আবার মধ্যবিত্ত গৃহসজ্জার জনপ্রিয় মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহূত হয়। তবে মুদ্রণ শিল্পকলায় সর্বাপেক্ষা সফল শিল্পি ছিলেন কেরালার রাজা রবি বর্মা। ১৮৯৪ সালে তিনি তাঁর নিজ ছাপাখানা স্থাপন করেন এবং ওলিওগ্রাফি পদ্ধতিতে তাঁর ছাপা ছবিগুলি বাংলাসহ সারা ভারতে অবিশ্বাস্য জনপ্রিয়তা অর্জন করে।

নতুন ধারার প্রবণতা  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ত্রিশের দশকের শেষ ও চল্লিশের দশকের গোড়ার দিকে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার পটভূমিকায় শিল্পি, লেখক ও অন্যান্য ক্ষেত্রের সৃষ্টিশীল মানুষের মাঝে এক নতুন ধরনের সমাজচেতনা গড়ে ওঠে। এই সময়ে শিল্পিরা বরাবরের অতিকথামূলক আখ্যান ও ঐতিহাসিক ঘটনা চিত্রায়নের নিগড় থেকে বেরিয়ে আসতে প্রয়াসী হন এবং তাঁদের শিল্পকর্মে সমসাময়িক জীবনকে তুলে ধরায় ব্রতী হন। এই প্রয়াসে তাঁরা নানা শিল্পিগোষ্ঠী গড়ে তোলেন। সেগুলির মধ্যে ‘ইয়ং আর্টিস্ট ইউনিয়ন’ ও ‘আর্ট রিবেল সেন্টার’ (১৯৩৩) উল্লেখযোগ্য। আর এ ধরনের শিল্পিদের মধ্যে বিশিষ্ট ছিলেন গোবর্ধন আশ, অবনী সেন, অন্নদা দে, ভোলা চ্যাটার্জী, অতুল বসু, গোপাল ঘোষ প্রমুখ। মুকুল দে ও রমেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী এই ধারার পথিকৃৎ চিত্রমুদ্রক ছিলেন। মুরলিধরণ টালি, আদিনাথ মুখার্জী, শফিউদ্দীন আহমদ ও হরেন দাস ছিলেন মুদ্রণ কলাকৌশলের গুরুত্বপূর্ণ প্রবক্তা। ১৯২০-এর দশকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতনে কলাভবন প্রতিষ্ঠা করেন। নন্দলাল বসুর নেতৃত্বে শান্তিনিকেতনে এক নতুন ধরনের শিল্পকলার উন্মেষ ঘটে। এই শিল্পকলা ছিল প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের শিল্পকলার এক মুক্ত সমন্বয়। আর এ ধরনের শিল্পবৈশিষ্ট্য নন্দলালের বিপুল প্রতিভাদীপ্ত ছাত্র বিনোদ বিহারী মুখার্জী ও রাম কিংকর বাইজের শিল্পকলায় বিধৃত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও ১৯৪০-এর দশকের বিশ্বজোড়া অর্থনৈতিক মন্দার পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের জীবন নিদারুণ বিপর্যস্ত হয় ও তারই পরিণতি লক্ষ্য করা যায় ১৯৪২-৪৩ সালের বাংলার মহামন্বন্তরের মাঝে। এই মহাদুর্ভিক্ষে অনেক লোকের মৃত্যু হয়। আর এই মহামানবিক দুর্দশায় বাঙালি শিল্পিদের বিবেক আলোড়িত হয়। বহু খ্যাতিমান শিল্পি এর বাস্তবতা তাঁদের শিল্পকর্মে তুলে ধরতে এগিয়েও আসেন। দুজন তরুণ শিল্পি তাঁদেরে মধ্যে অন্যতম। একজন জয়নুল আবেদীন গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজের একজন শিক্ষক, অন্যজন কমিউনিস্ট পার্টির কর্মী চিত্তপ্রসাদ। ইত্যবসরে দুশ বছরের উপনিবেশিক শাসনে পূর্ব বাংলায় সুকুমার শিল্পকলার ক্ষেত্রে কোন তৎপরতা ছিল না। একই সময়ে কলকাতা শুধু বাংলার নয়, বরং গোটা ভারতের রাজনীতি ও সংস্কৃতির প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে। ঢাকায় এ ধরনের কোন সাংস্কৃতিক তৎপরতা ছিল না। ঢাকা তখন ছিল ছোট এক উপনগরীয় জনপদ। আর কোন উদ্যমী বাঙালি তখন পূর্ব বাংলায় থেকে থাকলেও ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে তাঁরা সবাই তাঁদের নিজ নিজ প্রয়াসের প্রচারের জন্য কলকাতায় পাড়ি জমাতেন। ফলে লোকশিল্প ও সংস্কৃতির ঐতিহ্যে তৎকালীন পূর্ব বাংলা অর্থাৎ আজকের বাংলাদেশ সমৃদ্ধ ও বর্ণময় হলেও উপনিবেশিক আমলে এই অঞ্চলে মূলধারার শিল্পকলার কোন ঐতিহ্য গড়ে ওঠেনি। অনেক ইউরোপীয় শিল্পি ঐ আমলে পূর্ব বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল ভ্রমণ করেন এবং ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের অন্যান্য স্থানের ছবিও অাঁকেন। জর্জ চিনার্স ও স্যার চার্লস ডয়লীর মতো সুপরিচিত চিত্রশিল্পি ঢাকার নানা দৃশ্য নিয়ে ছবি অাঁকলেও তাঁদের প্রায় সকলেই অবসরের বিনোদনকর্ম হিসেবে ছবি অাঁকতেন। আর তাঁদের মেধাও ছিল মাঝারি মানের। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরআলম মুসাবিবর নামে এক শিল্পির ঢাকার ঈদ উৎসব, মুহররমের শোক পালনের জলরং ছবির ৩৯টি নমুনা সংরক্ষিত রয়েছে। এগুলি উনিশ শতকের গোড়ার দিকে অাঁকা। ধারণা করা হয় তিনি প্রাদেশিক মুগল শিল্পরীতির মুর্শিদাবাদ শিল্পি সংঘের কোন সদস্যের অধস্তন পুরুষ। অনুমান করা যায় যে, আঠারো শতকের শেষ নাগাদ কোম্পানি শিল্পশৈলীর একটা দুর্বল ঢেউ ঢাকাতেও পৌঁছেছিল। অবশ্য, অন্যান্য প্রমাণের অভাবে এ অনুমান সুনিশ্চিতভাবে প্রমাণিত নয়। চিত্রশিল্পি হিসেবে প্রতিষ্ঠার আশা নিয়ে যাঁরা পূর্ব বাংলা থেকে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ লাভের জন্য কলকাতায় যেতেন, তাঁরা জীবিকার তাগিদে সেখানেই থেকে যেতেন। কেবল ১৯৪৭-এর দেশভাগের পরেই বাঙালি মুসলমান শিল্পিরা পূর্ব পাকিস্তানে আসেন এবং এ অঞ্চলে পদ্ধতিসম্মত শিল্পকলা আন্দোলন শুরু হয়।  [আবুল মনসুর]

গ্রন্থপঞ্জি M Archer and WG Archer, Indian Paintings for the British 1770-1880, Oxford, 1955; J Appasamy, Abanindranath Tagore and the Arts of His Times, New Delhi, 1968; W G Archer, Kalighat Paintings, London, 1971; Atul Basu, Banglay Chitrakala O Rajnitir Eksha Bachhar, (in Bangla), Kolkata, 1993; P Mitter, Art and Nationalism in Colonial India, 1850-1922, Cambridge, 1994.