বসু, নন্দলাল


বসু, নন্দলাল (১৮৮২-১৯৬৬)  আধুনিক ভারতীয় চিত্রশিল্প প্রবর্তকদের অন্যতম। জন্ম ১৮৮২ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি পূর্ববিহারের হাভেলি-খড়গপুরে। তাঁর পৈতৃক নিবাস হুগলি জেলায়। পিতা পূর্ণচন্দ্র বসু হাভেলি-খড়গপুরে সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। মাতা ক্ষেত্রমণী দেবী।

নন্দলাল বসু

নন্দলাল বসু দ্বারভাঙ্গা ও  কলকাতা স্কুলে শিক্ষা লাভ করেন। এন্ট্রাস পাশ করেন ১৯০২ সালে। বাল্যকাল থেকেই তিনি চিত্রকলা এবং ভাস্কর্য শিল্পের প্রতি আগ্রহী ছিলেন। এ আগ্রহ থেকেই তিনি কলকাতার একটি চারুকলা বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। এ বিদ্যালয়ে তিনি  অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরএর একজন শিষ্য হয়ে ওঠেন। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন ভারতীয় শিল্পকলার সংস্কারবাদী আন্দোলনের নেতা। পরবর্তীকালে এ আন্দোলন বেঙ্গল স্কুল আন্দোলন নামে পরিচিতি লাভ করে এবং জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হন। অচিরেই নন্দলাল বসু অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সবচেয়ে নিবেদিত অনুসারী হিসেবে পরিগণিত হন। এমন কি শিক্ষানবিশ থাকা অবস্থায় নন্দলাল একজন চিত্রশিল্পী হিসেবে সুনাম অর্জন করেন। তাঁর জগাই-মাধাই এবং সতীর  মতো কিছু চিত্রশিল্প সারা ভারতে জনপ্রিয়তা লাভ করে।

চারুকলা বিদ্যালয় থেকে জোড়াসাঁকোতে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অধীনে পাস করার পর তিনি দি ইন্ডিয়ান সোসাইটি অব ওরিয়েন্টাল আর্ট স্কুলে যোগদান করে সেখানে তিন বছর কাজ করেন। ১৯০৮ সালে তিনি তাঁর শিব-সতী চিত্রশিল্পের জন্য ৫০০ টাকা পুরস্কার লাভ করেন। এ টাকায় তিনি ভারতীয় সভ্যতার শৈল্পিক কীর্তিসমূহ স্বচক্ষে দেখার জন্য বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থান পরিদর্শন করেন। এ রকম ভ্রমণ নন্দলালের শৈল্পিক দৃষ্টিভঙ্গির ওপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। এ প্রভাব তাঁর শিল্পসাধনায় গুরুত্বপূর্ণ ও মৌল পরিবর্তন এনে দেয়।

অপরদিকে ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, স্বামী বিবেকানন্দ ও সিস্টার নিবেদিতার আধ্যাত্মিকতা, প্রাচীন ভারতের শৈল্পিক ঐতিহ্য এবং অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিক্ষা নন্দলালকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। তাঁর প্রথম দিকের অনেক ধর্মীয় এবং পৌরাণিক শিল্পকর্ম অজান্তা এবং অন্যান্য ঐতিহ্যগত প্রাচীরচিত্রের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে অঙ্কিত হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে ১৯০৯ সালে তিনি ব্রিটিশ শিল্পী এবং নকল নবিশ লেডি হেরিংহ্যাম দ্বারা পরিচালিত একদল শিল্পীর অজন্তার প্রাচীরচিত্র অনুকৃতিকরণের নেতৃত্ব দেন।

সতী, ১৯৪৩ [শিল্পী: নন্দলাল বসু]

১৯১৪ সালে নন্দলাল শান্তিনিকেতনের কলাভবন পরিদর্শনে যান এবং সেখানে  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে আসেন। ১৯১৬ সালে রবীন্দ্রনাথ জোড়াসাঁকোতে বিচিত্রা প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানে স্বল্প সময়ের জন্য অবস্থান করে নন্দলাল ১৯২০ সাল থেকে শান্তিনিকেতনে বসবাস শুরু করেন এবং ১৯২২ সালে কলাভবনের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। নন্দলাল বসুর শিল্পীজীবনে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতী নামে একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রক্রিয়া শুরু করেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল এ শিক্ষায়তনের মাধ্যমে নিজের ধ্যান-ধারণার প্রতিফলন ঘটানো। রবীন্দ্রনাথ উগ্র জাতীয়তাবাদী ছিলেন না। তিনি প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের মধ্যে একটি উদারনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করতে চেয়েছিলেন। স্থানীয় ঐতিহ্যের সংকীর্ণ পুণরুজ্জীবনের চেয়ে তিনি শিল্পকলায় সত্যের সংমিশ্রণ কামনা করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের এ উৎসাহে উদ্দীপ্ত হয়ে নন্দলাল তাঁর চারদিকের পরিবেশ থেকে সমকালীন ভাবধারা চিত্রায়ন শুরু করেন এবং তাঁর ছাত্রদেরকে পারিপার্শ্বিক অবস্থার পর্যালোচনা ও তা প্রতিবিম্বিত করতে অনুপ্রাণিত করেন। তিনি প্রাচীরচিত্রেও আগ্রহী হয়ে ওঠেন। কেননা ভারতে বৃহৎ কিছু শিল্পকর্ম এ পদ্ধতি অবলম্বনে করা হয়েছিল।

নন্দলাল আধুনিক ভারতের প্রাচীরচিত্র পুনরুজ্জীবনে নেতৃত্ব দেন এবং নিজেও কিছু স্থানে প্রাচীরচিত্র অঙ্কন করেন। তিনি ছিলেন একজন বড় অনুপ্রেরণাদায়ক শিক্ষক। ভারতের সমকালীন শিল্প জগতে তিনি সর্বজনগ্রাহ্য মাস্টারমশাই নামে খ্যাতি লাভ করেন। নন্দলালের  কোনো কোনো ছাত্র, যেমন, বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়, রাম কিংকর বেইজ জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে বিখ্যাত শিল্পী হিসেবে খ্যাতিলাভ করেছিলেন।

একজন চিত্রশিল্পী ও প্রাচীরচিত্র শিল্পী হিসেবে নন্দলাল বসু আধুনিক ভারতের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় ছিলেন। তাঁর শিল্পকর্মকে বিশুদ্ধ ঐতিহ্য থেকে স্বাধীন ও আধুনিক ভারতের পরিবর্তনের ধারায় উত্তরণের উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা করা যায়। তাঁর রৈখিক ও অলংকারশোভিত শিল্পশৈলী তাঁর নিজের ব্যক্তিত্বে বৈশিষ্ট্যমন্ডিত। তাঁর অধিকতর পরিচিত চিত্রশিল্পের মধ্যে রয়েছে সাবিত্রী ও যম, গান্ধারী, সিদ্ধার্থ ও আহত হংস, হলাহল পানরত শিব, মিরাবাই, শ্রীচৈতন্যের জন্ম ইত্যাদি। শান্তিনিকেতনে বিদ্যমান তাঁর চিত্রশিল্পে ও অঙ্কনশিল্পে শান্তিনিকেতনের চারপাশের জীবনধারা চিত্রায়িত হওয়ার কারণে বিশিষ্টতা লাভ করেছে। ভারতের প্রাচীরচিত্রের পুনরুজ্জীবনে নন্দলাল অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। বরোদার কীর্তি মন্দির এবং শান্তিনিকেতনের চিনাভবনে তাঁর সর্বোৎকৃষ্ট দুটি কর্ম দেখা যায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং অন্যদের লেখা বেশ কিছু গ্রন্থের তিনি সচিত্র অলঙ্করণ করেন। ১৯৩০ সালে লবণ-আন্দোলনে গান্ধীর গ্রেফতারের ঘটনাকে স্মরণীয় করে তোলার জন্য তিনি লাঠিহাতে পদযাত্রারত গান্ধীর একটি বস্ত্রখোদিত নকশা অঙ্কন করেন। এটি অহিংস-আন্দোলনের একটি আদর্শ ছবি হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। ১৯৩৭ সালে নন্দলাল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের হরিপুর কাউন্সিলের মন্ডপ ৮৩ টুকরা চিত্রকর্ম দিয়ে সজ্জিত করেন। এ চিত্রকর্মে বাংলার লোকজ চিত্রশিল্প এবং তাঁর নিজস্ব মাধুর্যময় শিল্পশৈলীর সমন্বয় ঘটে। এ সকল চিত্রকর্ম হরিপুরা পোস্টার নামে সমধিক পরিচিত।

নন্দলাল বসু ভারতের শাসনতন্ত্রের প্রথম সংস্করণের সচিত্র অলঙ্করণ করেন। তাঁকে ভারত সরকারের নকশা তৈরি করার দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি ভারতরত্ন, পদ্মভূষণ, পদ্মশ্রী সহ বিভিন্ন পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৫০ সালে কাশী বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানিক ডিলিট. ডিগ্রি প্রদান করে। ১৯৫৬ সালে তিনি নয়া দিল্লীর ললিতকলা আকাদেমির ফেলো নির্বাচিত হন। ১৯৫১ সালে তিনি কলাভবন থেকে অবসর গ্রহণ করেন এবং তাঁকে প্রফেসর ইমেরিটাস পদ প্রদান করে সম্মানিত করা হয়। ১৯৫২ সালে বিশ্বভারতী তাঁকে দেশীকোত্তম  উপাধি এবং ১৯৫৪ সালে পদ্মভূষণ পুরস্কার প্রদান করা হয়। মৃত্যু ১৬ এপ্রিল ১৯৬৬।  [আবুল মনসুর]