বাগচী, অন্নদাপ্রসাদ


বাগচী, অন্নদাপ্রসাদ (১৮৪৯-১৯০৫)  উনিশ শতকের শেষ ও বিশ শতকের প্রথম পর্যায়ের বাংলার প্রতিকৃতি অঙ্কনকারী ও তৈলচিত্র শিল্পি। চবিবশ পরগনা জেলার শিখরবলি গ্রামের এমন একটি পরিবারে তাঁর জন্ম যেখানে শিল্প-সংস্কৃতির প্রভাব তখনও প্রবেশ করেনি। কলকাতার অ্যাসেম্বলি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অন্নদাপ্রসাদ বাগচী প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। চিত্রাঙ্কনকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার ব্যাপারে তাঁর বাবার আপত্তি ছিল এ কারণে যে, সে সময় এটিকে অশিক্ষিত পটুয়াদের গৃহীত নিম্নমানের পেশা মনে করা হতো। বিভিন্ন অবস্থান থেকে জীবনকে উপলব্ধি করার বাস্তব অভিজ্ঞতা তাঁর ছিল। তিনি শিক্ষানবিশ হিসেবে যেমন কাজ করেছেন, তেমনি কেরানি হিসেবেও ইংরেজি চিঠি মুসাবিদা করেছেন। তিনি তাঁর কিশোর বয়সে জোড়াসাঁকোর একটি ওয়ার্কশপে তামার প্লেটে খোদাই কাজে শিক্ষানবিশি করেন। এখানে তিনি নীলমণি মুখার্জির কাছ থেকে প্রশিক্ষণ পেয়েছিলেন। ১৮৬৫ সালে বাগচী সরকারি আর্ট স্কুলে ভর্তি হন এবং এইচ.এইচ লক-এর কাছ থেকে প্রশিক্ষণ লাভ করেন। আর্ট স্কুলে থাকাকালেই তিনি উডকার্ভিং, খোদাই, লিথোগ্রাফি ও তৈলচিত্রে শিক্ষা লাভ করেন।

ছাত্রজীবনে তাঁর বহু কর্মতৎপরতার মাঝে উল্লেখযোগ্য কাজ হলো রাজেন্দ্রলাল মিত্রের গ্রন্থের অলংঙ্করণ। ১৮৬৮-৬৯ সালে তিনি রাজেন্দ্রলাল মিত্র ও অন্যান্যদের সঙ্গে ব্যাপকভাবে উড়িষ্যা ভ্রমণ করেন এবং প্রাচীন সৌধ ও বস্ত্তর চিত্রাঙ্কন করেন। রাজেন্দ্রলাল মিত্রের অ্যান্টিকুইটিজ অব উড়িষ্যা গ্রন্থের উভয় খন্ডের অধিকাংশ চিত্রই অন্নদাপ্রসাদের অাঁকা। ১৮৭৭ সালে বাগচী বোধগয়া ভ্রমণে পুনরায় রাজেন্দ্রলাল মিত্রের সঙ্গী হন এবং বোধগয়ার উপর রাজেন্দ্রলালের গবেষণাকর্মে সহায়তার জন্য চিত্রাঙ্কন করেন।

অন্নদাপ্রসাদ বাগচী সরকারি আর্ট স্কুলের প্রশিক্ষক হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন এবং পরবর্তীকালে তিনি এর অধ্যক্ষ হন (১৮৮০)। এ চাকরিই তাঁকে প্রয়োজনীয় আর্থিক নিরাপত্তা দিয়েছিলো। স্বাধীন পোট্রেট অাঁকিয়ে, ড্রাফ্টসম্যান, খোদাইকারী ও ড্রয়িং মাস্টার হিসেবে বাণিজ্যিক মহলে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে বাংলার নবযুগের চিত্রকরদের মাঝে অন্নদাপ্রসাদ বাগচী হলেন সফলতার একটি আদর্শ উদাহরণ। সে সময়ে শিল্প বাজার ছিল সরাসরি দুভাগে বিভক্ত। একদিকে ছিল স্থানীয় জনপ্রিয় শিল্পি ও কারিগর, অন্যদিকে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা আর্ট স্কুলের তথাকথিত শিক্ষিত চিত্রকর। তৃতীয় দলটি অর্ন্তভুক্ত ছিল অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও ই. হ্যাভেলের উপস্থাপিত ইন্ডিয়ান স্কুলে, যেখানে শিল্প সৃষ্টিতে আধুনিক পশ্চিমা কৌশল প্রয়োগ করা হতো প্রাচীন ভারতীয় রীতি থেকে অনুপ্রেরণা ও বিষয়বস্ত্ত নিয়ে। অন্নদাপ্রসাদ ও তাঁর সমসাময়িক আরও কয়েকজন এ ধারার মধ্যে থেকেই আরও কিছু নতুন কৌশল সাফল্যজনকভাবে সূচনা করেন। এরমধ্যে ধাতু খোদাই শিল্প, লিথোগ্রাফি ও ক্রোম-লিথোগ্রাফি অন্তর্ভুক্ত। এগুলি অগণিত গ্রাহক সৃষ্টিতে সক্ষম হয়।

উপরের এ উদ্দেশ্যকেই সামনে রেখে ১৮৭৮ সালে নবকুমার বিশ্বাস, ফণিভূষণ সেন, যোগেন্দ্রনাথ মুখার্জি ও কৃষ্ণচন্দ্র পাল-এর সহযোগিতায় অন্নদাপ্রসাদ বাগচী ‘ক্যালকাটা আর্ট স্টুডিও’ প্রতিষ্ঠা করেন। ক্যালকাটা আর্ট স্টুডিও-র লক্ষ্য ছিল ধর্মীয় ও পৌরাণিক চিত্রের জনপ্রিয়তা সৃষ্টি এবং গ্রন্থ ও জার্নালের জন্য চিত্রাঙ্কন। এটি ছিল উনিশ শতকে শিল্প বাজারে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক পদক্ষেপ। পোট্রেট অঙ্কন, প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলি, তৈলচিত্র, জল রং, সর্বপ্রকার নকশা ও লিথোগ্রাফির উপরও এ স্টুডিও কাজ করে। স্টুডিও-র বাংলা ও ইংরেজি বর্ণমালা বোর্ড, কপিবুক এবং ধর্মীয় ও পৌরাণিক লিথোগ্রাফি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে।

১৮৮৩ সালের প্রদর্শনীর সফলতা স্টুডিও-র সঙ্গে জড়িত শিল্পিদের জনপ্রিয়তা আরও বাড়িয়ে দেয়। ক্যালকাটা আর্ট স্টুডিও-র সঙ্গে সম্পৃক্ত অধিকাংশ চিত্রকরকেই আর্ট স্কুলের অসাধারণ সৃষ্টি হিসেবে মনে করা হতো এবং শিল্পমহলে বাণিজ্যিক মানসিকতায় তাঁদের অনুপ্রবেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ ছাপ রাখে। এ গোষ্ঠীর মাঝে অন্নদাপ্রসাদ বাগচী একটি স্বতন্ত্র স্থানে অধিষ্ঠিত হন এবং তিনি হয়ে ওঠেন পোট্রেট অাঁকিয়ে হিসেবে সবচেয়ে সফল।

পোট্রেট অাঁকিয়ে ও তৈলচিত্র বিশারদ হিসেবে অন্নদাপ্রসাদের সফলতা লর্ড নর্থব্রুককে বেশকিছু পোট্রেট ক্রয়ে আগ্রহী করে। এ পোট্রেটগুলির মধ্যে ড. রাজেন্দ্রলাল মিত্র ও কেশবচন্দ্র সেন-এর ছবিও অন্তর্ভুক্ত ছিল। বাগচীর অঙ্কিত ছবি কলকাতা ও মাদ্রাজের অনেক প্রদর্শনীতে স্থান পায়। ১৮৭৪ সালে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় নিউ ইম্পেরিয়াল মিউজিয়ামে আয়োজিত প্রদর্শনীতে বাগচীর অঙ্কিত চিত্রকর্ম ব্যাপক সুনাম অর্জন করে। ১৮৭৯ সালের প্রদর্শনীতে স্থান পাওয়া বাগচীর অংঙ্কিত পোট্রেটগুলি ছিল সর্বাধিক মূল্যের চিত্রশিল্পগুলির মধ্যে অন্যতম। এ সময়েই বাংলার ছোট লাট জর্জ ক্যাম্পবেল বাগচীকে বাংলার স্যার জসুয়া রেনল্ডস বলে আখ্যায়িত করেন।

‘আর্টিস্ট’স প্রেস’ প্রতিষ্ঠা ও ১৮৮৫-৮৬ সালে বাংলা ভাষায় প্রথম শিল্পজার্নাল শিল্প পুষ্পাঞ্জলি প্রকাশে অন্নদাপ্রসাদ বাগচী অসামান্য অবদান রাখেন। জার্নালটির অল্প কয়েকটি সংখ্যা প্রকাশ পায় এবং এর লক্ষ্য ছিল মানুষের হূদয়ে শৈল্পিক চেতনা জাগ্রত করা। অন্নদাপ্রসাদ বাগচী বেশ কয়েকটি শিল্পসংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘বঙ্গীয় কলা সংসদ’। তিনি এ সংগঠনের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। অন্নদা প্রসাদ বাগচীর ১৯০৫ সালে ৫৬ বছর বয়সে মৃত্যু হয়।  [সীমা রায় চৌধুরী]