ফিফ্থ রিপোর্ট


ফিফ্থ রিপোর্ট, ১৮১২   ব্রিটিশ পার্লামেন্ট কর্তৃক ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিষয়াবলির ওপর ১৮১০ সালে গঠিত সিলেক্ট কমিটি দ্বারা প্রস্ত্ততকৃত দলিল গ্রন্থ যা ১৮১২ সালে পার্লামেন্টে পেশ করা হয়। সিলেক্ট কমিটিকে যে বিচার-বিবেচনার দায়িত্ব দেওয়া হয় তার আওতায় অন্তর্ভুক্ত ছিল রাজস্ব ও বিচার ব্যবস্থার উপর বিশেষ দৃষ্টি রেখে কোম্পানির শাসনাধীন এলাকাসমূহের অবস্থা সম্পর্কে অনুসন্ধান চালানো। এ সিলেক্ট কমিটি গঠনের আগে মুক্ত বাণিজ্যের উদ্যোক্তাগণ ও ধর্ম প্রচারের স্বার্থধারীগণ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আশু অবলুপ্তি দাবি করে আন্দোলন শুরু করেছিল। তাদের অভিযোগ ছিল যে, কোম্পানি সরকার অন্যায্যভাবে ও উৎপীড়নমূলকভাবে ভারত শাসন করছে।

সিলেক্ট কমিটিকে ভারতে কোম্পানির সাম্রাজ্যের উৎপত্তি ও সম্প্রসারণ বিশ্লেষণ এবং শাসন ব্যবস্থা ও জনগণের ওপর তার প্রভাবসমূহ পর্যবেক্ষণ করতে বলা হয়েছিল। সিলেক্ট কমিটি নিজেদেরকে ঐসব প্রতিষ্ঠান বিবেচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে, যেগুলি কোম্পানির প্রশাসনের রাজস্ব ও বিচার বিভাগসমূহের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিল। ১৭৬৫ সনে দীউয়ানি লাভের পর থেকে রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও বিচারকার্য নির্বাহের জন্য একের পর এক যে ব্যবস্থাসমূহ গ্রহণ করা হয়েছিল সিলেক্ট কমিটি তার একটি সংক্ষিপ্তসার তৈরি করে। এরূপ সকল পরীক্ষা-নিরীক্ষার বাস্তব ফলাফলসমূহ গভীরভাবে অনুসন্ধান করা হয়। কোম্পানির নথিসমূহ ও কোম্পানির বিষয়াবলী সম্পর্কে জ্ঞাত ব্যক্তিবর্গের সাক্ষাৎকারের ওপর ভিত্তি করে সিলেক্ট কমিটি ‘ফিফ্থ রিপোর্ট ফ্রম দি সিলেক্ট কমিটি অন দি এফেয়ার্স অব দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’ নামে এক বিরাট রিপোর্ট তৈরি করে তা ১৮১২ সালে পার্লামেন্টে পেশ করে।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতি আনুকূল্য প্রদর্শনকারী এ রিপোর্ট ১৮১৩ সালের চার্টার আইনকে (Charter Acts) প্রভাবিত করে, এবং কোম্পানিকে শাসক ও বাণিজ্যিক সংগঠন হিসেবে তার অস্তিত্ব বজায় রাখতে সহায়তা করে। যদিও জনমত কোম্পানির বিশাল সাম্রাজ্য অব্যাহতভাবে চলতে থাকার বিরোধী ছিল, ১৮১৩ সালের চার্টার আইন ব্রিটিশরাজের পক্ষে কোম্পানিকে ভারত শাসনের অনুমতি দেয়। তবে জন্মলগ্ন থেকে কোম্পানি যে একচ্ছত্র অধিকার ভোগ করে আসছিল সনদ আইনের অধীনে কোম্পানি তা হারায়।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রথম দিকের প্রশাসনের ব্যাপারে ঐতিহাসিক অনুসন্ধানের উৎস হিসেবে ১৮১২ সালের পঞ্চম রিপোর্ট এক অমূল্য দলিল। উপনিবেশিক রাষ্ট্র স্থাপনের প্রথম পঞ্চাশ বছরের বিবরণ সম্বলিত গুরুত্বপূর্ণ দলিলপত্র সিলেক্ট কমিটি সংগ্রহ করে সেগুলি রিপোর্টে সংযোজনী হিসেবে নথিভুক্ত করে। এ নথিসমূহের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো জন শোরকর্নওয়ালিসএর মিন্যুট্স, জৈমস গ্রান্ট এর বাংলার আর্থিক অবস্থার বিশ্লেষণ, রাজস্ব ও বিচার কার্যাবলির পরিসংখ্যান, রাজস্ব বোর্ড এর সভাসমূহের কার্যবিবরণী এবং জেলা জজ ও ম্যাজিস্ট্রেটদের রিপোর্টসমূহ। এ সকল দলিল বাংলায় উপনিবেশিক রাষ্ট্র কিভাবে গঠিত হয়েছিল এবং তার শাসনকার্য কিভাবে পরিচালিত হতো তা’ পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে স্পষ্ট করে তোলে।  [সিরাজুল ইসলাম]