রাজস্ব বোর্ড


রাজস্ব বোর্ড  কোম্পানি আমলে রাষ্ট্রীয় কার্যাদির দাপ্তরিক বিভাজনের পূর্বে মূলত ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রকাঠামোতে গঠিত রাজস্ব ব্যবস্থাপনার শীর্ষ প্রশাসনিক সংস্থা। ব্রিটিশ শাসনের সমাপ্তি পর্যন্ত ঔপনিবেশিক সরকারের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রশাসনিক অঙ্গ রাজস্ব বোর্ড তার প্রশাসনিক কাঠামো, আওতা, ক্ষমতা এবং কার্যক্রমে ধাপে ধাপে অনেক সংস্কার সাধন করে। ১৭৭০ সালে ওয়ারেন হেস্টিংস কর্তৃক কলকাতার রাজস্ব পরিষদ এবং পাটনার রাজস্ব পরিষদ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে ঔপনিবেশিক সরকারের রাষ্ট্রগঠন প্রক্রিয়া শুরু হয়। সমন্বয়ের জন্য কলকাতায় রাজস্ব বোর্ড প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করা হয়। কেন্দ্রীয়ভাবে রাজস্ব নির্ধারণ, নিয়ন্ত্রণ ও সংগ্রহের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত ১৭৭০ সালের ব্যবস্থাটি ১৭৭৩ সালে রহিত করা হয়। রাজস্ব বোর্ড এবং জেলা কালেক্টরেট প্রশাসন দুটি ব্যবস্থাই বিলোপ করা হয়। এর পরিবর্তে দেশকে প্রাদেশিক পরিষদ কর্তৃক শাসিত ছয়টি প্রদেশে ভাগ করা হয়। ১৭৮৬ সাল পর্যন্ত গভর্নর জেনারেলের সভাপতিত্বে গঠিত রাজস্ব কমিটি নামে পরিচিত একটি কেন্দ্রীয় দপ্তর কর্তৃক তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। গভর্নর জেনারেল পরিষদের সদস্যরা এই কমিটির সদস্য ছিলেন। অন্য কথায়, গভর্নর জেনারেল পরিষদই ছিল নতুন রাষ্ট্রের রাজস্ব কার্যাবলি পরিচালনার রাজস্ব কমিটি।

ওয়ারেন হেস্টিংসের শাসনকালে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র ব্যাপক প্রসার লাভ করে এবং অনেক প্রশাসনিক জটিলতার সম্মুখীন হয়। ১৭৮৫ সালে রাজস্ব কমিটি পুনর্গঠন করা হয়। সমগ্র দেশকে অনেকগুলি জেলায় ভাগ করা হয় এবং প্রতি জেলায় একজন করে ইউরোপীয় কালেক্টর নিয়োগ দেওয়া হয়। ১৭৮৬ সালে রাজস্ব কমিটিকে রাজস্ব বোর্ড নাম দেওয়া হয়। পুনর্গঠিত রাজস্ব বোর্ড সভাপতিসহ ৫ জন সদস্য নিয়ে গঠিত হয়। গভর্নর জেনারেলের পরিবর্তে গভর্নর জেনারেল পরিষদের একজন কনিষ্ঠ সদস্য এর সভাপতি নিযুক্ত হন। এভাবে উইলিয়ম কাউপার নামে একজন পরিষদ সদস্য রাজস্ব বোর্ডের প্রথম সভাপতি নিযুক্ত হন। এর অন্য চারজন সদস্যের প্রত্যেকেই ছিলেন বেসামরিক নাগরিক। এভাবে রাজস্ব বোর্ড গভর্নর  জেনারেল পরিষদ থেকে সাংবিধানিকভাবে বিযুক্ত হয়ে যায় এবং নির্বাহী বিভাগের অধীনে একটি পৃথক প্রশাসনিক সংস্থা হিসেবে আবির্ভূত হয়। রাজস্ব বোর্ডে একজন মহা-হিসাবনিরীক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয় যিনি ছিলেন যুগপৎ বোর্ডের সচিব এবং আর্থিক বিষয়াদির তত্ত্বাবধায়ক।

সাধারণভাবে কর্নওয়ালিস কোড নামে পরিচিত ১৭৯৩ সালের বিধিমালা অনুযায়ী রাজস্ব বোর্ডের গঠনতন্ত্র আরও সংশোধন করা হয়। গভর্নর জেনারেল পরিষদের সদস্যকে রাজস্ব বোর্ডের সভাপতি নিয়োগের বিধান বিলোপ করে এটিকে কেন্দ্রীয় সরকার থেকে সম্পূর্ণরূপে পৃথক করা হয় এবং একজন জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তাকে এর প্রধান করা হয়। ১৭৯৩ সালের ব্যবস্থাটি রাজস্ব বোর্ডকে জেলা কালেক্টরের নিযুক্তি, বদলি, এবং সাধারণ কর্মকর্তা নিয়োগের ক্ষমতা প্রদান করে। রাজস্ব বোর্ডের যেকোন কর্মকর্তাকে তার আচরণ ব্যাখ্যা ও যৌক্তিকতা প্রদর্শনের জন্য সদর দপ্তরে ডেকে পাঠানো, অনূর্ধ্ব এক মাসের বেতনের সমপরিমাণ জরিমানা আরোপ এবং দপ্তর থেকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করার ক্ষমতা ছিল। সাধারণভাবে, সমগ্র বেসামরিক প্রশাসন এবং বিশেষভাবে রাজস্ব প্রশাসন রাজস্ব বোর্ডের হাতে ন্যস্ত করা হয়। রাজস্ব বোর্ড অভিভাবক আদালত হিসেবে কাজ করত যা শিশুদের কল্যাণ এবং আইনের মাধ্যমে আইনগতভাবে অনুপযুক্ত অন্যান্য জমিমালিকদের বিষয়াবলি দেখাশুনা করত।

১৮২২ সাল পর্যন্ত রাজস্ব বোর্ডের আওতা সমগ্র বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিতে বিস্তৃত করা হয়। এর পূর্বপর্যন্ত রাজস্ব বোর্ড গভর্নর জেনারেল পরিষদ কর্তৃক প্রদত্ত সীমাহীন ক্ষমতাসম্পন্ন সর্বোচ্চ প্রশাসনিক অঙ্গ হিসেবে কাজ করে আসছিল। ১৮০০ সাল থেকে সাম্রাজ্যের দ্রুত সম্প্রসারণ ও কাজকর্মের বিস্তৃতির ফলে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের প্রশাসনিক দক্ষতা ঠিক রাখার উদ্দেশ্যে বোর্ডের সাংগঠনিক কাঠামো এবং আওতাকে পুনর্গঠন করার প্রয়োজন দেখা দেয়। রাজস্ব বোর্ডের আওতা হ্রাস করা হয়। ১৮২২ সালের বিধান অনুযায়ী পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশসমূহ ও কেন্দ্রীয় বাংলার ওপর থেকে বোর্ডের নিয়ন্ত্রণ তুলে নেওয়া হয় এবং এ দুটি এলাকার জন্য দুটি অতিরিক্ত বোর্ড প্রতিষ্ঠা করা হয়। এরপর মূল রাজস্ব বোর্ড সীমানাগতভাবে কেবল বদ্বীপ বা বাংলার নিম্নাঞ্চল (পূর্ববাংলা) নিয়েই সীমিত থাকে। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে, ১৮২৯ সালের বিধিমালা অনুযায়ী রাজস্ব বোর্ডের একটি বড় ধরনের পুনর্গঠন হয়। উইলিয়ম বেন্টিঙ্কের প্রশাসন লক্ষ্য করে যে, বোর্ড বিচারসংক্রান্ত ও রাজস্ব প্রশাসনের কাজে ভারাক্রান্ত এবং জেলা কর্তৃপক্ষকে বর্ধিত দায়িত্ব দিয়ে রাজস্ব প্রশাসনের কেন্দ্রীয় কাঠামোর পরিবর্তন করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। রাজস্ব বোর্ড এবং জেলা কালেক্টরদের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক কর্তৃপক্ষের একটি নতুন স্তর তৈরি করা হয়। বাংলাকে ১১টি বিভাগে বিভক্ত করা হয় ও প্রতিটিকে একজন বিভাগীয় কমিশনারের অধীনস্থ করা হয়। অতঃপর জেলা কালেক্টরদের সরাসরি বিভাগীয় কমিশনারের তত্ত্বাবধানে এবং বিভাগীয় কমিশনারদের রাজস্ব বোর্ডের অধীনে ন্যস্ত করা হয়।

এই শাসনের অধীনে বিভাগীয়করণের নীতিমালার আওতায় প্রশাসন পুনর্গঠন করা হয়। ১৮৬১ সালের বিভাগীয় পুনর্গঠন অনুযায়ী বোর্ডের বহু ক্ষমতা ও দায়িত্ব বিভিন্ন কেন্দ্রীয় এবং স্থানীয় দপ্তরের অধীনে ন্যস্ত হয়। এভাবে ১৮৮৯ সালে বোর্ড দুইজন সচিব নিয়ে একটি দুই সদস্যবিশিষ্ট প্রতিষ্ঠানে অবনমিত হয়। সদস্য দুজন পৃথকভাবে বোর্ডের সকল ক্ষমতা প্রয়োগের জন্য ক্ষমতাপ্রাপ্ত হন। একজন সাধারণ রাজস্বের বিষয়ে এবং অপরজন আপিল, স্ট্যাম্প আবগারি শুল্কের মতো বিবিধ রাজস্ব ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ ও বরাদ্দ, সরকারি কাজের পদ্ধতি ও পরিচালনার ক্ষেত্রে সাধারণ ক্ষমতা প্রয়োগ করেন। এরপরও কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধান, সিদ্ধান্ত ও আদেশের পুনর্বিবেচনা, জেলা কালেক্টরদের নিষ্পত্তিমূলক নির্দেশমূহের অনুমোদন, বকেয়া রাজস্বের নিয়ন্ত্রণ, ভূমি রেজিস্ট্রারের নিয়ন্ত্রণ, অভিবাসন, কর ও রাজস্ব, বাঁধ, লবণ, আফিম, আবগারি, অভিভাবক আদালত, স্ট্যাম্প ও অন্যান্য অনেক বিষয়ে বোর্ড বিপুল ক্ষমতার অধিকারী রয়ে যায়।

পুনঃএকীভূত বাংলাকে ১৯১২ সালে বোম্বে এবং মাদ্রাজের মতো একটি নির্বাহী পরিষদসহ গভর্নরের শাসনাধীন প্রদেশ করা হয়। বোর্ড কর্তৃক প্রযুক্ত পূর্বের নির্বাহী ক্ষমতার অনেকগুলি গভর্নরের পরিষদ এবং সচিবালয়ের আওতাভুক্ত করা হয়। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে গভর্নরের পরিষদ ইন্ডিয়া কাউন্সিলকে রাজস্ব বোর্ডের সম্পূর্ণ বিলুপ্তির সুপারিশ করে। কিন্তু একে সম্পূর্ণ বিলোপ করার পরিবর্তে ভারত সরকারের মুখ্য সচিব একজন সচিবের অধীনে বোর্ডকে এক সদস্যবিশিষ্ট সংস্থায় পরিণত করার জন্য বেঙ্গল কাউন্সিলকে নির্দেশ দেয়। এভাবে ১৯১৩ সাল থেকে রাজস্ব বোর্ড সচিব হিসেবে একজন কনিষ্ঠ বেসামরিক কর্মকর্তা নিয়ে এক সদস্যবিশিষ্ট বোর্ড হিসেবে কাজ করা শুরু করে। ১৯৪৭-এর পরেও বোর্ডের এই কাঠামোটি অপরিবর্তিত ছিল।

১৯৫০ সালের পূর্ববঙ্গ জমিদারি অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের প্রবিধান অনুযায়ী ওয়ার্ড-জাতীয় সম্পত্তিসহ সকল ভূ-সম্পত্তির রাজস্ব-স্বার্থ অধিগ্রহণের সাথে ভূমি ও রাজস্ব-সংক্রান্ত অধিকাংশ পুরানো আইন বাতিল বা বিলোপ করা হয়। এতে রাজস্ব বোর্ড আবার তার গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে। এই পরিস্থিতিতে ১৯৭৩ সালের এক রাষ্ট্রপতি আদেশবলে রাজস্ব বোর্ড বিলোপ করা হয় এবং এর অবশিষ্ট কার্যক্রম বিভাগীয় কমিশনার ও ভূমি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ওপর ন্যস্ত করা হয়।  [সিরাজুল ইসলাম]