প্রাথমিক শিক্ষা


প্রাথমিক শিক্ষা অবিভক্ত ভারতবর্ষের অংশ হিসেবে বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমারেখার মধ্যে প্রচলিত প্রাথমিক শিক্ষার আনুষ্ঠানিক প্রচলন কখন কোথায় প্রথম শুরু হয় তা বলা বেশ কঠিন। ঋগবেদ রচিত হওয়ার কালে, অর্থাৎ আনুমানিক ৩০০০ বছরেরও পূর্বে এ উপমহাদেশে আনুষ্ঠানিক শিক্ষার বীজ রোপিত হয় যা কালের আবর্তনে পরিবর্তিত হয়ে বর্তমান অবস্থায় উপনীত হয়েছে। আনুষ্ঠানিক শিক্ষা প্রচলনের প্রথম পর্যায়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের মাঝে কোনো সুস্পষ্ট সীমারেখা ছিল না। তাই আলাদাভাবে সে সময়ের প্রাথমিক শিক্ষার বর্ণনা করা খুবই কঠিন হলেও প্রাসঙ্গিক বিভিন্ন তথ্যের ওপর ভিত্তি করে উপমহাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার ঐতিহাসিক পটভূমি নির্মাণ করা সম্ভব।

প্রাচীন যুগ এ সময় শিক্ষার মূল লক্ষ্য ছিল আত্মার উন্নতি সাধন। যার জন্য প্রয়োজন হতো সাধনা, চিন্তা ও আত্মসংযম। ঐতিহাসিকদের মতে বৈদিক যুগে এদেশে বিশেষ এক ধরণের প্রাথমিক শিক্ষার প্রচলন ছিল। এ ধারণা অনুসারে প্রাক বৈদিক যুগেও শিক্ষার প্রচলন ছিল তবে তা ছিল একান্তই মন্দির কেন্দ্রিক। সেখানে পুরোহিতদেরই শুধু জ্ঞান চর্চার অধিকার ছিল এবং তারা পূজা-অর্চনার বিষয়েই মূলত শিক্ষা গ্রহণ করত। পাশাপাশি পার্থিব উন্নতির জন্য কৃষিকাজ, ব্যবসা, কারুশিল্প ইত্যাদি শেখারও ব্যবস্থা ছিল। তবে সম্ভবত এ উপমহাদেশে বেদ রচনার সঙ্গে সঙ্গে আর্য শিক্ষার সূচনা হয় এবং বৈদিক যুগের এ শিক্ষাকে ‘বৈদিক শিক্ষাও’ বলা হয়। আদি বৈদিক যুগে এদেশে শিক্ষা ছিল প্রধানত ধর্মকেন্দ্রিক এবং বিদ্যালয় বলতে গুরুগৃহকেই বুঝানো হতো। তখন ব্রহ্মচর্য বা ছাত্রজীবন পাঁচ স্তরে বিভক্ত ছিল। এক্ষেত্রে শিক্ষার কাল ছিল একাধারে ১২ বছর। এর মধ্যে প্রথম স্তরে শিশু ৫ বছর বয়সে বিদ্যারম্ভ বা হাতে খড়ি নিত। এটা ছিল প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তিস্তর। প্রাথমিক শিক্ষা লাভের উপযুক্ত হবার পর গুরু যাকে যোগ্য বলে মনে করতেন তাকে শিষ্য হিসেবে পুত্রবৎ স্নেহ দিয়ে পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে আপন করে নিতেন। শিষ্যের বয়স এবং উপযুক্ততা বিচার করে গুরু শিষ্যদের উপলব্ধিজাত আধ্যাত্মিক তত্ত্ব সম্পর্কে জ্ঞানদান করতেন। এভাবে আরোহিত জ্ঞানকে শিষ্যরা পরবর্তীকালে অনুরূপভাবে যোগ্য ব্যক্তির হাতে তুলে দিতেন। প্রথমদিকে শিক্ষাতত্ত্বগুলি এক একটি পরিবারের সম্পদ হিসেবে সংরক্ষিত হতো। পরে ক্রমে বাইরে থেকে আগত শিক্ষার্থীরাও এসে অনুরূপ তত্ত্বজ্ঞানের অধিকারী হতে লাগল। ফলে বেদ শিক্ষায় বিভিন্ন শাখার উৎপত্তি হওয়ার সাথে সাথে এর সম্প্রসারণও ঘটতে থাকে। স্তোত্রের আকারে শিক্ষাতত্ত্বগুলি প্রথমদিকে পরিবারকেন্দ্রিক হলেও ক্রমে ক্রমে স্তোত্রগুলি বিভিন্ন প্রকৃতির ও জটিলতর হবার কারণে পুরোহিতদের শিক্ষাদানের কাজে প্রশিক্ষণের লক্ষ্যে বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বা স্কুল গড়ে উঠতে থাকে (খ্রিস্টপূর্ব আনু. ১০০০-৮০০ অব্দে)। বৈদিক যুগের শিক্ষা ব্যবস্থা খুব একটা সুসংগঠিত না হলেও সে যুগের কাজকর্ম, সংস্কৃতি, ভাষায় নৈর্ব্যক্তিক শব্দ, প্রবাদ, ধারণা ইত্যাদির ব্যবহার প্রমাণ করে যে তৎকালীন শিক্ষা ব্যবস্থা অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক উন্নত ছিল। তবে এদের মাঝে একমাত্র ব্রাহ্মণরাই ধর্ম, দর্শন, শিল্পকলা, বিজ্ঞান ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি অধ্যয়নের অধিকার রাখতো এবং তারাই সমাজে সর্বাধিক প্রাধান্য পেত।  বৈদিক যুগেই মহাভারত ও রামায়ণ রচিত হয়।

আদি বৈদিক যুগের পর আসে ব্রাহ্মণ্য যুগ। খ্রিস্টপূর্ব ৮০০ অব্দে এ যুগের সূচনা হয়। শুধুমাত্র পুরোহিত তৈরিই না, বরং ‘সত্য অনুসন্ধান’ ও এ যুগের শিক্ষার উদ্দেশ্য ছিল। আদি বৈদিক শিক্ষার মত ব্রাহ্মণ্য শিক্ষা ব্যবস্থাও বৈদিক চিন্তাধারা ও দার্শনিক মতবাদের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল তবে এই শিক্ষা পুর্বাপেক্ষা অনেক উন্নততর ছিল। বিশ্বব্রহ্মান্ডের আদি মানুষের আত্মা, জন্ম, মৃত্যু পরিচালন নিয়ম সম্পর্কে জানার প্রয়োজনে নিয়োজিত ছিল শিক্ষা। এই শিক্ষাকে ‘ব্রাহ্মণ্য শিক্ষা’ বলে অভিহিত করা হত। সে সময় গভীরভাবে ধ্যানমগ্ন ঋষিরা যে জ্ঞানের সন্ধান পেতেন সেগুলো সুর সংযোগে পরিবেশিত হতো। পরিবারের অন্যরা তা মনোযোগ সহকারে শুনে আত্মস্থ করতেন। সম্ভবত ঋষি পরিবারের এই শিক্ষাদানের সূত্র থেকে ব্রাহ্মণ্য শিক্ষার সূত্রপাত হয়। এ ধরনের শিক্ষাকে সে সময়ে শিক্ষার প্রাথমিক পর্যায় হিসেবে উল্লেখ করা যায়। তাছাড়া ব্রাহ্মণ্য শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীকে ছাত্রজীবনে দীক্ষিত করার লক্ষ্যে ‘উপনয়ন’ অর্থাৎ শিক্ষা লাভের জন্য গুরুর কাছে নিয়ে যাওয়া হতো। শিশুরা পাঁচ বছর বয়স থেকে বারো বছর পর্যন্ত গুরুগৃহে বাস করতো। এ সময় মৌখিক শিক্ষাদান পদ্ধতিই অধিক প্রচলিত ছিল। উপনয়ন বা ছাত্র জীবন শুরু কোন বয়সে হবে সে সম্পর্কে শাস্ত্রকারগণ ভিন্ন ভিন্ন মত ব্যক্ত করেছেন। কারণ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য সন্তানদের উপনয়নের পৃথক বিধি ছিল। তুলনামূলকভাবে ব্রাহ্মণ শিশুরা ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য শিশুদের চেয়ে শিক্ষাক্ষেত্রে অধিক সুবিধা ভোগ করতো। অবশ্য সময়ের ব্যবধানে এই বৈষম্য দূরীকরণের মাধ্যমে শিক্ষাদান পদ্ধতির উন্নতি হলেও সে সময়ে শুদ্র শ্রেণির শিশুদের শিক্ষার ব্যবস্থা সমাজ কখনই অনুমোদন দেয়নি। ব্রাহ্মণ্য যুগে শিক্ষা অপরাবিদ্যা এবং পরাবিদ্যা  নামক দু’ভাগে বিভক্ত ছিল। অপরাবিদ্যাকে শুধুমাত্র বেদ মুখস্ত করার গন্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হতো কিন্তু এখানে বেদের অর্থ অনুধাবনের ওপর কোনো জোর দেওয়া হতো না। অপরদিকে পরাবিদ্যায় বেদের অর্থ উপলব্ধি এবং তদানুযায়ী ক্রিয়া করার উপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হতো। এ সময়ও শিক্ষা ছিল গুরুকেন্দ্রিক এবং শিক্ষাক্রম ছিল গুরুদ্বারা নির্ধারিত। বনবাসী ঋষির আশ্রম ছাড়াও জনসমাজে বা লোকালয়ে গৃহ-শিক্ষকরা শিক্ষাদানে আত্মনিয়োগ করতেন। কোনো বিশেষ লোকালয়ে গৃহ-শিক্ষকদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে সেই জনপদ বিরাট শিক্ষাকেন্দ্রে পরিণতি লাভ করত। সে কারণে পরবর্তীকালে গুরুগৃহ ছাড়াও অবিভক্ত উপমহাদেশের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপিত হয়েছিল। ভারতের পশ্চিম বাংলার নবদ্বীপ, বিক্রমশীল, পাকিস্তানের তক্ষশীলায় তৎকালীন প্রাচীন হিন্দু শিক্ষানিকেতনের সন্ধান পাওয়া যায়।

ব্রাহ্মণ্য শিক্ষা যুগের পর আসে বৌদ্ধ শিক্ষাযুগ। বৌদ্ধরা অজ্ঞতাকে পাপ বলে মনে করত এবং তাদের মতে শিক্ষাই হচ্ছে একমাত্র পাপ মোচনের উপায়। বৌদ্ধ শিক্ষার মূল বিষয় ছিল জ্ঞানানুশীলন, স্বাস্থ্য গঠন, ধর্মভক্ত দর্শন, চিকিৎসা বিজ্ঞান প্রভৃতি সম্বন্ধে জ্ঞান আহরণ। খ্রিস্টপূর্ব ছয় শতকে ভারতে গৌতম বুদ্ধের নেতৃত্বে যে বৌদ্ধ শিক্ষা ব্যবস্থার আবির্ভাব ঘটে তা ছিল অনেকটা উদার এবং সার্বজনীন। বৌদ্ধ শিক্ষাব্যবস্থার বেশিরভাগই ছিল মঠকেন্দ্রিক। এই মঠগুলোই প্রাথমিক শিক্ষার কাজ করতো। এ শিক্ষা ব্যবস্থায় ৮ বৎসর বয়স পর্যন্ত বৌদ্ধ শিশু পিতৃগৃহে শিক্ষালাভ করত। এটাকে আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় প্রাথমিক প্রবেশের প্রস্ত্ততি বলা হতো। ৮ বছর পূর্ণ হলে আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে শিক্ষার জন্য তাকে বৌদ্ধ মঠে প্রেরণ করা হতো। এ উদ্দেশ্যে তাকে মস্তক মুন্ডন করে বিশেষ গেরুয়া বস্ত্রে সঙ্গরাম অর্থাৎ ভর্তি পরীক্ষার্থী হিসেবে পন্ডিতের সম্মুখীন হতে হতো। বৌদ্ধসঙ্ঘে প্রবেশের এই প্রাথমিক অনুষ্ঠানকে বলা হতো প্রব্রজ্যা (প্রাথমিক দীক্ষা)। প্রব্রজ্যা গ্রহণের পর শিশু শ্রমণ উপাধি পেত। বৌদ্ধ শিক্ষায় সাধারণত ৮ বছরের কম বয়সের কেউ প্রব্রজ্যা বা প্রাথমিক দীক্ষা গ্রহণ করতে পারত না। তবে বৌদ্ধ শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষাগ্রহণ সকলের জন্য উন্মুক্ত ছিল। এখানে ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শুদ্র সকলেই প্রবেশাধিকার লাভ করতো। একারণে বলা যায় যে, গণতন্ত্র ও সর্বজনীনতাই ছিল বৌদ্ধ শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এছাড়া একসঙ্গে অনেক শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করতো বলে তাদের মাঝে সামাজিকতার গুণও বিকাশ লাভ করতো। লেখা ও পড়া উভয় প্রকার কৌশলের উপর তখন সমান গুরুত্ব আরোপ করা হতো। বৌদ্ধ শিক্ষাব্যবস্থায় প্রাথমিক শিক্ষার ঐতিহাসিক পটভূমি, চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন-সাং (আঃ ৬২৯-৬৪৫) -ৎসিঙ্  (আঃ ৬২৭-৬৮৭)-এর বিবরণ থেকে অনেকটা ধারণা পাওয়া যায়। হিউয়েন সাং কনৌজরাজ হর্ষবর্ধনের রাজত্বকালে (আঃ ৬০৬-৬৪৮ খ্রি.) ভারতে আগমন করেন। সেই যুগের শিক্ষা সম্পর্কে বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন যে, সেই যুগে প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার্থীকে সংস্কৃত অক্ষর পরিচয় এবং স্বর ও ব্যাঞ্জনবর্ণের সহযোগে গঠিত শব্দাবলী সম্মিলিত ১২টি অধ্যায় বিশিষ্ট সিন্ধাম বা সিদ্ধিরত্ন (অর্থাৎ তোমার সিদ্ধি লাভ হোক) নামক একখানি প্রাথমিক পুস্তক পড়তে দেওয়া হত। এই পুস্তকখানির পাঠ শেষ হলে শিক্ষার্থীকে সাত বছর বয়সে পাঁচটি বিজ্ঞান শাস্ত্রের সঙ্গে পরিচয় করানো হত। এই শাস্ত্রগুলি হল ১) ব্যাকরণ ২) শিল্পস্থান বিদ্যা ৩) চিকিৎসা বিদ্যা ৪) হেতু বিদ্যা এবং ৫) আধ্যাত্ম বিদ্যা। এভাবে উচ্চশিক্ষার ভিত্তিকে পাকা করার জন্য প্রাথমিক শিক্ষার প্রয়োজনীয় পাঠ্যক্রমের ব্যবস্থা ছিল। ই-ৎসিঙ্ খ্রিস্টীয় সাত শতকেই হিউয়েন-সাং -এর পর ভারত ভূমিতে ভ্রমণ করেন। তিনিও সেই যুগের প্রাথমিক শিক্ষা সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট ধারণা প্রদান করেছেন। তাঁর বর্ণনায়, ছয় বছর বয়সে শিক্ষার্থীরা পাঠ শুরু করত। উনপঞ্চাশটি অক্ষর এবং তিনশত থেকে সাজানো দশ হাজার সিলেবল্স (Syllables) বিশিষ্ট একটি পুস্তক তাদের অধ্যায়ন করতে হতো যার নাম ছিল সিদ্ধিরত্ন। আট বছর বয়সে পড়তে হতো ১০০০ শ্লোকযুক্ত পাণিনীয় সূত্র। দশ বছর বয়সে আরও গভীরভাবে ব্যাকরণের অধ্যয়ন চলতো। এই ব্যাকরণে থাকত ১৮,০০০ শ্লোক। পনের বছর বয়সে শিক্ষার্থীকে পতঞ্জলীর মহাভাষ্য, হেতু বিদ্যা, অভিধর্মকোষ, জাতকমালা প্রভৃতি আয়ত্ত্ব করতে হতো এবং এইভাবেই বৌদ্ধ শিক্ষার প্রাথমিক স্তর অতিক্রম করার বিধি প্রবর্তিত ছিল। খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতকে হিন্দু জাগরণের যুগে রাজনৈতিক কারণে বৌদ্ধ ধর্মের পতন ঘটে। পাল বংশের পর হিন্দু ধর্মাবলম্বী সেন বংশীয়রা ক্ষমতা দখল করে। ফলে বৌদ্ধ শিক্ষার প্রভাব ক্রমে ম্লান হতে শুরু করে এবং শিক্ষা ও ধর্মকর্মের ব্যাপারে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা প্রাধান্য লাভ করে।

মধ্যযুগ হযরত মুহাম্মদ (স.)-এর নবুয়ত প্রাপ্তি এবং ইসলাম ধর্মের প্রচার সাত শতকে আরবদের মাঝে এক নবজাগরণের সূচনা করে যার ফলশ্রুতিতে পরবর্তী ১০০ বছরে আরব সভ্যতা বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর প্রেরণা পায়। খ্রিস্টীয় আট শতকে সিন্ধুরাজ দাহিরকে পরাজিত করে মোহাম্মদ বিন কাশিমের সিন্ধু বিজয়ের মাধ্যমে ভারতভূমিতে প্রথম মুসলিমদের আগমন ঘটে। উত্তর-পশ্চিম ভারতে মোহাম্মদ বিন কাশিম কর্তৃক মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হলেও বাংলাদেশে মুসলিম শাসন শুরু হয় ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে বখতিয়ার খলজী কর্তৃক নদীয়া জয়ের মাধ্যমে। সে সময়ে বখতিয়ার খলজী দেশের বিভিন্ন স্থানে মসজিদ, মক্তব ও মাদ্রাসা স্থাপন করেন। বখতিয়ার খলজীর পরবর্তী মুসলিম শাসকগণও মসজিদ, মক্তব ও মাদ্রাসার মাধ্যমে শিক্ষাবিস্তারের এই পদ্ধতি অনুসরণ করেন।

পরবর্তীকালে মুহম্মদ ঘোরী (১১৭৪-১২০৬), সুলতান ইলতুৎমিশ (১২১১-৩৬), তাঁর কন্যা সুলতানা রাজিয়া (১২৩৬-৪০), সুলতান নাসিরুদ্দিন (১২৪৬-৬৬), সুলতান গিয়াসউদ্দীন বলবন (১২৬৬-৮৭), এরা সকলেই জ্ঞান অর্জন ও শিক্ষাবিস্তারে উৎসাহ প্রণদেতা ছিলেন। তাছাড়া ধর্মপ্রাণ মুসলমান ও মুসলিম পীর-আউলিয়াগণ এ সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে মসজিদ, মক্তব ও মাদ্রাসা স্থাপন করেন। খলজী ও তুঘলোকদের সময় মুসলমানদের শিক্ষা অর্থাৎ ইসলাম ধর্মের সাথে সাথে আরবি শিক্ষা ও সংস্কৃতির ব্যাপক উন্নতি ও প্রসার ঘটে। মধ্যযুগে বিদ্বান ও বিদ্যোৎসাহী অনেক শাসকের প্রচেষ্টায় শিক্ষা ব্যবস্থার শ্রীবৃদ্ধি ঘটতে থাকে এবং মসজিদ, মক্তব ও মাদ্রাসার মাধ্যমে শিক্ষা বিস্তার হতে থাকে। এর মধ্যে মক্তবের শিক্ষা ছিল মুসলিম শিক্ষাধারার প্রাথমিক স্তর। মূলত চার বছর বয়স থেকে প্রাথমিক শিক্ষার জন্য মক্তবে গমন করলেও প্রকৃত শিক্ষা চর্চার শুরু হতো সাত বছর বয়সে। কোরআন ও ধর্মের নির্দেশ মেনে চলার শিক্ষাই ছিল মক্তবের প্রাথমিক পাঠ। এর সঙ্গে শেখানো হতো পড়া, লেখা ও সাধারণ হিসাব পদ্ধতি। হিন্দু ছেলে-মেয়েদের জন্যও পাঠশালায় শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়। এছাড়া সমাজের উচ্চবিত্ত পরিবার গৃহশিক্ষক রেখে তাদের সন্তানদের লেখাপড়ার ব্যবস্থা করতেন। মক্তবের উচ্চস্তরে পড়ানো হতো দরবেশ ও পীরপয়গম্বরদের জীবনী, ফারসি কাব্য-গাথা প্রভৃতি। নামায আদায় ও ধর্মীয় আচার শিক্ষা ছিল মুসলিম আমলে নূন্যতম শিক্ষা যা সকল মুসলিম শিক্ষার্থীর জন্য বাধ্যতামূলক ছিল।

মুগল আমলে মুসলিম শাসক, আমীর ও ওমরাহগণ শিক্ষার সাথে সাথে সাহিত্যের ব্যাপারেও যথেষ্ট উদ্যাগী ছিলেন। রাজভাষা ফারসি থাকায় এ সময় ফারসি সাহিত্যের বিশেষ প্রসার ঘটে। মূলত মুগল সম্রাট আকবরের সময়ে স্কুলের শিক্ষাব্যবস্থা পূর্ব অপেক্ষা অনেক উন্নত ও সম্প্রসারিত হয়। প্রাথমিক স্তরে পঠন, লিখন ও হিসাবের শিক্ষাসহ ধর্মীয় শিক্ষাকে তিনি জাগতিক শিক্ষায় রূপান্তরিত করেন। এ সময় হিন্দু ও মুসলমানদের শিক্ষা ও সংস্কৃতির পারস্পরিক আদান-প্রদানের সুযোগ পায় যার ফলে হিন্দি, ফারসি ও আরবি ভাষার সংমিশ্রণে উর্দু ভাষার উদ্ভব হয়। মুগল আমলে মুসলমানদের জন্য মক্তব, মাদ্রাসা ও হিন্দুদের জন্য পাঠশালা, টোল প্রভৃতি ছিল। সমাজের বিত্তবান ব্যক্তিবর্গ এ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা, শিক্ষক সংগ্রহ, ভূমি-দান, অর্থ-দান, বেতন ও অনুদান ইত্যাদির ব্যবস্থা করতেন। অর্থাৎ শাসক শ্রেণি ও সমাজের পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালিত হতো। তবে মক্তবকেন্দ্রিক প্রাথমিক শিক্ষা মূলত মসজিদের আদায়ী অর্থ, জাকাতের অর্থ এবং সাধারণের দানেই পরিচালিত হতো। সুতরাং এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, সে সময়েও অবৈতনিক কিংবা প্রায় অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা এ সমাজে প্রচলিত ছিল। এছাড়া, রাষ্ট্র কর্তৃক পরিচালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির অর্থসংস্থান ও পরিচালনার ক্ষেত্রে সহায়তার করার জন্য একটি স্বতন্ত্র দপ্তরও ছিল।

আঠারো শতকের শেষার্ধে ভারতে মুসলিম শাসনের অবসান ঘটে এবং মিশনারীদের আগমন ও তাদের প্রচেষ্টায় পাশ্চাত্য শিক্ষার বিস্তার ঘটে। ১৭৫৮ খ্রিস্টাব্দে লর্ড ক্লাইভ এর আমন্ত্রণে মিশনারী কায়ের্নান্ডার এদেশে আসেন এবং বেশ কয়েকটি চ্যারিটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। এ ছাড়াও শ্রীরামপুরত্রয়ী নামে পরিচিত মার্শম্যান, ড. ক্যারী এবং ওয়ার্ড-এর মিলিত প্রচেষ্টায় খ্রিস্টধর্ম প্রচারের সাথে সাথে এদেশে শিক্ষাবিস্তারের ক্ষেত্রে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। শ্রীরামপুর মিশনে তখন প্রাথমিক শিক্ষার উপযোগী ভাষাশিক্ষা, ইতিহাস, ভূগোল, বিজ্ঞান প্রভৃতি নানা বিষয়ে বই লিখে ছাপানোর ব্যবস্থা ছিল। প্রধান উদ্দেশ্য ধর্ম প্রচার হলেও এর মাধ্যমে সে সময়ে স্কুলগুলিতে ভূগোল, ইতিহাস ও ব্যাকরণ পড়ানো হতো। শেখানোর মাধ্যম ইংরেজি হলেও তারাই প্রথম দেশিয় ভাষার মাধ্যমে উন্নত শিক্ষাপদ্ধতি ও পরিচালন ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন যার প্রভাব এখনও বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার অনেক ক্ষেত্রে লক্ষ্য করা যায়। এছাড়া মিশনারীগণ কর্তৃকই প্রথম ‘বাংলা ব্যাকরণ’ লেখা হয়। এদেশে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রবর্তনের ক্ষেত্রে রাজা রামমোহন রায় ছিলেন আর একজন বলিষ্ঠ সমর্থক। এদেশের কুসংস্কার দূর করে জনসাধারনের উন্নতিতে পাশ্চাত্য শিক্ষার মত উদার, উন্নত ও প্রগতিশীল শিক্ষা ব্যবস্থার সাহায্য নেওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মনে করতেন এবং তাঁর প্রচেষ্ঠায় সে সময় এদেশে অনেক স্কুল কলেজও খোলা হয়।

উপনিবেশিক যুগ ইংরেজ শাসনামলে অবিভক্ত ভারত দু’ভাগে বিভক্ত ছিল। প্রথম ভাগে শাসন পরিচালনা করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং দ্বিতীয় ভাগে ইংরেজ সরকার সরাসরি শাসন পরিচালনা করেন। ইংরেজ শাসনামলের প্রথম দিকে বিশেষ করে ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে এদেশে প্রাথমিক শিক্ষাক্ষেত্রে তেমন কোনো অগ্রগতি সাধিত হয়নি। তখন প্রাথমিক শিক্ষা বিস্তারের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে তেমন কোনো আর্থিক বরাদ্দও ছিল না। শিক্ষার জন্য যে বরাদ্দ হতো তার সিংহভাগই ব্যয় হতো মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে। প্রাথমিক শিক্ষার দায়িত্ব অর্পিত ছিল স্থানীয় স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলির উপর। তবে ১৮১৩ খ্রিস্টাব্দে ভারতের ইংরেজ শাসক লর্ড মিন্টোর প্রস্তাবনা অনুযায়ী ইংল্যান্ডের পার্লামেন্টে এক শিক্ষা সনদ এর মাধ্যমে তৎকালীন ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি এই উপমহাদেশে তাদের এলাকায় সরকারিভাবে শিক্ষার দায়িত্ব গ্রহণ করে। তখন ১৮১৩ খ্রিস্টাব্দের শিক্ষা সনদের ৪৩ নং ধারা অনুযায়ী এদেশীয় শিক্ষার জন্য ১ লাখ রূপি ধার্য করা হয়। এই সনদের মাধ্যমেই ব্রিটিশ ভারতে শিক্ষার জন্য প্রথম অর্থ বণ্টন, নীতি নির্ধারণ এবং নতুন শিক্ষা ব্যবস্থা নির্মাণের সূত্রপাত ঘটে।

২০ জানুয়ারি ১৮৩৫ সালে ভারতের তদানীন্তন বড়লাট লর্ড উইলিয়ম বেন্টিঙ্ক বাংলা ও বিহারের শিক্ষা বিষয়ক ব্যাপক ও পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য সংগ্রহের জন্য স্কটল্যান্ডবাসী মিশনারী উইলিয়ম অ্যাডামকে নিযুক্ত করেন। উইলিয়াম অ্যাডাম তাঁর দীর্ঘ গবেষণার ফলশ্রুতিতে ১৮৩৫ থেকে ১৮৩৮ সালের মধ্যে এদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কিত তথ্যের তিনটি বিবরণী দাখিল করেন। এগুলির মধ্যে প্রথম রিপোর্টটি ছিল প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কিত।

পরবর্তী সময়ে ১৮৪৪ সালে লর্ড হার্ডিঞ্জ এদেশের গ্রামাঞ্চলে মাতৃভাষার মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষার বিস্তারকল্পে ‘ভার্নাকুলার স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করেন, কিন্তু ইংরেজি শিক্ষার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ায় তা ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যায় যা ১৯০৪ সালে লর্ড  কার্জন কর্তৃক পুনরায় প্রবর্তিত হয়। এরপর ১৮৫৪ সালে স্যার চার্লস উডের বিখ্যাত ‘শিক্ষা প্রস্তাব’ (Wood's Education Despatch) প্রকাশিত হয় যা উড-এর শিক্ষা প্রস্তাব নামে পরিচিত। এই প্রস্তাবনা অনুসারে সমস্ত ভারতবর্ষের প্রতিটি প্রদেশে ‘ডাইরেক্টর অব পাবলিক ইনস্ট্রাকশন’ (DPI) বা ‘গণশিক্ষা পরিচালক’ এর পদ সৃষ্টি, অধিক সংখ্যক প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন এবং শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ প্রদানের জন্য ‘নর্মাল স্কুল’ স্থাপন করা হয়। ইংরেজি ও বাংলা উভয় ভাষাকে শিক্ষা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহূত করার ফলে প্রাথমিক শিক্ষাক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত ব্যাপক উন্নতি পরিলক্ষিত হয়। ১৮৮২ সালে লর্ড উইলিয়ম উইলসন হান্টারএর ভারতীয় শিক্ষা কমিশনের সুপারিশ অনুসারে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলিকে জেলা বোর্ড, পৌরসভা এবং বেসরকারি সংস্থার ওপর পরিচালনার ভার দেওয়া হয়। যদিও পরবর্তী সময়ে এই প্রকল্প ফলপ্রসু হয়নি। সে সময় তিন ধরনের বিদ্যালয় চালু ছিল। যথা- ১) প্রাথমিক বিদ্যালয় ২) মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও ৩) উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়। অবশ্য প্রতিটি বিদ্যালয়েই ইংরেজি পড়ানোর বিধান ছিল। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের জন্য ১৯০২ সালে প্রতিটি মহকুমায় ‘গুরু ট্রেনিং বিদ্যালয়’ও স্থাপন করা হয়।

১৯০২ সালের পরবর্তী সময়ে শিক্ষা সম্পর্কিত বিভিন্ন প্রস্তাব বা সুপারিশ করা হলেও সে সম্পর্কে সুস্পষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি কিংবা তার পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষাব্যবস্থায় তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন সাধন হয়নি। ১৯১৯ সালে ‘বঙ্গীয় প্রাথমিক শিক্ষা আইন’ প্রণয়ন করা হয় যেখানে প্রাথমিকভাবে শহর এলাকায় এবং পরে গ্রাম এলাকায় অবৈতনিক শিক্ষাব্যবস্থার সুপারিশ করা হয়। এরপর ১৯৩০ সালে প্রাথমিক শিক্ষা সংক্রান্ত আইন পাস হয়। এই আইন অনুসারে ৬-১১ বয়সের সকল ছেলেমেয়েদের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অবৈতনিক করা হয় এবং প্রাথমিক শিক্ষার মেয়াদ ৪ বছর হবে বলে উল্লেলখ করা হয়। ১৯৩৭ সালে পূর্ব বাংলার সরকার প্রাথমিক শিক্ষার উন্নতিকল্পে এক প্রস্তাব পেশ করেন এবং এ প্রস্তাবনা অনুযায়ী প্রাথমিক শিক্ষার চারটি শ্রেণিকে দু’ভাগে ভাগ করে শিক্ষা দেওয়ার ফলে অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা সর্বত্র প্রসার লাভ করতে থাকে। প্রাথমিক শিক্ষাকে গতিশীল রাখার জন্য ২৭ মাচ,র্ ১৯৪০ সালে এ স্তরের শিক্ষা পরিচালনার সরকারি নিয়মাবলী প্রণয়ন করা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা কার্যকর হতে পারেনি। ১৯৪৫ সালে প্রাথমিক শিক্ষার নিম্ন ও উচ্চ, এই দু’টি স্তরের পরিবর্তে চার বছর মেয়াদী প্রাথমিক শিক্ষাকাল নির্ধারণ করা হয় যা ইংরেজ শাসনের শেষ সময়াবধি কার্যকর ছিল।

১৯৪৭ পরবর্তী পর্যায় ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির ফলে পাকিস্তান ও ভারত নামে দুইটি রাষ্ট্রের জন্ম হয় এবং বর্তমান বাংলাদেশ তখন পূর্ববঙ্গ নামে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৪৮ সালে কেন্দ্রীয় সরকার ফজলুর রহমান শিক্ষা উপদেষ্টা কমিটির সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে পূর্ববঙ্গে (বাংলাদেশ) প্রাথমিক শিক্ষা চার বছরের পরিবর্তে পাঁচ বছরে অর্থাৎ পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত করে এবং অবৈতনিক বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা প্রবর্তনের উদ্দেশ্যে একটি দশ বছর মেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করে। পরবর্তীকালে ১৯৫২ সাল থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে ‘প্রাথমিক বৃত্তি’ পরীক্ষারও ব্যবস্থা করা হয়।

প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার (১৯৫৫-১৯৬০) উদ্দেশ্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয়, সার্বজনীন অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা কর্মসূচির সফল বাস্তবায়ন। যার প্রতিফলন দেখা যায় ১৯৫৭ সালে গঠিত ‘আতাউর রহমান শিক্ষা কমিশনে’, যেখানে অবৈতনিক বাধ্যতামূলক শিক্ষা প্রবর্তন ছাড়াও প্রাথমিক শিক্ষার ভার স্কুল বোর্ড এর পরিবর্তে প্রাদেশিক সরকারের ওপর অর্পিত করার কথা বলা হয়। এক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলির পরিবর্তে মডেল প্রাইমারি স্কুল স্থাপন করা হয় যা পরবর্তীকালে বিলুপ্ত হয়ে যায়। অর্থাৎ প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধি ছাড়া তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়নি। দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (১৯৬০-৬৫) প্রাথমিক শিক্ষাকে সার্বজনীন ও বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করা হয়। তৃতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (১৯৬৫-৭০) প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় মেয়ে শিক্ষার্থীদের আগমন নিশ্চিত করার জন্য সুপারিশ করা হয়।

পাকিস্তান সৃষ্টির জন্মলগ্ন থেকেই রাষ্ট্রের দুই অংশ অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি হয়ে আসছিলো এবং এই বৈষম্য বৃদ্ধি পেয়ে এমন এক রাজনৈতিক অস্থিরতার সৃষ্টি করে যার ফলশ্রুতিতে শিক্ষার এই সকল উদ্দেশ্যসমূহ বাস্তবায়ন করা তখন আর সম্ভবপর হয়ে উঠেনি।

বাংলাদেশ আমল  বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর গঠিত ১৯৭২ সালের সংবিধানে শিক্ষাকে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার হিসেবে উল্লেখ করা হয়। সংবিধানের ১৫ (ক), ১৭ এবং ২৮ (৩) নং আর্টিকেলে বাংলাদেশের নাগরিকদের শিক্ষার প্রতি রাষ্ট্রীয় দায়িত্বসমূহ বর্ণনা করা হয়েছে। দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনায়, বাংলাদেশ সরকার সে সময়ে প্রাথমিক শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেয়। প্রাচীন শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন এবং স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের উপযোগী সমাজগঠনমূলক একটি সার্বিক শিক্ষাব্যবস্থার রূপরেখা প্রণয়নের উদ্দেশ্যে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক গৃহীত প্রস্তাব অনুযায়ী ১৯৭২ সালের ২৬ জুলাই প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদ ড. কুদরাত-এ খুদাকে সভাপতি করে শিক্ষা কমিশন গঠনের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয় যা ১৯৭৪ সালের মে মাসে ‘বাংলাদেশ শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট’ নামে প্রকাশিত হয়। এটি পরবর্তীকালে ড. কুদরাত-এ-খুদার নামানুসারে ‘ড. কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট’ নাম রাখা হয়। এই কমিশনে প্রাথমিক শিক্ষাকে ১৯৭৬ সাল থেকে ক্রমধারায় ১৯৮৩ সালের মধ্যে প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করা হয় যদিও রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের কারণে তা পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হতে পারেনি। এছাড়াও, ১৯৭২ সালের সংবিধানের মূলনীতির আলোকে শিক্ষাকে ঢেলে সাজানোর পদক্ষেপ হিসেবে ২৬ অক্টোবর, ১৯৭৩ সালে ’Primary School Ordinance' এবং ১৯৭৪ সালে Primary Education Taking Over Act-এর মাধ্যমে বিপুল সংখ্যক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিচালন, নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব সরকার গ্রহণ করে। এর মাধ্যমে দেশের ৩৬,৬৬৬ টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত সকল শিক্ষক এবং স্কুলের যাবতীয় সম্পদ সরকারি নিয়ন্ত্রণে চলে যায় এবং এই পর্যায়ে প্রাথমিক শিক্ষা অবৈতনিক করা হয়। পরবর্তী সময়ে একাধিক শিক্ষা কমিশন গঠিত হয় এবং প্রায় প্রত্যেকটি কমিশন রির্পোটে প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করা হলেও সে সময়ে তা বাস্তবায়িত হয়নি।

প্রথম (১৯৭৩-৭৮) এবং দ্বিতীয় (১৯৮০-৮৫) পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাকালে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় দেশের ৮টি অঞ্চলে ৪৪টি থানায় International Development Agency (IDA)-এর অধীনে সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা (Universal Primary Education) প্রবর্তিত হয়। এছাড়া প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার (Non-formal Education) জন্য একটি ব্যাপক পরিকল্পনা গৃহীত হয়, যেমন গণবিদ্যালয়, সাক্ষরতা বিদ্যালয়, ফিডার স্কুল (Feeder School) যা প্রাথমিক শিক্ষার অগ্রসরকল্পে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। এছাড়া, বিদ্যমান প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম অন্তর্বর্তীকালীন দ্বি-বার্ষিক পরিকল্পনায়ও (১৯৭৮-৮০) অপরিবর্তিত ছিল। দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা গ্রহণের সময়ে প্রাথমিক শিক্ষার সফল উন্নয়নের লক্ষ্যে একটি স্বতন্ত্র প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরও প্রতিষ্ঠিত হয়।

পরবর্তীকালে ১৯৮১ সালে প্রাথমিক শিক্ষাক্ষেত্রে একটি আইন প্রণয়ন করা হয় যা ‘প্রাথমিক শিক্ষা আইন-১৯৮১’ নামে পরিচিত। এই আইনের অধীনে মহকুমা পর্যায়ে স্থানীয় শিক্ষা কর্তৃপক্ষ (Local Education Authority) গঠন করা হয় এবং প্রাথমিক শিক্ষায় পরিচালনা, নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসন ও তত্ত্বাবধান স্থানীয় শিক্ষা কর্তৃপক্ষের উপর ন্যস্ত করা হয়। তবে দুর্ভাগ্যবশতঃ আইনটি বাস্তবায়নের পূর্বেই বাতিল হয়ে যায়। ১৯৮২ সালে প্রশাসনিক পুনর্গঠন ও বিকেন্দ্রীকরণ অর্ডিন্যান্স জারির ফলে ১৯৮৩ সালে মহকুমা বিলোপ করে থানাকে উপজেলা পর্যায়ে উন্নীত করা হয় এবং উপজেলা প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণের ভিত্তিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রশাসনিক আদেশ বলে দেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব উপজেলা পরিষদের হাতে ন্যস্ত করে। তখন উপজেলা প্রশাসনের অধীনে প্রাথমিক শিক্ষার প্রশাসন, কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে উপজেলা পরিষদের নিয়ন্ত্রণে প্রেরণ করা হয়। এছাড়া শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক জারীকৃত ১৯৮৬ সালে Standing Orders on Distribution of Work, Organogram, Delegation of Financial and Administrative Powers and Authoritiers of the Education Division আইন প্রাথমিক শিক্ষার অনেক ক্ষেত্রে এখনও পর্যন্ত দিক নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়াও এ আইনে চাকরি নিয়োগ বিধি, শৃঙ্খলা বিধি, ছুটি, বদলি, পদোন্নতি, অবসর গ্রহণ ইত্যাদি সংক্রান্ত আইন-কানুন ও বিধি-বিধানও রয়েছে।

তৃতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাকালে (১৯৮৫-৯০) IDA এর অধীনে Universal Primary Education প্রকল্প চালু থাকার সাথে সাথে দেশব্যাপী সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষার জাতীয় প্রকল্প চালু হয়। সরকার প্রাথমিক শিক্ষার উন্নতিকল্পে সমন্বিত স্কুল উন্নয়ন নামে একটি উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এ পরিকল্পনা অনুসারে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলির সার্বিক উন্নতি বিধানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া এই পরিকল্পনার ফলশ্রুতিতে দ্বিতীয় প্রাথমিক শিক্ষা প্রকল্প ‘Second Primary Education Project (SPEP)’ বাস্তবায়ন করা হয়। এটি ছিল সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়নে একমাত্র সরকারি প্রজেক্ট যা প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর পরিচালনা করে। এই প্রকল্প বাংলাদেশ সরকার ও ৪টি আন্তর্জাতিক সংস্থা IDA, UNICEF, CIDA এবং UNDP-এর যৌথ অর্থায়নে বাস্তবায়িত হয়। এর মাধ্যমে স্কুলে ছাত্রছাত্রীর ভর্তি হার বাড়ানো এবং শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক শিক্ষাচক্র সমাপ্ত করার সহায়ক কর্মসূচি হিসেবে SMC (School Managing Commitee), PTA, UEC (Upazila Education Commission) গঠন এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণেরও ব্যবস্থা করা হয়। এ ছাড়াও প্রাথমিক শিক্ষাকে আরও কার্যকর করার লক্ষ্যে ১৯৭৬ সালে প্রণীত জাতীয় শিক্ষাক্রম ও সিলেবাসের নবায়ন ও উন্নয়ন করা হয় এবং সকল শিক্ষার্থীদেরকে বিনামূল্যে বই সরবরাহ করা হয়। এ সময় ৪টি পর্যায়ে প্রাথমিক শিক্ষার পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার কাজ পরিচালিত হতো। এগুলো হল- শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, উপজেলা পরিষদ এবং স্কুল ম্যানেজিং কমিটি।

চতুর্থ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (১৯৯০-৯৫) প্রাথমিক শিক্ষাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়। ১৯৯০ সালে জাতীয় সংসদ কর্তৃক ‘প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক আইন’ গৃহীত হয় এবং ঐ বছর ১৩ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতির সম্মতি লাভের মাধ্যমে বাংলাদেশ গেজেটের এক অতিরিক্ত সংখ্যায় বিজ্ঞাপিত হয়। ১৯৯২ সালে ১ জানুয়ারি থেকে সারা দেশের ৬৮টি থানায় বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা প্রবর্তন করা হয়। এছাড়া ১৯৯০ সালে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা আইনটির বাস্তবায়ন ও মনিটরিং ইউনিট (Compulsary Primary Education Implementation Monitoring Unit-CPEIM) গঠিত হয়। প্রাথমিক শিক্ষার কাঠামোকে শক্তিশালী করা, সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিতকরণ এবং নিরক্ষরতা দূরীকরণের লক্ষ্যে ১৯৯২ সালের আগস্টে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিভাগ (Primary and Mass Education Division-PMED) নামে একটি নতুন বিভাগ গঠিত হয়। এর অধীনে প্রাথমিক শিক্ষায় সার্বিকভাবে ভর্তিহার বৃদ্ধি, ছেলে ও মেয়ে শিক্ষার্থীর সম-অন্তর্ভুক্তি এবং শিক্ষার সঠিক ও গুণগত মান উন্নয়নের লক্ষ্যে, বিশেষ করে ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম এবং খুলনা বিভাগের প্রাথমিক স্তরের শিক্ষা, শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তকের মান উন্নয়নের লক্ষ্যে ‘General Education Project-GEP’ এর অন্তর্ভুক্ত তিনটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। এ ছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় বিদ্যালয় নির্মাণের প্রকল্পও পরবর্তী সময়ে বাস্তবায়ন করা হয়। ১৯৯৫ সালে পল্ললীর প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিদ্যালয় গমনোপযোগী ৬-১০ বছরের শিশুদের জন্য ‘স্যাটেলাইট স্কুল’ তৈরি করা হয় এবং প্রাথমিকভাবে সারাদেশে ৪০০০ স্কুল তৈরি করা ও ২০০০ সালের মধ্যে এর সংখ্যা ৬ হাজারে উন্নীত করার প্রকল্প হাতে নেওয়া হলেও বর্তমানে এর আর কোনো অস্তিত্ব নেই।

পঞ্চম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (১৯৯৭-২০০২) প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে গৃহীত ২৩টি প্রকল্পের অধিকাংশই কার্যকরীভাবে বাস্তবায়িত হয়। পরবর্তী সময়ে উন্নয়ন পরিকল্পনায় ‘শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি’ (Food for Education Programme) এবং ‘উপজেলা রিসোর্স সেন্টার’ (Upazila Resource Centre)-এর উদ্ভাবন হয়। এ ছাড়া প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়নে এবং এর সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন প্রকল্পের বাস্তবায়নে বাংলাদেশ সরকারের সাথে সাথে উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান যেমন-Asian Development Bank (ADB), World Bank, Department for International Development (DFID), German Technical Cooperation (GTZ), International Development Agency (IDA), Islamic Development Bank (IDB), Norwegian Agency for Development (NORAD), United Nation’s Children Fund (UNICEF), Swedish International Development Agency (SIDA), USAID সম্মিলিতভাবে কাজ করে থাকে। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার ADB-এর আর্থিক সহায়তায় এক নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করে যা ‘প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন প্রোগ্রাম (Primary Education Development Programme-PEDP) নামে পরিচিত। PEDP-I পরিপূর্ণভাবে সফলতা অর্জন করতে না পারায় ২০০২ সালে PEDP-II প্রকল্প গ্রহণ করা হয় যার প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষার্থী ভর্তিহার বৃদ্ধি এবং পরিপূর্ণভাবে প্রাথমিক শিক্ষাচক্র সম্পন্ন করা অর্থাৎ শিক্ষার হার ও শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে সহায়তা করা।

পরবর্তী সময়ে জানুূয়ারি, ২০০৩ সালে ‘প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিভাগ’ মন্ত্রণালয়ে পরিবর্তিত হয়ে ‘প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়’ (Ministry of Primary and Mass Education- MOPME) এ পরিণত করা হয়। এই মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন সরকারের সচিব। আর সচিবকে সহায়তা করার জন্য ২ জন যুগ্ম সচিব, ৪ জন উপ-সচিব, ১ জন উপ-প্রধান, ৯ জন সিনিয়র সহকারী সচিব বা সহকারী সচিব, ১ জন সিনিয়র সহকারী প্রধান, ২ জন সহকারী প্রধান, ১ জন পরিসংখ্যান কর্মকর্তা এবং ৫৬ জন কর্মচারী নিয়োজিত থাকেন। প্রাথমিক এবং উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার নীতিমালা প্রণয়ন, প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা এবং সার্বিক তত্ত্বাবধান করাই এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। তবে বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নের জন্য গৃহীত সকল প্রকল্পই এই মন্ত্রণালয়ের অধীন PEDP-II এর অন্তর্ভুক্ত থেকে বাস্তবায়িত হচ্ছে।

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা মূলত দেশিয় এবং পাশ্চাত্য শিক্ষাব্যবস্থা ও পদ্ধতির সম্মিলিত ফল। হাজার বছরের আর্য বা হিন্দু শিক্ষাব্যবস্থা, বৌদ্ধ শিক্ষাব্যবস্থা এবং সর্বশেষ মুসলিম শিক্ষাব্যবস্থার সংমিশ্রণ, সাথে রয়েছে পাশ্চাত্য শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামো। প্রকৃতপক্ষে ১৪৯৮ সালে ভাস্কো-দা-গামা কর্তৃক ভারতে আসার জলপথ আবিষ্কারের পর থেকেই এই উপমহাদেশে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রচার ও প্রসার প্রক্রিয়া শুরু হয়। কালক্রমে পর্তুগিজ, ওলন্দাজ, ফরাসি, দিনেমার এবং ইংরেজ মিশনারিগণ এদেশে শিক্ষা বিস্তারের বিভিন্ন কর্মকান্ড পরিচালনা করেন। বর্তমানে বাংলাদেশে ৬-১০ বছর বয়সী শিশুদের জন্য ৫ বছর মেয়াদী প্রাথমিক শিক্ষা প্রচলিত রয়েছে। ১ম থেকে ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা স্তর হিসেবে গণ্য করা হয় এবং দেশের ৬ থেকে ১০ বছরের সব শিশুর জন্য এই শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে নির্ধারিত বয়সসীমা যাই থাকুক না কেন বাস্তবে বাংলাদেশে ৪/৫ বছর থেকে শুরু করে ১৩ বছর পর্যন্ত বয়সের ছেলেমেয়েরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করে থাকে।

উল্লেখ্য যে, পূর্বে সরকারিভাবে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থা না থাকলেও বর্তমানে ৭ ডিসেম্বর, ২০১০ সালে জাতীয় সংসদে পাসকৃত ‘জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০’-এ ৫ বছর বয়স থেকে ১ বছর মেয়াদি প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার কথা বলা হয়েছে। তবে, দেশের অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিশেষ করে বিভিন্ন কিন্ডার গার্টেনে পূর্ব থেকেই এ ধরনের প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা চালু ছিল যেখানে শিশুদেরকে খেলাধুলা ও আনন্দের মাধ্যমে বর্ণমালা, সংখ্যা, ছড়া প্রভৃতি বিষয়ে শিক্ষা প্রদান করা হয়।

বর্তমানে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক গৃহীত সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষার আওতায় বিদ্যালয়ে ভর্তিকৃত সকল শিশুর সামর্থ্য ও চাহিদার প্রতি সচেতন দৃষ্টি রেখে সার্বিকভাবে ৯টি বিষয়কে শিক্ষাক্রমের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যথা- বাংলা, গণিত, পরিবেশ পরিচিতি: সমাজ, পরিবেশ পরিচিত: বিজ্ঞান, ইংরেজি, ধর্ম, শারীরিক শিক্ষা, চারু ও কারুকলা এবং সংগীত। এক্ষেত্রে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে পরিবেশ পরিচিতি সমাজ ও বিজ্ঞান একটি সমন্বিত বিষয় হলেও তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পরিবেশ পরিচিতি: সমাজ ও পরিবেশ পরিচিত: বিজ্ঞান নামক দুটি বিষয় পৃথকভাবে পাঠ্যক্রমে রয়েছে।

বাংলাদেশে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রধানত চার ধরনের বিদ্যালয় রয়েছে। যথা- সরকারি বিদ্যালয়, পরীক্ষণ বিদ্যালয় যা PTI এর সাথে সংযুক্ত, নিবন্ধীকৃত বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং কমিউনিটি বিদ্যালয়। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং পরীক্ষণ বিদ্যালয়গুলো সম্পূর্ণরূপে সরকারি অর্থে পরিচালিত। অন্যদিকে নিবন্ধীকৃত বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তাদের বেতনের শতকরা ৯০% সরকারের কাছ থেকে পেয়ে থাকেন। আর কমিউনিটি বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সরকারের কাছ থেকে নির্ধারিত হারে বেতন পেয়ে থাকেন। উল্লেলখিত চার ধরনের বিদ্যালয় ছাড়াও অনিবন্ধীকৃত বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, হাই স্কুল সংলগ্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়, কিন্ডার গার্টেন এবং কিছু এনজিও পরিচালিত প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এ ছাড়াও রয়েছে এবতেদায়ী মাদ্রাসা এবং হাই মাদ্রাসা সংযুক্ত ইবতেদায়ী মাদ্রাসা (সাধারণ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সমান্তরাল)। পূর্বে স্যাটেলাইট বিদ্যালয় নামে এক ধরনের প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও ২০০৪ সাল থেকে এই স্কুলগুলো বন্ধ হয়ে যায়। অর্থাৎ, বাংলাদেশে বর্তমানে ১০ প্রকার প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে যার সংখ্যা প্রায় ৮০,৪০১ টি যেখানে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশু লেখাপড়া করছে এবং শিক্ষক সংখ্যা প্রায় সোয়া তিন লাখ।

বাংলাদেশে এ পর্যন্ত গঠিত অধিকাংশ জাতীয় শিক্ষা কমিশন ও জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটি ৫ বছরের স্থলে ৮ বছর মেয়াদী প্রাথমিক শিক্ষা প্রবর্তনের সুপারিশ করে আসছে। এছাড়াও জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটি ২০০০ সালে প্রাথমিক শিক্ষার উপরে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেন যেখানে ৮ বছর মেয়াদী প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়। তাদের মতে, প্রাথমিক শিক্ষা দেশের বিরাট সংখ্যক শিক্ষার্থীর জন্য সমাপনী স্তর। এই স্তরের উপযোগী শিক্ষা গ্রহণের পর বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীকে জীবন ও জীবিকার জন্য বিভিন্ন পেশা গ্রহণসহ শ্রমবাজারে প্রবেশের চিন্তা করতে হয়। ফলে ৮ বছর মেয়াদী প্রাথমিক শিক্ষা তাদের জীবনে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়। তবে দেশিয় সম্পদের সীমাবদ্ধতা এবং ব্যবস্থাপনাগত অসুবিধা ইত্যাদি বিবেচনায় রেখে বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে তা উপযোগী নয় বলে আপাতত প্রাথমিক শিক্ষার মেয়াদ ৫ বছরেই রাখার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। [তাপস কুমার বিশ্বাস এবং তানিয়া রুবাইয়া]