প্রাকইতিহাস


প্রাকইতিহাস  বাংলা ‘বেসিন’-এর অনেক অংশে প্রাগৈতিহাসিক ও প্রায়-ঐতিহাসিক মানব বসতি ও সংস্কৃতির নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে। তৎকালীন সংস্কৃতি সম্পর্কিত নির্ভরযোগ্য ও অর্থপূর্ণ অনুমান এবং এর কাল নিরূপণের জন্য এ সমস্ত সাক্ষ্যগুলিকে- বিশেষ করে হাতিয়ার, ব্যবহূত বস্ত্ত, অন্যান্য প্রত্ননিদর্শন ইত্যাদিকে ভূমিরূপ, মৃত্তিকা ও পললের সাথে ভূতাত্ত্বিক ও ভূ-গঠন প্রক্রিয়ার সাথে সমন্বয় সাধনের চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু প্রাগৈতিহাসিক ও প্রায়-ঐতিহাসিক মানব বসতি ও সংস্কৃতির গতি-প্রকৃতি পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে পুরোপুরি সাফল্য লাভ করা যায় নি। তবে এ ব্যাপারে প্রত্নতাত্ত্বিকগণ গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন।

বাংলাদেশের প্রাকইতিহাস এদেশের চারিদিকে অবস্থিত বিভিন্ন দেশের, বিশেষ করে আসাম, অরুণাচল প্রদেশ, মনিপুর, নাগাল্যান্ড, মেঘালয়, মিজোরাম, ত্রিপুরা, বিহার, উড়িষ্যা, পশ্চিম বাংলা এবং মায়ানমারের প্রাকইতিহাসের সাথে সম্পর্কযুক্ত। বাংলাদেশের বর্তমান সীমারেখার মধ্যে প্রাগৈতিহাসিক অনুসন্ধান চারিদিকে অবস্থিত পার্শ্ববর্তী দেশগুলির তুলনায় অপেক্ষাকৃত নবীন ও সীমিত। তাছাড়া আসাম, বিহার এবং বঙ্গে প্রাপ্ত প্রাগৈতিহাসিক রেকর্ডসমূহ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অবিন্যস্ত। তাই এখন পর্যন্ত এ অঞ্চলের প্রাগৈতিহাসিক সংস্কৃতি সম্বন্ধে খুব বেশি জানা যায় নি।

বিশ শতকের ষাট দশকে উত্তর-পূর্ব ভারতে (আসাম, অরুণাচল, মনিপুর, মেঘালয়, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড, ত্রিপুরা) বিজ্ঞানভিত্তিক প্রাগৈতিহাসিক ও প্রায়-ঐতিহাসিক নিদর্শনের জন্য অনুসন্ধান শুরু হয়। এ সময়ে আসামের উত্তর কাছার পাহাড়ে লাংথিং এবং মহুর নদী উপত্যকায় এইচ.ডি সাংকালিয়ার নেতৃত্বে এক দল প্রত্নতত্ত্ববিদ অনুসন্ধান পরিচালনা করেন এবং দাউঝালি হাডিং নামে স্তরায়িত নবোপলীয় প্রত্নস্থল চিহ্নিত করেন। এখানে পরিচালিত উৎখননে একটি মসৃণ প্রস্তর হাতিয়ার শিল্প, একটি মৃৎপাত্র শিল্প ও বেশ কিছু গৃহসামগ্রী যেমন কর্ন গ্রাইন্ডার, স্টোন রাবার, ম্যুলার উম্মোচিত হয়। গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগ গারো পাহাড়ের গানোল, রংগ্রাম এবং সিমসাং নদী উপতক্যায় অনুসন্ধান পরিচালনা করে এবং প্রস্তর যুগের সকল পর্বের সাংস্কৃতিক বস্ত্ত সম্বনিত অনেক প্রত্নস্থল সনাক্ত করে।

প্রত্নস্থলগুলির মধ্যে সেলবাগিরি, থেব্রোংগিরি, মিসিমাগিরি, মোকবল আব্রি ও রংগ্রাম আলাগিরিতে পরীক্ষামূলক উৎখনন করা হয়। থেব্রোংগিরি, মোকবল আব্রি ও মিসিমাগিরি-২ এ ডলেরাইটের তৈরি কিছু হাতকুঠার, ক্লিভার ও বড় ডিসকয়েডসহ প্রচুর কোর, ফ্লেক ও অসম্পূর্ণ হাতিয়ার উন্মোচন করা হয়। মিসিমাগিরি-৩ এবং ডিডামি থেকে বিভিন্ন রকম ব্লেড ও প্রচুর পরিমাণ ব্লেডফ্লেকসহ বেশ কিছু ফ্লুটেড কোর আবিষ্কৃত হয়। গারো পাহাড়ে আর এক ধরনের ভিন্ন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রস্তর বস্ত্ত পাওয়া যায়, যা পূর্বাঞ্চলীয় পেব্ল ঐতিহ্য নামে পরিচিত। সিমসাং-নাঙ্গাল উপত্যকার নাঙ্গালবিব্রায়, ডলেরাইট ও চার্টের নুড়ির তৈরি এ সংস্কৃতির পেব্ল ও ফ্লেক হাতিয়ার চিহ্নিত করা হয়েছে।

সেলবাগিরি ও থেব্রোংগিরিতে অবস্থিত প্রত্নস্থলগুলোর ভূপৃষ্ঠে মাইক্রোলিথ পাওয়া যায়। পরে রংগ্রাম উপত্যকার সেলবাগিরি গ্রামের নিকট পুরাতন নদী সোপানে উৎখননে দেখা যায় যে, মাইক্রোলিথিক স্তরের অবস্থান নবোপলীয় স্তরের নিচে। এখানকার উল্লেখযোগ্য নবোপলীয় হাতিয়ার হচ্ছে গ্রাউন্ড এবং চিপ্ড এক্স (হাতকুঠার) ও হাতের তৈরি ধূসর সাধারণ মৃৎপাত্র। রংগ্রাম আলাগিরি উৎখননে দুটি সাংস্কৃতিক স্তর অবমুক্ত করা হয়: (১) গোলাকৃতির বাটযুক্ত হাতকুঠারের উপস্থিতি ও সোল্ডার হাতকুঠারের অনুপস্থিতিতে বৈশিষ্টায়িত উপরের স্তরের নবোপলীয় সংস্কৃতি এবং (২) মৃৎপাত্রবিহীন, ভারী প্রস্তর পাউল্ডারসহ পেব্ল হাতকুঠার ও চপার সম্বলিত এবং নবোপলীয় স্তরের নিচে অবস্থিত হোবিনহিয়ান সংস্কৃতি। রংগ্রাম নদীর বাম তীরে ও রেনচাঙ্গগিরি গ্রামের ২ কিমি দক্ষিণ-পশ্চিমে চিত্রা আব্রিতে উৎখননে দুটি বড় প্রস্তর যুগীয় শিল্প উন্মোচিত হয়। এদের একটি হচ্ছে ফ্লেক-ব্লেড শিল্প এবং অপরটি হচ্ছে হাতে তৈরি মৃৎপাত্রসহ নবোপলীয় গ্রাউন্ড-প্রস্তর কুঠার শিল্প।

চিত্রা আব্রি প্রত্নবস্ত্তসমূহের বৈশিষ্ট্য হলো এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে সোল্ডার্ড সেল্ট রয়েছে এবং এর সবগুলি হাতিয়ারই ডলেরাইট দ্বারা তৈরি। আসামের কামরূপ জেলার সারুতরু নামক স্থানে ডিব্রুগড় বিশ্ববিদ্যালয় উৎখনন কার্য পরিচালনা করে এবং নবোপলীয় সংস্কৃতির হাতিয়ার উন্মোচন করে।  আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া এর প্রাগৈতিহাসিক শাখার বি.পি বোপারডিকার অরুণাচল প্রদেশের লুহিত জেলার ডেফাবুম অঞ্চলে অনুসন্ধানকার্য পরিচালনা করেন এবং তিনি এ অঞ্চলে পুরোপলীয় ও নবোপলীয় ঐতিহ্যের হাতিয়ার আবিষ্কার করেন। আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব মনিপুর স্টেট এর ও.কে সিং এ প্রদেশের বিভিন্ন এলাকায় জরিপ চালান এবং উখরুলের নিকট বেশ কিছু চুনাপাথরের গুহা আবিষ্কার করেন। তিনি ৩নং গুহায় একটি পরিখা খনন করে হাড় ও পাথরের তৈরি হাতিয়ার পান। মিজোরাম থেকে একটি মাত্র পাথরের কুঠারের কথা জানা যায়। নাগাল্যান্ডের কেন্দ্রীয় অংশে সেমা ও লহোটা অঞ্চলে ভূ-পৃষ্ঠীয় ডাইওরাইট/সারপেন্টাইন পাথরের হাতিয়ারের সংগ্রহ (অবশ্য কিছু হাতিয়ার শেল, সিস্ট, বেলেপাথর দ্বারা তৈরি) এ প্রদেশের প্রাগৈতিহাসিক যুগের নির্দেশ করে। এই সংগৃহীত হাতিয়ারগুলিকে দুটো গ্রুপে ভাগ করা হয়েছে: একটি হচ্ছে সোল্ডারড্ / ট্যাঙ্গড সেল্ট সমৃদ্ধ এবং অপরটি ত্রিকোণাকার/ পয়েন্টেড বাটযুক্ত কুঠার সমৃদ্ধ।

বদ্বীপীয় সমতল দেশ বাংলাদেশকে ছাড়িয়ে উত্তর-পূর্ব ভারতের সবচেয়ে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় সীমানা প্রদেশ ত্রিপুরার খোয়াই ও হাওড়া নদী উপত্যকায় জিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার এন.আর রমেশ অর্ধ ডজনের উপরে হাতিয়ার সমৃদ্ধ প্রত্নস্থল শনাক্ত করেন। তিনি এ অঞ্চলের বিভিন্ন অবস্থান যেমন তেলিয়ামুড়া, জিরানিয়া, মোহনপুর, বিশালগড় ও আগরতলা থেকে ৭০০ এরও বেশি প্রস্তর যুগীয় হাতিয়ার সংগ্রহ করেন। ত্রিপুরার প্রাকইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এখানকার সবগুলো হাতিয়ারই স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য প্রস্তরীভূত জীবাশ্ম কাঠের তৈরি। এ হাতিয়ারগুলিকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে: (ক) নবোপলীয় হাতিয়ারের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ পোলিশ্ড এক্স বিহীন প্রাক-নবোপলীয় হাতিয়ার ও (খ) পোলিশ্ড এক্স সমৃদ্ধ নবোপলীয় হাতিয়ারসমূহ। প্রাক-নবোপলীয় হাতিয়ারসমূহ শেষ প্লাইস্টোসিন-হলোসিন যুগের (পুরাতন ও নতুন টেরেসের কালনিরূপিত স্তরিভূত অবক্ষেপসমূহের রেকর্ড থেকে বুঝা যায় যে এদের বয়স ৩৫০০০ বছরের চেয়ে অনেক কম এবং ৩৫০০ বছরের চেয়ে পুরাতন)। এই প্রত্নবস্ত্তসমূহ বার্মার ইরাবতী নদী উপত্যকায় প্রাপ্ত অ্যানাথিয়ান ও নবোপলীয় প্রত্নবস্ত্তসমূহের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।

ছোট নাগপুর মালভূমি পালামৌ, রাঁচি, হাজারীবাগ, মুঙ্গের, গয়া এবং সিংভূম জেলাগুলির বিভিন্ন অবস্থান থেকে নিম্ন পুরোপলীয় যুগের হাতিয়ার আবিষ্কৃত হয়েছে। পালামৌ জেলায় ঠিক স্তরায়িত প্রেক্ষাপটে কোন নিম্ন বা মধ্য পুরোপলীয় হাতিয়ার পাওয়া যায় নি। দিলীপ কুমার চক্রবর্তী পরিবর্তিত ধরণের কিছু প্রত্নবস্ত্তর কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি এবং এ.কে ঘোষ ৭টি উচ্চ পুরোপলীয় প্রত্নস্থল (এ প্রত্নস্থলসমূহে প্রাপ্ত হাতিয়ারসমূহ হচ্ছে কোয়ার্টজ এবং চার্টের তৈরি পয়েন্ট, ব্লেড, বিউরিন, ছুরি ও সুঁচ) আবিস্কার করেছেন। হাজারীবাগ-গিরিড অঞ্চলের প্রাগৈতিহাসিক গুরুত্ব স্পষ্ট নয়। এখানে চারটি নিম্ন ও চারটি মধ্য এবং বেশ কিছু উচ্চ পুরোপলীয় সংস্কৃতির অবস্থানের কথা জানা গেছে। এ প্রত্নস্থলসমূহে কোয়ার্টজের তৈরি ফ্লেক, হাতকুঠার, স্ক্রেপার, বোরার, পয়েন্ট ইত্যাদি পাওয়া যায়। বিদুলা জয়াসাল রাঁচি জেলার নয়টি প্রত্নস্থল থেকে প্রাপ্ত ত্রিশটি নতুন হাতিয়ারের কথা উল্লেখ করেছেন। এ হাতিয়ারসমূহ হলো চপিং হাতিয়ার, হাতকুঠার, স্ক্রেপার, ফ্লেক, কোর, ক্লিভার ইত্যাদি। এ.কে ঘোষ উচ্চ সুবর্ণরেখা নদী উপত্যকায় অবস্থিত এই জেলার কিছু নির্দিষ্ট অঞ্চলে অনুসন্ধান পরিচালনা করেন এবং প্রস্তর হাতিয়ার সমেত বেশ কিছু প্রত্নস্থল চিহ্নিত করেন। দিলীপ কুমার চক্রবর্তীও এই জেলায় কিছু প্রস্তর হাতিয়ারের অবস্থান আবিষ্কার করেন।

রাঁচি অঞ্চলের প্রস্ত্তর যুগীয় শিল্পে মূলত উচ্চপুরোপলীয় হাতিয়ারের সমাবেশ ও মাইক্রোলিথ এবং কিছু নিম্নপুরোপলীয় উপাদান বিদ্যমান। এ হাতিয়ারগুলি সাধারণত কোয়ার্টজ দ্বারা তৈরি এবং কিছু কিছু হাতিয়ার ধূসর-কালো চার্ট দ্বারা নির্মিত। প্রত্নতত্ত্ববিদগণ সিংভূম জেলায় ৪০টি প্রাগৈতিহাসিক প্রত্নস্থল চিহ্নিত করেছেন। এ অঞ্চলের হাতিয়ারগুলির মধ্যে কোয়ার্টজাইটের তৈরি নিম্নপুরোপলীয় হাতিয়ার (হাতকুঠার, চপার, চপিং হাতিয়ার, ক্লিভার, ডিসকয়েড, কোর, ইত্যাদি) এবং মিহিকণা কোয়ার্টজাইটের তৈরি মধ্য পুরোপলীয় হাতিয়ার (বোরার, পয়েন্ট, বিভিন্ন ধরনের স্ক্রেপার, রিটাচ্ড ফ্লেক ইত্যাদি) ও উচ্চ পুরোপলীয় হাতিয়ার (ব্লেড, রিটাচ্ড ব্লেড, বিউরিন, পয়েন্ট ইত্যাদি) রয়েছে। দিলীপ কুমার চক্রবর্তী সাঁওতাল পরগনা জেলার পশ্চিমাংশের উঁচু-নিচু ভূভাগে বিচ্ছিন্ন কিছু নিম্নপুরোপলীয় হাতিয়ারের অবস্থান সনাক্ত করেছেন। তিনি রাজমহল ও দামিন অঞ্চলে উচ্চ পুরোপলীয় শিল্পের ব্যাপক অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হন। তিনি দামিন শিল্পকে একটি আঞ্চলিক উচ্চ পুরোপলীয় শিল্প বলে অভিহিত করেন। এ ছাড়াও বিহারের মুঙ্গেরের নিকট খড়গপুর রেঞ্জে অবস্থিত পায়েসরায় লোকেলিটি এফ এ ভূ-পৃষ্ঠ থেকে ৬৫-৯০ সেমি নিচে ১০৫ বর্গ মিটার আয়তনের একটি মেসোলিথিক বসতি ফ্লোর উৎখননের মাধ্যমে অবমুক্ত করা হয়েছে এবং এই উৎখননে ২৬টি ফিনিস্ড মাইক্রোলিথ হাতিয়ার (লুনেট, সাইড স্ক্রেপার, বেকড ব্লেড ইত্যাদি ও একটি মাইক্রো-গ্যাভিটি পয়েন্ট) পাওয়া গেছে। এ প্রত্নস্থলটির রেডিও কার্বন ডেটিং অনুসারে এ প্রত্নস্থলের সম্ভাব্য সময় নির্ধারন করা হয় ৬৩৭৭ খ্রিস্টপূর্ব থেকে ৬০৬৭ খ্রিস্টপূর্ব। ছোটনাগপুর অঞ্চল থেকে কোন নির্ভরযোগ্য নবোপলীয় প্রত্নস্থল আবিষ্কৃত হয় নি, যদিও উত্তর বিহারের অ্যালুভিয়াল প্লেনের বিভিন্ন প্রত্নস্থলে (চিরান্ড, সেনার, তারাদি ইত্যাদি) নবোপলীয় স্তরের প্রাচুর্য রয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গে প্রাগৈতিহাসিক ও প্রায়-ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ভূ-তাত্ত্বিকভাবে, পশ্চিমবঙ্গ (২১°৩৪´ থেকে ২৭°১০´ উত্তর, ৮৫°৫০´ থেকে ৮৯°০৫´ পূর্ব) এক বিচিত্র ভূমিরূপের সমন্বয়: উত্তরে হিমালয়, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, পশ্চিমে ক্ষয়জাত পাহাড়শ্রেণী, পূর্বে নদীবিধৌত সমতল। এই চারটি অঞ্চল আবার চারটি ভিন্ন প্রতিবেশমন্ডলের আওতাভুক্ত। ভূমির মোট পরিমাণ ৮৭.৬১৬ বর্গ কিমি। পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে পাওয়া গেছে পুরোপলীয় সংস্কৃতির নিদর্শন। এই অঞ্চলে পড়েছে বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, বীরভূম ও বর্ধমান জেলা এবং মেদিনীপুরের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশ। বিভিন্ন নদী, যেমন কসাই বা কংসবতী, সুবর্ণরেখা, ময়ুরাক্ষী, অজয়, দামোদর, গন্ধেশ্বরী প্রভৃতি এবং এদের শাখা নদীসমূহ জালের মত জড়িয়ে আছে এই বিশাল এবড়ো-থেবড়ো ভূমি জুড়ে। পুরোপলীয় প্রত্নস্থলগুলির অবস্থান মূলত ৫০ সমোন্নতি রেখার উপরে, বিভিন্ন পর্বত ঢালে, ছোট পাহাড়ে কিংবা উঁচু স্থানে এবং নদী তীরে।

প্রস্তরীভূত জীবাশ্ম কাঠের হাতিয়ার (প্রাক নবোপলীয়), লালমাই

এই রাজ্যে আছে ১৬২টি নিম্ন পুরোপলীয় প্রত্নস্থল। এদের এক বিরাট অংশ পাওয়া গেছে রাঢ় অঞ্চলের পাহাড়ে, উপত্যকার ঢালে বা নদীতীরে। প্রাপ্ত প্রত্নবস্ত্তর অধিকাংশই কোয়ার্টজ বা কোয়ার্টজাইট দ্বারা তৈরি। বর্ধমান জেলার এগারো মাইল ও মেদিনীপুর জেলার তারাফেনী রিজার্ভয়ার ব্রিজ-এ প্রস্তরীভূত জীবাশ্ম কাঠের তৈরি প্রত্নবস্ত্ত পাওয়া গেছে। এই অঞ্চলে প্রাপ্ত নিম্নপুরোপলীয় প্রত্নবস্ত্তর মধ্যে রয়েছে হাতকুঠার, ক্লীভার, নোড়া, বিভিন্ন প্রকার স্ক্র্যাপার, রিটাচড্ ব্লেড, ফ্লেক, কোর ইত্যাদি। গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নস্থলগুলির মধ্যে আছে এগারো মাইল (বর্ধমান), পরীহাটি, মোহনপুর, সাতবটী, তারাফেনী রিজার্ভয়ার ব্রীজ (মেদিনীপুর), নাকবিন্ধী, পতিনা, জিবধারীপুর (বীরভূম), জগন্নাথপুর, গাঙ্গানীর মঠ প্রভৃতি।

মধ্য পুরোপলীয় যুগের মোট ৪১টি প্রত্নস্থলের অস্তিত্ত্ব পাওয়া গেছে পশ্চিমবঙ্গে। এদের মধ্যে ১৯টির অবস্থান বাঁকুড়া’য়, ১৩টির মেদিনীপুরে এবং বীরভূম ও বর্ধমান জেলায় চারটি করে। ফ্লেক হাতিয়ার এবং লেভালয় কৃৎকৌশলের ব্যবহার এ স্থানে প্রাপ্ত মধ্য-পুরোপলীয় প্রত্নবস্ত্তর প্রধান বৈশিষ্ট্য। প্রত্নবস্ত্তর মধ্যে রয়েছে স্ক্র্যাপার, পয়েন্ট এবং বোরার ইত্যাদি। গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নস্থলগুলির মধ্যে আছে কানাপাহাড়, দাভা (পুরুলিয়া), বাঁকুড়া জেলার ধানকুড়া এবং মেদিনীপুর জেলার পরীহাটি, মোহনপুর, সাতবাটি ইত্যাদি।

আপার বা উচ্চ পুরোপলীয় যুগের ১০টি প্রত্নস্থলের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে পশ্চিমবঙ্গে। এদের মধ্যে পাঁচটি মেদিনীপুর, চারটি বাঁকুড়া এবং একটি বর্ধমান জেলায়। মেদিনীপুরের কাত্তারা (২২°৩৯´ উ. ৮৬°৪১´ পূ.) প্রত্নস্থলটির খনন কার্য ১৯৮৯ সালে এ. দত্ত এবং ডি. রায়ের তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন হয়। পশ্চিমবঙ্গে প্রাপ্ত উচ্চ পুরোপলীয় সংস্কৃতির প্রত্নবস্ত্তগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ট্যাঙ্গড পয়েন্ট, বেকড ব্লেড, বিউরিন, স্পিয়ার হেড ইত্যাদি এবং এগুলি সবুজ কোয়ার্টজাইট, চার্ট, কোয়ার্টজ, বেলেপাথর ইত্যাদি দ্বারা তৈরি।

প্রস্তরীভূত জীবাশ্ম কাঠের হাতিয়ার (নবোপলীয়), লালমাই

পশ্চিমবঙ্গে ২০৮টি মাইক্রোলিথ প্রত্নস্থলের কথা জানা গেছে। এদের মধ্যে ৮৬ টি বাঁকুড়ায়, ৬১টি মেদিনীপুরে, ৩৬ টি বীরভূমে এবং মুর্শিদাবাদ ও চবিবশ পরগনা জেলায় একটি করে। এদের মধ্যে মাত্র তিনটিতে উৎখনন কার্য সম্পন্ন হয়েছে; এগুলি হচ্ছে বর্ধমান জেলার বীরভনপুর, বীরভূমের পারুলডাঙা এবং মেদিনীপুরের চামরগড়। এই অঞ্চলের মেসোলিথিক প্রত্নস্থল গুলির পাথরের প্রত্নবস্ত্তসমূহ জ্যামিতিক এবং অ-জ্যামিতিক উভয় আকৃতির। প্রত্নবস্ত্তর মধ্যে আছে লুনেট, পয়েন্ট, বোরার, স্ক্র্যাপার, বিউরিন কোর ইত্যাদি যা মূলত চার্ট, ক্যালসেডোনি, কোয়ার্টজ, কোয়ার্টজাইট, প্রস্তরীভূত জীবাশ্মকাঠ ইত্যাদি দিয়ে প্রস্ত্তত। দিলীপ চক্রবর্তী এ অঞ্চলের বিভিন্ন স্তরায়ন সম্পর্কে প্রস্তাব করেন যে, ড্যাটরিটাল ল্যাটেরিটিক কংগ্লোম্যারিট স্তরের নীচে ক্রমান্বয়ে মটল্ড ক্লে স্তর এবং বেড রক স্তরের অবস্থান। এই কঙ্গলোমারেট স্তরের উপরে হলুদাভ বালুময় স্তরের অবস্থান। মাইক্রোলিথ প্রত্নবস্ত্তর অবস্থান ল্যাটেরিটিক কংগ্লোম্যারিট-এর উপরিভাগে এবং এর উপরস্থ বালুস্তরে। নিম্ন পুরোপলীয় প্রস্তর হাতিয়ার পাওয়া যায় কংগ্লোম্যারিট এবং মটল্ড ক্লে স্তরের সংযোগস্থলে। পক্ষান্তরে, মধ্য পুরোপলীয় প্রস্তর হাতিয়ারের অবস্থান এর চেয়ে উপরে। চক্রবর্তীর মতে উচ্চ পুরোপলীয় প্রস্তর হাতিয়ারের অবস্থান কংগ্লোম্যারিটের সবচেয়ে উপরের স্তরে। সমস্যা এই যে, পুরোপুরিভাবে এ অঞ্চলের ভূতাত্ত্বিক স্তরবিন্যাস ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্তরবিন্যাসের মধ্যে সমন্বয় সাধন করা যায় নি। উপরন্তু পুরোপলীয় ও মধ্যোপলীয় বিভিন্ন স্তরে কালনিরূপণযোগ্য বস্ত্ত পাওয়া যায় নি। স্বাভাবিকভাবেই, পশ্চিমবঙ্গ ও ছোটনাগপুরে উপরোল্লিখিত সংস্কৃতির কালানুক্রম এখনও পর্যন্ত অনিশ্চিত।

মোট ৮৪ নবোপলীয় প্রত্নস্থল রয়েছে পশ্চিমবঙ্গে। এদের প্রকৃতি ও বিন্যাস পর্যবেক্ষণে বিপরীত ধারার দু’ধরনের নবোপলীয় সংস্কৃতির প্রমাণ পাওয়া যায়। এরা হলো, হিমালয় পাহাড়শ্রেণী এলাকা (কালিম্পঙ ও তৎসংলগ্ন সিকিম) এবং প্রান্তিক মালভূমি বা প্লেট্যু ফ্রিঞ্জ এলাকা (মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, বর্ধমান ও বীরভূম জেলা সংলগ্ন)। প্লেট্যু ফ্রিঞ্জ এলাকায় নবোপলীয় প্রত্নস্থলগুলির অবস্থান নদীতীরবর্তী অঞ্চলে, অথচ হিমালয় পাহাড়শ্রেণীতে এদের পাওয়া যায় পাহাড়ঢালে। প্লেট্যু ফ্রিঞ্জ এলাকায় প্রাপ্ত নবোপলীয় হাতিয়ারের সাথে সুস্পষ্টভাবেই ভিন্ন সিরামিক শিল্পের (ধুসর ও ঈষৎ লাল মৃৎপাত্র, যাতে কখনও কখনও কর্ড ছাপ দেখা যায়) পরিচয় দৃশ্যমান, অথচ হিমালয় নবোপলীয় সংস্কৃতিতে কোন সিরামিকস পাওয়া যায় না। পশ্চিমবঙ্গের ওয়েস্টার্ণ প্লেইন এ যে নবোপলীয় সংস্কৃতির পরিচয় পাওয়া যায়, তার সাথে পরবর্তী ক্যালকোলিথিক সংস্কৃতির প্রভাব বিদ্যমান। প্লেট্যু ফ্রিঞ্জ এলাকায় প্রাপ্ত নবোপলীয় প্রত্নস্থলগুলির নামকরণ করা হয়েছে সংলগ্ন নদীর উপর ভিত্তি করে, যেমন সুবর্ণরেখা কমপ্লেক্স (২৩টি অবস্থান: ভেদুআহারি, পান্ডাপাতা, তিলকামতি, ঘোড়াপিঞ্চা, কালাইয়াশাল প্রভৃতি), কসাই কমপ্লেক্স (২২ টি অবস্থান: অর্গাদা, পলাশডাঙা, লালজল, কাত্তারা ১ এবং ২, লালঘর ইত্যাদি) এবং গন্ধেশ্বরী কমপ্লেক্স (১৪ টি অবস্থান: বনশূরিয়া, শিমুলবাড়িয়া, পরেশনাথ প্রভৃতি)। সুবর্ণরেখা কমপ্লেক্সে প্রাপ্ত হাতিয়ারের মধ্যে রয়েছে সেল্ট্, বাটালি, স্প্লেইড কুঠার, সোল্ডার্ড কুঠার, ছেনি ইত্যাদি। কসাই কমপ্লেক্সে মূলত বিভিন্ন রকম সেল্টস পাওয়া গেছে। এছাড়া রয়েছে বিবিধ রিং স্টোন, বাটালি প্রভৃতি। গন্ধেশ্বরী কমপ্লেক্সে রাউন্ডেড বাট সেল্ট এর প্রাচুর্য দেখা যায়, কিন্তু সোল্ডার্ড কুঠার একটিও পাওয়া যায় নি। এতদঞ্চলে বর্ধমানের ভারতপুর ও পান্ডু রাজার ঢিবি, বাঁকুড়ার দিহার ও মেদিনীপুরের তমলুকে নবোপলীয় বস্ত্তসমূহ ক্যালকোলিথিক বস্ত্তর সাথে বেইস লেভেল-এ অথবা পৃষ্ঠে বিদ্যমান, যা এ অঞ্চলে একটি ভিন্ন নিও-ক্যালকোলিথিক পর্যায়ের উপস্থিতির সাক্ষ্য দেয়।

প্রস্তরীভূত জীবাশ্ম কাঠের হাতিয়ার (প্রাক নবোপলীয়), লালমাই

পশ্চিমবঙ্গের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কর্তৃক পান্ডুরাজার ঢিবিতে উৎখননের ফলে চারটি ভিন্ন যুগের সাংস্কৃতিক বস্ত্তসমূহ উম্মোচিত হয়। প্রথম দুটি যুগ নিও-ক্যালকোলিথিক সংস্কৃতির আওতাভূক্ত, তৃতীয় যুগটি লৌহযুগের সংস্কৃতির অন্তর্গত এবং চতুর্থ যুগটি প্রাচীন ও মধ্যযুগের সংস্কৃতির সমন্বয়। ১৯৭৫ সালে তমলুক উৎখননে অবমুক্ত পোড়া কয়লা ডিপোজিটে পাওয়া ক্যালকোলিথিক বস্ত্তসমূহ, যেমন বিশিষ্ট আকারের কালো-এবং-লাল মৃৎপাত্র, ক্ষুদ্রাকৃতি নবোপলীয় সেল্ট এবং বিভিন্ন হাড়ের তৈরি হাতিয়ার। ক্যালকোলিথিক সংস্কৃতির যুগের পর নবোপলীয় হাতিয়ার সহ লৌহব্যবহারকারী প্রাচীন মানব সংস্কৃতির নিদর্শন পাওয়া যায়। এ সংস্কৃতিতে কালো এবং লাল মৃৎপাত্রের ব্যবহার অব্যাহত থাকে। এ স্তরের উপরের দিকের স্তর থেকে ব্ল্যাক পিপ্ড মৃৎপাত্রসহ নর্দার্ন ব্ল্যাক পলিস্ড মৃৎপাত্র (NBPW) উদ্ধার করা হয়।

বাংলাদেশে প্রাগৈতিহাসিক অনুসন্ধান ১৯১৭ সালে জে. কগিন ব্রাউন তাঁর Prehistoric Antiquities of India Preserved in Indian Museum গ্রন্থে চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডে প্রাপ্ত এক প্রাগৈতিহাসিক সেল্ট এর কথা উল্লেখ করেন। রাখালদাস বন্দোপাধ্যায় ১৮৮৬ সালে চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড পাহাড়ে এক প্রস্তরীভূত জীবাশ্ম কাঠে নির্মিত সোল্ডারড সেল্ট আবিষ্কারের কথা জানান। ১৯৫৮ সালে, নিতান্ত ঘটনাচক্রে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক ডাইসন চট্টগ্রামের রাঙ্গামাটি জেলায় ভূমির উপরে একটি প্রাগৈতিহাসিক হাতিয়ার পেয়েছিলেন বলে জানা যায়। কিন্তু হাতিয়ারটি সম্পর্কে আর কিছু জানা যায় নি।

বর্তমানে ঢাকাস্থ জাতীয় জাদুঘরে একটি প্রাগৈতিহাসিক হাতিয়ার হাত কুঠার হিসেবে প্রদর্শিত হচ্ছে। এই প্রাগৈতিহাসিক হাতিয়ারটি ১৯৬৩ সালে চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকায় ছাগলনাইয়া থানার আমজাদহাটা ইউনিয়ন থেকে জাদুঘর কর্তৃপক্ষ সংগ্রহ করেন। ১৯৭৯ সালে নাজিমউদ্দিন আহমেদ জানান যে, ১৯৭৬-৭৮ সালে ময়নামতীর আনন্দ বিহার উৎখনন কালে কিছু নবোপলীয় কুঠারের সাথে আট-দশ শতকের কিছু অসম্পূর্ণ নিদর্শন ও কাঁচামাল আবিষ্কৃত হয়েছে। এদের মধ্যে নয়টি নিদর্শন বর্তমানে ময়নামতী মিউজিয়ামে প্রদর্শিত হচ্ছে। মোঃ হাবিবুল্লা পাঠান নরসিংদী জেলার উয়ারী-বটেশ্বর এলাকায় আটটি নবোপলীয় সেল্ট সংগ্রহ করেন।

১৯৯২ সালে কুমিল্লা জেলার লালমাই-ময়নামতী অঞ্চলে দিলীপ কুমার চক্রবর্তীর নেতৃত্বে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের একটি দল অনুসন্ধান কার্য পরিচালনা করেন। এ সময় লালমাই পাহাড়ের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব অংশের বিভিন্ন অবস্থান থেকে প্রস্তরীভূত জীবাশ্ম কাঠ দ্বারা নির্মিত বিভিন্ন প্রকারের ২৩৪ টি প্রাগৈতিহাসিক প্রত্নবস্ত্ত উদ্ধার করেন। ১৯৯১ সালে বাংলাদেশের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, লালমাই পাহাড়ে আরেকটি অনুসন্ধানকার্য সম্পন্ন করে। এর ফলে এলাকার চারটি অবস্থান থেকে প্রস্তরীভূত জীবাশ্ম কাঠের ২৪০টি প্রাগৈতিহাসিক হাতিয়ার উদ্ধার করা হয়। ১৯৯৮ সালে জাহাঙ্গীনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের দু’জন ছাত্র লালমাই অঞ্চলের মধ্যের মুড়া ও মেম্বারের খিল এর মধ্যবর্তী এলাকা থেকে প্রস্তরীভূত জীবাশ্ম কাঠের তৈরি একটি আদর্শ অ্যাশুলিয়ান হাতকুঠার এবং লালমাই পাহাড়ের ধনমুড়া থেকে কিছু সংখ্যক ব্লেড, ব্লেডলেট এবং ফ্লেক উদ্ধার করেন।

১৯৯৭ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি দল হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাটস্থ চাকলাপুঞ্জি চা বাগানে প্রাগৈতিহাসিক দ্রব্যসমেত একটি অবস্থান চিহ্নিত করে। দলটি প্রস্তরীভূত জীবাশ্ম কাঠের নির্মিত কিছু প্রত্নবস্ত্তও উদ্ধার করে।

বাংলাদেশে প্রাগৈতিহাসিক উপাত্ত বাংলাদেশের কুমিল্লার লালমাই পাহাড়, সিলেটের হবিগঞ্জ জেলার চুনারঘাটস্থ চাকলাপুঞ্জি চা বাগান, চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড ও রাঙ্গামাটি এবং নরসিংদী জেলার উয়ারী বটেশ্বর অঞ্চলে প্রাগৈতিহাসিক প্রত্নবস্ত্ত পাওয়া গেছে। এসব অঞ্চলে রয়েছে প্লাইস্টোসিন ডিপোজিট এবং পর্যাপ্ত/মানানসই কাঁচামাল। সীতাকুন্ডে নুড়িশিলার বেশ বড় অবস্থান রয়েছে; কিন্তু এ সব নুড়িশিলাই যে এতদঞ্চলের প্রাগৈতিহাসিক প্রত্নবস্ত্ত তৈরির মূল উপাদান সে সম্বন্ধে নিশ্চিত হওয়া যায় নি। পক্ষান্তরে, উয়ারী-বটেশ্বরে যেসব নবোপলীয় অস্ত্র, যেমন সেল্ট, সোল্ডার্ড হাত কুঠার প্রভৃতি পাওয়া গেছে, সেগুলি বেলেপাথর, সিল্ট পাথর ও প্রস্তরীভূত জীবাশ্ম কাঠে প্রস্ত্তত। কিন্তু ঐ এলাকায় এসব কাঁচামাল সহজলভ্য নয়। হাতিয়ার তৈরিতে কাঁচামালের মধ্যে প্রস্তরীভূত জীবাশ্ম কাঠের ব্যবহারই এ পর্যন্ত চিহ্নিত প্রত্নস্থলগুলিতে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। তাই লালমাই পাহাড় ও চাকলাপুঞ্জি চা বাগানের প্রাগৈতিহাসিক শিল্প এবং অন্যান্য অঞ্চলের প্রাগৈতিহাসিক হাতিয়ার মূলত প্রস্তরীভূত জীবাশ্ম কাঠ নির্ভর। এসব প্রস্তরীভূত জীবাশ্ম কাঠ প্যাটরিফিকেশান প্রক্রিয়ায় জীবাশ্মে পরিণত হয়েছে। প্যাটরিফিকেশন হলো জীবাশ্মায়নের এক ধীর প্রক্রিয়া যাতে পানিতে দ্রবীভূত অজৈব পদার্থ (যেমন ক্যালসিয়াম কার্বনেট, সিলিকা, ক্যালসাইট, লাইমোনাইট, পাইরাইট ইত্যাদি) কাঠে অনুপ্রবেশ করে এবং যা কাঠ থেকে মূল জৈব পদার্থ অপসারণ করে ও জৈব পদার্থের স্থান দখল করে এবং কাঠের মূল কাঠামোর পরিবর্তন না করে পাথর জাতীয় পদার্থে রূপান্তরিত করে। লালমাই শিল্পে প্রত্নবস্ত্ত নির্মাণে মোট তিন ধরনের প্রস্তরীভূত জীবাশ্ম কাঠ ব্যবহূত হয়েছে। প্রথম প্রকারটি কালচে রঙের, কাঠিন্য মোহ স্কেলে ৮ এবং ৯ এর মাঝামাঝি। আপেক্ষিক গুরুত্ব ২.৭ এবং ২.৫ এর মাঝামাঝি। দ্বিতীয় প্রকারের রং হালকা কালচে থেকে হালকা বাদামি। কাঠিন্য মোহ স্কেলে ৭ ও ৮ এর মাঝে এবং আপেক্ষিক গুরুত্ব ২.৫ এবং ২.৬ এর মাঝামাঝি। তৃতীয় প্রকারটি বাদামি থেকে হলুদাভ রঙের হয়। কাঠিন্য ৪ ও ৫ এর মাঝামাঝি এবং আপেক্ষিক গুরুত্ব ২.৪ এবং ২.৩ এর মধ্যে। লালমাই পাহাড়ে প্রাপ্ত প্রত্নবস্ত্তর অধিকাংশই দ্বিতীয় প্রকার প্রস্তরীভূত জীবাশ্ম কাঠে নির্মিত।

বাংলাদেশে প্রাগৈতিহাসিক প্রত্নস্থলগুলি প্লাইস্টোসিন যুগস্থ প্রাচীন পলল ভূমির উপর অবস্থিত। প্লাইস্টোসিন অঞ্চল, বিশেষ করে লালমাই পাহাড়ে দৃশ্যমান পললস্তরকে তাদের পাথুরে বৈশিষ্ট্য ও ডিপোজিশনাল এনভায়রনমেন্ট বিচারে তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়। এগুলি হলো:

(ক) প্লাইওসিন ইপোকের ঢুপিটিলা সংঘ (কিছু শেল স্তরসমেত হলদে অসংবদ্ধ বালুস্তর যার গভীরে রয়েছে নুড়িপাথর), (খ) প্লায়োস্টোসিন যুগের মধুপুর কর্দম (ঢুপিটিলা সংঘের উপরিভাগে বিদ্যমান মূলত লালচে বাদামি এবং হলদে বাদামি কাদামাটি ও বালুময় কাদামাটি, মাঝে মাঝে ক্ষুদ্র লৌহপিন্ড) এবং (গ) বর্তমান সময়কালীন পলল সংঘ (ধূসর পলিমাটি)।

লালমাই-ময়নামতী পাহাড় কমপ্লেক্স ৮ কিমি লম্বা এবং সবচেয়ে চওড়া স্থানে ৪.৮ কিমি প্রশস্থ। কমপ্লেক্সটি উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত এক ক্রমোন্নত ব্লক, যার চারিদিকে রয়েছে কিছু স্থানীয় চ্যুতি সম্বলিত লালমাই সোপান। এই পাহাড়গুলির গড় উচ্চতা ২০ মি। তবে কোন কোনটি ৩০ মি বা তারও চেয়ে বেশি উচ্চ হতে দেখা যায়। এলাকাটির স্থলভাগ মূলত রোলিং উচ্চ ভূমি মাঝে মাঝে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত পাহাড় শিরার মধ্যখানে অগভীর খাদ। লালমাই পাহাড়ের অধিকাংশ এলাকাই মধুপুর কর্দম সংঘ দ্বারা আবৃত বলে ধরে নেয়া যায়। যদিও এর কিছু অংশ অপসারিত হয়েছে। তবে এলাকার গাছ-গাছালি পরিবেশ আধুনিকায়ন ও অন্যান্য কারণে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তা সত্ত্বেও এর প্রাচীন ঐতিহ্যের নিদর্শনস্বরূপ এখনও দাঁড়িয়ে আছে শাল গাছ, বাঁশঝাড়, আম-কাঁঠালের গাছ ইত্যাদি। সম্ভবত কোন এক সময় আদিবাসীরা বিশেষ করে ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী এই এলাকায় জুম চাষ করত। এখন এলাকার কৃষকেরা চূড়ায় ও ঢালে বিভিন্ন শাক-সব্জির চাষ করে, পক্ষান্তরে মধ্যবর্তী খাদগুলিতে চলে ধান চাষ।

এ এলাকার প্রাগৈতিহাসিক প্রত্নবস্ত্তগুলির অবস্থান পাহাড়ের চূড়ায়, ঢালে, সোপানে ও পাহাড়ের চূড়ার, বা ঢালের পৃষ্ঠীয় ক্ষয়ে নিম্নভূমিতে অবক্ষেপিত পললে। চুনারুঘাটের চন্ডীর মাযারস্থ চাকলাপুঞ্জি চা বাগান প্রাগৈতিহাসিক প্রত্নস্থলে পাওয়া গেছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রাগৈতিহাসিক হাতিয়ার। মূলত মধুপুর সংঘ দ্বারা আবৃত ক্ষয়িষ্ণু ভাঁজকৃত পাহাড় মালার দিয়ে প্রবাহিত বালু নদীর খাতে এগুলি পাওয়া যায় (বৃষ্টি হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পানি শুকিয়ে যায় বলে নদীর নাম বালু নদী হয়েছে)। প্রস্তরীভূত জীবাশ্ম কাঠে প্রত্নবস্ত্তগুলির সুঠাম কৌণিক বিন্যাস ও তরতাজা ভাব দেখে অনুমান করা যায় যে, এরা ধারে কাছের সংলগ্ন কোন পাহাড়ের চূড়ায় বা ঢালে নির্মিত বা সংরক্ষিত হয়েছিল। গঠন বিচারে, প্রযুক্তি ও কলাকৌশলে এবং সংস্থানগত পরিমাপন অনুসারে এতদঞ্চলের প্রত্নবস্ত্তর সঙ্গে লালমাই অঞ্চলের প্রত্নবস্ত্তর উল্লেখযোগ্য মিল পাওয়া যায়। লালমাই ও চাকলাপুঞ্জিতে প্রাপ্ত হাতিয়ারসমূহকে দুভাগে ভাগ করা যায়: (১) মসৃণ হাতিয়ার বিহীন প্রাক-নবোপলীয় হাতিয়ারসমূহ (হাতকুঠার, ক্লিভার, স্ক্রেপার, চপিং টুল, পয়েন্ট, ইত্যাদি), (২) নবোপলীয় হাতিয়ারসমূহ (হাত কুঠার, মসৃণ সেল্ট, অল ইত্যাদি)। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের উৎখননে শেষোক্ত ধরনের হাতিয়ারের সাথে মৃৎপাত্রের ভগ্নাংশ পেয়েছেন বলে শফিকুল আলম দাবী করেন। উল্লেখ করতে হয় যে, ভারতের ত্রিপুরার হাওড়া এবং খোয়াই উপত্যকায়ও প্রায় একই রকম প্রাগৈতিহাসিক নিদর্শন পাওয়া গেছে। বার্মা বা মায়ানমারের ইরাবতী উপত্যকায় প্রাপ্ত অন্যাথিয়ান ও নবোপলীয় হাতিয়ারের সাথে বাংলাদেশের লালমাই পাহাড় ও চাকলাপুঞ্জিতে প্রাপ্ত প্রত্নবস্ত্তর সাদৃশ্য রয়েছে। বাংলাদেশের পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলে, ত্রিপুরার হাওড়া ও খোয়াই উপত্যকা এবং বার্মা বা মায়ানমারের ইরাবতী উপত্যকায় প্রাপ্ত প্রস্তরীভূত জীবাশ্ম কাঠের প্রত্নবস্ত্তর নিয়মিত উপস্থিতি এবং কলাকৌশল ও সংস্থানিক সাদৃশ্য পর্যবেক্ষণে মনে হয় প্রাগৈতিহাসিক যুগে এতদঞ্চলে এক আঞ্চলিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য গড়ে উঠেছিল। [সৈয়দ মোহাম্মদ কামরুল আহসান]