আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া


আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ প্রাচীন বস্ত্তগত সামগ্রী ও হস্তনির্মিত শিল্পকর্ম যেমন, পান্ডুলিপি, অভিলেখন (শিলালিপি, মুদ্রালিপি, তাম্রলিপি ইত্যাদি) স্মৃতিসৌধ ইত্যাদির জরিপ, সংগ্রহ এবং এগুলোর প্রামাণিক দলিল তৈরি, ব্যবহার ও প্রদর্শনের বিষয়টি স্যার উইলিয়ম জোনস কর্তৃক ১৭৮৪ সালে এশিয়াটিক সোসাইটি, কলকাতা প্রতিষ্ঠার পর পূর্ণ উদ্যোগে শুরু হয়। এই সোসাইটির উদ্যোগে বা ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার মাধ্যমে ভারতের প্রাচীন নিদর্শনসমূহের সংগ্রহের ধারা প্রায় শতাধিক বছর ধরে অব্যাহত থাকে।

১৮০০ সালে সরকারের পক্ষ থেকে এ ধরনের প্রথম পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। এ সময় ওয়েলেসলির মার্কুইস কর্তৃক ফ্রান্সিস বুকাননকে মহীশুর জরিপ করার কাজে নিযুক্তি করা হয়। তিনি ১৮০৭ সালে বর্তমান বিহার ও উত্তর প্রদেশের স্মৃতিসৌধ এবং প্রাচীন নিদর্শন জরিপের কাজ শুরু করেন। এ সময় স্মৃতিসৌধ সংস্কারের কথা ভাবা না হলেও তাজমহল, ফতেপুর সিক্রি এবং সিকান্দারাবাদের মতো কিছু স্মৃতিসৌধ সংস্কার করা হয়। ১৮১০ সালের বেঙ্গল রেগুলেশনের ১৯ ধারার মাধ্যমে সরকার সর্বপ্রথম ঝুঁকিপূর্ণ ঐতিহাসিক স্মৃতিসৌধের সংস্কারের ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করে।

বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ার্সের দ্বিতীয় লেফটেন্যান্ট আলেকজান্ডার কানিংহাম ইন্দো-গ্রিক ও ইন্দো-সাইটিক রাজবংশ অনুসন্ধানের প্রথম দিকে জেমস প্রিন্সিপকে সহায়তা করেন এবং তিনি বিলসার সূতপ সমূহও অনুসন্ধান করেন। আলেকজান্ডার কানিংহাম ১৮৪৮ সালে ইন্ডিয়ান আর্কিওলজিক্যাল সার্ভের জন্য একটি পরিকল্পনা প্রণয়ন করে ব্রিটিশ সরকারের নিকট পেশ করেন। কিন্তু তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। এ সময়ে যুক্তরাজ্যের রয়্যাল এশিয়াটিক সোসাইটির সুপারিশমালার ভিত্তিতে সরকার অনেক গুলো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এই সুপারিশমালার আলোকে ভারত সরকার স্মৃতিসৌধসমূহ সংস্কারের জন্য সামান্য তহবিল অনুমোদন করে। লর্ড হার্ন্ডিজ ভারতীয় প্রাচীন নিদর্শনসমূহের উপর গবেষণা এবং জ্ঞানের উপর ভিত্তি করে কোনো ব্যক্তি কর্তৃক প্রদত্ত প্রস্তাব অনুমোদনের একটি পদ্ধতি চালু করেন। পরবর্তী বছরগুলোতে ১৮৫৭ সালের বিপ্লবের প্রভাব পড়ে এবং যে কারণে প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান প্রকৃতপক্ষে বন্ধ হয়ে যায়।

আলেকজান্ডার কানিংহাম একটি নতুন প্রস্তাব পেশ করেন। এই প্রস্তাবকে লর্ড ক্যানিং গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেন এবং তিনি উত্তর ভারত জরিপের জন্য একটি পরিকল্পনা অনুমোদন করেন। এই পরিকল্পনাকে নিম্নভাবে বর্ণনা করা হয়: ‘‘একটি সঠিক বর্ণনা, নকশার সচিত্র ব্যাখ্যা, পরিমাপন, অঙ্কন বা ছবি এবং যে সব বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন সেগুলোর অভিলিখনের চিত্রসহ ব্যাখ্যা। এ ছাড়া এতে রয়েছে এগুলো সম্পর্কে এ পর্যন্ত প্রাপ্ত ইতিহাসের বর্ণনা এবং এগুলো সম্পর্কে যে ঐতিহ্য রয়েছে তার দালিলিক প্রমাণাদি।’’ ১৮৬১ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে কানিংহামকে প্রথম প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপকারক নিযুক্ত করা হয়।

তিনি ১৮৬১ সাল থেকে ১৮৬৫ সালের মধ্যে পূর্বে গয়া থেকে উত্তর পশ্চিমে সিন্ধু পর্যন্ত, এবং উত্তরে কালসি থেকে দক্ষিণে নর্মদা পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকা জরিপ করেন। এ ব্যাপারে তিনি চিনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাং-এর পদাঙ্ক অনুসরণ করেন। কিন্তু ১৮৬৬ সালে লর্ড লরেন্স কর্তৃক প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ বিলুপ্ত ঘোষণার পর এই প্রচেষ্টা হঠাৎ করেই বন্ধ হয়ে যায়। অবশ্য ইতোমধ্যে ১৮৬৩ সালে একটি আইন (অ্যাক্ট-২০) পাশ হয় যাতে সরকারকে এই ক্ষমতা প্রদান করা হয়: ‘‘প্রাচীন নিদর্শনের জন্য সুপ্রসিদ্ধ বা যার ঐতিহাসিক বা প্রত্নতাত্ত্বিক মূল্য রয়েছে সেগুলোর সংরক্ষণ করা ব্যতীত কোনো ক্ষতিসাধন করা যাবে না।’’

তৎকালীন সেক্রেটারি অব স্টেট স্যার স্টাফোর্ডের প্রস্তাবের উপর ভিত্তি করে লর্ড লরেন্স স্থানীয় সরকারকে ঐতিহাসিক দালানকোঠার তালিকা প্রস্ত্তত ও সেগুলোর ছবি সংগ্রহের নির্দেশ দেন। সেক্রেটারি অব স্টেট ডিউক অব অর্গিল ভারত সরকারকে দেশের প্রত্নতাত্ত্বিক সমস্যা মোকাবেলা করার জন্য একটি কেন্দ্রীয় বিভাগ স্থাপনের নির্দেশ দেন। তিনি স্মৃতিসৌধ সংরক্ষণের উপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন যে, সরকারের অবশ্যপালনীয় কাজ হচ্ছে স্মৃতিসৌধসমূহকে ‘সরকারের নিজস্ব কর্মচারীদের দ্বারা যথেচ্ছাভাবে দ্রুত ধ্বংসসাধনের হাত থেকে রক্ষা করা’। কানিংহামকে মহাপরিচালক 'করে সরকারের একটি বিভাগ হিসেবে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভেকে পুনঃপ্রবর্তন করা হয়। তিনি ১৮৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই বিভাগকে দায়িত্ব দেয়া হয় যে, তারা ‘সমগ্র দেশে একটি পূর্ণ অনুসন্ধান কাজ পরিচালনা করবে এবং প্রাচীনত্ব বা সৌন্দর্য বা ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ সকল প্রত্নতাত্ত্বিক এবং এরূপ অন্যান্য স্থাপনার একটি সুসংবদ্ধ তালিকা এবং এগুলোর একটি বিবরণমূলক তথ্য সংরক্ষণ করবে।’

কানিংহামকে আরো দায়িত্ব দেওয়া হয় যে, তিনি ‘পূর্ববর্তী সকল অনুসন্ধান কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণী এবং এই অনুসন্ধান কাজ থেকে ইতোমধ্যে প্রাপ্ত ফলাফলেরও বিবরণী তৈরি করবেন। এছাড়া তিনি বর্তমান ও ভবিষ্যৎ অনুসন্ধান কাজের সঙ্গে যুক্ত সহকারীদের দিক নির্দেশনার জন্য একটি সার্বিক পরিকল্পনা তৈরি করবেন।’

১৮৭১ সালে কানিংহাম দিল্লী এবং আগ্রায় পুনরায় জরিপ কাজ শুরু করেন; ১৮৭২ সালে তিনি রাজপুতনা, বুন্দেলখন্দ, মথুরা, বোধগয়া এবং গৌড় জরিপ করেন; ১৮৭৩ সালে তিনি পাঞ্জাব এবং ১৮৭৩ ও ১৮৭৭ সালের মধ্যে তিনি কেন্দ্রীয় প্রদেশ, বুন্দেলখন্দ এবং মালওয়া জরিপ করেন। সুশৃঙ্খল ও সুপরিকল্পিতভাবে জরিপ কাজ শুরু করার জন্য আলেকজান্ডার কানিংহাম বৌদ্ধ-স্থাপনা ও স্মৃতিসৌধগুলোকে মানচিত্রের উপর ছক আকারে রেকর্ড করেন।

১৮৭২ সালে জেমস বার্জেস কর্তৃক ইন্ডিয়ান এন্টিকয়ারি জার্নাল প্রকাশের ফলে বুলার ও ফ্লিট, ইগেলিং ও রাইস, ভন্ডারকার ও ইন্দ্রজির মতো পন্ডিতদের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ অভিলেখন এবং এগুলোর সংকেতলিপির অর্থোদ্ধার করে প্রকাশ করা সহজ হয়। উৎকীর্ণ লিপি সামগ্রীর একটি সুসংবদ্ধ ও সুন্দর সংখ্যা প্রকাশ করার জন্য কানিংহাম করপাস ইন্সক্রিপশনাম ইন্ডিকারাম নামে একটি জার্নালও প্রকাশ করেন। কানিংহামের প্রস্তাবে সরকার ইপিগ্রাফিক্যাল সার্ভে নামে একটি প্রতিষ্ঠান স্থাপন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। ১৮৮৩ সালের জানুয়ারি মাসে সরকার জে. এফ. ফ্লিটকে তিন বছরের জন্য সরকারি উৎকীর্ণ লিপিবিদ হিসেবে নিযুক্ত করেন।

১৮৭৮ সালের ট্রেজার ট্রোভ এ্যাক্ট প্রবর্তন ছিল পরীক্ষামূলক খননের সময় প্রাপ্ত মূল্যবান ধাতু সামগ্রী ও প্রাচীন নিদর্শনসমূহ বাজেয়াপ্তকরণ ও সংরক্ষণ নিশ্চিতকরণের একটি মাইল ফলক। ১৮৭৮ সালে লিটন লক্ষ্য করেন যে, কেন্দ্রীয় সরকার ১৮৭৩ সালে প্রাদেশিক সরকারকে প্রাচীন স্মৃতিসৌধ সংরক্ষণের যে দায়িত্ব প্রদান করে তা এককভাবে তাদেও উপর ছেড়ে দেওয়া ঠিক নয় বলে তিনি মনে করেন। তাই এই দায়িত্ব ভারত সরকারের ক্ষমতার মধ্যেই আনা উচিত। স্মৃতিসৌধ সংরক্ষণের সঙ্গে সম্পর্কিত সকল বিষয়ে প্রাদেশিক ও কেন্দ্রীয় সরকারকে সাহায্য করার জন্য ১৮৮১ সালে রিপনের শাসনামলে মেজর এইচ. এইচ. কোলেকে প্রাচীন স্মৃতিসৌধসমূহের কিউরেটর নিযুক্ত করা হয়। তিনি বোম্বে, মাদ্রাজ, রাজপুতনা, হায়দ্রাবাদ, পাঞ্জাব ও উত্তর-পশ্চিম প্রদেশের স্মৃতিসৌধের উপর বহু প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রদান করেন। ১৮৮৩ সালে কোলের চাকরির মেয়াদ শেষ হলে স্মৃতিসৌধ সংরক্ষণের কাজটি পুনরায় স্থানীয় সরকারকে প্রদান করা হয়।

১৮৮৫ সালে কানিংহাম চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন। তিনি মহা-পরিচালকের পদ বিলুপ্তি এবং উত্তর ভারতকে পুনঃসংগঠিত করে পাঞ্জাব, সিন্ধু এবং রাজপুতনা; উত্তর-পশ্চিম প্রদেশ (উত্তর প্রদেশ) এবং কেন্দ্রীয় প্রদেশ; এবং বিহার, উড়িষ্যা, আসাম ও ছোট নাগপুরসহ বাংলা নামে তিনটি স্বাধীন অঞ্চল করার জন্য সরকারের নিকট সুপারিশ করেন। এই তিনটি অঞ্চলের প্রতিটি দুইজন নকশাকার ও দুইজন সহকারীসহ একজন জরিপকারক দ্বারা পরিচালিত হবে। মাদ্রাজ, বোম্বে এবং হায়দ্রাবাদ এলাকা বার্জেসের অধীন এবং উৎকীর্ণ লিপি ফ্লিটের অধীন ন্যস্ত করার সুপারিশ করেন। এভাবে বাংলা বেগলারের অধীন, উত্তর-পশ্চিম প্রদেশ মেজর জে.বি. কিথ এবং তাঁর সহকারী হিসেবে ড. এ. ফুরারের অধীন, এবং পাঞ্জাব সি.জে. রজারসের অধীন চলে আসে।

১৮৭১ সাল থেকে ১৮৮৫ সালের মধ্যে বার্জেস পশ্চিম ভারতে এবং ১৮৮২ সাল থেকে আলেকজান্ডার রি’কে সহকারী করে দক্ষিণ ভারতে ব্যাপক জরিপ কাজ পরিচালনা করেন। ১৮৮৬ সালে ড. ই. হুলটজেককে (Hultzsch) সংস্কৃত, পালি ও দ্রাবিড় ভাষার সংকেতলিপির অর্থোদ্ধার ও ব্যাখ্যার জন্য উৎকীর্ণ লিপিবিদ হিসেবে পাঁচ বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনটি নতুন অঞ্চলের পেশকৃত প্রতিবেদন পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও দক্ষিণ ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপকার হিসেবে বার্জেসকে অতিরিক্ত দায়িত্বও প্রদান করা হয়।

১৮৮৬ সালের মার্চে বার্জেস মহাপরিচালকের পদে নিয়োগ লাভ করেন। তাঁর সুপারিশের ভিত্তিতে তিনটি পৃথক অঞ্চলকে একীভূত করে একক পরিচালনার অধীনে আনা হয়, তবে এই একীভূত এলাকার কার্য থেকে অনুসন্ধান, সংরক্ষণ ও উৎকীর্ণ লিপি নামে তিনটি স্বতন্ত্রভাগে বিভক্ত করা হয়। বার্জেস পরিচালিত প্রধান প্রধান অনুসন্ধানের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ গুলো হচ্ছে ১৮৮৬ সাল থেকে ১৮৮৭ সালের মধ্যে ফুরার ও স্মিথ কর্তৃক পরিচালিত জরিপসমূহ। এই জরিপসমূহের মধ্যে রয়েছে   জৌনপুরের শারকি স্থাপত্য এবং জাফরাবাদ, শাহেথ, মাহেথ ও অযোধ্যার স্মৃতিসৌধসমূহ। এগুলো ছাড়াও স্মিথ বদাউন ললিতপুর, অর্কা, বুন্দেলখন্দে জরিপ কাজ পরিচালনা করেন। হেনরি কুসেঁ উত্তর গুজরাট এবং বিজাপুরে জরিপ কাজ পরিচালনা করেন, অন্যদিকে রি’ মহাবালিপুরম, কৃষ্ণা, নিলোর ও গোদাবরীতে জরিপ কাজ পরিচালনা করেন। এ ছাড়া বার্জেস দুটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা প্রদানে সহায়তা করেন: সরকারি অনুমোদন ব্যতীত কোনো সরকারি কর্মকর্তা প্রাচীন নিদর্শনসমূহ স্থানান্তরিত করতে পারবে না এবং আর্কিওলজিক্যাল সার্ভের অনুমতি ব্যতীত কোনো প্রাচীন ধ্বংসস্তুপ খনন করা যাবে না। তিনি ১৮৮৮ সালে এপিগ্রাফিকা ইন্ডিকা  নামে একটি নতুন প্রকাশনা প্রকাশের কাজ শুরু করেন। তিনি নিউ ইম্পেরিয়াল সিরিজের ২০ খন্ডও প্রকাশ করেন। এই খন্ড গুলোর মধ্য থেকে ৭ খন্ড নিয়ে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার অংশ বিশেষ রচনা করা হয়। সম্ভবত অতীতের ব্যাপক কাজের পর্যালোচনা থেকে বার্জেস কানিংহামের মতোই মনে করেন যে, অবশিষ্ট কাজের বিশাল জরিপ সংগঠনের আর কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই। সুতরাং, তিনি সরকারের নিকট মহা-পরিচালকের পদের অবলুপ্তি এবং সমগ্র দেশকে দুইভাগে বিভক্ত করে এক ভাগ কুসেঁ’র অধীন এবং অন্যভাগ রি’র অধীনে ন্যস্ত করার সুপারিশ করেন। এভাবে কাজের ক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা ও বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়, এবং কেন্দ্রীয় সংস্থা হিসেবে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভের অবলুপ্তি ঘটে। বর্তমানে পশ্চিম ও দক্ষিণে সুপারিন্টেনডেন্ট হিসেবে কর্মরত মাত্র দুইজন জরিপকারক থেকে যায়। ফ্লিটকে উৎকীর্ণ লিপির গবেষণা কাজের দায়িত্ব প্রদান করা হয়। হুলট্জেককে পূর্ব সরকারি উৎকীর্ণ লিপিবিদ হিসেবে তিন বছরের জন্য মাদ্রাজেই রাখা হয়।

পরবর্তী বছরগুলোতে অত্যন্ত বিশৃঙ্খলা ও বিভ্রান্তি দেখা দেয়। ফলে জরিপের প্রতিবেদন প্রকাশনা মূলত বন্ধ হয়ে যায়। ১৮৯৫ সালে সরকার বাস্তব অবস্থা উপলব্ধি করে স্থানীয় সরকার, রয়্যাল এশিয়াটিক সোসাইটি, টাউনে, বুলার ও ফ্লিটের নিকট থেকে জরিপ কাজের প্রস্তাব ও পরিকল্পনা আহবান করে। সেক্রেটারি অব স্টেটের নিকট পেশকৃত সুপারিশমালা;

১.   আর্কিওলজিক্যাল সার্ভেয়রকে প্রধান করে ৫টি অঞ্চল সৃষ্টি; সিন্ধু ও;বেরারসহ বোম্বে অঞ্চল; মাদ্রাজ ও কোর্গ (coorg) অঞ্চল; পাঞ্জাব, বেলুচিস্তান ও আজমির অঞ্চল; উত্তর-পশ্চিম প্রদেশ ও কেন্দ্রীয় প্রদেশসমূহ; এবং বেঙ্গল ও আসাম অঞ্চল।

২.   অঞ্চল প্রধানদের মূললক্ষ্য থাকবে সংরক্ষণ, গৌণ লক্ষ্য থাকবে খনন কাজ।

৩.  প্রাপ্ত তহবিল অজানা অনুসন্ধান কাজে ব্যয় করার চেয়ে স্মৃতিসৌধ সংরক্ষণের কাজে ব্যয় করা হবে।

উৎকীর্ণ লিপির কাজকে অগ্রাধিকার দিয়ে এবং হুলট্জেককে দক্ষিণ ভারতের অভিলেখনের দায়িত্বে রেখেই অন্যান্য অঞ্চলের জন্য অবৈতনিক লিপিবিদ রাখার প্রস্তাব বিবেচনা করা হয়।

লর্ড কার্জনের আগমন আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার পুনরুজ্জীবনে সহায়ক হয়। তিনি সমন্বিত প্রচেষ্টার অভাব এবং অঞ্চলসমূহের সামগ্রিক বিশৃঙ্খলা পর্যবেক্ষণ করে মহা-পরিচালকের পদ পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করেন। এই পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তি হবেন প্রত্নতাত্ত্বিক জ্ঞানসম্পন্ন এবং প্রকৌশলীর দক্ষতাসহ একজন প্রশিক্ষিত অনুসন্ধানকারী। ‘‘তিনি দেশের সামগ্রিক প্রত্নতাত্ত্বিক কাজ পরিদর্শন করবেন-তা সেটি খনন কাজেরই হোক, বা সংরক্ষণেরই হোক, বা সংস্কারই হোক বা উৎকীর্ণ লিপিরই হোক, অথবা সেটি স্মৃতিসৌধ ও প্রাচীন নিদর্শনসমূহের নিবন্ধন বা বর্ণনাই হোক না কেন। তিনি স্থানীয় জরিপ ও প্রতিবেদনের সমন্বয় ও হাল-নাগাদ করবেন। এছাড়াও তিনি তার কাজের একটি বার্ষিক প্রতিবেদন সরকারের নিকট পেশ করবেন।’’

১৯০১ সালে সুপারিশমালা গৃহীত হলে জন মার্শালকে নতুন মহা-পরিচালকের পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। লর্ড কার্জন সমগ্র আর্কিওলজিক্যাল সার্ভেকে কেন্দ্রীভূত করেন এবং আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার মহা-পরিচালকের নিকট এ সংক্রান্ত ক্ষমতা অর্পণ করেন। ১৯০২ সালে মার্শাল দায়িত্বভার গ্রহণ করেন এবং ভারতের প্রত্নতত্ত্বের ক্ষেত্রে নতুন যুগের সূচনা হয়।

তাঁর প্রত্নতাত্ত্বিক সংরক্ষণের নীতিসমূহ আজও সঠিক বলে গৃহীত হয় এবং আধুনিক সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞগণ এই নীতি অনুসরণ করেন। মার্শালের প্রধান পর্যবেক্ষণসমূহ নিম্নরূপ:

অট্টালিকার অনুমানলব্ধ পুনঃসংস্কার সমর্থন করা যাবে না, যদি না তা অট্টালিকার স্থায়ীত্বের জন্য প্রয়োজনীয় হয়।

অট্টালিকার প্রতিটি কক্ষ যেভাবে আছে ঠিক সেভাবেই সংরক্ষণ করতে হবে, এবং ভবন ভেঙে ফেলা বা পুনর্গঠন করা যাবে যদি এর অবকাঠামো অন্য কোনোভাবে রক্ষা করা না যায়।

উৎকীর্ণ পাথর, কাঠ বা আস্তর করা কোনো কিছু পুনঃসংস্কার করা যাবে যদি কারিগর এগুলোর প্রাচীনত্বের উৎকর্ষ ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়; এবং

কোনো অবস্থাতেই পৌরাণিক বা অন্যান্য দৃশ্যচিত্রের পুনঃ উৎকীর্ণ করা বা খোদাই করা যাবে না।

তিনি এ্যানুয়াল রিপোর্টস অব দি ডাইরেক্টর জেনারেল নামে একটি নতুন ধারাবাহিক পত্রিকা প্রকাশ শুরু করেন। এই পত্রিকায় আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে কর্তৃক পরিচালিত বিভিন্ন কার্যক্রম ও গবেষণামূলক কাজের বিবরণ প্রকাশ করা হত। আরবি ও ফার্সি উৎকীর্ণ লিপির জন্য একটি স্বতন্ত্র শাখা সৃষ্টি করা হয় এবং ড. রসকে এই উদ্দেশ্যে নিয়োগ দেওয়া হয়।

স্মৃতিসৌধ সংরক্ষণ সংক্রান্ত সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হচ্ছে এ্যানসিয়েন্ট মনুমেন্টস প্রিজারভেশন এ্যাক্ট-১৯০৪-এর প্রবর্তন। উপরন্ত ১৮৯৯ সালে সৃষ্টি ৫টি অঞ্চলের কিছু পরিবর্তন সহ ১৯০২ সালে উত্তর ভারতে মুসলিম অট্টণালিকাসমূহের পরিদর্শনের জন্য একজন স্থপতি নিয়োগ করা হয়। ১৯০৪ সালে মার্শালের চাকরির ৫ বছর মেয়াদকাল শেষ হয়। তিনি আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে বিলুপ্ত না করে তা বজায় রাখার পক্ষে দৃঢ় যুক্তি প্রদান করেন। সরকার তাঁর এই প্রস্তাব সাময়িকভাবে গ্রহণ করে। ১৯০৬ সালের ২৮ এপ্রিল সরকার ঘোষণা করে যে, আর্কিওলজিক্যাল সার্ভেকে স্থায়ী এবং উন্নত করা হয়েছে।

পরবর্তীতে নিম্ন পদগুলো সৃষ্টি করা হয়; সমগ্র ভারতের জন্য একজন ডাইরেক্টর জেনারেল অব আর্কিওলজি ও সরকারী লিপিকারক; বোম্বে, সিন্ধু, হায়দ্রাবাদসহ কেন্দ্রীয় ভারত ও রাজপুতনাসহ পশ্চিম অঞ্চলের জন্য সুপারিন্টেনডেন্ট; মাদ্রাজ ও কোর্গসহ দক্ষিণ অঞ্চলের জন্য সুপারিন্টেনডেন্ট ও উৎকীর্ণ লিপির জন্য একজন অস্থায়ী সহকারী সুপারিন্টেনডেন্ট; ইউনাইটেড প্রভিন্স, পাঞ্জাব, আজমির, কাশ্মীর ও নেপালসহ উত্তর-অঞ্চলের জন্য সুপারিন্টেনডেন্ট ও আর্কিওলজিক্যাল সার্ভেয়র; বেঙ্গল, আসাম, কেন্দ্রীয় প্রদেশ ও বেহারসহ পূর্ব অঞ্চলের জন্য সুপারিন্টেনডেন্ট ও সহকারী সুপারিন্টেনডেন্ট; উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ ও বেলুচিস্তানসহ সীমান্ত অঞ্চলের জন্য সুপারিন্টেনডেন্ট; এবং বার্মা অঞ্চলের জন্য সুপারিন্টেনডেন্ট।

সেই সঙ্গে ১৯১৭ ও ১৯১৮ সালে যথাক্রমে একটি আর্কিওলজিক্যাল ক্যামিস্ট এবং একটি ডেপুটি ডাইরেক্টর জেনারেল পদও সৃষ্টি করা হয়। ১৯১৯ সালের মন্টেগু-চেম্সফোর্ড সংস্কার দ্বারা আর্কিওলজিক্যাল সার্ভের প্রশাসনিক পদে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন সাধিত হয়, অন্যদিকে ১৯২১ সালের ডিভোলিউশন রুলস দ্বারা প্রত্নতত্ত্বকে কেন্দ্রীয় সরকারের আওতাধীন বিষয় হিসেবে গণ্য করা হয়। পূর্ব অঞ্চলের পুনঃনির্ধারিত নাম হয় কেন্দ্রীয় অঞ্চল, এবং কোলকাতায় প্রধান কার্যালয় স্থাপন করে নিউ ইস্টার্ণ সার্কেল সৃষ্টি করা হয়।

১৯২১-২২ সালে সিন্ধুসভ্যতা আবিষ্কৃত হলে একজন ডেপুটি ডাইরেক্টর জেনারেল এবং তিনজন সহকারী সুপারিন্টিডেন্ট সহকারে একটি স্বতন্ত্র অনুসন্ধান শাখা সৃষ্টি করা হয়। এ শাখায় অনুসন্ধান ও খনন কাজের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রাদেশিক সরকারগুলোকে শুধু স্মৃতিসৌধ সংরক্ষণ ঘোষণা করার বিধিবদ্ধ ক্ষমতা দেওয়া হয়। ১৯২৮ সালে স্যার জন মার্শাল ডাইরেক্টর জেনারেলের পদ থেকে পদত্যাগ করেন এবং ১৯৩১ সালের ১৯ মার্চ অবসর গ্রহণ করেন।

১৯৩১ সালের জুলাই মাসে রায় বাহাদুর দয়ারাম স্বামী তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন। তাঁর সময়ে তেমন গুরুত্বপূর্ণ কোনো অগ্রগতি সাধিত হয়নি। ফলে এ্যানুয়াল রিপোর্ট গুলোর ছাপানোর কাজ জমতে থাকে। ১৯৩৫ সালে জে. এফ. ব্লাকিসটোন ডাইরেক্টর জেনারেলের স্থলাভিষিক্ত হন। এই সময় ১৯৩৫ সালের ভারত সরকার আইনের মাধ্যমে প্রাদেশিক সরকারের উপর ন্যস্ত সকল ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকার গ্রহণ করে। এ্যানসিয়েন্ট মনুমেন্টস প্রিজারভেশন এ্যাক্ট এর কতিপয় ধারা সংশোধনের মাধ্যমে বিদেশি প্রতিষ্ঠান গুলোকে ভারতে মাঠপর্যায়ে কাজ করার অনুমতি দেওয়া হয়। ফলে সিন্ধুর চানহুডারোতে অনুসন্ধান চালানো হয় ও পরে খনন কাজ করা হয়।

১৯৩৭ সালে রায় বাহাদুর কে. এন. দীক্ষিত দায়িত্বভার গ্রহণ করেন এবং পুনরায় সিন্ধুতে খনন কাজ শুরু হয়। অবশ্য ডাকাতদের হাতে দলনেতা শ্রী এন. জি. মজুমদারের মৃত্যুর ফলে এই খনন কাজের পরিসমাপ্তি ঘটে। এই সময় ভবিষ্যৎ খনন কাজ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য বিদেশি বিশেষজ্ঞ হিসেবে স্যার লিওনার্ড উলেকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাঁর প্রতিবেদনে খনন কাজ সংশ্লিষ্ট সরকারের নীতি-প্রকৃতি, গৃহীত কৌশল ইত্যাদির বেশ নিন্দা করা হয়। অবশ্য তিনি আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে কর্তৃক পরিচালিত সংরক্ষণ কার্যাবলির প্রশংসা করেন, কিন্তু উৎকীর্ণ লিপির কাজের উপর কোনোরূপ মন্তব্য করেন নি। তিনি কিছু কিছু এলাকায় বৃহৎ পরিসরে খনন কাজ করারও সুপারিশ করেন; এগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে বেরেলি জেলার অহিচছাত্রা (Ahichchhatra) ও একজন দক্ষ প্রত্নতত্ত্ববিদের তত্ত্বাবধানে উত্তর প্রদেশ। এরপর ১৯৪০ থেকে ১৯৪৪ সালের মধ্যে কে. এন. দীক্ষিতের নির্দেশনায় অহিচছাত্রায় খনন কাজ করা হয়।

১৯৪৪ সালে আর.ই.মি.  হুইলার চার বছরের চুক্তিতে মহাপরিচালক হিসেবে কে. এন. দীক্ষিতের স্থলাভিষিক্ত হন। তিনি একজন সহকারী সুপারিন্টেডেন্টের অধীনে এক্সকাভেশন ব্রাঞ্চ পুনরুজ্জীবিত করেন। এই পদ পরবর্তীতে সুপারিন্টেডেন্টের পদে উন্নীত করা হয়। তিনি অনুসন্ধান ও খনন কৌশল এবং কাল নিরূপণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সমস্যার উপর সবিশেষ গুরুত্ব প্রদান করেন। ১৯৪৫ সালে সংরক্ষণ বিভাগকে কেন্দ্রীভূত করে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভের অধীনে আনা হয় এবং এ কারণে অতিরিক্ত পদের অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রাগৈতিহাসিক কাল বিশেষজ্ঞের জন্য সহকারী সুপারিন্টেডেন্টের পদ মর্যাদায় একটি পদ সষ্টি করা হয়। ১৯৩৫ সালে প্রধান কার্যালয়সমূহের অতিরিক্ত কাজ দেখাশুনার জন্য একটি যুগ্ম-মহাপরিচালকের পদ সৃষ্টি করা হয়। একটি উচ্চমানের প্রকাশনার প্রয়োজনীয় চাহিদা পরিপূরণের জন্য একটি সুপারিন্টেনডেন্ট অব পাবলিকেশন্সের পদও সৃষ্টি করা হয়।

মর্টিমার হুইলার পন্ডিচেরির আরিকামেদু, কর্ণাটকের ব্রহ্মগিরি এবং তক্ষশীলা (বর্তমানে পাকিস্তানে অবস্থিত), এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে খনন কাজ পরিচালনা করেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল ভারতীয় ইতিহাসের প্রাগৈতিহাসিক সময় সুস্পষ্টভাবে নিরূপণ ও নিশ্চিতকরণ করা, যা দীর্ঘদিন প্রত্নতত্ত্ববিদগণ এড়িয়ে গেছেন। খনন কৌশল, সংরক্ষণ এবং অন্যান্য বিষয়ে ভারতীয় ছাত্রদের প্রশিক্ষণের জন্যও এই খনন কাজ কাজে লাগানো হয়। হুইলার খনন স্তরবিন্যাস কৌশলের প্রবর্তন করেন। এছাড়া তিনি প্রতিবেদন তৈরি পদ্ধতি এবং প্রকাশনা পদ্ধতিরও উন্নতি সাধন করেন। তিনি এ্যানসিয়েন্ট ইন্ডিয়া (Ancient India ) নামে একটি নতুন ধারাবাহিক জার্নালও প্রকাশ করেন। এই জার্নালে গবেষণামূলক প্রবন্ধ ও মাঠ-জরিপের প্রতিবেদন ছাড়াও বহু স্থানের খনন কাজের বিস্তৃত প্রতিবেদন প্রকাশিত হত।

১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান নামক রাষ্ট্র সৃষ্টি হওয়ার পর উভয় দেশই তাদের প্রত্নতাত্ত্বিক কাজের জন্য নিজস্ব প্রতিষ্ঠান স্থাপন করে। সেই সময় থেকে উভয় দেশই অনেক গুরুত্বপূর্ণ খনন কাজ পরিচালনা করে আসছে।  [আবদুল মমিন চৌধুরী]