আহমদ, নাজিমউদ্দীন


আহমদ, নাজিমউদ্দীন (১৯২৩-২০০৯)  জন্ম ১৯২৩ সালের ১ মার্চ রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ি, তাঁর নানাবাড়িতে। তিনি ছিলেন একজন বিশিষ্ট প্রত্নতত্ত্ববিদ। তাঁর দাদাবাড়ি মুর্শিদাবাদ (বর্তমান পশ্চিমবঙ্গ) জেলার ভগবানগোলা থানার আজমতপুর গ্রামে। নাজিমউদ্দীন আহমদের পিতা, মৌলভী শামসুদ্দীন আহমেদও ছিলেন একজন বিখ্যাত প্রত্নতত্ত্ববিদ। তাঁর শিক্ষাজীবনের  শুরুটা কলকাতায় হলেও পিতার বদলির কারনে পরবর্তী সময়ে তিনি তাকি, বশিরহাট, ২৪ পরগণায়ও (বর্তমান পশ্চিম ২৪ পরগণা) শিক্ষা গ্রহণ করেন। তিনি ১৯৪২ সালে তাকি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিকুলেশন, ১৯৪৪ সালে বারহামপুর কে. ডব্লিউ কলেজ থেকে আই.এ এবং ১৯৪৬ সালে কলকাতার ইসলামিয়া কলেজ থেকে বি.এ পাস করেন। তিনি ১৯৪৯ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামের ইতিহাস এবং ঐতিহ্য বিষয়ে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। নাজিমউদ্দীন আহমদ ১৯৫৮ সালে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় (বর্তমানে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের অন্তর্ভূক্ত) থেকে প্রত্নতত্ত্বে পিএইচ.ডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর গবেষণামূলক অভিসন্দর্ভের বিষয় ছিল ‘তক্ষশীলার ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব’ (History and Archaeology of Taxila)।

নাজিমউদ্দীন আহমদ ১৯৫০ সালের অগাস্টে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন পাকিস্তান জাদুঘর এবং প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সহকারী প্রত্নখননকারী হিসেবে। এরপর ১৯৫১ সালে সহকারী সুপারিনটেনডেন্ট হিসেবে তাঁর পদোন্নতি হয়। পিএইচ.ডি ডিগ্রি অর্জন করে লন্ডন থেকে ফিরে আসার পর ১৯৫৯ সালে তিনি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সুপারিনটেনডেন্ট (সিনিয়র ক্লাস-১) হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন। ১৯৭০ সালে তিনি পাকিস্তান জাদুঘর এবং প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের পরিচালক (বর্তমান, মহা পরিচালক) হিসেবে নিয়োজিত হন। পাকিস্তান থেকে ফিরে আসার পর ফেব্রুয়ারী, ১৯৭৩ সালে নাজিমউদ্দীন আহমদ বাংলাদেশের জাদুঘর ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে যোগদান করেন। সেপ্টেম্বর, ১৯৭৬ সালে তিনি সোমালিয়ার প্রত্নতত্ত্বস্থল এবং স্মৃতিসৌধ সমূহের উপর জরীপ কাজে ইউনেস্কোর (UNESCO) বিশেষজ্ঞ উপদেষ্টা হিসেবে স্বল্প সময়ের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। সেখানে তিনি সোমালিয়ায় একটি জাদুঘর ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ প্রতিষ্ঠা করার জন্য বিস্তারিত পরিকল্পনাসহ সুপারিশ পেশ করেন। ফেব্রুয়ারী, ১৯৮২ সালে তিনি চাকুরী হতে অবসর গ্রহণ করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি ইউএনডিপি (UNDP) এর অর্থায়নে পরিচালিত প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের ‘সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ (Cultural Heritage) প্রজেক্টে দুই বছরের জন্য স্বল্পকালীন বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করেন।

ড. আহমদ ছিলেন একজন পন্ডিত এবং জ্ঞানী ব্যাক্তি। প্রত্নতত্ত্ববিদ হিসেবে তাঁর কর্মজীবন (১৯৫০) এর শুরুতে তিনি বিখ্যাত প্রত্নখননকারী স্যার মর্টিমার হুইলার (Sir Mortimer Wheeler) এর অধীনে মহেঞ্জোদারো খননে এবং হার্বাড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আগত দ্বিতীয় আফগান অভিযানমূলক দলের (Second Afghan Expedition Team) প্রধান অধ্যাপক রেইয়ার সার্ভিস (Professor Rair Service) এর অধীনে বেলুচিস্তানের কোয়েটা (Quetta), জব উপত্যকা (Zhob Valley), লোরা লাতি (Lora Lati) এবং পিশিন (Pishin) এ খনন কাজে মাঠভিত্তিক প্রশিক্ষন গ্রহণ করেন। তিনি তাঁর অর্জিত দক্ষতা মহেঞ্জোদারো এবং বাংলাদেশের অন্যান প্রত্নতত্ত্বস্থল প্রত্নতাত্ত্বিক খননে প্রয়োগ করেছেন।

ড. আহমদ বিশ শতকের ষাট এর দশকে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক জীবনযাত্রার ওপর গবেষণার জন্য ব্যাপক তথ্য অনুসন্ধাণ করেন। অনুসন্ধাণকালে প্রাপ্ত অনেক নৃতত্ত্বাত্বিক নিদর্শনাদি পরবর্তী সময়ে ১৯৭৪ সালে চট্টগ্রামে জাতিতাত্ত্বিক জাদুঘর স্থাপনে তা প্রাথমিক সংগ্রহ সামগ্রীতে পরিণত হয়।

France–Bangladesh Joint Venture Excavations at Mahasthangarh: First Interim Report (1993-1999) প্রকাশিত হওয়ার পুর্বে মহাস্থানগড় খননের উপর ১৯৬৫ সালে প্রকাশিত নাজিমউদ্দীন আহমদের Mahasthan: a Preliminary Report of the Recent Archaeological Excavations at Mahasthangarh (1965), ছিল মহাস্থান সম্পর্কে তথ্যের প্রধান উৎস যার একাধিক নতুন সংস্করণ ২০০১ সালে প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও বাংলায় প্রকাশিত তাঁর মহাস্থান, ময়নামতি ও পাহাড়পুর গ্রন্থ তিনটি প্রত্নতত্ত্ব বিষয়ে অধ্যয়নে গুরুত্বপূর্ন উৎস। তিনি পাহাড়পুরের বৌদ্ধ বিহার এবং বাগেরহাটের ঐতিহাসিক মসজিদ নগরীর ধ্বংসস্তূপ সংরক্ষণ ও উপস্থাপনের জন্য মূল পরিকল্পনা প্রণয়নে আন্তর্জাতিক উপদেষ্টামন্ডলীর একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন।

প্রাগৈতিহাসিক, ইতিহাস যুগপূর্ব অধ্যায়, লিপিতত্ত্ব, মুদ্রাতাত্ত্বিক আইকোনোগ্রাফি এবং অন্যান্য শাখার প্রতিও নাজিমউদ্দীন আহমদের সমান আগ্রহ ছিলো। তিনি অধিকাংশ সময়ই বিভিন্ন প্রত্নস্থান ও স্মৃতিসৌধসমূহ ঘুরে দেখতেন এবং দেশের ধ্বংসপ্রায় স্থাপত্যিক নিদর্শনের এর প্রতি অধিক মনোযোগী ছিলেন। তাঁর প্রকাশিত The Buildings of Khan Jahan in and around Bagerhat, Kantajee Temple, Buildings of the British Raj in Bangladesh and Discover the Monuments of Bangladesh-গবেষণা গ্রন্থসমূহ প্রত্নতত্ত্ব সম্পর্কে তাঁর গভীর জ্ঞানের পরিচয় দেয়। মৃত্যুর কিছুদিন পূর্বে নাজিমউদ্দীন আহমদের প্রকাশিত Panam City-তে পানাম নগরী সম্পর্কিত পূর্ব গবেষণালব্ধ সকল তথ্য এবং ধারনার যথার্থতাকে তিনি প্রশ্নবিদ্ধ করেন। জীবনের অন্তিম দিনগুলো তিনি অধ্যাপক ড. মুহম্মদ সিরাজুল ইসলামের স্মৃতিরক্ষামূলক স্মারকখন্ড প্রকাশে পূর্ণ মনোযোগী ছিলেন। ২০০৯ সালের ৭ নভেম্বর ড. নাজিমউদ্দীন আহমদ এর মৃত্যু হয়।  [শফিকুল আলম]