নুসরত শাহ


Mukbil (আলোচনা | অবদান) কর্তৃক ১৬:১৯, ৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ পর্যন্ত সংস্করণে

(পরিবর্তন) ←পুর্বের সংস্করণ | সর্বশেষ সংস্করণ (পরিবর্তন) | পরবর্তী সংস্করণ→ (পরিবর্তন)

নুসরত শাহ (১৫১৯-১৫৩২)  সুলতান আলাউদ্দীন হোসেন শাহ-এর জ্যেষ্ঠপুত্র নুসরত শাহ পিতার উত্তরাধিকারী হিসেবে ১৫১৯ খিস্টাব্দে ‘সুলতান নাসিরুদ্দীন নুসরত শাহ’ উপাধি ধারণ করে বাংলার সিংহাসনে আরোহণ করেন। পিতা জীবিতকালে তিনি প্রশাসনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং পিতা তাঁকে বিশেষ অধিকার হিসেবে স্বনামে মুদ্রা উৎকীর্ণ করার অনুমতি দিয়েছিলেন।

বাংলা ও ত্রিপুরার মধ্যে যে শত্রুতা হোসেনের রাজত্বকালে চরম আকার ধারণ করেছিল তা নুসরতের রাজত্বকালেও অব্যাহত ছিল। উত্তর ভারতে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুযোগে নুসরত শাহ তাঁর রাজ্যসীমা ত্রিহুত (উত্তর বিহার) পর্যন্ত সম্প্রসারিত করেন এবং গন্ডক ও গঙ্গার সঙ্গমস্থলে হাজীপুরে তাঁর সদর দফতর স্থাপন করেন। মুগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বাবুর পানিপথের যুদ্ধে ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দে লোদী রাজ্যের পতন ঘটিয়ে পূর্ব ভারতের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে আবির্ভূত হন এবং বাংলার সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি হয়ে দাঁড়ান। নুসরত শাহ প্রথমদিকে মাহমুদ লোদীসহ পরাজিত আফগানদের আশ্রয় দিয়েছিলেন। নুসরত শাহের মনোভাব জানার জন্য বাবুর ১৫২৭ খ্রিস্টাব্দে মোল্লা মুহাম্মদ মাজহাবকে গৌড় দরবারে প্রেরণ করেন। আসন্ন বিপদ উপলব্ধি করে নুসরত তাঁর নিরপেক্ষতার প্রতিশ্রুতি দেন। এতে সন্তুষ্ট হয়ে বাবুর বাংলায় অভিযান না করার সিদ্ধান্ত নেন। মাহমুদ লোদী আফগান দলপতিদের সাথে যে মুগল বিরোধী মৈত্রীসংঘ গড়ে তুলেছিলেন নুসরত তার সাথে কোনরূপ সম্পর্ক স্থাপন থেকে বিরত থাকেন। কিন্তু এতেও মুগলদের সঙ্গে সংঘর্ষ এড়ানো সম্ভব হয় নি। গোগরার যুদ্ধে নুসরত শাহ বাবুরের বাহিনীর নিকট পরাজিত হন। বাবুরের বাহিনী বাংলার প্রবেশদ্বার গোগরার পূর্বতীরবর্তী ত্রিহুতের উপকণ্ঠ পর্যন্ত ভূভাগ দখল করে নেয়। কূটনৈতিক বিবেচনা অযোধ্যা ও বিহার বিজয়ের আগে বাবুরকে বাংলা অভিযান থেকে বিরত রাখে। নুসরত বাবুরের সাথে সন্ধি স্থাপন করেন। বাংলা আসন্ন ধ্বংসলীলা থেকে রক্ষা পায়।

নুসরত দৌরার যুদ্ধে (১৫৩১) আফগান পক্ষে যোগদান থেকে বিরত থাকেন। হুমায়ুন এ যুদ্ধে মাহমুদ লোদীর নেতৃত্বাধীন আফগানদের পরাজিত করেন। হুমায়ুনের বাংলা অভিযানের আশংকায় নুসরত গুজরাটের বাহাদুর শাহের সঙ্গে মিত্রতা স্থাপনের জন্য দূত পাঠান। কিন্তু মৈত্রী স্থাপনের পূর্বেই নুসরত ১৫৩২ খ্রিস্টাব্দে মারা যান।

নুসরতের রাজত্বের শেষ সময় পর্যন্ত কামরূপ ও কামতার উপর বাংলার কর্তৃত্ব অক্ষুণ্ণ ছিল। উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে ব্যস্ততার কারণে আসামের দিকে মনোযোগ দেওয়ার কোন সুযোগই তাঁর হয় নি। কামরূপ ও কামতার মুসলিম শাসনকর্তারা অহোমদের বিরুদ্ধে কয়েকটি অভিযান পরিচালনা করেন। এর মধ্যে একটি অভিযান পরিচালিত হয় ১৫৩২ খ্রিস্টাব্দে তুরবক নামক এক সেনাপতির অধীনে। মুসলিম বাহিনী কালিয়াবার পর্যন্ত অগ্রসর হয়। কিন্তু ১৫৩২ খ্রিস্টাব্দে নুসরতের মৃত্যু ঘটায় তিনি এ যুদ্ধের ফলাফল দেখে যেতে পারেন নি। উড়িষ্যার রাজা প্রতাপরুদ্রের সঙ্গে নুসরতের যুদ্ধের ফলাফল সঠিকভাবে নিরূপণ করা যায় না। তবে জানা যায় যে, উড়িষ্যার অধিপতি নুসরতের রাজ্যের অংশ দখল করে নিজ রাজ্যসীমা বাড়াতে সচেষ্ট ছিলেন।

১৫২১ খ্রিস্টাব্দের শেষদিকে বাংলার সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের উদ্দেশ্যে দুটি পর্তুগিজ প্রতিনিধিদল নুসরতের দরবারে আসেন। তাঁর রাজত্বকালে পর্তুগিজগণ বঙ্গোপসাগরে সক্রিয় ছিল। এ প্রতিনিধিদলের সদস্য গনসেলো টেভারেজ বাংলায় পর্তুগিজ ব্যবসায়ীদের জন্য শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা লাভে সমর্থ হন। চট্টগ্রামের শাসনকর্তাদের বহুবারই চট্টগ্রামের বাইরের উপকূলীয় এলাকায় পর্তুগিজ হামলার মোকাবেলা করতে হয়েছে।

নুসরত শাহের রাজত্বকালেই হোসেনশাহী শাসনের পতনের প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং গিয়াসউদ্দীন মাহমুদ শাহ-এর রাজত্বকালে তা চরমে পৌঁছে। উত্তর-পশ্চিমে গন্ধক নদীর পশ্চিম তীরের ভূ-ভাগ তিনি বাবুরকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। পূর্ব বা উত্তর-পূর্ব সীমান্তে কোন ভূভাগ তাঁর হস্তচ্যুত হয়েছে বলে মনে হয় না। রাজ্যের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে কি ঘটেছিল তা স্পষ্টভাবে জানা যায় না।

নুসরত শাহ কতিপয় সদ্গুণের অধিকারী ছিলেন। তাঁর ভাইগণ ও আফগান শরণার্থীদের প্রতি আচরণে তাঁর চরিত্রের মানবিক দিক প্রকাশ পেয়েছে। কিছু আফগান শরণার্থীকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ পদে নিযুক্ত করেছিলেন। কিন্তু রাজত্বের শেষদিকে তাঁর দুর্বল চিত্তের পরিচয় পাওয়া যায়। আফগান রাজনীতির অনিশ্চয়তা এবং মুগলদের উন্নত কৌশল তাঁকে সঙ্গিন অবস্থায় ফেলে দেয়। নুসরত বাংলা সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা করেন এবং সাহিত্যে তাঁর নামের বহুল উল্লেখ রয়েছে। গৌড়ে পিতার সমাধি জিয়ারতকালে তাঁর জনৈক ক্রীতদাস কর্তৃক তিনি নিহত হন বলে কথিত আছে।  [আবদুল মমিন চৌধুরী]