পর্তুগিজ, জাতি


পর্তুগিজ, জাতি  ইউরোপীয়দের মধ্যে পর্তুগিজরাই প্রথম বাংলায় আগমন করে। পনেরো শতকের শুরু থেকেই তারা বাণিজ্যের জন্য দুঃসাহসিক সমুদ্রযাত্রা শুরু করে। ১৪৯৮ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট মাসে ভাস্কো ডা গামার কালিকটে পৌঁছার কয়েক দশক পরে বাংলায় পর্তুগিজদের আগমন ঘটে। পনেরো শতকের শেষ দিক হতেই এশিয়া থেকে মসলা আহরণের উদ্দেশ্যে ভেনিস ও আরব বণিকদের এড়িয়ে বিকল্প পথ অনুসরণের ফলেই এদেশে পর্তুগিজদের অনুপ্রবেশ ঘটে। ১৪৪৫ খ্রিস্টাব্দের দিকে হালকা দ্রুতগামী জাহাজের ব্যবহার এবং ১৪৫৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে অক্ষাংশ নির্ণয়ে কৌণিক উচ্চতা পরিমাপক যন্ত্র ব্যবহারে পর্তুগিজদের দক্ষতা তাদের সমুদ্রযাত্রায় যথেষ্ট সহায়তা করে এবং তাতে পৃষ্ঠপোষকতা করেন প্রিন্স হেনরি এবং পরবর্তীকালে রাজা দ্বিতীয় যোয়াও।

মালাক্কা অধিকারের পর (১৫১১) পর্তুগিজদের বঙ্গোপসাগরের অভ্যন্তরে প্রবেশের চেষ্টা সফল হয় এবং সেখান থেকে চাল ও বস্ত্রের সরবরাহ নিশ্চিত হয়। বাংলার সঙ্গে প্রথম পরোক্ষ যোগাযোগ স্থাপিত হয় ১৫১২-১৩ খ্রিস্টাব্দে। ১৫১৬ খ্রিস্টাব্দে দিয়েগো রেনেল কর্তৃক অংকিত এশিয়ার মানচিত্রে শুধু উপকূলীয় অঞ্চলের রূপরেখা চিহ্নিত করা ছিল; তাতে দ্বীপ ও বন্দরের উল্লেখ ছিল না। কাজেই এগুলি সম্পর্কে সম্ভবত পর্তুগিজদের কোন ধারণাই ছিল না। আলবুকার্কের মৃত্যুর পর লোপো সোয়ারেসের নিয়োগের ফলে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত বাণিজ্যিক কার্যক্রমের সমাপ্তি ঘটে এবং এক্ষেত্রে উদার নীতি অনুসরণের ফলে বাংলায় পর্তুগিজদের আগমন ঘটে।

পর্তুগিজ ব্যবসায়ী মার্টিন লুসেনা যখন বাংলার রাজধানী গৌড়ে বাস করছিলেন তখন ফ্লোরেন্সের বণিক গিওভান্নি ডি এম্পলি কর্তৃক প্রেরিত প্রথম পর্তুগিজ বণিক যোয়াও কোয়েলহো ১৫১৬ খ্রিস্টাব্দের দিকে গঙ্গায় এসে পৌঁছেন। সোয়ারেস চারটি জাহাজের একটি বহর যোয়াও ডি সিলভেরিয়ার নেতৃত্বে প্রেরণ করেন। সিলভেরিয়া বাংলার জাহাজগুলি লুণ্ঠন করে ১৫১৮ খ্রিস্টাব্দের ৯ মে চট্টগ্রামে নোঙ্গর করেন। চট্টগ্রামের মুসলিম শাসনকর্তার সৈন্যদের সঙ্গে পর্তুগিজদের কখনও যুদ্ধ এবং কখনও বা শান্তির অবস্থা চলতে থাকে। আরাকানের রাজা বাংলার সুলতানের নিকট থেকে চট্টগ্রাম উদ্ধারের জন্য সিলভেরিয়ার নিকট সাহায্য চাইলে অবস্থা আরও জটিল হয়ে ওঠে। কিন্তু সিলভেরিয়া চট্টগ্রাম ছেড়ে সিংহলের দিকে রওনা হন এবং এভাবেই বাংলার সঙ্গে পর্তুগিজদের প্রথম সরকারি যোগাযোগের পরিসমাপ্তি ঘটে।

সোয়ারেসের স্থলাভিষিক্ত দিয়েগো লোপেস করমন্ডল ও পেগুর প্রতি অনেক বেশি আগ্রহী ছিলেন। তিনি এন্টোনিও ডি ব্রিট্টোর অধীনে বাংলায় তিনটি জাহাজ প্রেরণ করেন। ব্রিট্টোর চট্টগ্রাম থেকে গৌড়ে আগমনের (অক্টোবর, ১৫২১) উপর তাঁর অজ্ঞাতনামা দোভাষী একটি মূল্যবান বিবরণ রেখে গেছেন। ব্রিট্টো ভারতের পর্তুগিজ গভর্নরের নিকট থেকে কিছু উপঢৌকনসহ একটি পত্র বাংলার সুলতানের জন্য নিয়ে আসেন এবং সেই সঙ্গে নিয়ে আসেন বিক্রয়ের জন্য কিছু পণ্যসামগ্রী। তার আগমনের কয়েকদিন পূর্বে রাফায়েল প্রেস্টেলোর নেতৃত্বে অপর একটি পর্তুগিজ মিশনের উপস্থিতি তার কাজকে কঠিন করে তোলে। রাফায়েলের প্রতিনিধি ও বাংলায় অবস্থানরত একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তি ক্রিস্টোভাও জুসার্তে আমদানি-রপ্তানি শুল্ক ১০%-এ হ্রাস করার অনুমতি লাভের জন্য গৌড়ে গিয়েছিলেন। ব্রিট্টো বাংলায় পর্তুগিজদের আমদানি-রপ্তানি শুল্ক প্রদান থেকে অব্যাহতি দানের প্রস্তাবসহ গনজালভেস ট্র্যাভার্সকে সুলতানের কাছে প্রেরণ করেন। সরকারি পদমর্যাদার দাবিদার দুই দূতের আগমন বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে এবং পরিণামে দুই পক্ষ চট্টগ্রামে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। এ যুদ্ধে তুর্কী বণিক আগা খান রাফায়েলের পক্ষে অবস্থান নেন।

জুসার্তে গৌড় দরবারের পারিষদবর্গকে প্ররোচিত করে ব্রিট্টোর দোভাষীকে গুপ্তচর হিসেবে চিহ্নিত করার ব্যবস্থা করেন। পর্তুগিজদের আমদানি রপ্তানি শুল্ক প্রদান থেকে অব্যাহতি দানের প্রতিশ্রুতিসহ দোভাষীকে শেষ পর্যন্ত বাংলা ছেড়ে যাবার অনুমতি দেওয়া হয়। এ ব্যবস্থাই হয়ত নিয়মিতভাবে বাংলায় জাহাজ প্রেরণে পর্তুগিজদের উদ্বুদ্ধ করে। ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দে রাই ভায্ পার্সিরা চট্টগ্রাম আসে এবং পারস্যের বণিক খাজা শাহাবুদ্দীনের জাহাজ লুণ্ঠন করে। চট্টগ্রামের গভর্নরের সঙ্গে খাজা শাহাবুদ্দীনের বন্ধুত্বের ফলে এ লুণ্ঠনের প্রতিশোধ গ্রহণ করা হয়। এভাবে ষোলো শতকের শুরু থেকে ব্যক্তি খাতের পর্তুগিজ বণিক এবং তার পাশাপাশি সরকারি পর্যায়ের পর্তুগিজরা নিয়মিতভাবে বাংলায় আসতে শুরু করে। ফলে তাদের নিজেদের মধ্যে প্রায়শই প্রচন্ড সংঘর্ষ বাধত। লিসবনে কিছুকালের জন্য পরস্পর বিরোধী বাদানুবাদের ঘটনা ঘটে। পরবর্তী সময়ে আগত ইউরোপীয়রা তাদের আগমনের পরপরই স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মকান্ডে লিপ্ত হয়ে পড়েছিল। তবে পর্তুগিজরা ইউরোপীয়দের তুলনায় বিলম্বে স্থানীয় রাজনীতিতে জড়িত হলেও তারা বেশি জটিলতার সৃষ্টি করে। ১৫২৮ খ্রিস্টাব্দে একটি ঝড়ের পর চট্টগ্রাম জেলার চকরিয়ায় আটকে পড়া পর্তুগিজদের সাহায্য পাবার পর খুদা বখশ খান তাদের বন্দি করেন। তাদের মুক্তির জন্য মার্টিন আলফন্সো জুসার্ত ডি মেলোর আলোচনা ব্যর্থ হলে বন্দিরা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু ধরা পড়ে যায়। ডি মেলোর তরুণ ভ্রাতৃস্পুত্রের হত্যাকান্ডের পর, বাংলার সুলতান নুসরত শাহ এর বিরুদ্ধে ব্যবসায়ী শাহাবুদ্দীনের অভিযানে গোয়া থেকে সাহায্য পাওয়ার শর্তে শাহাবুদ্দীন বন্দিদের মুক্তিপণের অর্থ প্রদান করেন।

নুসরত শাহের মৃত্যুর পর গোয়া থেকে পাঁচটি জাহাজের বহর নিয়ে জুসার্ত চট্টগ্রাম পৌঁছেন। সন্ধি স্থাপনের উদ্দেশ্যে জুসার্ত গৌড় সুলতান গিয়াসউদ্দীন মাহমুদ শাহ এর দরবারে একটি প্রতিনিধিদল প্রেরণ করেন। কিন্তু মুসলমানদের একটি জাহাজ লুণ্ঠনের দায়ে সুলতান পর্তুগিজ প্রতিনিধিদলের সদস্যদের বন্দি করেন। চট্টগ্রামেও জুসার্ত ও অপরাপর পর্তুগিজকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের মধ্যে পাঁচ জনকে হত্যা করা হয় এবং অবশিষ্টদের অন্তরীণ রাখা হয়। বন্দিদের মুক্তির জন্য গোয়া থেকে এক শক্তিশালী সৈন্যদল প্রেরণ করা হয়। গৌড়ে আপোস আলোচনা ব্যর্থ হয় এবং জর্জ আলকোকোরেডো সংলাপ বন্ধ রেখে নগরীতে অগ্নি সংযোজনের পর কোন রকমে পালিয়ে যান। বাংলায় শেরশাহের আবির্ভাবের ফলে অবশ্য পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে।

নতুন সংকটের মুখে গিয়াসউদ্দীন মাহমুদ দিয়েগো র‌্যাবেলোর সাথে আলোচনায় বসেন। সম্ভবত দিয়েগো র‌্যাবেলো ছিলেন প্রথম পর্তুগিজ যিনি গঙ্গা নদী পথে গৌড়ে পৌঁছেন। শেরশাহের বিরুদ্ধে পর্তুগিজদের সাহায্যের আশ্বাস পেয়ে মাহমুদ বন্দিদের মুক্তি দেন। পর্তুগিজদের সাহায্য সত্ত্বেও শেরশাহের সঙ্গে যুদ্ধে মাহমুদ শাহ পরাজিত হন। পর্তুগিজদের নিষেধ সত্ত্বেও মাহমুদ কর্তৃক প্রদত্ত ১৩ লক্ষ স্বর্ণমুদ্রা প্রাপ্তির অব্যবহিত পরেই শেরশাহ  গৌড় ছেড়ে যান। বাংলায় শুল্ক অফিসসহ কুঠি স্থাপনের জন্য সুলতান এবার পর্তুগিজদের অনুমতি দেন। নুনো ফার্ণান্দেজ ফ্রেইরকে বাড়ির কর আদায়ের বিশেষ ক্ষমতা প্রদান পূর্বক চট্টগ্রামে নিয়োগ করা হয়। যোয়াও কোরিয়া সাতগাঁও-এর শুল্ক অফিসের দায়িত্ব গ্রহণ করে। পর্তুগিজ বন্দিদের মুক্তি দেওয়া হয়। শেরশাহ গৌড়ে প্রত্যাবর্তনকালে মাহমুদের বাহিনী কর্তৃক সামান্য বাধাপ্রাপ্ত হন। পতনোন্মুখ সুলতানকে রক্ষার জন্য গোয়া থেকে প্রত্যাশিত সাহায্য অনেক বিলম্বে এসে পৌঁছায়। মাহমুদের মৃত্যুর ফলে হোসেন শাহী বংশের অবসান ঘটে। সাতগাঁও ও চট্টগ্রামের শুল্ক অফিস পর্তুগিজদের নিয়ন্ত্রণে থেকে যায়।

চট্টগ্রাম বন্দরের উপর পর্তুগিজদের নিয়ন্ত্রণ ছিল স্বল্পস্থায়ী, কারণ পনেরো শতকের মধ্যভাগ থেকেই এটি আরাকান, ত্রিপুরা, বাংলা ও বার্মার মধ্যে বিরোধের কেন্দ্রে পরিণত হয়। ১৫৫৯ খ্রিস্টাব্দে গোয়ার পর্তুগিজ ভাইসরয় বাকলার পরমানন্দ রায়ের সঙ্গে একটি বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন করেন এবং এ চুক্তির ফলে পর্তুগিজরা শুল্ক প্রদান করে পণ্য ক্রয়ের অধিকার লাভ করে। সফরকারী পর্তুগিজ জাহাজগুলিতে খাদ্যদ্রব্য সরবরাহের বিনিময়ে তারা বাকলাকে সামরিক সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেয়। পর্তুগিজরা সম্ভবত বাকলার একচেটিয়া বাণিজ্য সুবিধা লাভের উদ্দেশ্যে চট্টগ্রামের ব্যবসা বাকলায় স্থানান্তর করতে চেয়েছিল। চট্টগ্রামে পর্তুগিজদের নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত থাকে। ১৫৬৯ খ্রিস্টাব্দে সীজার ফ্রেডারিক  চট্টগ্রাম বন্দরে আঠারোটি পর্তুগিজ জাহাজ নোঙ্গর করা অবস্থায় দেখতে পান।

বাংলায় অবস্থান সংহত করার জন্য যখন সরকারিভাবে পর্তুগিজ প্রয়াস চলছিল সোনা রূপার বার ও বারুদের কারবারের মাধ্যমে, সে সময় পর্তুগিজ ভাড়াটে সৈন্যরা বাংলা ও আরাকান উপকূলে দস্যুবৃত্তি চালিয়ে যাচ্ছিল। জলদস্যুরা লবণের জন্য বিখ্যাত সন্দীপ দ্বীপটিকে সহজেই ঘাঁটি হিসেবে পেয়ে যায় এবং সেখানে ব্যক্তি খাতের পর্তুগিজ বণিকরাও কর্মকান্ড শুরু করে। সেখানে বসবাসকারী আফগান পরিবারগুলি দস্যুতা অথবা দ্বীপটি নিয়ন্ত্রণে পর্তুগিজদের প্রচেষ্টা এর কোনটিই সুনজরে দেখে নি। মূল ভূখন্ড আক্রমণের জন্য দ্বীপটিকে সুবিধাজনক ঘাঁটি হিসেবে প্রস্ত্ততে আরাকানিদের উচ্চাভিলাষ দ্বীপটির ঘাতপ্রতিঘাতময় ইতিহাসের সাথে ক্রমান্বয়ে সম্পৃক্ত হয়ে উঠছিল।

এভাবে বাংলায় পর্তুগিজ সম্প্রদায় ধীরে ধীরে সরকারি ও ব্যক্তিখাতের বণিক, অভিযাত্রী ও জলদস্যু প্রভৃতি অংশে বিভক্ত হয়ে পড়ে। তবে এই স্বাতন্ত্র্য তেমন সুনির্দিষ্ট ছিল না; সুযোগ প্রায়শই তাতে ব্যতিক্রম ঘটাত। হোসেন শাহী বংশের ক্রমাবনতির ফলে বাংলার উপকূলীয় এলাকায় আরাকান ও উড়িষ্যা শক্তির অনুপ্রবেশ ঘটে এবং প্রায়শই তারা দেশের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়ে। কোন কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণবিহীন পর্তুগিজ দলগুলি দাস ব্যবসার মাধ্যমে স্ব স্ব আধিপত্য প্রতিষ্ঠা শুরু করে।

এফন্সো ডি মেলো কর্তৃক ভাগীরথীর তীরে স্থাপিত প্রথম পর্তুগিজ বসতি ছিল সাতগাঁওয়ে, বান্ডেলে নয়। মনে হয়, সাতগাঁওয়ে পর্তুগিজদের কুঠি স্থাপনের জন্য অনুমতি দেওয়া হয় নি, প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল শুল্ক আদায়ের ছাউনি। ১৫৫৪ খ্রিস্টাব্দের দিকে পোর্টো গ্রান্ডো  নামে অভিহিত চট্টগ্রামের সাথে তুলনা করে পর্তুগিজরা সাতগাঁওয়ের নাম দেয় পোর্টো পিকুইনো (ছোট বন্দর)। আব্দুল হামিদ লাহোরীর মতে সতেরো শতকে কিছুসংখ্যক পর্তুগিজ সন্দ্বীপ থেকে সাতগাঁওয়ে এসে দুর্গবেষ্টিত কিছু ভবন নির্মাণ করেছিল। সাতগাঁয়ের গুরুত্ব হ্রাস পাওয়ার পর তারা হুগলির আশেপাশে কম খাজনায় কিছু জমি পেয়েছিল। ত্রিবেণী বা সম্ভবত বাঁশবাড়িয়ায় তাদের বসতি ১৫৭৯ খ্রিস্টাব্দে আকবরের ফরমানের পূর্বেকার বলে প্রতিপন্ন হয়। সেখানকার আঠারো শতকের মন্দির, প্রাচীরের ভাস্কর্য এখনও পর্তুগিজদের স্মৃতি বহন করে। ফ্রেডারিকের বর্ণনায় দেখানো হয়েছে যে, পর্তুগিজদের বসতি সাতগাঁও সদরে ছিল না, বরং তা দিল আদি সপ্তগ্রাম স্টেশন এবং বর্তমানে শুকিয়ে যাওয়া সরস্বতী নদীর তলদেশের মধ্যবর্তী স্থানে। হুগলিতে অর্থাৎ ভাগীরথীর তীরে ১৫৬৫ খ্রিস্টাব্দের আগে কোন পর্তুগিজ বসতি ছিল না, কেননা তখন পর্তুগিজরা ছোট ছোট নৌকায় করে বেত্তোর (হাওড়ার বিপরীতে) থেকে সাতগাঁওয়ে পণ্যসামগ্রী পারাপার করত। ভাগীরথীর তীরে অবস্থিত ত্রিবেণীর বদলে পর্তুগিজদের বেত্তোর ব্যবহারের অন্যতম কারণ ছিল সম্ভবত ১৫৬০ থেকে ১৫৬৭ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে উড়িষ্যার রাজা কর্তৃক ত্রিবেণী অধিকার।

১৫৭৯ খ্রিস্টাব্দের পর বেত্তোরে পর্তুগিজদের মৌসুমী বসতির পরিবর্তে হুগলিতে তাদের বসতি সুনির্দ্দিষ্ট রূপ পরিগ্রহ করতে শুরু করে। আকবরের দরবারে ফিরিঙ্গিদের উপস্থিতি সম্পর্কে আবুল ফজলের বর্ণনায় বোঝা যায় যে, সাতগাঁও মুগলদেরই নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল, যদিও তিনি সুনির্দ্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, সাতগাঁও ও হুগলি উভয় বন্দরই পর্তুগিজদের অধীনে ছিল। সমকালীন ফরাসি পরিব্রাজক ভিন্সেন্ট লি ব্রাংকের দেখা সাতগাঁওয়ের যে ভবনটির কথা আব্দুল হামিদ লাহোরী উল্লেখ করেছেন সেটি অবশ্যই কিছুকাল পর বিধ্বস্ত হয়ে থাকবে। আপাতদৃষ্টিতে এটি যুক্তিসঙ্গত বলে মনে হয় যে, একবার সরস্বতী নদীতে পলি জমতে শুরু করলে হুগলি নদী দিয়ে অধিক পানি প্রবাহিত হতে থাকে। হুগলির ক্রমোন্নতি সত্ত্বেও ভ্যান লিন্শোটেন (ষোলো শতকের শেষভাগ) দেখতে পান যে, পর্তুগিজরা বন্য লোক ও জংলী ঘোড়ার ন্যায় বাস করছে যেন প্রতিটি মানুষই এক একজন রাজা।

পূর্ব উপকূলে পর্তুগিজ জলদস্যুরা প্রায়শ তাদের পৃষ্ঠপোষকদের যুদ্ধ জয়ে সাহায্য করত। ১৫৮৬ খ্রিস্টাব্দে পর্তুগিজদের সহায়তায় ত্রিপুরা আরাকানিদের কাছ থেকে চট্টগ্রাম ছিনিয়ে নেয়; কিন্তু অচিরেই তারা আরাকানের পক্ষ অবলম্বন করে এবং আরাকানের রাজা সিকান্দর শাহ শেষ পর্যন্ত ১৫৮৮ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম অধিকার করেন। প্রায় এক শতাব্দীকাল চট্টগ্রাম আরাকানিদের দখলে ছিল।

১৫৯০ খ্রিস্টাব্দে এন্টোনিও ডি সউসা গডিনহোর নেতৃত্বে সন্দ্বীপ দখলকারী পর্তুগিজরা আরাকানের ক্রমবর্ধমান ক্ষমতাবৃদ্ধিকে পছন্দ করে নি। সন্দ্বীপের উপর তাদের কর্তৃত্ব ছিল ক্ষণস্থায়ী। সতেরো শতকের ইতিহাস সংকলনকারী পিয়েরে ডু জারিক থেকে আমরা জানতে পারি যে, বিক্রমপুরের কেদার রায় সম্ভবত অপর একটি ভাড়াটিয়া পর্তুগিজ সৈন্যদলের সাহায্যে গডিনহোর নিকট থেকে দ্বীপটি দখল করে নেন। কেদার রায়ের পরাজয় ও অকাল মৃত্যুর ফলে দ্বীপটি ডোমিঙ্গো কার্ভালহোর হাতে চলে যায়। এ কার্ভালহোকে পরবর্তীকালে বাংলা সাহিত্যে অমর করে রাখা হয়েছে। সন্দ্বীপে যাতে অপর্তুগিজ জনসংখ্যা বাড়তে না পারে তার জন্য নৃশংস ব্যবস্থা নেয়া হয়। অপর এক পর্তুগীজের সাথে ক্ষমতা ভাগাভাগিকারী কার্ভালহোকে পর্তুগালের রাজা কি কারণে সম্ভ্রান্ত শ্রেণীতে উন্নীত করেন পরিস্কার নয়।

এবারও পর্তুগিজ আধিপত্য ছিল স্বল্পস্থায়ী। কার্ভালহো আরাকানের একটি আক্রমণকে প্রতিহত করলেও শেষ পর্যন্ত তাকে ও তার সমমনা পর্তুগিজদের দ্বীপটি ছেড়ে যেতে হয়েছিল। এরা আধা-স্বায়ত্বশাসিত উপকূলীয় রাজ্য শ্রীপুর বাকলা ও যশোরে জায়গিরসহ গোলন্দাজ বাহিনীতে ও নৌবাহিনীর নাবিক হিসেবে চাকরি এবং বেশ লাভজনক ব্যবসার সুযোগ পেয়েছিল। মুগলদের বিরুদ্ধে এক যুদ্ধে কার্ভালহো আহত হন এবং তাকে হুগলিতে চলে যেতে হয়। সেখানে তিনি আরোগ্য লাভ করেন।

রেভারেন্ড লং বর্ণনা করেছেন যে, পর্তুগিজরা হুগলিতে চারটি বুরুজ ও একটি পরিখাসহ একটি দুর্গ নির্মাণ করেছিল। ফাদার হোস্টেন এ ধরনের কোন দুর্গের অস্তিত্বের কথা অস্বীকার করেছেন। কাফী খান অবশ্য একটি দুর্গের উল্লেখ করেছেন, যদিও সমকালীন পরিব্রাজকরা এ সম্পর্কে নীরব ছিলেন। পিয়ারে ডু জ্যারিকের মতে, নদীর অপর তীরে মুগলদের নির্মিত একটি দুর্গ কার্ভালহো দখল করে নিয়েছিল। চট্টগ্রামে আরাকানিরা একটি দুর্গ নির্মাণ করেছিল এবং এর চারপাশে বসতি স্থাপনের জন্য পর্তুগিজদের অনুমতি দিয়েছিল।

পশ্চিমবঙ্গের অভ্যন্তরভাগেও পর্তুগিজরা বসতি স্থাপন করেছিল। ষোড়শ শতকের শেষভাগ এবং সতেরো শতকের শুরুতে পর্যটক জেসুইট ফাদাস-র্এর লেখা চিঠিতে হুগলি নদীর মুখে এধরনের বসতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। রেভারেন্ড লং একটি মানচিত্রের ভিত্তিতে ডায়মন্ড হারবারে একটি পর্তুগিজ বসতির কথা উল্লেখ করেছেন। মানচিত্রটির অস্তিত্ব এখন আর নেই। জেসুইট ফাদারদের বিবরণে শতাব্দীর শেষে পূর্ব বাংলায় বিশেষত শ্রীপুর ও যশোরে পর্তুগিজ বসতির উল্লেখ রয়েছে যেখানে যশোরের জমিদার প্রতাপাদিত্য কিছুসংখ্যক পর্তুগিজসহ কার্ভালহোকে অন্তরীণ করে রেখেছিলেন। পর্তুগিজরা ঈশ্বরীপুর ও ধুমঘাটের মধ্যবর্তী স্থানে বসতি স্থাপন করেছিল বলে মনে হয়। ফলে যশোরের জনগণের মধ্যে উদ্বেগ ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয় যার পরিণতিতে পর্তুগিজ পুলিশ প্রধান খুন হন। পরবর্তী সময়ে জেসুইটরা কিছুসংখ্যক পর্তুগিজ বন্দিকে মুক্তিপণের বিনিময়ে ছাড়িয়ে নেয়।

পর্তুগিজদের অসংযত জীবনযাপন পদ্ধতি ছাড়াও কিছু কিছু পর্তুগিজ জলদস্যু কর্তৃক আরাকানিদের সঙ্গে যুক্তভাবে দ্রুতগামী নৌকাযোগে হামলা চালিয়ে উপকূলীয় লোকদের ধরে নিয়ে দাস বানানোই পর্তুগিজদের প্রতি স্থানীয় জনগণের ঘৃণার মনোভাবের অন্যতম কারণ। শিহাবুদ্দীন তালিশের বিবরণে এ ধরনের তথ্য বিধৃত রয়েছে। ফ্রাঁসোয়া বার্নিয়ের জলদস্যুদের প্রধান হিসেবে জনৈক ব্যাস্টিয়ান গনজালভেসের (সেবাস্টিয়ান গনজালভেস টিবিউ) উল্লেখ করেছেন। প্রাথমিক অবস্থার উষ্ণ অভ্যর্থনা এবং গির্জা নির্মাণ ও ধর্মান্তরিত করার অনুমতি দানের অবস্থার পরিবর্তে ১৬০৫ খ্রিস্টাব্দের পর পর্তুগিজদের প্রতি এবং একই সাথে জেসুইটদের প্রতি উপকূলীয় অঞ্চলের জমিদারদের পরিপূর্ণ শত্রুতার মনোভাব কেবল এ ধরনের দস্যুতা ও মানুষকে দাসত্বে বাধ্য করার পটভূমিতে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।

কার্ভালহোর প্রস্থানের পর সন্দ্বীপ ম্যানোয়েল ডি ম্যাট্টু কর্তৃক শাসিত হয়। তার মৃত্যুর পরই ফতেহ খান পর্তুগিজদের হত্যা করে সন্দীপ দখল করেন। গনজালভেস টিবিউ তাকে হত্যা করে সন্দীপ দখল করেন এবং তথাকার সকল মুসলমান পুরুষকে হত্যা করেন। কিন্তু প্রথম অবস্থায় একজন ব্যবসায়ী হওয়ায় টিবিউ সন্দ্বীপকে একটি বাণিজ্যকেন্দ্র বিশেষত লবণের ব্যবসাকেন্দ্রে উন্নীত করেন এবং তা বাংলা ও করমন্ডলের বণিকদের আকৃষ্ট করে। টিবিউ তখন বাকলার নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য দক্ষিণ শাহবাজপুর দখল করেন। এতকাল তিনি বাকলার অধীনে থেকে তার কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছিলেন।

মুগলরা যখন উপকূলের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল তখন টিবিউ আরাকানের পলাতক রাজার কন্যা অনুপোরমকে (কোন কোন ভাষ্যমতে বোন) বিয়ে করেন এবং আরাকানের রাজার সাথে জোটবদ্ধ হয়ে ভুলুয়া দখল করেন। কিন্তু মুগলরা কৌশলে টিবিউকে জোটমুক্ত করে এবং আরাকানিদের সম্পূর্ণভাবে পরাজিত করে। টিবিউ আরাকানি জাহাজগুলি দখল করে নেন। আরাকান ছেড়ে এসে টিবিউ ১৬১৫ খ্রিস্টাব্দে গোয়া কর্তৃপক্ষের কাছে আরাকান দখল করার প্রস্তাব পাঠান। আরাকানের সমর্থক ওলন্দাজ নৌবহর গোয়ার ষোলটি জাহাজের বহরকে পরাজিত করে। টিবিউ সন্দ্বীপে পশ্চাদপসরণ করেন এবং ১৬১৬ খ্রিস্টাব্দে আরাকানিদের নিকট পরাজিত হন।

পশ্চিম উপকূলের বসতির তুলনায় পূর্ব উপকূলের পর্তুগিজ বসতিগুলির অরাজক অবস্থার কারণ হয়ত এই ছিল যে, পূর্ব উপকূলের উপনিবেশগুলি বৈধভাবে পর্তুগাল রাজার রাজ্যের অংশ ছিল না। এগুলি ছিল ব্যক্তিখাতের পর্তুগিজ বণিক ও ফটকাবাজদের বসতি যেগুলি প্রায়শই অস্পষ্ট স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করত, স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে কর প্রদান করত এবং কিছু বিশেষ সুবিধা ভোগ করত। সতেরো শতকের মধ্যভাগ থেকে বাংলায় স্থাপিত অপরাপর ইউরোপীয় কুঠি থেকে এগুলি ছিল ভিন্ন ধরনের।

১৫৮০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ কিছু পর্তুগিজ ব্যবসায়ী ঢাকা ও শ্রীপুরে বসতি স্থাপন করে। এখান থেকে তারা মসলিন, তুলা ও রেশমি দ্রব্য ইউরোপ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় রপ্তানি করতে শুরু করে। দেশের অভ্যন্তরভাগে অবস্থিত স্থাপনাগুলিতে দুর্গ ছিল না এবং খ্রিস্টধর্মীয় দলিলপত্র থেকে প্রমাণিত হয় যে, আঠারো শতকের প্রথম দিক পর্যন্ত কোথাও কোথাও পর্তুগিজ অগাস্টাইন ফাদার্স কর্তৃক স্থাপিত গির্জাগুলির পাশাপাশি পর্তুগিজ বসতিগুলি ভালভাবেই পরিচালিত হচ্ছিল। ঢাকা, বরিশাল, নোয়াখালী এবং বিশেষত ঢাকার ২৮ মাইল দক্ষিণে অবস্থিত লড়িকলে এ ধরনের গির্জা দেখা যেত এবং অগাস্টাইন যাজকরা ষোলো শতকের শেষভাগে লড়িকলে একটি গির্জা নির্মাণ করেছিলেন।

সতেরো শতকের শেষদিকে নিকোলো ডি পইভার মতো ধনবান পর্তুগিজ বণিক বাংলায় ব্যবসা করছিল। ভুলুয়ায় বহু লোক পর্তুগিজ ধর্মে দীক্ষা গ্রহণ করে। ১৬৩৫ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত একটি গির্জাসহ পর্তুগিজরা তামলুকে বসতি স্থাপন করে। সতেরো শতকে তামলুকে বর্ধিষ্ণু দাস ব্যবসার উল্লেখ করেছেন শিহাবুদ্দীন তালিশ। ১৭২৪ খ্রিস্টাব্দে তামলুকে মোমের কারবারের কথা উল্লেখ করেছেন ভ্যালিন্টাইন। ক্যারেরি ১৬৯৫ খ্রিস্টাব্দে তামলুক পর্তুগিজদের নিয়ন্ত্রণাধীন দেখতে পান।

চট্টগ্রাম আরাকানিদের হাতে চলে যাবার পর পর্তুগিজদের প্রধান বসতি গড়ে ওঠে হুগলিতে। পর্তুগিজ ঐতিহাসিক ক্যাব্রাল এ বসতির উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন। পর্তুগিজরা লবণ ব্যবসার জন্য মুগলদেরকে বার্ষিক এক লক্ষ টাকা আমদানি-রপ্তানি শুল্ক প্রদান করেছিল বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। শুল্কের এ অর্থের পরিমাণ অত্যুক্তি বলেই মনে হয়। হুগলিতে জমজমাট ব্যবসা সত্ত্বেও সতেরো শতকের তৃতীয় দশক নাগাদ স্পেনের অন্তর্ভুক্ত হওয়া পর্তুগিজ সাম্রাজ্য তখন পতনের পথে। সিংহলের পর্তুগিজ গভর্নর পর্তুগিজ অধিকৃত পূর্বাঞ্চল শাসন করছিলেন এবং ওলন্দাজদের কাছে একটির পর একটি স্থানের অধিকার হারাচ্ছিলেন। পর্তুগিজদের না ছিল কোন সঞ্চিত অর্থ, না ছিল কোন সুসংবদ্ধ নীতিমালা।

পর্তুগালের রাজা হুগলিতে পর্তুগিজ বসতির প্রশাসন কাজে ক্যাপ্টেন নিয়োগ করতেন। এই ক্যাপ্টেনের চার জন প্রশাসনিক সহকারি ছিলেন; প্রতি বছর এঁরা পর্তুগিজ বাসিন্দাদের দ্বারা নির্বাচিত হতেন। এরাঁ সবাই নামেমাত্র সিংহলের গভর্নরের অধীন ছিলেন। গোয়ার মতোই হুগলি শহরের অভ্যন্তরে ধনবান পর্তুগিজরা সচরাচর একজন ধনাঢ্য মুসলমানের ন্যায় হারেমসহ জীবন যাপন করত। তাদের অধীনে বহুসংখ্যক পর্তুগিজ বর্ণসংকর (মেস্তিকো) লোক ক্রীতদাস ও ভারতীয় কৃষি শ্রমিকদের কাজকর্ম তদারকি করত। পর্তুগিজ ধর্মযাজকরা ছিল সমাজে সর্বোচ্চ স্তরের লোক যদিও ধর্মগত অপরাধ তদন্তের জন্য যাজকদের বিচারসভার কোন নজির সেখানে ছিল না যেমনটি সতেরো শতকের গোয়ায় দেখা গেছে। বাঙালি কারিগর ও শ্রমিকরা (পর্তুগিজদের কথায় গরিবো) পর্তুগিজ শাসন টিকে থাকুক আর না থাকুক এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ নিরাসক্ত ছিল।

হুগলি নদী থেকে পর্তুগিজদের তাড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে মুগলরা ১৬৩২ খ্রিস্টাব্দে হুগলির সন্নিকটে পৌঁছে। মির্জা নাথান ও শিহাবুদ্দীন তালিশের মতে পর্তুগিজ ও মগ হানাদারদের দস্যুবৃত্তি এবং হুগলিকে একটি বর্ধিষ্ণু দাস বেচাকেনার বাজারে পরিণত করাই ছিল মুগলদের হুগলি আক্রমণের কারণ। পক্ষান্তরে ক্যাবরাল অভিযোগ করেছেন যে,  শাহজাহানের প্রয়োজনের সময় পর্তুগিজ নৌবহর মুগলদের পক্ষ ত্যাগ করার কারণেই তারা হুগলি আক্রমণ করে।

শহরতলিতে বসবাসকারী বাঙালি পরিবারগুলি সম্পূর্ণভাবে এলাকা ছেড়ে যাওয়ায় এবং মার্টিন আলফন্সো ডি মেলোর সহায়তার ফলে মুগলরা ১৬৩২ খ্রিস্টাব্দের ১৩ সেপ্টেম্বর হুগলি দখল করে। কিছুসংখ্যক পর্তুগিজ সাগর দ্বীপে পালিয়ে যায়। মুগলদের কামানের গোলায় এক শত পর্তুগিজের মৃত্যুর কথা ক্যাব্রাল উল্লেখ করেছেন যা প্রায় সঠিক বলেই প্রতীয়মান হয়। পরবর্তীকালের ইংরেজ ও ওলন্দাজ দলিলপত্র থেকে জানা যায় যে, পর্তুগিজরা হুগলিতে প্রত্যাবর্তন করেছিল। আঠারো শতকের শেষভাগ এবং উনিশ শতকের প্রথম দিকের ইউরোপীয় দলিলপত্রে সম্রাট শাহজাহানের একটি ফরমানের উল্লেখ রয়েছে যাতে পর্তুগিজদের হুগলিতে ৭৭৭ বিঘা জমি প্রদান করা হয়েছিল। ফরমানটির কোন অস্তিত্ব এখন আর নেই। বান্ডেল গির্জার একজন যাজককে যে দায়িত্বপত্রের দ্বারা পর্তুগিজ বসতির বিশেষত বান্ডেলের বসতির দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছিল, সেটি ১৬৪১ খ্রিস্টাব্দে সুবাহদার শাহ সুজার একটি পরওয়ানা দ্বারা অনুমোদন করা হয়েছিল বলে প্রতীয়মান হয়। যশোরে গির্জা নির্মাণের প্রায় একই সময়ে যে অগাস্টাইন যাজকরা ১৬০০ খ্রিস্টাব্দে বান্ডেলে একটি গির্জা নির্মাণ করেন, তারা ১৬৩২ খ্রিস্টাব্দে গোয়ার জেসুইটদের সঙ্গে একটি শান্তিচুক্তির ফর্মুলা তৈরি করেছিলেন।

নিকোলো মানুচি ১৬৬০ খ্রিস্টাব্দে অনেক ধনী পর্তুগিজ বণিককে হুগলিতে লবণ ব্যবসায়ে একচেটিয়া সুবিধা ভোগ করতে দেখেছেন। এর কয়েক বছর পর বার্নিয়ার বাংলায় নয় হাজার পর্তুগিজ এবং তাদের বংশজাত বর্ণসংকর (মেস্তিকো) লোকদের দারিদ্রে্যর মধ্যে জীবন যাপনের কথা উল্লেখ করেছেন। ১৬৭০ খ্রিস্টাব্দে টমাস বাউরি সমগ্র বাংলায় অবস্থানরত বিশ হাজার পর্তুগিজের মধ্যে দশ হাজারকে হুগলিতে প্রধানত জাহাজে কাজ করতে দেখেছেন। ধনবান পর্তুগিজদের কেউ কেউ গির্জায় মোটা অঙ্কের অনুদান প্রদান করতেন। ১৭৬১ খ্রিস্টাব্দে বান্ডেল গির্জা পুনর্নির্মাণ কাজে এক ধনী পর্তুগিজ কর্তৃক প্রদত্ত অনুদান থেকেই তা বোঝা যায়।

এমনকি গনজালভেস টিবিউর চলে যাওয়ার পরও চট্টগ্রামের উপকূলীয় অঞ্চল পর্তুগিজদের দস্যুবৃত্তির জন্য অবারিত থেকে যায়। এরা সন্দ্বীপকে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে এবং প্রায়শ আরাকানিদের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে দস্যুবৃত্তি চালিয়ে যেত। সাধারণত পর্তুগিজ-আরাকানি মৈত্রী ছিল সাময়িক এবং মুগল অভিযানে অপরাপর পর্তুগিজদের অংশগ্রহণ অনেকাংশে ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দের ২৬ জানুয়ারি মুগলদের চট্টগ্রাম বিজয়কে সম্ভব করে তুলেছিল। এরা ১৬৮১ খ্রিস্টাব্দেও সন্দ্বীপ থেকে আরাকানিদের বিতাড়নকালে মুগলদের সমর্থন করে এবং ফলে উপকূলীয় অঞ্চলে দস্যুতা বহুলাংশে হ্রাস পায়। চট্টগ্রাম বিজয়ের পর শায়েস্তা খান পর্তুগিজদের অনেককে হত্যা করেন এবং অনেক পর্তুগিজকে ঢাকার আশেপাশে বসতি গড়ার জন্য প্রেরণ করেন বলে মানুচি যে মন্তব্য করেছেন তা সমর্থনযোগ্য নয়। আঠারো শতকের শেষ নাগাদ পর্তুগিজদের মধ্যে কেউ কেউ বিশিষ্ট ব্যবসায়ী হয়ে ওঠেন। এদের মধ্যে জনৈক কস্মো গোমেজের উল্লেখ পাওয়া যায় যিনি সতেরো শতকের শেষভাগ থেকে আঠারো শতকের তৃতীয় দশক পর্যন্ত ব্যবসায়ে নিয়োজিত ছিলেন। বিদ্রোহী শোভা সিংহ ও  রহিম খান হুগলির পথে বান্ডেল অভিমুখে অগ্রসর হলে বান্ডেলের পর্তুগিজ বাসিন্দারা সাফল্যের সাথে তাদের অগ্রযাত্রা প্রতিহত করে মুগল কর্তৃপক্ষের কৃতজ্ঞতাভাজন হয়। আঠারো শতকের গোড়ার দিক থেকে দক্ষিণ-পুর্ব উপকূলের পর্তুগিজ বসতিগুলি দিয়াঙ্গা, চট্টগ্রাম জেলার ফিরিঙ্গি বাজার এবং চট্টগ্রাম শহরের জামাল খান পৌর এলাকায় অবস্থিত ছিল।

ফরাসিদের বাণিজ্য বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পর্তুগিজ বণিকরা হুগলি থেকে ফরাসি অধিকৃত চন্দননগরে চলে যায়। চন্দননগরে আঠারো শতকের পৌর নথিপত্রে দেখা যায় যে, বিপুল সংখ্যক ধনবান পর্তুগিজ বণিক তাদের দাসদাসীদের নিয়ে নিজেদের বাড়িতে বসবাস করত। কিছুসংখ্যক পর্তুগিজ কলকাতায় বসতি স্থাপন করলেও ১৭৩৩ সালে ইংরেজরা পর্তুগিজদের সঙ্গে ব্যবসায়িক যোগাযোগ না রাখার জন্য তাদের কর্মচারীদের নির্দেশ দেয়। তখনও যে হুগলি পরিত্যক্ত হয় নি তার প্রমাণ ১৭৪০ সালে সেখানে একটি পর্তুগিজ জাহাজের আগমন সম্পর্কিত তথ্য। সেসময় থেকেই পর্তুগিজরা স্থানীয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণের উচ্চাভিলাষ এবং প্রয়োজনীয় অর্থ ব্যয়ের সঙ্গতি হারিয়ে ফেলে। নবাবদের সেনাবাহিনীতে কিছু কিছু বর্ণসংকর লোকদের অল্প বেতনে চাকরি প্রদান করা হয়। সংস্কৃতির ক্ষেত্রে কিন্তু পর্তুগিজরা স্থায়ী প্রভাব রেখে যায়।

পর্তুগিজরা বিদেশি ফল, ফুল এবং গাছের চারা নিয়ে এসেছিল যেগুলি বাঙালি সভ্যতা ও সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে। তাদের নিয়ে আসা অন্যান্য ফলের মধ্যে রয়েছে গোল আলু, কাজু বাদাম, পেঁপে, আনারস, কামরাঙ্গা, পেয়ারা। এসবই কৃষি-উদ্যান পালনের প্রতি তাদের আগ্রহের পরিচয় বহন করে। তাদের নিয়ে আসা এসব ফল ও আলফন্সো আম বাঙালি জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে আছে। এমনকি নানা রঙের কৃষ্ণকলির চারাও পর্তুগিজদেরই অবদান।

তাদের আগমনের প্রথম দিক থেকেই পর্তুগিজরা স্থানীয় মহিলাদের সাথে বিয়েতে আপত্তি করে নি, যদিও উচ্চপদের চাকরিগুলি পর্তুগাল থেকে আগত শ্বেতাঙ্গ পর্তুগিজদের জন্য সংরক্ষিত ছিল। চাবি, বালতি, পেরেক, আলপিন, তোয়ালিয়া এবং আরও অনেক পর্তুগিজ শব্দ বাংলা শব্দ তালিকায় যোগ হয়েছে। গদ্য রীতিতে বাংলা ভাষার প্রথম মুদ্রিত পুস্তক পর্তুগিজদের দ্বারা মুদ্রিত হওয়ায় সম্ভবত কাজটি সহজ হয়েছিল। প্রথম বাংলা ব্যাকরণ ও বাঙলা অভিধান লিখেছিলেন একজন পর্তুগিজ। ১৫৯৯ খ্রিস্টাব্দে ফাদার সোসা একটি ক্ষুদ্রাকৃতির ধর্মীয় পুস্তিকা বাংলায় অনুবাদ করেন। পুস্তিকাটির কোন কপি এখন আর নেই। কিন্তু বাংলায় অপর একটি ধর্মীয় পুস্তক লিখেছিলেন যশোরের এক বাঙালি যুবরাজ যাকে দাসত্বে আবদ্ধ করে খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরিত করা হয়। তার নতুন নাম দেয়া হয় ডম এন্টোনিও। তার মনিব ম্যানসেল ডি রোজারিও একটি বাংলা ব্যাকরণ ও অভিধানসহ বাংলায় একটি নাটিকা লেখেন এবং তা ১৭৪৩ সালে লিসবনে মুদ্রিত হয়। পর্তুগিজরা ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে গোয়ায় প্রথম ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করলেও বাংলায় তাদের স্থাপনার অস্থিতিশীল অবস্থার কারণে তারা এর ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারে নি।  [অনিরুদ্ধ রায়]