নাথধর্ম


নাথধর্ম  তন্ত্র, হঠযোগ,  সহজিয়া, শৈবাচার, ধর্মপূজা প্রভৃতি মতের সমন্বয়ে উদ্ভূত একটি সাধনমার্গ। পূর্ব ভারতে এর উদ্ভব ও বিকাশ ঘটে।  মৎস্যেন্দ্রনাথ বা মীননাথ (আনু. ১০ম-১২শ শতকের মধ্যে) নামে একজন বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্য এ ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা।

নাথধর্ম গুরুবাদী। গুরুদের মধ্যে মৎস্যেন্দ্রনাথ, গোরক্ষনাথ, চৌরঙ্গীনাথ, জালন্ধরীপাদ প্রমুখ সিদ্ধাচার্য ছিলেন প্রধান। মৎস্যেন্দ্রনাথ চন্দ্রদ্বীপে বাস করতেন এবং পেশায় ছিলেন ধীবর। তিনি বেশ কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করেন, যার পাঁচটি নেপালে পাওয়া যায়। মৎস্যেন্দ্রনাথের শিষ্য গোরক্ষনাথ ছিলেন ময়নামতীর রাজা গোপীচন্দ্রের সমসাময়িক। গোপীচন্দ্রের মাতা ময়নামতী ছিলেন গোরক্ষনাথের শিষ্যা এবং যোগশক্তিতে পারদর্শিনী, আর গোপীচন্দ্র ছিলেন জালন্ধরীপাদ বা হাড়িপার শিষ্য।

হঠযোগ ও কায়াসাধনা নাথধর্মের প্রধান বৈশিষ্ট্য। কায়াসাধনায় শরীর নিরোগ ও অধ্যাত্ম সাধনায় অমরত্ব লাভ সম্ভব বলে নাথধর্মীরা বিশ্বাস করে। নাথদের যুগী নামেও অভিহিত করা হয়। নাথযোগীদের মাথায় থাকে জটা, সর্বাঙ্গে ছাই-ভস্ম, কানে কড়ি ও কুন্ডল, গলায় সুতা, বাহুতে রুদ্রাক্ষ, হাতে ত্রিশূল, পায়ে নূপুর, কাঁধে ঝুলি ও কাঁথা। তাদের কুলবৃক্ষ হচ্ছে বকুল এবং প্রধান আহার্য কচুশাক। একসময় তাঁত বোনাই ছিল তাদের পেশা। পরবর্তীকালে তারা কৃষিকাজ ও বিভিন্ন অফিস-আদালতে চাকরি করে।

নাথযোগীরা তিন দিন দীক্ষা নেন। প্রথম দিন গুরু শিষ্যের চুল কেটে দেন এবং দ্বিতীয় দিন তার কানে কুন্ডল পরিয়ে দেন। তৃতীয় দীক্ষা হলো উপদেশী। এতে প্রথমে হরপার্বতী,  ব্রহ্মাবিষ্ণু ও গণেশের পূজা হয়, পরে গোরক্ষনাথের পূজা এবং শেষে ভাঙ ও মদমাংসের সঙ্গে আকাশভৈরবের পূজা হয়। এসময় সারারাত দীপ জ্বলে এবং নানা অনুষ্ঠান হয়। এর নাম ‘জ্যোৎ-জাগান’।

বিবাহের ক্ষেত্রে নাথধর্মীরা হিন্দু আচার-অনুষ্ঠান অনুসরণ করে। তাদের মধ্যে বাল্যবিবাহ প্রচলিত এবং তালাক দেওয়ার কোনো রীতি নেই। স্ত্রী বন্ধ্যা কিংবা দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হলে স্বামী অন্যত্র বিবাহ করতে পারে, অন্যথায় নয়। তাদের মধ্যে বিধবাবিবাহ নিষিদ্ধ। নাথযুগীরা মৃতদেহ কবর দেয়, তবে সৎকারের ক্ষেত্রে হিন্দু আচার-অনুষ্ঠান পালন করে।

ভারতের উড়িষ্যা থেকে পাকিস্তানের পেশোয়ার পর্যন্ত নাথযোগীদের আস্তানা ও তীর্থক্ষেত্র বিস্তৃত। গোরক্ষনাথ গোর্খা জাতি তথা সমগ্র নেপালে পূজনীয়। ধর্মনাথী, আইপন্থী, ধ্বজাপন্থী প্রভৃতি ১২টি শাখায় নাথরা বিভক্ত। কলকাতার দমদম অঞ্চলে এবং হুগলির মহানাদে চৈত্র মাসে গাজনের সময় এদের উৎসব হয়। নাথধর্ম ও নাথগুরুদের কাহিনী নিয়ে মধ্যযুগে এক বিশেষ ধারার  বাংলা সাহিত্য রচিত হয়, যা নাথসাহিত্য নামে পরিচিত। [আনোয়ারুল করীম]