সহজিয়া


সহজিয়া একটি বিশেষ ধর্মসম্প্রদায়, যারা সহজপথে সাধনা করে। ‘সহজ’ শব্দের অর্থ যা সঙ্গে সঙ্গেই জন্মায়। জীব বা জড়ের বাহ্য রূপের সঙ্গে সঙ্গে তার ভেতরেও একটি শাশ্বত স্বরূপ জন্মলাভ করে। এই শাশ্বত স্বরূপই ‘সহজ’। এর উপলব্ধির মধ্য দিয়েই যাবতীয় প্রাণী ও বস্ত্তর উপলব্ধি হয়। আর এই উপলব্ধির প্রণালীই হলো সহজপথ।

‘সহজ’ শব্দের আরেকটি অর্থ হলো যা মানুষের স্বভাবের অনুকূল, আর যা প্রতিকূল তা বক্র। এ অর্থে মনুষ্য-স্বভাবকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা না করে বরং স্বভাবের অনুকূল পথে আত্মোপলব্ধির চেষ্টা করাই সহজিয়ামতের লক্ষ্য। সহজিয়াদের বিশ্বাস, সাধনার যিনি লক্ষ্য তিনি জ্ঞানস্বরূপ; তাঁর অবস্থান দেহের মধ্যে, দেহের বাইরে নয়। সুতরাং দেহকে বাদ দিয়ে তাঁকে পাওয়া যায় না। তাঁকে যুক্তিতর্ক বা গ্রন্থপাঠেও জানা যায় না, জানা যায় কেবল গুরূপদেশ ও সহজ-সাধনায়। তাই সহজ-সাধনায় দেহের গুরুত্ব অনেক। দেহকে ক্ষুদ্র ব্রহ্মান্ড মনে করা হয়। দৈহিক সাধনা বা পরকীয়া প্রেমের মধ্য দিয়েই সাধনায় সিদ্ধি লাভ করা যায় এটাই সহজিয়ামতের মূল কথা। সহজিয়াদের এই মতাদর্শের ওপর ভিত্তি করে যে ধর্মমত গড়ে উঠেছে তাই সহজিয়া ধর্ম। আর এই ধর্মমত প্রচারের উদ্দেশ্যে যে বিশাল সাহিত্য রচিত হয়েছে তা সহজিয়া সাহিত্য নামে পরিচিত।

সহজিয়ারা দুই ভাগে বিভক্ত বৌদ্ধ সহজিয়া ও বৈষ্ণব সহজিয়া। বৌদ্ধ সহজিয়াদের উদ্ভব বজ্রযানী বৌদ্ধদের থেকে এবং তাদেরই অনুকরণে বৈষ্ণবদের একটি অংশ বৈষ্ণব সহজিয়া নামে পরিচিত হয়।

বৌদ্ধ সহজিয়া  মতবাদ  সহজযান নামে পরিচিত। বজ্রযানী বৌদ্ধদের মধ্যে মন্ত্র-তন্ত্র, পূজার্চনা, ব্রত-নিয়ম, শাস্ত্রপাঠ ইত্যাদির প্রাবল্য দেখা দিলে তাদেরই একটি অংশ উপলব্ধি করে যে, এসব শাস্ত্রাচার পালন নিরর্থক; প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই বোধি বা বুদ্ধ আছেন এবং কেবল সহজ-সাধনায় তাঁকে উপলব্ধি করতে পারলেই মোক্ষলাভ করা যায়। এভাবেই পাল রাজাদের আমলে বাংলায় বৌদ্ধ সহজিয়া মতের উদ্ভব হয়। যা মানুষের মধ্যে শাশ্বত স্বরূপের উপলব্ধি আনে, তার মাধ্যমে জগতের প্রাণিকুল ও বস্ত্তনিচয়কে অনুভব করার দর্শনই বৌদ্ধ সহজিয়া ধর্মমতের অন্তর্নিহিত সত্য। এই উপলব্ধি মনুষ্য-স্বভাবকে সহজে চেনা এবং বিষয়বুদ্ধি পরিহারে অনুপ্রেরণা জোগায়। বৌদ্ধগান বা চর্যাপদের পদকর্তা লুইপা, ভুসুকুপা,  কাহ্নপা, সরহপা, শান্তিপা, শবরপা প্রমুখ সিদ্ধাচার্য সহজিয়া ধর্মমতে দীক্ষিত ছিলেন। এঁদের অধিকাংশই বাংলা, মিথিলা, উড়িষ্যা ও কামরূপের অধিবাসী ছিলেন বলে সহজিয়া-সাধনতত্ত্বে পূর্বভারতীয় জীবনাচার প্রাধান্য পায়।

শৈব নাথধর্ম ও তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মে চুরাশি সিদ্ধা বা ধর্মগুরুর মধ্যে ভুসুকুপা, কাহ্নপা প্রমুখ অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। এঁরা তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্ম বা সহজিয়া বৌদ্ধধর্মপন্থী হয়ে নিজেদের কুল ও জাতি পরিচয় গোপন রেখে ছদ্মনাম গ্রহণ করেন। চর্যাপদে সহজিয়াপন্থীদের সাধনতত্ত্ব, ধর্মতত্ত্ব ও দর্শনের কথা হেঁয়ালির আকারে সন্ধ্যা ভাষায় নানা উপমা-রূপকের মাধ্যমে বিবৃত হয়েছে।

বৃহত্তর অর্থে বৌদ্ধধর্মের যে মহাযান ধর্মমত, তাই পরে বজ্রযান, কালচক্রযান, মন্ত্রযান, সহজযান ইত্যাদি উপবিভাগে বিভক্ত হয়। ধর্মসাধনার ক্ষেত্রে এসব মতবাদের মধ্যে পার্থক্য থাকলেও নির্বাণ সম্পর্কে সকলে একমত। সহজিয়া ধর্মসাধনার অভীষ্ট লক্ষ্য হচ্ছে  জরা, ব্যাধি, মৃত্যু এবং ভাগ্যচক্রে সংঘটিত পুনর্জন্মের প্রান্তসীমা অতিক্রম করে নির্বাণ লাভ করা। এমতে যারা দীক্ষিত তারা কতগুলি তান্ত্রিক আচার-আচরণের মাধ্যমে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে বলে বিশ্বাস করে। এই সাধনতত্ত্বের ওপর ভিত্তি করেই বৌদ্ধগান ও দোহার পদগুলি রচিত। তাই  চর্যাপদ প্রকৃতপক্ষে বৌদ্ধ সহজিয়া মতের পদসংকলন। এগুলিতে সহজযানভিত্তিক তান্ত্রিক যোগসাধনার কথাই ব্যক্ত হয়েছে।

বৌদ্ধ সহজিয়ামতে স্বরূপের উপলব্ধি প্রধানভাবে বিবেচিত। এতে যে চিত্তশুদ্ধির ওপর প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে, বৌদ্ধগান ও দোহার রচয়িতৃগণও তার ওপরই গুরুত্ব আরোপ করেছেন। এ ধর্মে বিশ্বাসী সিদ্ধাচার্যগণের ধর্মসাধনা ও মতবাদের ব্যাখ্যাটি হলো: চিত্তকে শুদ্ধ করতে হলে বিষয়াসক্তি ত্যাগ করতে হবে এবং চিত্তকে শূন্যতাবোধে স্থাপন করতে হবে। করুণার সংস্পর্শে চিত্তের নির্বাণ লাভ হয়, তাতে পরিতৃপ্তি আসে এবং পরিতৃপ্ত নির্বাণের মাধ্যমে মহাসুখ লাভ হয়। এই মহাসুখই হলো জীবের মূল লক্ষ্য এবং তাতেই সহজানন্দ অর্থাৎ সহজ স্বরূপকে উপলব্ধির এক অতীন্দ্রিয় আনন্দ লাভ হয়।

বৌদ্ধশাস্ত্রের পারিভাষিক শব্দ, যেমন শূন্য, ত্রিশরণ, বোধি, তথাগত, জিনরত্ন, দশবল, নির্বাণ ইত্যাদি ব্যবহারের মাধ্যমে বৌদ্ধ সহজিয়াপন্থী সিদ্ধাচার্যগণ বৌদ্ধদর্শনের ওপর যথেষ্ট গুরুত্বারোপ করেছেন এবং বিশেষ অনুভবের এই শব্দগুলিকে একটি তাত্ত্বিক সম্পর্কসূত্রে গ্রথিত করেছেন। এছাড়া আছে গুরুবাদের ওপর অপরিমেয় গুরুত্বারোপ। কাহ্নপাদের চলি­শ সংখ্যক পদে বলা হয়েছে: ‘গুরু বোবা শিষ্য কালা।’ এর অর্থ গুরু আভাস-ইঙ্গিতে যা বোঝান, শিষ্য তা সহজেই বুঝতে পারে।

সতেরো শতকে বৈষ্ণব সমাজে এবং আঠারো শতকে বাউল সম্প্রদায়ের মধ্যে সহজিয়া ধর্মমতের সম্প্রসারণ ঘটে। বৌদ্ধ সহজিয়াদের মতো বৈষ্ণব ও বাউল সাধকরাও সাধনার এই পথ ধরে জীবনের স্বরূপ উপলব্ধিতে বিশ্বাসী। তাদের উপলব্ধি ও বিশ্বাসের কথা বৈষ্ণবপদ ও বাউলগানে বিধৃত হয়েছে। বৌদ্ধ সহজিয়াদের ধর্মমত ও সাধন-প্রণালী ব্যাখ্যা করে সংস্কৃত,  অপভ্রংশ ও বাংলা ভাষায় অনেক  তন্ত্র ও তার ভাষ্য, দোহা এবং  চর্যাগীতি রচিত হয়েছে। সেগুলি বৌদ্ধ সহজিয়া সাহিত্য নামে পরিচিত।

বৈষ্ণব সহজিয়া  ঈশ্বর সাধনার অন্যতম ধর্মমত ও সম্প্রদায়। চতুর্দশ শতকের কবি বড়ু চন্ডীদাসকে এই মতের উদ্ভাবক ও প্রচারক বলা হয়। রামী নামে এক রজকিনীর সাহচর্যে তিনি এই তত্ত্ব-দর্শনের সন্ধান লাভ করেন। পরে খ্রিস্টীয় সতেরো-আঠারো শতকে বৌদ্ধ সহজিয়াদের অনুকরণে এই মত সমাজে প্রচলিত হয়। এই মতের অনুসারীরা নিজেদের সহজ রসিক বা সহজ পথের পথিক মনে করে। এখানে ‘সহজ পথ’ অর্থ প্রেম, যা মানুষের সহজধর্ম। এই প্রেমসাধনায় সিদ্ধিলাভ করাই মানুষের শ্রেষ্ঠ পুরুষার্থ এবং তার জন্য মানবদেহই শ্রেষ্ঠ অবলম্বন। বৈষ্ণব সহজিয়াদের মূল আদর্শ রূপ-প্রেম-আনন্দ।

বৈষ্ণব সহজিয়াদের দার্শনিক মত ও সাধন-পদ্ধতি দুইই গৌড়ীয় বৈষ্ণবদের থেকে স্বতন্ত্র। এরা বিশ্বাস করে যে, সব তত্ত্ব-দর্শনই মানুষের দেহের মধ্যে বিরাজমান। গৌড়ীয় বৈষ্ণবরা পরকীয়া প্রেমকে সাধনার রূপক হিসেবে গ্রহণ করে, বাস্তব জীবনে নয়। কিন্তু সহজিয়া সাধকরা বাস্তব জীবনেও পরকীয়া প্রেমে বিশ্বাস করে। এদের বিশ্বাস, এর মধ্য দিয়েই সিদ্ধিলাভ সম্ভব।

সহজিয়া বৈষ্ণবগণ বৈষ্ণবমত ও রাধাকৃষ্ণতত্ত্ব একত্রে মিশিয়ে এবং নিমাই-নিতাইচাঁদের নাম স্মরণ করে প্রেমধর্মের এক বিচিত্ররূপ নির্মাণ করেছেন। তাঁদের সাধন-ভজনের দুটি দিক: একটি মনোমার্গে বৈদেহী সাধনা, অপরটি দেহমার্গে মহাসুখোপলব্ধি। সহজমতে প্রত্যেক নর-নারীর দৈহিক রূপের মধ্যেই তাদের স্বরূপ বা সহজরূপ নিহিত, যেমন নররূপে নর, স্বরূপে কৃষ্ণ এবং নারীরূপে নারী, স্বরূপে রাধা। এই রূপের মিলনের মধ্য দিয়ে যখন স্বরূপের মিলন ঘটে তখনই আসে অনাবিল আনন্দের অনুভুতি। এটাই মহাভাব বা সহজানন্দ।

বৈষ্ণব সহজিয়াগণ কামকে প্রেমে পরিণত করতে চান। তাদের মতে রস ও রতির প্রতীক কৃষ্ণ ও রাধার যে সহজ রসলীলা, তা শুধু স্বর্গের বস্ত্ত নয়, তার সঙ্গে মর্তেরও যোগ আছে। পৃথিবীর নরনারীও আরোপতত্ত্বের (রূপে স্বরূপের আরোপ, যেমন নর-নারীতে কৃষ্ণ-রাধার আরোপ) দ্বারা সীমাবদ্ধ মানবদেহেই সেই রসরতির অপার্থিব স্বরূপ উপলব্ধি করতে পারে। এই আরোপ সাধনার দ্বারা যখন স্বরূপের উপলব্ধি হয়, তখন নর-নারীর আকর্ষণে আর কাম থাকে না, তা প্রেমে পরিণত হয়। এভাবে মানবকেই দেবপীঠস্থানে তুলে ধরা সহজিয়া মতের প্রধান লক্ষ্য। তবে এ সহজ-সাধনা অত্যন্ত কঠিন। বৈষ্ণব সহজিয়াদের মতে সহজ-সাধনা হলো সাপের মুখে ভেক নাচানো, অর্থাৎ কাঙ্ক্ষিত বস্ত্ত পাওয়ার আশায় লোভনীয় বস্ত্ত সামনে থাকলেও লোভ সংবরণ করা। চন্ডীদাসের মতে এ সাধনায় সিদ্ধিলাভ হয় কোটিতে মাত্র গুটি কয়েকের।

পরকীয়া প্রেম বা দেহসাধনাকে প্রাধান্য দেওয়ার কারণে বৈষ্ণব সহজিয়ারা গৌড়ীয় বৈষ্ণবদের দৃষ্টিতে হেয় প্রতিপন্ন হয়। এ নিয়ে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে বেশ দূরত্বেরও সৃষ্টি হয় এবং সহজিয়াদের সামাজিক মর্যাদা অনেকাংশে ক্ষুণ্ণ হয়। স্বয়ং চন্ডীদাসকেও এজন্য ব্রাহ্মণ সমাজ ছাড়তে হয়েছিল। তা সত্ত্বেও পর্যায়ক্রমে এই সহজ-সাধনার প্রসার ঘটতে থাকে এবং এক সময় তা ঈশ্বর সাধনার অন্যতম পন্থা হিসেবে স্বীকৃত হয়।

বৈষ্ণব-সহজিয়া ধর্মকে কেন্দ্র করে মধ্যযুগের বাংলা ভাষায় এক বিশাল সাহিত্য গড়ে ওঠে। এর রচয়িতাদের মধ্যে  বড়ু চন্ডীদাস শ্রেষ্ঠ। তাঁর শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে বৌদ্ধ সহজযানের মূল সূত্রগুলি স্পষ্টভাবে বিধৃত। চন্ডীদাসসহ সহজিয়া মতের আরও অনেক কবি নিজেদের তত্ত্বসাধনা সম্পর্কে প্রহেলিকাপূর্ণ ভাষায় রাগাত্মক পদ (যে পদে বিশুদ্ধ অনুরাগকেই সাধ্য-সাধন বলে গ্রহণ করা হয়) রচনা করেছেন। এই রাগাত্মক পদাবলি মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক বিশেষ স্থানের দাবিদার।

বৈষ্ণব সহজিয়া সাহিত্যকে দুভাগে ভাগ করা যায় পদাবলি সাহিত্য ও নিবন্ধ সাহিত্য। পদাবলির রচয়িতারা হচ্ছেন  বিদ্যাপতিরূপ গোস্বামী প্রমুখ এবং বড়ু চন্ডীদাস,  কৃষ্ণদাস কবিরাজ প্রমুখ নিবদ্ধ রচয়িতা। অনেক পদকর্তা রচনার ভণিতায় নিজেদের নামের পরিবর্তে বিদ্যাপতি, চন্ডীদাস, নরহরি সরকার, রঘুনাথ দাস, কৃষ্ণদাস কবিরাজ, নরোত্তম দাস, রূপ গোস্বামী, সনাতন গোস্বামী, বৃন্দাবন দাস, লোচনদাস, চৈতন্যদাস প্রমুখ প্রাচীন কবির নামোল্লেখ করেছেন। বৈষ্ণব সহজিয়া সাহিত্যের উলে­খযোগ্য কয়েকটি রচনা হলো: বিবর্তবিলাস (অকিঞ্চন দাস), আনন্দভৈরব, অমৃতরসাবলী, আগমগ্রন্থ, প্রেমবিলাস (যুগলকিশোর দাস), রাধা-রস-কারিকা, দেহকড়চা (নরোত্তম দাস), সহজ-উপাসনা-তত্ত্ব (তরুণীরমণ), সিদ্ধান্তচন্দ্রোদয়, রতিবিলাসপদ্ধতি, রাগময়ীকণা, রত্নসার প্রভৃতি।  [আজহারুল ইসলাম এবং সমবারু চন্দ্র মহন্ত]