সহজযান


সহজযান মহাযান বৌদ্ধধর্মীয় একটি মতবাদ। খ্রিস্টীয় অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতকের মধ্যে এর বিকাশ ঘটে। এর মূল তত্ত্ব- কঠোর সাধনায় মুক্তি কামনার পরিবর্তে সদ্গুরুর নির্দেশ অনুযায়ী জীবন পরিচালনার মাধ্যমে পরম সুখ লাভ করা। এটি চিত্তের এমন এক অবস্থা, যেখানে সুখ ভিন্ন অন্য কোনো বিষয়ের অস্তিত্ব থাকে না। এ পরম সুখ সহজযানমতে কেবল গুরুর মাধ্যমেই লাভ করা যায়। এক্ষেত্রে গুরুই প্রধান এবং তাঁকে বলা হয় ‘বজ্রগুরু’। ‘বজ্র’ মানে শূন্য বা নিরাসক্তি, অর্থাৎ যিনি সাধনার দ্বারা চিত্তকে সর্ববিষয়ে নিরাসক্ত করেন তিনিই বজ্রগুরু। তবে সহজযানে যে পরম সুখের কথা বলা হয়েছে তা স্ত্রী-পুরুষ সংযোগজনিত সুখ। শরীরকে এখানে সাধনার ক্ষেত্ররূপে বিবেচনা করা হয়।

সহজযানীদের মতে সংসারও শূন্য, নির্বাণও শূন্য; পাপ-পুণ্য বলতে কিছু নেই। তাই সবই যখন শূন্য তখন উৎপত্তি নেই, নিবৃত্তিও নেই। এমনকি অন্যান্য মতবাদে যে চিত্তের কথা বলা হয়, তাও শূন্য। চিত্তের এই শূন্যতাই পরমার্থ বা নির্বাণ। নির্বাণে সকল ক্লেশের নাশ হয় এবং এর পরম ফল শান্তি। এ শান্তি গুরুর উপদেশ ছাড়া লাভ করা যায় না।

সহজযানে ইন্দ্রিয় নিরোধ, কঠোর ব্রত ধারণ ইত্যাদি নিয়ম পালন করা বৃথা। কারণ এতে শারীরিক কষ্ট হয় এবং মানসিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়। আর মন স্থির না থাকলে কখনই সিদ্ধি লাভ হয় না। তাই কঠোর নিয়মে নয়, অত্যন্ত সহজ পথে ইন্দ্রিয় ভোগের অবসান করতে হবে। পাঁচ ইন্দ্রিয়ের যে পাঁচটি বিষয় সেগুলিকে বলা হয় ভোগ বা কাম। সহজিয়ামতে তপস্যার দ্বারা নিজেকে কষ্ট না দিয়ে বরং ভোগের মাধ্যমে বোধির সাধনা করতে বলা হয়েছে। তাই সহজপন্থীদের মতে বোধিলাভের জন্য গুরুর অনুমতি সাপেক্ষে পঞ্চকামের উপভোগ করণীয়। যার এতে নিষ্ঠা নেই তার পক্ষে নির্বাণ লাভও সম্ভব নয়।

সহজিয়াদের এই ধর্মমত এক সময় বাংলায় প্রবলভাবে বিস্তার লাভ করেছিল, কারণ এর অনুসরণীয় রীতি-নীতি ছিল অত্যন্ত সহজ। তাছাড়া মানুষ যা চাইত, বজ্রগুরুরা তাই অনুমোদন করতেন। এই বজ্রগুরুদের আরেক নাম ছিল সিদ্ধাচার্য। জানা যায় এরূপ চুরাশিজন সিদ্ধাচার্য ছিলেন। তাঁরা কেবল বক্তৃতা, উপদেশ বা শাস্ত্রের ব্যাখ্যা দিয়েই নয়, বরং বিভিন্ন রাগ-রাগিণীর সুরে গান গেয়ে সাধারণ মানুষের কাছে সহজযানতত্ত্ব পৌঁছে দিতেন। তাঁদের এ গানগুলি রচিত হয়েছে রহস্যময় এক আলো-অাঁধারি ভাষায়, যা m®¬Åvfvlv নামে পরিচিত। এ ভাষা শোনামাত্র এক রকম অর্থবোধ হয়, আবার গূঢ়ভাবে চিন্তা করলে রহস্যময় অন্য অর্থ হয়। এই আলো-অাঁধারি ভাষাই বাংলা ভাষার আদি নির্দশন এবং এই ভাষায় রচিত হয়েছে  চর্যাপদ। আদি সিদ্ধাচার্য লুইপাকে বলা হয় বাংলা সাহিত্যের আদি কবি। বাংলার সাহিত্য ও ইতিহাসে সহজিয়াদের অবদান অত্যন্ত গৌরবের সঙ্গে স্মরণ করা হয়।  [সুমন কান্তি বড়ুয়া]