ধর্মঠাকুর


ধর্মঠাকুর  হিন্দুধর্মীয় দেবতাবিশেষ। তিনি সূর্যের প্রতীক এবং ধর্মরাজ নামেও পরিচিত। অন্যতম অনার্য দেবতা ধর্মঠাকুর প্রথমদিকে ছিলেন আদিবাসী কোমদের দেবতা; পরে সূর্য, বরুণ প্রমুখ বৈদিক দেবতার পর্যায়ে উন্নীত হয়ে আর্য-অনার্য উভয়ের উপাস্য দেবতায় পরিণত হন।

শস্য উৎপাদন ও প্রজননকে কেন্দ্র করে কতগুলি ঐন্দ্রজালিক বিশ্বাস ও ক্রিয়াকর্মের মধ্য দিয়ে ধর্মঠাকুরের উদ্ভব। কালক্রমে এর সঙ্গে যুক্ত হয় বহু বিচিত্র হিন্দু-বৌদ্ধ ধারণা ও আচার-অনুষ্ঠান। কৌম সমাজের নিকট পাহাড়, গাছ ও সাপ ছিল যথাক্রমে পৃথিবী, অরণ্য ও প্রজনন শক্তির প্রতীক।  রাঢ় অঞ্চলের অনার্য কোমরা এদের পূজা করত। তাদের জাদুবিশ্বাস ও জাদুকর্ম কতগুলি আর্য উপকরণের সঙ্গে মিলিত হয়েই এক সময় ধর্মঠাকুরে পরিণত হয়। তাই ধর্মঠাকুরের মধ্যে হিন্দুধর্মের সূর্য, সোম,  শিব, নারায়ণ; বৌদ্ধদর্শনের শূন্যতা ও করুণা সংক্রান্ত ধারণা এবং লৌকিক দেবী মনসার বৈশিষ্ট্য খুঁজে পাওয়া যায়।

ধর্মঠাকুর নিম্নজাতির পূজ্য দেবতা। হিন্দু সম্প্রদায়ের  ডোমবাগদি, হাড়ি প্রভৃতি শ্রেণির লোকেরাই বিশেষভাবে এঁর উপাসক। ধর্মঠাকুর কুষ্ঠব্যাধি নিরাময় করেন, ভক্তকে সন্তানের বরদান করেন এমন ধারণা তাঁর উপাসকদের মধ্যে প্রচলিত। ধর্মমঙ্গল কাব্যের রঞ্জাবতী তাঁর পূজা করে বীরপুত্র লাউসেনকে লাভ করে।

ধর্মঠাকুর শুভ্র নিরঞ্জন। আদিম লোকদের বিশ্বাস সূর্যের রং সাদা এবং তার বাহন ঘোড়ায় টানা রথ। এ থেকে সূর্যের প্রতীক ধর্মকেও মনে করা হয় শুভ্র এবং তাঁর পূজার সময় তাঁকে কাঠের ঘোড়ায় চড়ানো হয়। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে ধর্মঠাকুরের পূজার সময় মাটির ঘোড়া উপহার দেওয়ার প্রথাও প্রচলিত আছে।

ধর্মঠাকুরের বাহন সাদা ঘোড়া এবং সাদা ফুল তাঁর প্রিয়। তাঁর আসল প্রতীক পাদুকা। ধর্মপূজার সময় পুরোহিতরা গলায় একখন্ড পাদুকা বা পাদুকার মালা পরিধান করে। এ পূজার প্রধান পুরোহিত হচ্ছে ডোম; তবে কৈবর্ত, শুঁড়ি, বাগদি এবং ধোপাদের ভেতর থেকেও আজকাল ধর্মপন্ডিত বা পুরোহিত হতে দেখা যায়। বর্তমানে কোথাও কোথাও ধর্মঠাকুর শিব বা বিষ্ণুর সঙ্গে একীভূত হয়ে গেছেন।

ধর্মপূজা সাধারণত তিন প্রকারে অনুষ্ঠিত হয়: নিত্য, বারমতি এবং বাৎসরিক। নিত্যপূজা অনাড়ম্বর; তবে ঠাকুরের কৃপালাভে ধন্য ভক্তরা কিছুটা আড়ম্বরসহ তাঁর পূজা দিয়ে থাকে। বারমতি পূজা যেকোনো রবিবার (অঞ্চলভেদে শনি বা মঙ্গলবার) অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এ পূজায় সাদা রঙের পাঁঠা বা কবুতর বলি দেওয়ার রীতি আছে। বারমতি পূজা অনেকটা সার্বজনীন এবং তা বিখ্যাত কোনো স্থানকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত হয়। এজন্য কোনো একটি অঞ্চলের ১২টি স্থানে পূজিত ১২টি ধর্মশিলা বা ধর্মঠাকুরের প্রতীক কেন্দ্রীয় স্থানে স্থাপন করা হয় এবং ১২ দিন ব্যাপী এ পূজা অনুষ্ঠিত হয়। বাৎসরিক পূজা সমারোহের সঙ্গে অনুষ্ঠিত হয়। এ পূজায় বহু কৃত্য ও বিধিবিধান পালিত হয়। বাৎসরিক পূজা অনুষ্ঠিত হয় সাধারণত বৈশাখী পূর্ণিমায়। কোনো কোনো স্থানে চৈত্র বা জ্যৈষ্ঠ পূর্ণিমায়ও অনুষ্ঠিত হয়। এ পূজাকে ‘দেল’ বা ‘দেউল পূজা’ও বলে। এ উপলক্ষে কোথাও কোথাও ধর্মঠাকুরের  গাজন হয়।

ধর্মঠাকুরের মাহাত্ম্য প্রচারের উদ্দেশে মধ্যযুগে বিভিন্ন  মঙ্গলকাব্য রচিত হয়েছে; মঙ্গলকাব্যের একটি প্রধান শাখাই হলো ধর্মমঙ্গল। এ কাব্যে রাঢ়বাসীদের জীবনযাত্রা, বিশেষত ডোম নরনারীর বীরত্বের কাহিনী সুপরিস্ফুট হয়েছে।  চন্ডী ও মনসার মতো ধর্মঠাকুরকে কেন্দ্র করেও বাংলা ভাষায় এক বিরাট সাহিত্য গড়ে ওঠে। ধর্মঠাকুরের বিষয় অবলম্বনে ধর্মমঙ্গল ব্যতীত আরও এক ধরনের গ্রন্থ রচিত হয়েছে, যেগুলিকে বলা হয় ‘ধর্মপুরাণ’। তাতে ধর্মঠাকুরের উপাসকদের মতানুযায়ী বিশ্বসৃষ্টির কাহিনী, ধর্মপূজা প্রবর্তনের কাহিনী এবং ধর্মপূজার পদ্ধতি বর্ণিত হয়েছে।  [সমবারু চন্দ্র মহন্ত]