ডোম


ডোম  হিন্দু ধর্মের একটি অন্যতম নিম্ন বর্ণ। ডোমেরা মূলত মৃতদেহ পরিচর্যা, ব্যবচ্ছেদ ও সেলাই করা এবং ময়না তদন্তকাল পর্যন্ত তত্ত্বাবধানের কাজে জড়িত। এরা মৃতদেহ সৎকারের কায়িক কাজও করে থাকে।  বর্ণপ্রথার কারণে ‘অস্পৃশ্য’ হিসেবেই এরা চিহ্নিত। পূর্বে এই উপমহাদেশের বিভিন্ন অংশে তারা দড়ি, মাদুর, পাখা, ঝুড়ি তৈরি এবং ঝাড়ুদারের কাজ করতো। এক সময় ডোম নারীরা গান-বাজনা ও অভিনয় করতো।

বাংলাদেশে বাঙালি এবং অবাঙালি- এই দুই ধরনের ডোম আছে। অবাঙালি ডোমদের ব্রিটিশ শাসনামলের মাঝামাঝিতে বিভিন্ন কাজের জন্য ভারতের উত্তর প্রদেশ, অন্ধ্রপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, উড়িষ্যা, কুচবিহার, রাঁচি, মাদ্রাজ ও আসামের বিভিন্ন স্থান থেকে নিয়ে আসা হয়। অনেকের ধারণা মধ্যযুগে ডোমরা দাক্ষিণাত্য থেকে বাংলায় এসেছিল। ধারণা করা হয় যে, এরা ১৮৩৫-১৮৫০ এর দিকে ভারতের পাটনা এবং অন্ধপ্রদেশ থেকে এসেছে। চর্যাপদে ডোম শব্দের উল্লেখ আছে এবং এটা থেকে ধরে নেওয়া হয় যে, তারা এই বাংলায় বসবাস শুরু করে আর্যদেরও আগে। বর্তমানে সমাজ বিজ্ঞানী এবং বাম-রাজনীতিবিদগণ ধর্মীয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে অবহেলিত ও শোষিত শ্রেণীকে ‘দলিত’ অর্থাৎ নীপিড়িত বলে আখ্যায়িত করেন, কেননা সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে ডোমেরা উপরিশ্রেণীর সর্বনিম্নে অবস্থিত।

১৮৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত পোস্তগলা শ্মশানঘাটের পাশে এখনও ৭টি ডোম পরিবার আছে যারা ১৫০ বছর যাবত বংশ পরম্পরায় বসবাস করছে। ১৮৯১ সালের আদমশুমারিতে ডোমদের নমশুদ্র বলা হয়েছে। এর আগ পর্যন্ত এরা চাড়াল হিসেবে পরিচিতি ছিল। মহাত্মা গান্ধী এদেরকে হরিজন হিসেবে আখ্যায়িত করেন। ডোম নারীদের অনেকেই দাইয়ের কাজ করে থাকেন। ডোমদের বিবাহ, ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠান নিজস্ব নিয়মে পালিত হয়।

বাংলাদেশের প্রায় সব জেলায়ই ডোমদের বসতি রয়েছে। ২০০১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী বাংলাদেশে ডোমদের সংখ্যা ৩১৭,৩৩৭। বর্তমানে ডোমদের প্রধান কর্মক্ষেত্র বিভিন্ন হাসপাতাল। তাছাড়া এদের অনেকেই গৃহস্থালির জিনিসপত্র যথা কুলা, ঝুড়ি, সরপোস, ঢাকনা, ফুলরাখার ঝুড়ি, পাখা, খাঁচা, বড় বড় টুকরি, চাল ধোয়ার ডালা ইত্যাদি নির্মাণে কর্মরত থাকে।

অধিকাংশ ডোম ধর্মীয়ভাবে বৈষ্ণব মতের অনুসারী, কিন্তু আদর্শের প্রতীক ধর্মরাজ তাদের উপাস্য। তাদের প্রধান অনুষ্ঠান শ্রাবণী পূজা। এটা অনুষ্ঠিত হয় জুলাই এবং আগস্ট মাসে। পূজায় শূকরছানা বলি দেওয়া হয় এবং সেখান থেকে এক বাটি রক্ত সংগ্রহ করে আরেক বাটি দুধসহ তা দেবতা নারায়ণের উদ্দেশে উৎসর্গ করা হয়। আবার ভাদ্র মাসের অন্ধকার রাতে এক কৌটা দুধ, একটি নারকেল, এক ছিলিম তামাক ও অল্পপরিমাণ শন হরিরাম দেবতার উদ্দেশে উৎসর্গ করা হয়। এরপর তারা শূকর জবাই করে ভোজ উৎসবের আয়োজন করে।

তবে বর্তমানে মুসলিমরাও ডোমের কাজে আসছে। বাংলাদেশে বিভিন্ন হাসপাতালে কর্মরত ডোমদের একটা বড় অংশ মুসলমান যার কারণে বংশ পরম্পরায় তৈরি হওয়া জাত ডোমদের কাজের ক্ষেত্র সীমিত হয়ে আসছে।  [জোবাইদা নাসরীন]