চন্ডী


চন্ডী  হিন্দু দেবতা। তিনি দেবী দুর্গার রূপভেদ এবং ‘শক্তি’ নামে পরিচিত। মার্কন্ডেয়পুরাণ অনুসারে দেবী চন্ডী শুম্ভ, নিশুম্ভ নামে দু দানব এবং চন্ড ও মুন্ডসহ আরও অনেককে বধ করেন। চন্ডরূপ ধারণ করে দেবশত্রুদের বধ করেন বলে তাঁর নাম হয় চন্ডী। চন্ডীই যখন ভক্তের দুর্গতি বিনাশ করেন তখন তাঁকে বলা হয় দুর্গা। দুর্গারূপে তিনি মহিষাসুরকে বধ করেন।

বহু নামে ও রূপে চন্ডী পূজিত হন, যেমন: দেবীচন্ডী, মঙ্গলচন্ডী, জয়চন্ডী, ওলাইচন্ডী, কুলুইচন্ডী, চেলাইচন্ডী প্রভৃতি। জয়চন্ডীরূপে তিনি দ্বিভুজা, ত্রিনয়না, গৌরবর্ণা, বরাভয়হস্তা এবং পদ্মোপরি দন্ডায়মানা। মার্কন্ডেয়পুরাণে চন্ডী নামে একটি অধ্যায় আছে যার শ্লোকসংখ্যা সাতশ। এখানে দেবীচন্ডীর বিচিত্র রূপ ও মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে। দেবীপূজা, বিশেষত  দুর্গাপূজা উপলক্ষে কিংবা গৃহস্থের কল্যাণ কামনায় এক বা একাধিকবার চন্ডীপাঠের নিয়ম আছে।

মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে চন্ডীমঙ্গলের কাহিনীতে দুর্গা অর্থাৎ অরণ্যানী চন্ডীর মাহাত্ম্য গীত হয়েছে। এখানে তিনি অভয়া মঙ্গলচন্ডী নামে বর্ণিত। তাঁর বাহন গোধা বা গো-সাপ। বাংলার বিশেষত পশ্চিম বাংলার নারীসমাজে মঙ্গলচন্ডী গৃহকল্যাণের প্রধান দেবতা হিসেবে পূজিত হন। সধবা নারী জ্যৈষ্ঠ মাসের প্রতি মঙ্গলবারে ফলাহার করেন এবং দেবীর ব্রতকথা শ্রবণ করেন। এ ধারা বহু প্রাচীনকাল থেকেই চলে আসছে। ওই  সমাজে প্রত্যেক নববধূর একটি করে মঙ্গলচন্ডীর ‘ঝাঁপি’ থাকে। এটি দেবীর প্রতীক।

বাংলাদেশের লোকসমাজে চন্ডীকে বিভিন্ন রূপে কল্পনা ও বিশ্বাস করা হয়, যেমন: শেওড়া গাছে অধিষ্ঠিত দেবীকে বলা হয় বনদুর্গা, পাকুড় গাছে অধিষ্ঠিত দেবী ষষ্ঠী, বসন্তরোগের উপশমকারিণী দেবী বসন্তচন্ডী বা বসন চন্ডী ইত্যাদি। কোনো কোনো গ্রামের নামের সঙ্গেও চন্ডীদেবীর সম্পর্ক রয়েছে, যেমন: বোয়াঁই চন্ডী, সগড়াই চন্ডী ইত্যাদি। কোথাও বিশেষ কোনো বৃক্ষে কল্পিত চন্ডীর কাছে মানতের লক্ষ্যে একখন্ড বস্ত্র বেঁধে দেওয়ার রীতি প্রচলিত আছে। এখানে দেবী নেকড়াই চন্ডী নামে পরিচিত। আবার কোনো কোনো অঞ্চলে চন্ডী-অধিষ্ঠিত বৃক্ষের তলায় ঢিল বা ইটের টুকরা দিলেই তা পূজার সমতুল্য বলে গণ্য হয়। এখানে দেবী ইটাল চন্ডী বা হেঁটাল চন্ডী নামে পরিচিত। [পরেশচন্দ্র মন্ডল]